ভোটারকে ভোটমুখী করবে কে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ৯ কার্তিক ১৪২৬

রংপুর উপনির্বাচন

ভোটারকে ভোটমুখী করবে কে

সুলতান মাহমুদ ১০:৫৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৬, ২০১৯

print
ভোটারকে ভোটমুখী করবে কে

পৃথিবীর যে কোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ সর্বাধিক ভোটমুখী। নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য তারা সবসময় মুখিয়ে থাকে। কখন নির্বাচন আসবে সে অপেক্ষায় থাকেন ভোট দেওয়ার জন্য। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে ভোট দেওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ কমেছে। বিগত সময় বেশকিছু নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল খুবই হতাশাজনক, কারণ সেখানে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ছিল না। আর গত শনিবার অনুষ্ঠিত রংপুর-৩ আসনের উপ-নির্বাচনেও ভোটারদের উপস্থিতি ছিল আরও হতাশাজনক।

মাত্র ২১ দশমিক ৩১ ভাগ মানুষ সেখানে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ৭৮ ভাগের বেশি মানুষ ভোট দিতে কেন্দ্রে যাননি। একটি বিশাল সংখ্যক মানুষ ভোট দিতে কেন কেন্দ্রে যাননি তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে বিভিন্ন মহলে।

নির্বাচন কমিশন বলেছে- ভোটারদের কেন্দ্রে আনার দায়িত্ব তাদের নয়, এ দায়িত্ব প্রার্থীদের। আর ভোটাররা বলছেন, ভোট দেওয়ার সুষ্ঠু পরিবেশ ভোটকেন্দ্র ও এর আশপাশে না থাকায় তারা ভোট দিতে কেন্দ্রে যাচ্ছেন না। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল। তারা পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় ভোট দিতে কেন্দ্রে যেতে অনাগ্রহী। তাছাড়া ভোটকেন্দ্র একটি বিশেষ মহলের দখলে থাকায় অপ্রীতিকর অবস্থা এড়াতে অনেক সময় ভোট দিতে কেন্দ্রে যাচ্ছেন না তারা।

এমন পরিস্থিতি কীভাবে এড়ানো যায়, তা নিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হলে ভোটারদের বাড়ি গিয়ে কেন্দ্রে আনতে হবে না। তারা এমনিতেই কেন্দ্রে আসবেন। ভোট দেওয়ার জন্য তারা সবসময়ই প্রস্তুত থাকেন। নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ায় তারা ভোট দিতে কেন্দ্রে আশার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। নির্বাচন কমিশনকেই ভোটারদের মধ্যে এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা গত এপ্রিলে ময়মনসিংহে একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ভোটারদের কেন্দ্রে আনার দায়িত্ব তাদের নয়, দায়িত্ব প্রার্থীদের। প্রধান নির্বাচন কমিশনের এমন বক্তব্যের বিষয়ে একমত নন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পদক বদিউল আলম মজুমদার।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার গতকাল খোলা কাগজকে বলেছেন- ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তাদের কোনো দায়িত্ব না থাকলে কম্পিউটার দিয়ে ভোট করা যায়, তাদের দরকার হতো না। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের দায়িত্ব অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করা, যা লক্ষ করা যাচ্ছে না। যে কারণে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে যে, ভোট দিলেও সে ভোট কোনো কাজে লাগে না। যে কারণে মানুষ ভোট দিতে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। এর দায় নির্বাচন কমিশনের। ভোট যদি সুষ্ঠু, নিরপক্ষে ও গ্রহণযোগ হয়, তাহলেই মানুষ আবার ভোট দিতে আসবে। এই কমিশন দিয়ে যা আশা করা যায় না।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান গতকাল খোলা কাগজকে বলেন, ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকায় মানুষ ভোটকেন্দ্রে আসা কমিয়ে দিয়েছে। নির্বাচনের জন্য অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা গেলে মানুষকে বলতে হবে না কেন্দ্রে আসতে। তারা এমনিতেই ভোট দিতে আসবে। এই নির্বাচন কমিশন যেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। যে কারণে মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।

জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনের পর রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি একেবারেই কম ছিল। প্রতিটি কেন্দ্রে দিনভর একজন-দুজন করে ভোটারের উপস্থিতি চোখে পড়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে সরব উপস্থিতিও সেভাবে ছিল না। ভোট পড়েছে ২১ দশমিক ৩১ শতাংশ।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এই আসনে শতকরা ৫২ দশমিক ৩১ শতাংশ ভোট পড়েছিল। জাতীয় পার্টির এইচ এম এরশাদ ভোট পান ১ লাখ ৪২ হাজার। বিএনপির প্রার্থী রিটা রহমানের ভোট ছিল ৫৩ হাজার। কিন্তু এরশাদের শূন্য আসনে এসে ভোট পড়ে গড়ে মাত্র ২১ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এই কয়েক মাসের ব্যবধানে মানুষের অনাগ্রহে ভোট কম পড়েছে।

নির্বাচনে জাতীয় পার্টির রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদ ৫৮ হাজার ৮৭৮ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রার্থী বিএনপির রিটা রহমান পেয়েছেন ১৬ হাজার ৯৪৭ ভোট। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক সাংসদ এরশাদের ভাতিজা হোসেন মকবুল শাহরিয়ার পেয়েছেন ১৪ হাজার ৯৪৮ ভোট। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা সাড়ে ৪ লাখের মতো।