ইসমাইল যেভাবে ‘সম্রাট’

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

ইসমাইল যেভাবে ‘সম্রাট’

হাসান ওয়ালী ১০:৪৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৬, ২০১৯

print
ইসমাইল যেভাবে ‘সম্রাট’

সম্রাটের বাবা ছিলেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। টানাটানির সংসারে কাকরাইলে সার্কিট হাউস সড়কের সরকারি কোয়ার্টারে বেড়ে ওঠা তার। নব্বই দশকের শুরুতে রাজনীতিতে নাম লেখান। শুরুর দিকে সুবিধা করতে না পারলেও কপাল খুলে যায় ২০১২ সালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি হওয়ার পর।

গত এক দশকে ইসমাইল হয়ে উঠেছেন ‘সম্রাট’। ক্যাসিনো কারবার থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বাড়ি-জমিদখল-এ সবই ছিল তার নিয়ন্ত্রণে।

শীর্ষ নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে ক্রমেই প্রতাপশালী হয়ে উঠেন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। সম্রাটের অপকর্মে ক্ষুব্ধ হয়ে ২০১৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর যুবলীগ দক্ষিণের কমিটি ভেঙে দিতে বলেছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু সুচতুর সম্রাট দেনদরবার করে সে যাত্রায় রক্ষা পান। কিন্তু এ যাত্রায় গ্রেফতার হতে হলো প্রতাপশালী সম্রাটকে। হারাতে হলো যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি পদও।

রাজনীতিতে সম্রাটের আগমন ঘটে নব্বই দশকের শুরুর দিকে। কিছুদিন যুক্ত ছিলেন ছাত্রলীগের সঙ্গে। অবশ্য তার আগে এরশাদের জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্রসমাজের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল বলেও গুঞ্জন রয়েছে। ১৯৯৩ সালে ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পায় সম্রাট। সে সময় যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম। ওয়ার্ড যুবলীগের পদ পেয়েই বেপরোয়া হয়ে উঠতে থাকেন সম্রাট। ওয়ার্ড সভাপতিকে প্রহারের অভিযোগে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হলেও পরে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি।

২০০৩ সালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পান মহিউদ্দিন মহি এবং সাধারণ সম্পাদক হন নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন। সে সময় মহির সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে শাওন নিজের হাত শক্ত করতে সম্রাটকে দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক করেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল থেকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন সম্রাট। ২০১২ সালে ওমর ফারুক চৌধুরী যুবলীগের চেয়ারম্যান হওয়ার পর সম্রাট ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি হন। এরপর আর তার পেছনে তাকাতে হয়নি।

সম্রাট দায়িত্ব নেওয়ার পর কাকরাইলে রাজমণি সিনেমা হলের উল্টো দিকে বিশাল এক ভবনের পুরোটাজুড়ে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের অফিস শুরু করেন। এখানে বসেই সম্রাট ক্যাসিনো ব্যবসা থেকে শুরু সব অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, তার অধীনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ১৫টিরও বেশি ক্যাসিনো। এসব ক্যাসিনো থেকে নাকি প্রতি রাতে ৪০ লাখেরও বেশি টাকা পেতেন সম্রাট।

জুয়া খেলাই সম্রাটের নেশা : শারমিন চৌধুরী
যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদ্য বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাটকে গ্রেফতারের পর রাজধানীর মহাখালীতে তার বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। আরেকটি দল অভিযান চালায় শান্তিনগরে সম্রাটের ভাই বাদলের বাসায়। রোববার দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে মহাখালীর ওই বাসায় অভিযানের সময় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন সম্রাটের স্ত্রী শারমিন চৌধুরী।

ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে চলমান অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘দেশরন্ত শেখ হাসিনাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে এই অভিযানের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাব। তিনি যদি আরও আগে উদ্যোগ নিতেন, আরও ভালো হতো।’

শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘ওর (সম্রাট) সাথে আমার দুই বছর ধরে সম্পর্ক নেই। ও যে ক্যাসিনোর গডফাদার, এটা আমি জানি না। আমি জানি যুবলীগ... ভালো একটা নেতা। এটা ঢাকা দক্ষিণের সবাই জানে। আমার সাথে দুই বছরের যেহেতু দূরত্ব, সে কারণে আমি জানি না ও এতবড় ক্যাসিনো চালায়।

সম্রাটের জুয়ার নেশা রয়েছে জানিয়ে তার স্ত্রী বলেন, ‘ওর সম্পদ বলতে কিছু নেই। ও যা ইনকাম করে ক্যাসিনো চালিয়ে, তা দলের জন্য খরচ করে, দল পালে। আর যা বোধহয় রাখে, সিঙ্গাপুর কিংবা...এখানে জুয়া খেলে। ও সিঙ্গাপুরে জুয়া খেলতেই যেত। জুয়া খেলা তার নেশা, কিন্তু সম্পত্তি করা তার নেশা না।’

সম্রাট ক্যাসিনোতে কীভাবে আসলেন-এমন প্রশ্নের উত্তরে শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘ক্যাসিনোতে ও (সম্রাট) ধীরে ধীরে কীভাবে আসছে, সেটা আমি জানি না। কিন্তু ওর নেশা আছে জুয়া খেলার।’

ক্যাসিনো চালাতে সম্রাটকে নিষেধ করতেন কি না, উত্তরে তার স্ত্রী বলেন, ‘ওর (সম্রাট) সাথে আমার একটু মিলত কম। মানে ও ছেলেপেলে নিয়ে থাকতে বেশি পছন্দ করত। ও কিন্তু শুরু থেকেই সম্রাট। নাম যেমন... ও কিন্তু আর যারা আছে, ওদের মতো না। আগে থেকেই ওর চলাফেরা খুব ভালো।’

ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে চলমান অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে এই অভিযানের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাব। তিনি যদি আরও আগে উদ্যোগ নিতেন, আরও ভালো হতো।’