গডফাদাররা কোথায়

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ৯ কার্তিক ১৪২৬

সম্রাট গ্রেফতার

গডফাদাররা কোথায়

শফিক হাসান ১১:০৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৬, ২০১৯

print
গডফাদাররা কোথায়

নানা জল্পনা-কল্পনা ও ধোঁয়াশার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গ্রেফতার হলেন ক্যাসিনো গুরুখ্যাত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। রোববার ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে র‌্যাব গ্রেফতার করলেও গডফাদারদের নাম যথারীতি থেকে গেছে অনুচ্চারিত। রাঘববোয়ালদের ধরা হবে কিনা, মুখোশ উন্মোচিত হবে নাকি তারা বরাবরের মতো আড়ালে থেকেই নতুন কোনো সম্রাটের জন্ম দেবেন এমন প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের মনে।

সম্রাটরা যায়, সম্রাটরা আসে গডফাদাররা থেকে যান নিজ নিজ গোপন বলয়েই। সম্রাট কিংবা সম্রাটের মতো দুর্বৃত্তরা নিজ থেকে তেমন কিছুই করতে পারে না, যদি সেখানে প্রভাবশালীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ না থাকে। শনিবার রাত ১২টার দিকে কুমিল্লা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

র‌্যাব জানায়, চলমান ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিকতায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে রোববার ভোর ৫টায় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এদিকে চৌদ্দগ্রামের আলকরা ইউনিয়নের কুঞ্জুশ্রীপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গভীর রাতে ওই এলাকায় একটি বাড়ি র‌্যাব ঘিরে রাখে। পরে সম্রাটকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

স্থানীয়রা আরও জানান, কুঞ্জুশ্রীপুর গ্রামের এক আত্মীয়ের বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন সম্রাট।

বাড়ির মালিকের নাম মনির চৌধুরী বলে জানা গেছে। তবে তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি।

আলকরা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান গণমাধ্যমকে বলেন, ঘটনার সময় তিনি এলাকায় ছিলেন না। তবে স্থানীয়রা তাকে ফোন করে ঘটনা সম্পর্কে বলেছেন।

অভিযুক্ত সম্রাট ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি; পরিচয়টি ভাঙিয়ে গড়ে তোলেন ক্যাসিনো সাম্রাজ্য, চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন দীর্ঘদিন যাবৎ। একপর্যায়ে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের নির্মাণাধীন ভবন থেকে চাঁদা দাবি করেন সম্রাট।

প্রত্যাশিত চাঁদা না পেয়ে প্রভাব খাটিয়ে বন্ধ করে দেন নির্মাণকাজ। খবরটি পৌঁছে যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কানেও; তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, যে প্রতিষ্ঠানে আমি ও রেহানা (বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা) জাকাতের টাকা দিই, সেখান থেকেই চাঁদা দাবি করে সম্রাট! এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থা নিতে বললেও তারা ধানাইপানাই করে বিষয়টি ধামাচাপা দেন। সম্রাট থেকে যান বহাল তবিয়তে, হয়ে ওঠেন আরও দুর্বিনীত।

সর্বশেষ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর কোটি টাকা চাঁদা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কঠোর অবস্থানে যান প্রধানমন্ত্রী। পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় অভিযুক্ত দুজনকে। সে সময়ে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সম্রাট-খালেদকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন, কোনো কোনো যুবলীগ নেতা শোভন-রাব্বানীর চেয়েও খারাপ।

এর চার দিন পর থেকে শুরু হয় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান। একে একে আটক হন দুজন যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া এবং জি কে শামীম; কৃষকলীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ ও বিসিবির পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া। এরা ক্যাসিনো, টেন্ডারবাজিসহ অনৈতিক ব্যবসায় জড়িত। গ্রেফতার সবাই বলেছেন ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রক হিসেবে সম্রাটের নাম।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক ও ইয়ংমেন্স ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানিয়েছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার এ অবৈধ ব্যবসার ভাগ কারা কারা পেতেন।

