রাঙ্গার ধৃষ্টতায় সর্বত্রই ক্ষোভ

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

নূর হোসেনকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য

রাঙ্গার ধৃষ্টতায় সর্বত্রই ক্ষোভ

হাসান ওয়ালী ১০:৩২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৯

print
রাঙ্গার ধৃষ্টতায় সর্বত্রই ক্ষোভ

স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন তার অমর কবিতা ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’। সত্যিকারার্থেই বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে বাংলাদেশের হৃদয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। জীবন দিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক হয়ে আছেন শহীদ নূর হোসেন।

শ্রমজীবী মহান এই তরুণের আত্মদানের দিন রোববার যখন তাকে স্মরণ করছে জাতি, ঠিক সেদিনই ‘মাদকাসক্ত’ অপবাদ দিয়ে তাচ্ছিল্য করেছেন জাপা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। তার এ বিতর্কিত মন্তব্যে ক্ষোভ ছড়িয়েছে সর্বত্রই। নূর হোসেনকে নিয়ে রাঙ্গার বক্তব্যকে চরম ‘ধৃষ্টতা’ বলছেন তারা। আর বিশ্লেষকরা বলছেন, নূর হোসেনকে শহীদ করেছিলেন স্বৈরাচার এরশাদের সরকার, আর তারই প্রতিষ্ঠিত দলের নেতা তাকে আরেকবার ‘খুন’ করলেন। রাঙ্গাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি তাদের।

গত রোববার জাতীয় পার্টির মহানগর উত্তর শাখার এক আলোচনা সভায় নূর হোসেনকে নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নাচানাচি করে মন্তব্য করে দলটির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কাকে হত্যা করলেন। নূর হোসেনকে? নূর হোসেন কে? একটা অ্যাডিকটেড ছেলে। একটা ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর।’

রাঙ্গার এ বক্তব্যে সমালোচনার ঝড় বইছে। অফিস-আদালত থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম- সবখানেই চলছে আলোচনা। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, নূর হোসেনকে ইয়াবা-ফেনসিডিল খোর আখ্যা দিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা চরম মিথ্যা বলে স্পর্ধার সীমা লঙ্ঘন করেছেন। তারা বলছেন, নূর হোসেন ১৯৮৭ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়ার দশ বছর পর ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে ইয়াবার আবির্ভাব ঘটে। রাঙ্গার এ বক্তব্য তার স্বৈরাচারী মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে।

এদিকে এ ঘটনায় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের ভূমিকা নিয়েও চলছে সমালোচনা। নাট্যকার ও নাট্য নির্দেশক মাসুম রেজা রাঙ্গার বক্তব্যে আওয়ামী লীগ নেতারা প্রতিবাদ না জানানোয় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতারা বঙ্গবন্ধুকন্যা হাসিনা হাসিনা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন অথচ শেখ হাসিনা যাকে জামা পরে নিতে বলেছিলেন আর যে বলেছিল আপনি আমার মাথায় হাত দিয়ে দেন.. সেই নূর হোসেনকে যখন ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগী চাঁদাবাজ রাঙ্গারা ইয়াবাখোর বলে আখ্যায়িত করছে, তখন চুপ করে থাকছেন সেই নেতারা.. ধিক এই রাজনীতিকে ধিক..’

নূর হোসেন পেশায় ছিলেন একজন ড্রাইভার। আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন প্রাণের তাগিদে; গণতন্ত্রের জন্য। দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য তিনি জীবন দিয়েছেন। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে বুকে ও পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে জীবন্ত পোস্টার হয়েছিলেন তিনি। ছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী মিছিলের পুরোভাগে। জিরো পয়েন্টেই এরশাদের লেলিয়ে দেওয়া পুলিশ নূর হোসেনকে ওইদিন গুলি চালিয়ে হত্যা করে।

নূর হোসেনকে দ্বিতীয়বার হত্যা করল : সৈয়দ আবুল মকসুদ, লেখক-বুদ্ধিজীবী
লেখক-বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদ খোলা কাগজকে বলেন, ‘নূর হোসেনকে তখনকার স্বৈরশাসক একবার শহীদ করেছে। এইবার সেই শাসকের দল তাকে দ্বিতীয়বার হত্যা করল। নূর হোসেনের চরিত্র এইভাবে হরণ করা যে কত বড় রকমের নিষ্ঠুরতা এবং পরিহাস, সেটি যিনি বলেছেন তার কিছুটা হলেও উপলব্ধি করা উচিত ছিল। একজন গণতন্ত্রকামী মানুষকে তারা হত্যা করেছে এবং এতদিন পর তার চরিত্র হরণ করে যে শুধু তাকে অপমান করা তা না, দেশের সমস্ত গণতন্ত্রকামী মানুষের অনুভূতিকে আঘাত দিয়েছেন। একজন শহীদ সম্পর্কে এই ধরনের মন্তব্য করা অত্যন্ত জঘন্য কাজ।’

রাঙ্গাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে : ডা. মুশতাক হোসেন, সাবেক জিএস, ডাকসু

ডাকসুর সাবেক জিএস ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতা ডা. মুশতাক হোসেন খোলা কাগজকে বলেছেন, ‘সরকার বিভিন্ন ইস্যুতে কুৎসা রটনাকারীদের শাস্তির আওতায় এনে থাকেন। তাদের অজামিনযোগ্য শাস্তি হয়। কিন্তু একজন শহীদ, যিনি সর্বজনীনভাবে শ্রদ্ধেয়, ওই সময় যারা ভিন্ন ভূমিকা পালন করেছে তাদের পক্ষ থেকে এতদিন পর নূর হোসেনকে নিয়ে এই ধরণের স্পর্ধামূলক বক্তব্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের চ্যালেঞ্জ করছে।

এটিকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া যায় না। তার শাস্তি হওয়া উচিত। তার এই কটূক্তি কোনো রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের কটূক্তি না। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাইলফলক শহীদ নূর হোসেনের আত্মত্যাগ। তাকে চ্যালেঞ্জ করা মানে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা। কাজেই কটূক্তিকারীর যথোপযুক্ত শাস্তি হওয়া দরকার।’