ছাত্রলীগ-যুবলীগ কি বিষফোঁড়া

ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ছাত্রলীগ-যুবলীগ কি বিষফোঁড়া

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে

হাসান ওয়ালী ১০:৩৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৯, ২০১৯

print
ছাত্রলীগ-যুবলীগ কি বিষফোঁড়া

টানা তিন মেয়াদে দেশ পরিচালনা করছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়াচ্ছে দলটি। কিন্তু সব উন্নয়ন-অগ্রগতি যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মকাণ্ডে। নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে সরিয়েও শুদ্ধ করা যায়নি সংগঠনটিকে।

সে ঘটনার মাস না পেরুতেই বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে আবরার ফাহাদ নামে এক শিক্ষার্থীকে। অন্যদিকে যুবলীগের চাঁদাবাজ, ক্যাসিনোকাণ্ডের হোতাদের গ্রেফতারেও অখুশি দলের সুবিধাভোগী অংশ। বিশ্লেষকরা বলছেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্রমেই বিষফোঁড়া হয়ে উঠছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য।

রাজনীতির মাঠে অপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। সরকারবিরোধী আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েও রাজপথে সুবিধা করতে পারেনি বিএনপিসহ বিরোধী জোট। কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ছাড়া রাজপথ ছিল উত্তাপহীন।

সমালোচকরা বলছেন, টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় সুসময়ের কোকিলরা ভিড় জমিয়েছে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোতে। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকায় অপরাধীরা আসন গাড়ছে ক্ষমতাসীন সংগঠনগুলোতে। সে ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ আর যুবলীগ হয়ে উঠেছে সুযোগসন্ধানীদের অভয়ারণ্যে। নিজ দলের ‘মনস্টার’দের দৌরাত্ম্যের লাগাম টানতে হার্ডলাইনে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের বেপরোয়া হয়ে ওঠার চিরচেনা চিত্রের ‘স্বাভাবিক’ ঘটনায় ছেদ ঘটান আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক রাব্বানীকে সরিয়ে দেন তিনি। এর পরই যুবলীগের কিছু নেতার কর্মকা- নিয়েও চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এমন কঠোর অবস্থানের চার দিন পর থেকেই শুরু হয় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান। একে একে আটক হন যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা জি কে শামীম, কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম, মোহামেডান ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, গেণ্ডারিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু, রুপম ভূঁইয়া, অনলাইন ক্যাসিনোর মূল হোতা সেলিম প্রধান। গ্রেফতার সবার দেওয়া তথ্যে ঘুরেফিরে আসে সম্রাটের নাম। নাটকীয়তা শেষে অবশেষে গত রোববার ভোরে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয় সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের। এত সহযোগী সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।

লেখক-বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদ খোলা কাগজকে বলেন, ‘এ সমস্ত অঙ্গ-সংগঠনের দলের কোনো প্রয়োজনই নেই। যে অঙ্গ-সংগঠনগুলো আছে, আরপিও হিসেবে থাকতে পারে না। জনপ্রতিনিধিত্ব যে আইন আছে, সে আইনে তো অঙ্গ-সংগঠনের কোনো বিধান নেই। এরা বলছে যে, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন। কাজেই, এসব সংগঠনের বিভিন্ন পদে যাদের বসানো হয় তারা তাদের নিজেদের স্বার্থটাই পূরণ করেন। দল বা সরকারের উপকারের জন্য তাদের কোনো প্রয়োজনই হয় না। প্রত্যেকটা অঙ্গ-সংগঠনের যে কয়েকশো নেতা আছেন, এ নেতারা তাদের নিজেদের স্বার্থটাই দেখেন। যার ফলে দলের স্বার্থ, দেশের স্বার্থ, সরকারের স্বার্থ-এর কোনোটাই তারা দেখেন না। এ ধরনের অঙ্গ-সংগঠন কিংবা ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন একেবারেই নিঃপ্রয়োজন।’

স্বাধীনতার আগে ছাত্রলীগ ছাড়া আওয়ামী লীগের কোনো অঙ্গ-সংগঠন ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তখন তো আওয়ামী লীগ অনেক শক্তিশালী ছিল। আওয়ামী লীগের জন-সমর্থন অনেক বেশি ছিল। ফলে এ ধরনের সংগঠন দলের জন্য বড় রকমের বোঝা। এগুলো না থাকলে দলের কোনো ক্ষতি হতো না।’

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নব্বই দশকের পর থেকেই হারাতে থাকে ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্য, খসে পড়তে থাকে গৌরবের পালক। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা শিক্ষাঙ্গন ও পাড়া-মহল্লা, নগরে-বন্দরে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, দরপত্র ছিনতাই, ঠিকাদারি বেচা-কেনাসহ নানা অপরাধে মেতে ওঠে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে অবস্থা অপরিবর্তিত থাকে। বরং তিন মেয়াদে টানা ক্ষমতায় থাকায় ছাত্রলীগ হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। ছাত্রলীগের লাগাম টানতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও শুদ্ধ হয়নি সংগঠনটি। সবশেষ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার জের ধরে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে রোববার (৬ অক্টোবর) রাতে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি প্রতিষ্ঠিত যুবলীগকে আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বিবেচনা করা হয়। ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যুবলীগের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক নূর হোসেন ছিলেন যুবলীগকর্মী। তত্ত্বাবধায়ক সরকার-পূর্ববর্তী সময়ে বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলনে ঢাকার রাজপথ দখল করে যুবলীগ। আওয়ামী লীগের ‘ভ্যানগার্ড’ হয়ে শক্তিশালী কর্মকা- পরিচালনায় সুনাম ছিল সংগঠনটির। তবে সে সবই গত হয়েছে। তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকায় শৃঙ্খলার সব সীমা ছাড়িয়েছে যুবলীগে। যুবলীগেরই শীর্ষ নেতাদের ইন্ধনে চাঁদাবাজি, জমি দখল, ক্যাসিনো বাণিজ্যসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে মূল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন যুবলীগ নেতারা। যুবলীগের ‘শ্রেষ্ঠ সংগঠক’ সম্রাটকে গ্রেফতারের পর নেতারা গা-ঢাকা দিলেও সুবিধাভোগী একাংশ নাখোশ এই শুদ্ধি অভিযানে। দলের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন ক্যাসিনোকাণ্ডের হোতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটকে। দলের নেতারা নানা মাধ্যমে শেখ হাসিনার দুর্দিনের কর্মীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে বলে আওয়াজ তুলছেন।

ডাকসুর সাবেক জিএস ডা. মুশতাক হোসেন বলেছেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক দলের অঙ্গ কিংবা সহযোগী সংগঠন থাকা উচিত না। আর ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠন হয়ে গেছে দুর্বৃত্তপনা এবং অত্যাচারের যন্ত্র।’ খোলা কাগজের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন-সহযোগী সংগঠন অবশ্যই থাকা উচিত না। আর যুব সংগঠন হলেই তারা টেন্ডারে ভাগ বসাবে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, তা হতে পারে না। তারা যুবকদের সমস্যা নিয়ে কাজ করবে এবং ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের তো অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। তারা ভলান্টিয়ার হিসেবে সরকারের জনবান্ধব আইন, গণমুখী আইন বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে। প্রশাসন যদি এগুলো বাস্তবায়নে গড়িমসি করে, তাহলে তারা প্রশাসনকে চাপ দিতে পারে, সহায়তা করতে পারে। কিন্তু এগুলো হয়ে গেছে দুর্বৃত্তপনা এবং অত্যাচারের যন্ত্র। ফলে গোটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটাই বিষাক্ত হয়ে গেছে।’