সব অন্যায়-অপকর্মে সম্রাটের নাম আলোচিত হলেও তার গ্রেফতার না হওয়াটা জন্ম দিয়েছিল অনেক প্রশ্নের। সম্রাটের গডফাদার বিষয়েও শুরু থেকে অদ্যাবধি টুঁ-শব্দটিও হয়নি। শেষপর্যন্ত সম্রাট গ্রেফতার হয়েছেন গডফাদারদের ‘সুরক্ষিত’ রেখেই।

ক্যাসিনো ব্যবসা থেকে শুরু করে নানাভাবেই গডফাদাররা ‘অলক্ষে’ প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন।

লেখক-বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদ গতকাল খোলা কাগজকে বলেন, খুব বড় রকমের অপকর্ম ও বেআইনি তৎপরতা অতি ক্ষমতাবান কারও প্রশ্রয় ছাড়া সম্ভব নয়। ক্যাসিনোর ব্যবসা ফুটপাতের চানাচুর-ঝালমুড়ির ব্যবসা নয়। ওই জুয়াখেলার যারা খেলোয়াড় তারাও কোনো পাড়ার কিশোর-যুবক নন। তারা অতি বিত্তবান, প্রভাবশালী মহলের মানুষ। রাজনৈতিক প্রভাবও অত্যন্ত বেশি।

খ্যাতনামা এই সাংবাদিক-কলামিস্ট আরও বলেন, সম্রাটের ক্যাসিনো সাম্রাজ্যে মহাসম্রাট আছেন অনেকেই। তাদের লোকে বলে গডফাদার। সমাজে তারা মুখোশ পরে থাকেন। হয়তো টেলিভিশনেও আমরা তাদের দেখি, কিন্তু চিনতে পারি না। মানুষ খুশি হবে যদি সম্রাটের কাছ থেকে নামগুলো নিয়ে সেই মহাসম্রাটদের মুখোশ খুলে তাদের আইনের আওতায় আনা হয়।

ক্যাসিনোকাণ্ডে শেষ পর্যন্ত সম্রাট আটক হয়েছেন, এতে সাধারণ মানুষ আপাত খুশি হলেও পুরো খুশি হতে পারেনি। নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়ানো গডফাদাররা গ্রেফতার হবেন কিনা, রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনা হবে কিনা হিসাব কষছেন তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি গোড়াতেই হাত দেওয়া না যায়, সম্রাটদের মতো ‘চুনোপুঁটি’ ধরে সাময়িক বাহ্বা পাওয়া গেলেও সুদূরপ্রসারী সুফল মিলবে না। অনৈতিক পন্থায় অর্জিত টাকার ভাগ বিভিন্নজনকেই দিতেন সম্রাট। সেই সুবিধাভোগীদের তালিকা অনুসন্ধান করে বের করা হলে বেরিয়ে আসবে রাঘববোয়ালদের নাম। ইতিহাসের মহাপরাক্রমশালী হালাকু খাঁর পতন হলেও তার নাতিপুতিরা কোথায়- এমন জিজ্ঞাসাও উচ্চকিত হয় প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপটে।

রসিকজনরা বলেন, আজকের দিনের যে অন্যায়-অপকর্ম সংঘটিত হচ্ছে সবগুলোর নেপথ্যেই রয়েছে হালাকু খাঁর বংশধরদের ভূমিকা! তেমনি দীর্ঘদিন রাজত্বের পর সম্রাটেরও কিছু উত্তরসূরি তৈরি হয়েছে। যে গুরুরা সম্রাটকে ব্যবহার করে মাখন খেয়েছেন তারা রাতারাতি সব ভুলে যেতে পারলেও সম্রাটের বানানো উত্তরসূরিরা ঠিকই অনৈতিক পন্থাতেই অগ্রসর হবে। চ্যালাচামুণ্ডারা সৃষ্টি করতে চাইবে অপরাধজগতের নতুন ফাঁকফোকর। সম্রাট অধ্যায়ের শেষ কোথায় আপাতত জানা না গেলেও তার পোষ্যরাই যে হয়ে উঠবে ‘হালাকু খাঁর নাতিপুতি’ এতে বেশি দ্বিধা-সংকোচের অবকাশ নেই। উঁচু-নিচু দুই পক্ষেরই লাগাম টানা না গেলে বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্রাটের গডফাদারদের সন্ধান পাওয়া না গেলেও তার প্রতি সহানুভূতিশীল ৭২ বছর বয়সী যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীই ক্যাসিনোকা- উদ্ঘাটিত হওয়ার পর প্রকাশ্যে সম্রাটের পক্ষাবলম্বন করেন। ১৮ সেপ্টেম্বরের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সমালোচনা করেন তিনি। পরদিন যুবলীগের এক অনুষ্ঠানে ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘কেউ অপরাধ করলে শাস্তি হবেই। তবে প্রশ্ন হলো কেন এতদিন পর একজনকে গ্রেফতার করা হলো? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এতদিন কোথায় ছিল? অতীতে সব জানত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমার দিকে আঙ্গুল তুলছে। এতদিন কেন ব্যবস্থা নেয়নি?

