উজানে হাঁটছে আ.লীগ

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

উজানে হাঁটছে আ.লীগ

শফিক হাসান ১০:৫৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০১৯

print
উজানে হাঁটছে আ.লীগ

দেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ছিল প্রতিকূল পথের যাত্রী; বর্তমানেও দলটি উজানে হাঁটছে। দল গোছাতে, বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে স্বচ্ছ ব্যক্তিদের বাছাই করে স্থান করে দেওয়ার দিকেই সর্বাধিক মনোযোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চলমান শুদ্ধি অভিযান সেই লক্ষ্যেরই ইঙ্গিত।

আওয়ামী লীগের চারটি সহযোগী সংগঠনের মধ্যে তিনটিরই জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সম্মেলন সরাসরি তত্ত্বাবধান করেছেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক স্বচ্ছ নেতৃত্বের হাতেই দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন তারা।

খুব বেশি পরিচিত মুখ নবনির্বাচিতদের কেউই নন। যার সর্বশেষ নজির মিলেছে গতকাল শনিবার স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনেও। সহযোগী এ সংগঠনের নতুন সভাপতি হয়েছেন নির্মল রঞ্জন গুহ, সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান বাবু। আগের কমিটিতে নির্মল ও বাবু উভয়েই ছিলেন সহসভাপতি।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া শুদ্ধি অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে যুবলীগ, কৃষক লীগের কয়েকজন শীর্ষনেতাকে। এরপর একের পর এক অভিযানে দুর্নীতিবাজ নেতাকর্মীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়েছে। এদের কেউ কেউ বিদেশে পালিয়ে গেছেন, অনেকেই গোপনে দেশত্যাগের পাঁয়তারা করছেন।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর হাতে শুদ্ধি অভিযানের চাবিকাঠি থাকায় কেউ আগ থেকে ধারণা করতে পারছেন না কে হবেন পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু! বঙ্গবন্ধুকন্যার এমন অবস্থান প্রশংসিত হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন, চারদিকে গিজগিজ করা ইতর শ্রেণির লোকজন নিয়ে শেখ হাসিনার উজানে পথপরিক্রমার ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়াবে।

অন্যদিকে অকুতোভয় বঙ্গবন্ধুকন্যা সব জেনে বুঝে শুনেই নিয়েছেন এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। স্বচ্ছতার প্রশ্নে তার আপসহীন মনোভাবের প্রভাবই পড়ছে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সম্মেলনে। ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলন। আগামী ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য যুবলীগের সম্মেলনের জন্য অপেক্ষা করছেন অনেকেই। সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্মেলন শেষে আগামী ২০-২১ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন। সেখানেও থাকতে পারে পরিচ্ছন্ন ইমেজের নেতাকর্মীর আধিক্য।

আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর কাউন্সিলের মাধ্যমে দলটিতে আসন্ন পরিবর্তন বোঝা যাচ্ছে কিনা প্রশ্ন করা হয় লেখক-বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদকে। গতকাল তিনি খোলা কাগজকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের যে সহযোগী সংগঠনগুলোর নির্বাচন হলো, তা নিচের দিকের সদস্যদের ভোটে হয়নি। নির্বাচনে আগের বিতর্কিত অনেকেই বাদ গেছে সত্য; কিন্তু যে কোনো সংগঠনেরই নির্বাচন হওয়া উচিত কাউন্সিলরদের ভোটে। এখন আমাদের দেশে যেটা হচ্ছে, উপস্থিত মনোনয়ন দিয়েই নির্বাচন করা হয়।’

খ্যাতনামা এ রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘একটা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে পেশাজীবী সংগঠন বা রাজনৈতিক দল হোক সব জায়গাতেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হওয়া উচিত। কে স্বচ্ছ আর কে অস্বচ্ছ, কেন জনপ্রিয় নেতা, কে জনপ্রিয় নন এটা নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। সে জন্য আমি মনে করি, প্রত্যেকটি জায়গায় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচনের মাধ্যমে কর্মকর্তা নির্বাচন করা বাঞ্ছনীয়।’

পরামর্শ দিয়ে সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘উদাহরণস্বরূপ সাংবাদিক ইউনিয়ন আছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সমিতি আছে, ব্যবসায়ীদের সংগঠনও রয়েছে- এদের আদলেই নির্বাচন হওয়া উচিত। তাতে সত্যিকারের নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে। তা না হলে- ব্যক্তি সৎ কী অসৎ সেটা বড় কথা নয়, সংগঠনের সদস্যরা তাকে সমর্থন করে কিনা সেটা বোঝা যায় না। প্রমাণও হয় না তার গ্রহণযোগ্যতা। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, হয়তো এদের কেউই বিতর্কিত নন কিন্তু পদ্ধতি হওয়া উচিত গোপন ভোটে।’

