জাল টাকা তৈরির ভয়ঙ্কর চক্র

ঢাকা, বুধবার, ২ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

জাল টাকা তৈরির ভয়ঙ্কর চক্র

প্রীতম সাহা সুদীপ ৮:৫৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২০

print
জাল টাকা তৈরির ভয়ঙ্কর চক্র

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে দেশে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জালনোট তৈরির ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট। পুলিশ বলছে, চক্রটি সারা বছরই জাল টাকার ব্যবসা করে, তবে দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে তারা বিপুল পরিমাণ জাল টাকা তৈরি করে অভিনব পদ্ধতিতে বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছিল।

পুলিশ জানায়, এই চক্রের মূল হোতা হুমায়ুন কবির খান (৪৫)। তিনি এর আগে বিভিন্ন সময় র‌্যাব ও পুলিশের হাতে ছয়বার গ্রেফতার হন। প্রতিবারই জেল থেকে জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার একই কাজে জড়িয়েছেন। সর্বশেষ দেড় বছর আগে জেল থেকে বেরিয়ে আরও বড় পরিসরে একটি জাল টাকা তৈরির কারখানা গড়ে তোলেন হুমায়ুন।

গত রোববার দিবাগত রাতে মোহাম্মদপুর এলাকায় নূরজাহান রোডের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে হুমায়ুন কবিরের এই জাল টাকার কারখানার সন্ধান পায় মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।

অভিযানে কারখানার মালিক হুমায়ুন কবিরসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার অন্যরা হলেন- জামাল উদ্দিন (৪২), তাসলিমা আক্তার (৩০) ও সুখী আক্তার (৩০)। তাদের কাছ থেকে দুটি আসুস ল্যাপটপ, চারটি ইপসন প্রিন্টার, কয়েকটি কাটার, অনেকগুলো স্ক্রিন, ডাইস, নিরাপত্তা সুতা, বিভিন্ন রঙের কালি, আঠা, বিপুল পরিমাণ জলছাপযুক্ত বিশেষ কাগজসহ অন্যান্য সামগ্রী ও সফট ডাটা/কপি উদ্ধার করা হয়। যা দিয়ে আনুমানিক চার কোটি টাকার জালনোট তৈরি করা সম্ভব। এ ছাড়া বাসার বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রাখা কয়েক বান্ডিলে ৪৯ লাখ টাকার জাল নোট উদ্ধার করা হয়।

গতকাল এই চক্র সম্পর্কে ডিবি পুলিশ দৈনিক খোলা কাগজকে জানায়, জাল টাকা তৈরির অভিযোগে হুমায়ুন এর আগে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), ডিবি ও থানা পুলিশের হাতে ছয়বার গ্রেফতার হয়েছেন। জামালের নামে রয়েছে জাল টাকার দুটি মামলা।

ডিবি সূত্র আরও জানায়, হুমায়ুন ও জামাল ২০০৮ সালের দিকে নুরুল হুদা নামের এক কারিগরের কাছে জাল টাকা তৈরির কৌশল রপ্ত করেন। এরপর হুমায়ুন নিজেই জাল টাকা তৈরির কারখানা চালু করেন। জামাল শুরু থেকেই হুমায়ুনের তৈরিকৃত জাল টাকার ডিলার হিসেবে কাজ করে আসছে। চক্রটি সারা বছর ধরে জাল টাকা তৈরি করলেও আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে বেশ কয়েকদিন ধরে জোরেসোরে জাল টাকা তৈরি করে আসছিল।

কারখানার মালিক হুমায়ুন তাদের সহযোগী হিসেবে ১৫ হাজার টাকা এবং ১০ হাজার টাকা বেতনে দুই নারীকে চাকরি দিয়েছিলেন। তাদেরকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তাসলিমা আক্তারের স্বামী সাইফুল ইসলাম গত জানুয়ারি মাসে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে জেলে আছেন।

দীর্ঘ ১২ বছর ধরে জাল টাকার ব্যবসা করে আসা হুমায়ুন দেড় বছর আগে জেল থেকে জামিনে ছাড়া পেয়ে আরও বড় আকারে জাল টাকা তৈরির এই কারখানা স্থাপন করেন। তার আরেক ভাই কাওসারও জাল টাকার কুখ্যাত ব্যবসায়ী। বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, এই চক্রের মূল হোতা হুমায়ুন প্রথমে পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে প্রতি লাখ জাল টাকা ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করে। পরে পাইকারী বিক্রেতারা প্রথম খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে তা ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকায় বিক্রি করে। প্রথম খুচরা বিক্রেতারা এসব জাল টাকা দ্বিতীয় খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায়। মাঠ পর্যায়ে দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতার হাত ধরে সেই টাকার মূল্য হয়ে যায় আসল টাকার সমান। মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য বা দ্রব্যাদি ক্রয়ের মাধ্যমে এই জাল টাকা বাজারে ছড়িয়ে দেয়।

ডিবি পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, চক্রটি ঢাকায় বসে জাল টাকা তৈরি করলেও দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারি এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে ১০ হাজার টাকায় প্রতি বান্ডিল জাল টাকা বিক্রি করতেন। তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। চক্রটির অন্য সদস্যদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যহত রয়েছে।