ওয়ার্কার্সের বোঝা এমপিরাই

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯ | ২৮ কার্তিক ১৪২৬

ওয়ার্কার্সের বোঝা এমপিরাই

সাইদ রহমান ১০:৫১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০১৯

print
ওয়ার্কার্সের বোঝা এমপিরাই

কমরেড অমল সেনের মতো নেতার হাত ধরে যে দলের যাত্রা, সেই ওয়ার্কার্স পার্টি এখন লেজেগোবরে। দুর্নীতি, অনিয়ম আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে নেতাদের একাট্টা হওয়ার কথা, তাদের বিরুদ্ধেই উঠেছে অনিয়ম-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির নানান অভিযোগ। যে নেতাদের জীবন হওয়ার কথা ‘সাদামাটা’ এবং আদর্শ হওয়া উচিত ‘সাম্যবাদী’, সংসদ সদস্য হওয়ার পর তাই উল্টে গেলেন ১৮০ ডিগ্রি। বিশ্লেষকরা বলছেন, দলের এমপিরাই এখন হয়ে উঠেছেন দলের বোঝা।

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি ৩টি আসনে জয়লাভ করে। তারা হলেন রাজশাহী-২ আসন থেকে দলটির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, সাতক্ষীরা-১ থেকে পলিট ব্যুরোর সদস্য মুস্তফা লুৎফুল্লাহ এবং ঢাকা-৮ আসন থেকে দলের সভাপতি রাশেদ খান মেনন।

নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে সমালোচনা শুরু হয়। এমনকি ‘কমিউনিস্ট আদর্শ থেকে বিচ্যুতি’র অভিযোগ এনে দলের অনেকে পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন ইতোমধ্যেই। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ওয়ার্কার্স পার্টি এখন ভাঙনের মুখে!

আগামী ২ থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত বসতে যাচ্ছে ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কংগ্রেস। ওই কংগ্রেস সামনে রেখে দলের বর্তমান নীতি এবং কয়েকজন বিশেষ নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন কেন্দ্রীয় পলিট ব্যুরোর বেশ কয়েকজন সদস্য। তাদের সঙ্গে একমত হয়ে অবস্থান নিচ্ছেন জেলা পর্যায়ের নেতারাও। তাদের অভিযোগ, সরকারের সঙ্গে থেকে ওয়ার্কার্স পার্টির সংসদ সদস্যরা অনিয়ম, দুর্নীতিতে যুক্ত হয়েছেন। যা পার্টির সংগ্রামী ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে। সর্বোপরি কমিউনিস্ট আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে দল।

তিন এমপির মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ খোদ দলের সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে। ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে যখন দেশব্যাপী শুদ্ধি অভিযান শুরু হলো তখন সবাইকে অবাক করে দিয়ে এর সুবিধাভোগী হিসেবে নাম উঠে আসল রাশেদ খান মেননের! ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে শুরুর দিকেই রাজধানীর ফকিরাপুলের যে ‘ইয়ংমেন্স ক্লাবে’ অভিযান চালানো হয়েছিল, সেই ক্লাবের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান রাশেদ খান মেনন। যদিও তার দাবি, ক্লাবের ভেতরে জুয়ার আসর বসার বিষয়টি তিনি জানতেন না। কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে তিনি যে লাখ লাখ মাসোহারা নিতেন, সে বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট।

ক্লাবের মালিক যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে রাশেদ খান মেননকে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। খালেদের গুরু বহিষ্কৃত আরেক যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটও মেননের নাম বলেছেন। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, মেনন প্রতি মাসে সম্রাটের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা নিতেন। এমনকি প্রতি মাসে নিয়মিত মাসোহারা না পেলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন যুবলীগের নেতাদের। এমনকি ইয়ংমেনস ক্লাব থেকে উদ্ধার করা চাঁদাবাজির খাতায় মেননের নাম রয়েছে ৫নং সিরিয়ালে।

এ নিয়ে দল এবং দলের বাইরে প্রচণ্ড চাপে ওয়ার্কার্স পার্টির এই সভাপতি। এমন সময় গত কয়েকদিন আগে দলীয় এক সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসেন এই নেতা। তিনি বলেন, ‘আমি ও প্রধানমন্ত্রীসহ যারা নির্বাচিত হয়েছি, আমাদের দেশের কোনো জনগণ ভোট দেয়নি। কারণ ভোটাররা কেউ ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেনি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, গত নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি।’

স্বাভাবিকভাবেই এই মন্তব্য ভালোভাবে নেয়নি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ইতোমধ্যে ক্যাসিনো-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তার বিরুদ্ধে তদন্তেরও ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা।

এর আগে স্বজনপ্রীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এই বামপন্থি নেতার বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন দলের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখে আসছেন, এমন অনেককে বাদ দিয়ে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী হিসেবে নিজের স্ত্রী লুৎফুন্নেসা খান বিউটিকে বেছে নেন তিনি। এমনকি এ নিয়ে দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনাই করেননি। এতে সে সময় প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা।

এর আগে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পরও তার বিরুদ্ধে উঠতে থাকে নানা অভিযোগ। বিশেষ করে রাজধানীর দুটি নামি স্কুল ভিকারুননিসা নূন এবং আইডিয়ালে ভর্তির ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা ভর্তি-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল সে সময়। সে সময় প্রথমে তিনি বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং পরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এবার মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন মেনন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়-বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে তাকে।

দলটির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশার স্ত্রী অধ্যাপক তসলিমা খাতুন রাজশাহী বরেন্দ্র কলেজের সহকারী অধ্যাপক। তার বিরুদ্ধে উঠেছে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ। বিগত ৮ বছর ধরে কলেজে কোনো ক্লাস নেন না তিনি। তবে থেমে নেই তার বেতন-ভাতা উত্তোলন। ক্লাস নেওয়াসহ একাডেমিক কোনো কাজে অংশগ্রহণ না থাকলেও নিয়ম বহির্ভূতভাবে কলেজ থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলনসহ ভোগ করেন সব সুযোগ-সুবিধা। স্বামী ওয়ার্কার্স পার্টির সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশার ক্ষমতার অপব্যবহার করেই তিনি এমনটা করে যাচ্ছেন বলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া কলেজটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীর।

দলের আরেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুৎফুল্লার বিরুদ্ধেও রয়েছে এন্তার অভিযোগ। দশম জাতীয় সংসদেও তিনি সদস্য হিসেবে ছিলেন। সে সময় ৫ বছরে তার সম্পদ বেড়েছে প্রায় দশ গুণ। হলফনামার বিবরণ অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তার অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ এক কোটি ৪ লাখ ৫০ হাজার ৩৭০ টাকা এবং স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১১ লাখ ৪২ হাজার টাকা।

অথচ ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সময় দাখিলকৃত হলফনামায় তার নামে অস্থাবর সম্পদ ছিল এক লাখ টাকা মূল্যের একটি মোটরসাইকেল। আর বার্ষিক আয় ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সেই হিসাব মতো তার বার্ষিক আয় বেড়েছে প্রায় ১০ গুণেরও বেশি।