মনোনয়ন নিয়ে বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

মনোনয়ন নিয়ে বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল

মাহমুদুল হাসান ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০

print
মনোনয়ন নিয়ে বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল

আন্দোলনে মাঠে শক্তিমত্তা দেখাতে না পারলেও দলীয় সমর্থন নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে দলের নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৈরি করেছে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। যা নিয়ে দলের হাইকমান্ডও ক্ষুব্ধ। ফলে গুলশানে মারামারির ঘটনায় জড়িতরা দলের সাংগঠনিক শাস্তির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ‘উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন’ তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। আসন্ন উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার ঘিরে সম্প্রতি গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে চার প্রার্থীর সমর্থকদের মারামারির ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন মারাত্মকভাবে আহত হন। দুজনের মাথা ফেটে যায়। এর মধ্যে কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও টঙ্গী হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ঘটনার পর থেকে ঢাকা-১৮ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী দুই প্রার্থী তাদের নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে দলের হাইকমান্ড বরাবর চিঠি দিয়েছেন। নিজেদের মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে নিজ সংসদীয় আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী, বিএনপি ও অঙ্গ দলগুলোর নেতাদের সমর্থন নিয়ে চিঠিতে সংযুক্ত করা হয়। এছাড়া মারামারির ঘটনার ভিডিও ফুটেজও বিএনপির হাইকমান্ড সংগ্রহ করেছে। 

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গুলশান কার্যালয়ের সামনে প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে তা দুঃখজনক। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত শনিবার বিকালে গুলশান কার্যালয়ে ২৮ প্রার্থীর সাক্ষাৎকারকে ঘিরে প্রথম দফায় ঢাকা-৫ এর মনোনয়নপ্রত্যাশী নবী উল্লাহ নবী ও সালাহ উদ্দিনের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। এরপর কিছুক্ষণ পরই ঢাকা-১৮ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন ও এম কফিল উদ্দিন আহম্মেদের কর্মী-সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। এ ঘটনায় রক্তারক্তি হয়। সাক্ষাৎকার শেষে কফিল উদ্দিন আহম্মেদ ও এস এম জাহাঙ্গীর কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছি। আমাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। একক প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় যে কোনো সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নেব।

নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ প্রসঙ্গে দুই নেতা বলেন, এ সময় আমরা কার্যালয়ের ভিতরে ছিলাম। বাইরে কী হয়েছে হাইকমান্ড খোঁজ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, এ ঘটনার সময় আমরা ভিতরে ছিলাম। কার্যালয়ে বাইরে সবার কর্মী-সমর্থকরা ছিলেন। কীভাবে এটা হলো তার বিস্তারিত আমি বলতে পারব। তবে এ ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক।

তিনি বলেন, এখানে যারা ছিল তারা বিএনপির কর্মী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কর্মী। ঘটনা যেহেতু ঘটে গেছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী এম কফিল উদ্দিন আহম্মেদ দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, আমার প্রায় ১৯ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং টঙ্গী হাসপাতাল ও বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিয়েছেন। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চেয়ে চিঠি দিয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে ভার্চুয়াল মাধ্যমে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরেছি। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার গুলশান কার্যালয়ের সামনে মারামারির ঘটনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু।

ঢাকা-১৮ আসনের উপ-নির্বাচনে বিএনপির সাত মনোনয়ন প্রত্যাশী অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী এস এম জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন। জাতীয় সংসদের চারটি আসনের উপনির্বাচনে গত শনিবার বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে হামলা ও আহত করার ঘটনায় এস এম জাহাঙ্গীরকে অভিযুক্ত করে সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন তারা। এ আসনে বিএনপির ৯ নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী। এর মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন, কফিলউদ্দিন আহমেদ, ইসমাইল হোসেন, আক্তার হোসেন মোস্তফা কামাল, বাহাউদ্দিন সাদী ও আব্বাসউদ্দিন লিখিতভাবে এ অভিযোগ করেন।
অভিযোগে বলা হয়, এস এম জাহাঙ্গীরের বাহিনী লাঠি-সোঁটাসহ এম কফিল উদ্দিনের সমর্থকদের ওপর বর্বরোচিত হামলা করে।

এতে বিএনপি নেতা নাজিম উদ্দিন, এস এম রাজ্জাক বকুল, ইয়াকুতুর রহমান, রায়হান, আব্দুর রাজ্জাক, সুলতান, বকুল ম-ল, মাসুদ মিয়া, মহিউদ্দিন, বদরুল আলমসহ আরও বেশ কয়েকজন মারাত্মক আহত হন। লিখিত অভিযোগে নেতৃবৃন্দ হামলার ঘটনায় বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ ও ছবি সংযুক্ত করেছেন। এরকম সংযুক্তিতে আরও বলা হয়, হামলায় লাঠি হাতে নেতৃত্ব দেন এস এম জাহাঙ্গীরের শ্যালক ছাত্রলীগ নেতা দিপু সিকদার।

এস এম জাহাঙ্গীরের আরেক শ্যালক উত্তরা পূর্ব থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক অপু সিকদার এবং আহম্মেদ আলী সাগর, দক্ষিণখান থানা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি আল আমিন সরকার, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুমের ঘনিষ্ঠভাজন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন রুবেল এবং এস এম জাহাঙ্গীরের নিজ এলাকা শরীয়তপুরের ছেলে মনিরুল ইসলাম সোহাগ এ হামলায় নেতৃত্ব দেন। এছাড়া গুলশান কার্যালয়ে প্রবেশের সময় কার্যালয়ের গেটে মনোনয়ন প্রত্যাশী মোস্তাফিজুর রহমান সেগুনকে এস এম জাহাঙ্গীরের সমর্থকরা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

মনোনয়ন প্রত্যাশী সাত নেতা ঢাকা-১৮ এর নির্বাচনের তফসিল নভেম্বর মাসের আগে ঘোষণা হচ্ছে না বলে সময় নিয়ে হলেও এই তদন্ত প্রতিবেদন সম্পন্ন হওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা ও বহিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত প্রার্থিতা ঘোষণা না করার জন্য অনুরোধ জানান। এস এম জাহাঙ্গীরও ঢাকা-১৮ আসনের বিএনপি-অঙ্গ দলগুলোর সমর্থনে স্বাক্ষর সংবলিত চিঠি বিএনপি মহাসচিব বরাবর জমা দেন।

এদিকে ঢাকা-৫ আসনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নবী উল্লাহ নবী। তিনি নিজেদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পার্লামেন্টারি বোর্ডের সদস্যদের ইঙ্গিত করে বিরূপ মন্তব্য করেন। এই দলের বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন নিজের সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে নবী উল্লাহ নবীর মন্তব্য শেয়ার করে এর জবাবে প্রতিবাদসহ প্রার্থী বাছাই সংক্রান্ত করণীয় নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।