ধারণা করা হচ্ছে, দলের নিজস্ব পদ্ধতিতেই অনুষ্ঠিত হবে আসন্ন যুবলীগের সম্মেলন। এখানেও দেখা মিলতে পারে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের। এরা তুলনামূলক কম পরিচিত হতে পারেন তবে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির অধিকারী। এমন ধারণাই পোষণ করছেন কৌতূহলীরা। ইতোমধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মন্তব্য করেছিন, যুবলীগের নেতৃত্ব আসবে ছাত্রলীগ থেকে।

ইতিপূর্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে বাদ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে। প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্ত প্রশংসিত হয়েছে। এ দুজনের প্রতি বিতৃষ্ণা প্রকাশ করে তিনি পরোক্ষভাবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছিলেন।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর উষ্মা প্রকাশের পর ১৮ সেপ্টেম্বরে ধরা হয় অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা পরিচালনাকারী খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। এরপর পর্যায়ক্রমে আটক করা হয় যুবলীগ নেতা জি কে শামীম, ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, এনামুল হক আরমান, কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ, বিসিবির পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান, কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান পাগলা মিজান ও তারেকুজ্জামান রাজীবসহ কয়েকজনকে।

৭১ বছর বয়সী যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীসহ অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন গডফাদারদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে পরিচালনা করে আসছিলেন তারা। ক্যাসিনোকাণ্ডে সাবেক মন্ত্রী এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের নাম বেরিয়ে এলেও তিনি শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন। অভিযোগ উঠেছে জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধেও।

ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরীও যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আনা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। ইতোমধ্যে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে কয়েকজন নেতাকর্মীকে।

গতকাল স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনে বাদ পড়েছেন ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত আগের কমিটির সভাপতি মোল্লা মোহাম্মদ আবু কাওছার ও সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ। তারা প্রায় সাত বছর সংগঠনটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। গতকাল সম্মেলনের পর নবনির্বাচিত সভাপতি নির্মল বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। সারা দেশে স্বেচ্ছাসেবক লীগকে সুসংগঠিত রাখব। নতুন সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান বাবু বলেন, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব।

গত ৬ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত কৃষক লীগের সম্মেলনে সভাপতির দায়িত্ব পান সমীর চন্দ, সাধারণ সম্পাদক উম্মে কুলসুম। এই কমিটির মেয়াদ তিন বছর। সর্বশেষ ২০১২ সালের ১৯ জুলাই কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন হয়। এই কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয় ২০১৫ সালের জুলাইয়ে।

গত ৯ নভেম্বরে শ্রমিক লীগের নতুন সভাপতি নির্বাচিত হন ফজলুল হক মন্টু, সাধারণ সম্পাদক কে এম আজম খসরু। কার্যকরী সভাপতি হন মোল্লা আবুল কালাম আজাদ। মন্টু আগের কমিটির কার্যকরী সভাপতি, খসরু প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, আজাদ সহসভাপতি ছিলেন।

নতুন সভাপতি মন্টু বলেন, শ্রমিক লীগের সভাপতি পদে দায়িত্ব সততা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব। আজম খসরু বলেন, সারা দেশে শ্রমিক লীগ সুসংগঠিত করে রাখতে কাজ করব। প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বাস অক্ষু্ণ্ন রাখব। প্রায় আট বছর পর শ্র?মিক লীগের এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সম্মেলন হয় সর্বশেষ ২০১২ সালে। তখন সভাপতি হন শুকুর মাহমুদ, সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম। ৩ বছরের এই কমিটি চলেছে প্রায় ৮ বছর।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ সাধারণ মানুষ বলছেন, সহযোগী সংগঠনগুলোর নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিগত কমিটির তুলনায় ভালো। তবে তাদের সুযোগ দিলে আরও পরেই বোঝা যাবে তারা সত্যিকার অর্থে কতটা সৎ, দক্ষ ও যোগ্য। ধারণা করা হচ্ছে, চলমান শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকলে সেটা হবে সবার জন্যই ‘লেসন’। অন্যায় করে পার পাওয়ার সুযোগ থাকছে না আওয়ামী লীগে। দলটির বর্তমান উজানে চলা নীতি সেই অবস্থানই পরিষ্কার করে চলেছে!