সম্রাট থেকে মোল্লা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্রাট থেকে মোল্লা

শফিক হাসান ১১:০৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০১৯

print
সম্রাট থেকে মোল্লা

শুদ্ধি অভিযানের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ সাজার মুখোমুখি হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার। বুধবার তাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই অব্যাহতি। প্রধানমন্ত্রী নিজের ঘরের মধ্য থেকে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যারাই অভিযুক্ত হবে, যারাই দুর্নীতির সঙ্গে, সন্ত্রাস ও মাদকের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তাদের কেউ ছাড় পাবে না।’ ক্যাসিনোগুরু সম্রাট থেকে ক্যাসিনো কারবারি মোল্লা কাওছার- বাদ যাচ্ছেন না কেউই। অভিযুক্তরা একের পর এক আসছেন আইনের আওতায়। মাঝখানে কৌশলগত অভিযান ঢিমেতালে চললে কেউ কেউ সমালোচনায় বলেছিলেন, এখানেই শেষ!

‘শুদ্ধি অভিযান’ যে শেষ নয়, প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি একচুলও- সেটাই দেখছে দেশবাসী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৪ সেপ্টেম্বর শুদ্ধি অভিযানের ইঙ্গিত দেন। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে প্রথমে আটক হন ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবের সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। পর্যায়ক্রমে ক্যাসিনোকাণ্ডে বেরিয়ে আসে আরও নাম।
যুবলীগ নেতা ও টেন্ডার মোগল জি কে শামীম, কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ, বিসিবি পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান, এনামুল হক আরমানসহ কয়েকজনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বেরিয়ে আসে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসায় আশ্রয়-প্রশ্রয় দানকারী গডফাদারদের নামও। গডফাদারদের কেউ কেউ এখনও ‘সুরক্ষিত’ অবস্থায়।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে গ্রেফতারের মাধ্যমে ক্যাসিনো-কাহিনীতে আসে নতুন মোড়! খালেদের পর সম্রাটও জিজ্ঞাসাবাদে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেন! সম্রাট জানান, তিনি সব জায়গায় চাঁদা পৌঁছে দিতেন। তাহলে কেন তাকে একাই গ্রেফতার হতে হবে!

বর্তমানে গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগছেন আড়ালের গডফাদাররা। বিদেশ পালানোর পাঁয়তারা করলেও বিমানবন্দরসহ সীমান্ত এলাকায় সতর্কতা জারিতে তা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুজন সংসদ সদস্যসহ ২২ জনকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

যুবলীগের পদ-পদবি ব্যবহার করে সম্রাটসহ কয়েকজন নেতা কায়েম করেছেন ত্রাসের রামরাজত্ব। আর্থিক সুবিধা নিয়ে দুর্নীতিবাজ নেতাকর্মীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে গেছেন সংগঠনটির সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান ৭১ বছর বয়সী ওমর ফারুক চৌধুরী। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বিব্রত হয়েছে দলের নেতাকর্মীদের এমন কাণ্ডে। অতিষ্ঠ হয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ‘ফাইনাল অ্যাকশনে’ নামেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ বহিষ্কার করা হয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে। এরপরই শুদ্ধি অভিযানের চাকা ঘোরে যুবলীগসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর দিকে। আটককৃত সবার মুখেই শোনা যেত সম্রাটের নাম। সত্যিকার অর্থে অপরাধজগতের ‘সম্রাট’ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। যাপন করেছেন সম্রাটেরই জীবন। দেশে ক্যাসিনোর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করলেও নিজে জুয়া খেলতেন সিঙ্গাপুরে। সেখানে তিনি ভিআইপি জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত।

সেবামূলক প্রতিষ্ঠান আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের নির্মাণাধীন ভবন থেকে চাঁদা দাবি করে প্রত্যাশিত চাঁদা না পেয়ে বন্ধ করে দেন নির্মাণকাজ। খবরটি শুনে প্রধানমন্ত্রী মর্মাহত হয়ে বলেছিলেন, যে প্রতিষ্ঠানে আমি ও রেহানা (বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা) জাকাত দিই, সেখান থেকে সম্রাট চাঁদা দাবি করে! প্রধানমন্ত্রী সম্রাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকা নিয়েছিলেন। শেষপর্যন্ত স্বেচ্ছাচারিতার মাশুলও গুনতে হয়েছে ফারুককে। হারিয়েছেন গণভবনে প্রবেশের অধিকার ও চেয়ারম্যানের পদ। স্ত্রী-ছেলেসহ নিজের ব্যাংক লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে ফারুকের দেশত্যাগে।