এখন বলছে, ৬০টি ক্যাসিনো ছিল। তাহলে কি এতদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আঙ্গুল চুষছিল? যে ৬০ জায়গায় ক্যাসিনো সেই ৬০ থানাকে অ্যারেস্ট করা হোক। সে সময় ক্যাসিনো চলল, আর সেই এলাকার পুলিশ কী করছে? র‌্যাব কী করছে? তাদের অ্যারেস্ট করা হোক। আমাকে অ্যারেস্ট করবেন করেন? রাজনীতি করি। আমাকে অ্যারেস্ট করবেন, আর আমি বসে থাকব? এতদিন ক্যাসিনো চলত, আপনারা জানতেন না?’

এমন বক্তব্যের মাধ্যমে যুবলীগ চেয়ারম্যান পরোক্ষভাবে সম্রাট তথা ক্যাসিনো কারবারিদেরই পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চলমান থাকলে একপর্যায়ে হাজারের অধিক যুবলীগকর্মী নিয়ে ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে যান সম্রাট। তারপর কয়েক দিন কাকরাইলের যুবলীগ কার্যালয়েই অবস্থান করেছিলেন। ‘আত্মগোপনকারী’ সম্রাটের প্রহরায় ছিল প্রায় একশ যুবক। অভিযান চলাকালে সম্রাট ইস্যুতে আর সরাসরি পক্ষাবলম্বন করেননি যুবলীগ চেয়ারম্যান।

২০ সেপ্টেম্বরে সুর নমনীয় করে বলেন, ‘দেশের প্রতিটি গণমাধ্যমে অবৈধ ক্যাসিনোর খবর ছাপা হচ্ছে এবং আমাদের দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে। আগে জানলে ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতাম। এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসবে তাদের বহিষ্কার করা হবে।’

প্রতিশ্রুতিমতো গতকাল সম্রাট এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত আরমানকে সম্রাটসহ একই বাসা থেকে আটক করা হয়েছে। আরমান কয়েকটি বাংলা চলচ্চিত্রে অর্থলগ্নি করেছেন। তার প্রযোজিত সর্বশেষ সিনেমা শাকিব খান-বুবলী অভিনীত ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’।

সর্বশেষ গত ৩ অক্টোবর বিকালে ওমর ফারুক চৌধুরীর ব্যাংক হিসাব তলব করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তার সব হিসাবের লেনদেন তথ্য, বিবরণীসহ সব পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সম্রাটসহ একাধিক যুবলীগ নেতা গ্রেফতার হওয়ার পর গতকাল যুবলীগ চেয়ারম্যানের বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বচ্ছতা ফেরাতে ক্যাডারকেন্দ্রিক রাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে। দিনের পর দিন কাউকে অপরাধ করার সুযোগ দিয়ে, শীর্ষ অপরাধী বানিয়ে অভিযানে নামা কতটা যৌক্তিক! চাইলে শুরু থেকেই লাগাম টানা সম্ভব। এই উদ্যোগ তখনই ফলপ্রসূ হবে- সংশ্লিষ্ট গডফাদারদের মুখোশ উন্মোচন করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হলে।