সম্রাটকে নিয়ে কে খেলছে লুকোচুরি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ৯ কার্তিক ১৪২৬

সম্রাটকে নিয়ে কে খেলছে লুকোচুরি

শফিক হাসান ১০:৫০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৪, ২০১৯

print
সম্রাটকে নিয়ে কে খেলছে লুকোচুরি

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের শুরু গত ১৮ সেপ্টেম্বর; এর আগে ১৪ তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষোভ ও উষ্মা প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতেই শুরু হয় ‘শুদ্ধি অভিযান’। শুদ্ধি অভিযান সম্বন্ধে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে ঘর থেকেই শুরু হয়েছে; রেহাই পাবেন না কেউই। ক্ষমতাসীনদের এমন ‘দম্ভোক্তি’র বিপরীতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের ‘বহাল তবিয়তে পালিয়ে থাকা’ জন্ম দিয়েছে অনেক প্রশ্নের।

এ লুকোচুরি খেলা কেন, কারা খেলছেন এমন ‘জনবিরোধী’ খেলা, সেই প্রশ্নও দেশের লাখো মানুষের মনে। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন- শেষপর্যন্ত সম্রাট গ্রেফতার হবেন কি-না। নাকি নতুন কোনো নাটক অবতারণার মাধ্যমে আড়াল করে দেওয়া হবে তাকে এবং তার যাবতীয় দুষ্কর্মকে।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গ্রেফতারকৃত আরও যুবলীগ ও কৃষক লীগ নেতার সাক্ষ্যে বেরিয়ে এসেছে সম্রাটের নাম। সম্রাটই ঢাকা শহরের অলিখিত ‘ক্যাসিনো সম্রাট’; এতদিন গোপন থাকলেও বর্তমানে সবার মুখে মুখে। রূপকথার গল্পের মতোই সম্রাট অনৈতিক উপায়ে অর্জন করেছেন কোটি কোটি টাকা; হয়ে উঠেছেন নগর ঢাকার অলিখিত সম্রাট; নিজস্ব কর্মীবাহিনীর মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন ত্রাসের রাজত্ব। ত্রাসের রাজত্ব যে একদিন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে বুঝতে পারেননি কেউ।

গত বুধবার আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘অপেক্ষা করুন, গরম খবর আসছে।’ এমন মন্তব্যে নানা জল্পনা-কল্পনার পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, সম্রাটকে গ্রেফতার করার খবর দেবেন তিনি। কিন্তু এরপরও সম্রাট ইস্যু ‘ফাইল চাপা’ থাকলেও আড়াল থেকে সামনে এসেছেন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। গত বৃহস্পতিবার তার ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তার নামে থাকা ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের তথ্যসহ বিবরণী পাঠাতে বলা হয়েছে।

সাধারণ মানুষের কৌতূহলের আগুনে যেন একফোঁটা পানি পড়ল। এটাই কি তবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর ‘গরম খবর’! যদি তাই হয়, সম্রাটের অপরাধকে কি লঘু হিসেবে দেখা হচ্ছে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যুবলীগ চেয়ারম্যানের ছত্রছায়ায় থেকে অনেক অন্যায়-অপকর্ম করেছেন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট; সেখান থেকে বড়জোর একটা অংশ নজরানা পেতেন ওমর ফারুক চৌধুরী। তাই বলে সম্রাটের সঙ্গে তার সম্পদের তুলনা হতে পারে না। দেশের আরও যুবলীগ নেতাকে ব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে কালো টাকা বানাতে পারেন যুবলীগ চেয়ারম্যান; সেটা পাহাড় নাকি টিলাপরিমাণ জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।

শুরু থেকেই সম্রাটের সহযোগীরা তাকে ক্যাসিনোসহ ঢাকা শহরের চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজিসহ সব অপকর্মের বিষয়ে মুখ খুললেও এখনও গ্রেফতার হননি তিনি। থানা-প্রশাসন ম্যানেজ করেই দীর্ঘদিন অবৈধ ব্যবসা চালিয়েছেন সম্রাট। পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন অনেককে। সেক্ষেত্রে সম্রাট যদি গ্রেফতার হন অনেককেই মুখ লুকাতে হবে অথবা পালাতে হবে দেশ ছেড়ে; এ ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না সম্রাটকে শেল্টার দেওয়া গডফাদাররা।

ইতিপূর্বে গুঞ্জন বেরিয়েছে, প্রথমে কিছুদিন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর জিম্মায় সংস্থার কার্যালয়ে ছিলেন সম্রাট। সেখান থেকে ছদ্মবেশে পালিয়ে এসে বর্তমানে প্রভাবশালী এক নেতার বাসায় আশ্রিত রয়েছেন। চিকিৎসার কারণ দেখিয়ে বিদেশে যাওয়ার পাঁয়তারা করলেও মিলছে না সমর্থন। প্রধানমন্ত্রীর রোষানলে পড়তে চান না বলে সংশ্লিষ্টরা সম্রাট ইস্যুতে গোলকধাঁধায় পড়েছেন। সম্রাটকে ধরা যেমন বিপদ, ছাড়াও বিপদ! তবে এর আগে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- সম্রাট নজরবন্দি রয়েছেন; গ্রিন সিগন্যাল পেলেই গ্রেফতার করা হবে।

সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার সম্রাটের অবস্থান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আমি স্পেসিফিক কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই না। আমরা ধৈর্য ধরি, সমস্ত কিছুর উত্তর পাওয়া যাবে।’ র‌্যাব ডিজির এমন মন্তব্য সেই বার্তাই দেয়- এখনও মিলছে না গ্রিন সিগন্যাল। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ মুখপাত্র ওবায়দুল কাদেরও ধৈর্য ধরতে বলেছেন।

এ কালক্ষেপণের নেপথ্যে কী কৌশল কাজ করছে তা বুঝে উঠতে পারছেন না অনেকেই। সংশ্লিষ্টদের ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ জাতীয় কৌশলী বক্তব্যও জন্ম দিচ্ছে অনেক আশঙ্কার। সম্রাটের মতো অপরাধজগতের গুরুকে বহাল তবিয়তে রেখে শুদ্ধি অভিযান কতটা ‘শুদ্ধ’ হবে এমন প্রশ্ন উচ্চকিত হচ্ছে প্রায়ই।
সম্রাট প্রশ্নে এ লুকোচুরি গল্পের স্ক্রিপ্ট লিখছেন কারা এটা কেউ কেউ জানলেও প্রকাশ করছেন না। প্রচারমাধ্যমও ‘অপেক্ষা’ করছে এবং পাঠকদের অপেক্ষা করাচ্ছে! সম্রাটের আটক হওয়ার বিষয়ে কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন মাধ্যমের সাংবাদিকরা ডিএমপি ও ডিবি কার্যালয়ে ভিড় জমালেও পাচ্ছেন না ‘খবরের খোঁজ’। পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীলরাও সম্রাটের বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন না।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে তাকে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ক্যাসিনোবাণিজ্যে অভিযুক্তদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য দলের কতিপয় নেতাকে ইঙ্গিত করে তির্যক মন্তব্য করেন, ‘বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজদের জন্য কেউ কোনো তদবির নিয়ে আসবেন? কাউকে বাঁচাতে চাইবেন? আমি কিছু করতে পারব না।’

দলীয় নেতাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘কে কী করেছেন আমি সব জানি। অপরাধীদের কেউ শেল্টার দেওয়ার চেষ্টা করবেন না।’ তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘ক্যাসিনো খেলেন? ক্যাসিনো ব্যবসা করেন? আমি ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের জন্য ভাসানচরে থাকার ব্যবস্থা করব।’