২০১২ সালের জুলাইয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে মোল্লা কাওছার সভাপতি এবং পংকজ দেবনাথ সাধারণ সম্পাদক হন। ক্যাসিনোকাণ্ডে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সঙ্গে সম্পৃক্ততা মেলে তার। যদিও তিনি দাবি করেছেন, ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, ক্যাসিনোয় জড়িত নন।

অব্যাহতির বিষয়ে বুধবার মোল্লা কাওছার বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে মায়ের মতো শ্রদ্ধা করি। তার কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছি। রাজনীতি করতে গিয়ে ভুল-ত্রুটি থাকতেই পারে। অব্যাহতি দেওয়া হলে আমার কীইবা করার থাকতে পারে।’ এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল কাওছার ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছে।

২২ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে দুদক বুধবার এ-সংক্রান্ত চিঠি পুলিশের বিশেষ শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) বরাবর পাঠিয়েছে। সংস্থাটির পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়- সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দেশে মানিলন্ডারিংসহ বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ আছে। অভিযোগ-সংশ্লিষ্টরা দেশ ছেড়ে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তারা যাতে দেশ ছাড়তে না পারেন, কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন- ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন, চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরী, গ্রেফতার হওয়া যুবলীগ নেতা জি কে শামীম, যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, মোহামেডান ক্লাবের ডাইরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, বহিষ্কৃত ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি সম্রাট, সম্রাটের সহযোগী এনামুল হক আরমান, কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ, অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান (মিজান), গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু ও তার ভাই গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রুপন ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় যুবলীগের বহিষ্কৃত দফতর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান ও তার স্ত্রী সুমি রহমান, লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার স্ত্রী নাবিলা লোকমান, গণপূর্ত অধিদফতরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল হাই, ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদার।

নিষেধাজ্ঞায় আরও রয়েছেন- এনামুল হকের সহযোগী ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের কর্মচারী আবুল কালাম আজাদ (আজাদ রহমান), রাজধানীর কাকরাইলের জাকির এন্টারপ্রাইজের মালিক জাকির হোসেন ও সেগুনবাগিচার শফিক এন্টারপ্রাইজের মালিক শফিকুল ইসলাম। দুদক জানায়, আগামী কয়েক দিনে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আরও অনেকেই আসবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে কঠোর অবস্থানে, তার প্রকৃষ্ট নজির যুবলীগের সম্রাট থেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কাওছারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। আত্মীয়দের কেউ যদি এ সব দুর্নীতি আর অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকে তারাও রেহাই পাচ্ছেন না। সম্মেলনকে সামনে রেখে গণভবনে যুবলীগের সভায় নিজের দুই আত্মীয় সেখানে প্রবেশের অনুমতি পাননি। নাম ভাঙিয়ে কেউ যেন অপরাধ করতে না পারেন, এ জন্য পরিবারের সদস্যের নামও প্রকাশ করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

জানা গেছে, ক্যাসিনোকাণ্ডে সম্রাটের মূল খুঁটি হিসেবে কাজ করছেন ৭ জন; আর নিয়মিত টাকা দিতেন ২৫ জনকে। এ তালিকায় রয়েছেন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে হোমরাচোমরাও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রথম ধাপে চুনোপুঁটি ধরা চলছে, রুই-কাতলারাও আসবে শিকারের আওতায়!

ক্যাসিনো খালেদকে আটকের পর আলোচনায় আসেন সাবেক মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের নাম। ফকিরাপুল ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে তাকে সভাপতি করা হয়েছিল। সেখানে রমরমা ক্যাসিনো বাণিজ্য চলত। তবে বর্ষিয়ান রাজনীতিক মেনন শুরু থেকেই ক্যাসিনোর বিষয়ে কিছু জানতেন না বলে জানিয়ে আসছেন।

সম্প্রতি বরিশালে তার একটি বক্তব্যে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এরপর সেই বক্তব্য থেকে সরে এসেছেন ‘নতুন’ বক্তব্য দিচ্ছেন। এ বিষয়ে গতকাল ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ইউটার্ন নিয়েছেন মেনন’! ক্যাসিনোসহ আরও নানা অপকাণ্ডে অনেকেই ‘টার্ন’ নেওয়ার অপেক্ষায়।