মহানগর আ.লীগে অচলাবস্থা

ঢাকা, বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

মহানগর আ.লীগে অচলাবস্থা

ডিসেম্বরের শুরুতেই কাউন্সিল

হাসান ওয়ালী ১০:২৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০১৯

print
মহানগর আ.লীগে অচলাবস্থা

বিগত চারদলীয় জোট সরকার আমলে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথ দখলে ছিল অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের। রাষ্ট্র পরিচালনায় আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদে এসে বিভক্ত উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগের অবস্থা এখন নাজুক। ২০১৬ সালে ভাগ হওয়া দুই ইউনিটের অধিকাংশ থানা এবং ওয়ার্ড চলছে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ছাড়াই। গত তিন বছরে মাসিক কার্যনির্বাহী কমিটির একটি বৈঠকও করতে পারেনি ইউনিট দুটি। ফলে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে ঢাকার রাজপথের নেতাকর্মীরা। গত ১০ এপ্রিল মেয়াদ শেষ করেছে কমিটি দুটি। অচলাবস্থা কাটাতে ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকা মহানগরের দুই অংশের সম্মেলন দিতে চায় আওয়ামী লীগ। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান খোলা কাগজকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

নেতাকর্মীরা বলছেন, মহানগরের শীর্ষ নেতাদের দ্বন্দ্ব, স্বজনপ্রীতি, বিতর্কিত ও হাইব্রিডদের নেতৃত্বে আনতে চাওয়ায় একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও ভেস্তে গেছে কমিটি গঠন প্রক্রিয়া। এরমধ্যে উত্তরে দুবার কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার উদ্যোগ নিলেও থানা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের বিরোধিতায় সে উদ্যোগও ভেস্তে যায়। আর দক্ষিণের কয়েকটি থানা পূর্ণাঙ্গ হলেও অধিকাংশ কমিটিই দুই সদস্যের। সমস্যা সমাধানে দলের শীর্ষ নেতারা একাধিকবার উত্তর-দক্ষিণের সভাপতি ও সম্পাদককে মৌখিকভাবে নির্দেশ দিলেও কোনো সুরাহা হয়নি। কমিটি গঠন নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নিলে বেশ কয়েকবার মহানগরের দুই অংশের নেতাদের ডেকে ‘ধমক’ দেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। গত বছরের ৩১ মে’র মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়ার নির্দেশও দেন তিনি। কিন্তু সেই নির্দেশনাও আলোর মুখ দেখেনি।

বিভক্তির আগে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর। কিন্তু নানা জটিলতায় আটকে যায় কমিটি গঠন প্রক্রিয়া। এর তিন বছর পর ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগকে দুভাগে বিভক্ত করা হয়। ২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল এ কে এম রহমতুল্লাহকে সভাপতি ও সাদেক খানকে সাধারণ সম্পাদক করে মহানগর উত্তর এবং আবুল হাসনাতকে সভাপতি ও শাহে আলম মুরাদকে সাধারণ সম্পাদক করে মহানগর দক্ষিণ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ৭৫ সদস্যের উত্তর-দক্ষিণ মহানগর কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে মহানগর উত্তরের অধীনে ২৬টি থানা, ৪৬টি ওয়ার্ড ও ৯টি ইউনিয়ন এবং দক্ষিণের অধীনে ২৩টি থানা ও ৫৭টি ওয়ার্ডের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়। কমিটির তিন বছরের মেয়াদ শেষ হলেও দুই সদস্যের এসব কমিটির বেশির ভাগই আর পূর্ণাঙ্গ হয়নি।

দলীয় সূত্র বলছে, ঢাকা মহানগর উত্তরের অধীনস্থ থানা-ওয়ার্ডের পূর্ণাঙ্গ কমিটি দুবার ঘোষণা দিয়েও নেতাকর্মীদের বাধায় বাতিল করা হয়। গত বছর ৫ জুলাই প্রথমবার ঢাকা উত্তরের অধীন থানা-ওয়ার্ডে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। বিন্তু নেতাকর্মীদের প্রতিবাদের কারণে কমিটি বাতিল করতে হয়। এরপর ২৭ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় থানা ও ওয়ার্ডে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয় মহানগর উত্তর। প্রতিটি থানায় ৭১ সদস্য এবং প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে ৬৯ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করে মহানগর উত্তর। কিন্তু এ কমিটি নিয়েও বিস্তর অভিযোগ আসে তৃণমূল নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হয়ে এ অভিযোগ গড়ায় গণভবনে দলীয় সভাপতির কাছে। এরপর দ্বিতীয়বার পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার সময় উত্তরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেননি বলে দলীয় সভাপতির কাছে অভিযোগ করেন বিভিন্ন থানার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে সেই কমিটিও স্থগিত করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। এরপর মহানগর কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সেই কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি।

অন্যদিকে মহানগর দক্ষিণের কদমতলী, শ্যামপুর, গেণ্ডারিয়া, সূত্রাপুর, ওয়ারী, কোতয়ালি, কামরাঙ্গীরচর, শাহাবাগ, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, কলাবাগান ও নিউমার্কেট থানার পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়েছে। তবে অন্য থানা-ওয়ার্ডের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা যায়নি কমিটি নিয়ে মহানগর এবং থানা-ওয়ার্ডের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের দ্বন্দ্বের কারণে।
মহানগরের তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, কমিটি দুভাগে বিভক্ত করলেও নেতাদের দ্বন্দ্বে সাংগঠনিক কাজে গতি আসেনি। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে কয়েকটি বর্ধিত সভা হলেও দীর্ঘ সময়ে মাসিক কার্যনির্বাহী কমিটির মিটিংও করতে পারেনি ইউনিট দুটি। শুরুর দিকে মহানগর উত্তরের একটি পরিচিত সভা হলেও এরপর আর একত্রে বসা হয়নি মহানগর কমিটির নেতাদের। রাজপথ সরকারের অনুকূলে থাকায় দিবসভিত্তিক কর্মসূচি পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের সব কর্মকা-। দীর্ঘ সময় পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় বঞ্চিত হয়েছে তৃণমূল কর্মীরা। পদ-পদবিতে না থাকায় পরিচয় সংকটে ভুগছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রয়াত এম এ আজিজের ছেলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ড. ওমর বিন আবদুল আজিজ তামিমের সঙ্গে। খোলা কাগজকে তিনি বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হলে দীর্ঘদিন যারা মাঠে ময়দানে কাজ করেন তারা মূল্যায়িত হন না। ফলে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যারা মাঠে-ময়দানে থাকেন তাদের মূল্যায়নের জন্য কমিটি হওয়া উচিত।’ তিনি মনে করেন কমিটি হতে হবে স্বচ্ছ ও ক্লিন ইমেজবিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে। ত্যাগী নেতারা যেন সঠিকভাবে মূল্যায়িত হন সেদিকটা খেয়াল রাখতে হবে।

ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণের অচলাবস্থা কাটাতে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের আগেই মহানগরে নতুন নেতৃত্ব আনতে চায় দলীয় হাইকমান্ড। সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য সম্মেলন তারিখ হতে পারে ডিসেম্বরের শুরুতে। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান খোলা কাগজকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলের আগেই মহানগর উত্তর-দক্ষিণের কমিটি হবে। আমরা কাউন্সিলরের তালিকা প্রস্তুত করছি। ৩০ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে।’