প্রথম পদক্ষেপ দুর্নামমুক্ত ছাত্রলীগ

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯ | ৭ কার্তিক ১৪২৬

প্রথম পদক্ষেপ দুর্নামমুক্ত ছাত্রলীগ

হাসান ওয়ালী ১০:৫৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৯

print
প্রথম পদক্ষেপ দুর্নামমুক্ত ছাত্রলীগ

বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ডে শোভন ও রাব্বানীকে সরিয়ে দেওয়ার পর ছাত্রলীগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্যের হাতে। সংকটময় পরিস্থিতিতে গুরুদায়িত্ব তাদের কাঁধে, সময়ও হাতে কম। এ অবস্থা সামাল দিয়ে কীভাবে সংগঠনের ভাবমূর্তি ফেরাবেন, কীভাবে তৃণমূলে কাজ করবেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর অনুভূতিই বা কেমন- এ সব কিছু নিয়ে খোলা কাগজের সঙ্গে কথা বলেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। আলাপচারিতায় হাসান ওয়ালী

ছাত্রলীগ নিয়ে চারদিকে বিতর্ক ও সমালোচনা চলছে। নানা অভিযোগের দায় নিয়ে প্রথমবারের মতো সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বিদায় নিতে বাধ্য হলেন। টালমাটাল এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনাদের ওপর আস্থা রাখলেন। অনুভূতি নিশ্চয় দারূণ...

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অভিভাবক জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন, একজন ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর হতে পারে না। একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব আমাদের হাতে এসেছে। এ অবস্থায় ছাত্রলীগের সব স্তরের নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে এ দায়িত্ব রক্ষা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাব।

দায়িত্ব পাওয়ার পরে কি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে?
না, এখনো কথা হয়নি। আমরা কাল (আজ) আপার (প্রধানমন্ত্রী) সঙ্গে দেখা করব। ধানমন্ডি-৩২-এ বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কার্যক্রম শুরু করব।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের তরফ থেকে কোনো অভিনন্দন বার্তা বা পরামর্শ পেয়েছেন?
পরামর্শ এসেছে, অভিনন্দন বার্তা বলব না। আমাদের পথচলাকে সহজ করতে তারা পরামর্শ দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সাজেশন নিয়েই আমরা যাত্রা শুরু করছি।

বিদায়ী সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের প্রতিক্রিয়া কেমন?
গণভবন থেকে সংবাদ আসার পরই ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও আমি সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে ছিলাম। তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই নেত্রীর সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন।

বিদায়ী দুই নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। এ সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাই...
আমরা মনপ্রাণ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করে যারা ছাত্রলীগ করি, আমাদের কিন্তু একটাই উদ্দেশ্য থাকে, নেত্রীর (শেখ হাসিনা) আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানো। কাজের ক্ষেত্রে আমরা পজিটিভ কিছু যখন দিতে না পারি, তখন কর্মী হিসেবে নিজেদের ব্যর্থ মনে হয়।

তাদের পদচ্যুতির একটা পরিস্থিতি তো সৃষ্টি হলো...
আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি, গণভবনে নেত্রী ছাত্রলীগের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। আমরা ছাত্রলীগের কর্মীরা কখনো মানতে পারি না, ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে তিনি ক্ষুব্ধ হবেন। তার মনে কষ্ট দিয়ে আমরা কেউ ছাত্রলীগ করতে চাই না। যে সব অভিযোগ এসেছে, সেগুলো যেন দ্বিতীয়বার আমাদের বিরুদ্ধে না আসে, সেদিকে আমরা সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকব।

একটা সংকটজনক পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগের দায়িত্বে এসেছেন। এখন ভাবমূর্তিই বড় সংকট। এ থেকে উত্তরণে আপনাদের প্রথম পদক্ষেপ কী হবে?
আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হবে, ছাত্রলীগকে দুর্নামমুক্ত করা। এ জন্য যা যা করা লাগে আমরা তাই করব। আপার সরাসরি কনসার্ন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পরামর্শ, ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের পরামর্শের মাধ্যমে আমরা পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাবো। পদবঞ্চিতদের যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তাদের অস্তিত্ব আমরা এখনো দেখতে পাই। তারা আমাদের নেতৃত্ব সুন্দরভাবে গ্রহণ করেছেন। তাদের কীভাবে পুনরায় মূল্যায়ন করা যায়, সে বিষয়ে আমরা অবশ্যই দেখব। ছাত্রলীগের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১০ মাস আগে আমরা দায়িত্ব পেয়েছি। ১০ মাস পরে সম্মেলন করতে হলে আমাদের যে প্রস্তুতি প্রয়োজন সেটা নিয়েই আমাদের কর্মপরিকল্পনা। সম্মেলন করতে হলে ১১১ ইউনিটের কমিটি থাকতে হবে। তাদের প্রত্যক্ষ ভোটে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। আমরা সারা দেশে যোগ্যতার ভিত্তিতে, কোনো প্রকার লবিং-তদবির ছাড়াই সঠিক নেতৃত্ব তুলে আনতে চাই।

ছাত্রলীগের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নানা অভিযোগে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক বিদায় নিতে বাধ্য হলেন। তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন নেতৃত্বের প্রতি কোনো রকম সংশয় সৃষ্টি হচ্ছে কিনা?
যারা মনেপ্রাণে ছাত্রলীগকে ধারণ করে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে, তারা জননেত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন। এরপরও যদি কারও মনে কোনো সংশয় থাকে, আমাদের দরজা তাদের জন্য সব সময় খোলা। আমাদের ব্যাপারে তাদের যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে আমাদের তারা সরাসরি জানাতে পারেন।

আপনারা দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বিভিন্ন ইউনিটে কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। এ ইউনিটগুলোর এখন কী হবে...
আমরা ধারাবাহিকভাবে সব ইউনিটে কমিটি করব। এই কয়েক দিনে আমাদের বেশকিছু ইউনিটে সম্মেলন মিস হয়েছে। আগামী ২০ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের সম্মেলনের একটি ডেট রয়েছে। আমরা স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অবশ্যই সম্মেলন করব। ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য কমিটিও হবে। আর আমরা যেহেতু ছাত্রলীগের সঙ্গে আগে থেকেই যুক্ত ছিলাম, যার কারণে সারা দেশের ইউনিট সম্পর্কে ধারণা আছে। সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি কষ্ট হবে না। আর আমরা নতুন করে নেতৃত্বে আসছি দেখেই যে ‘মাইম্যান’ তৈরি করব এমন ইচ্ছা আমাদের নেই। যারা পরিশ্রম করেছে, যোগ্য, তাদের হাতেই ছাত্রলীগের পতাকা উঠবে।

অনেক ইউনিটের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে কমিটি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আপনারা কি তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছেন?
অভিযোগ শব্দটিই একটি বিতর্কিত শব্দ। অভিযোগ করলাম, আর প্রমাণিত হয়ে গেল বিষয়টা এমন না। তদন্তসাপেক্ষে প্রমাণের ব্যাপার আছে। তদন্তের মাধ্যমে যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব। এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স।

রাজনীতিতে আসার শুরুটা জানতে চাই...
আমার জন্ম রাজনৈতিক পরিবারে। সাংগঠনিক রাজনীতি শুরু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরে। কিন্তু আদর্শিক রাজনীতি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আমার রক্তে মেশা। একটি গল্প বলি...

সিওর..
তখন আমি স্কুলে পড়ি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায়, ২০০৩-৪ সালে হবে। মাইকে জিয়াউর রহমানের ভাষণ চলছে। যেখানেই যাচ্ছি জিয়াউর রহমানের ভাষণ। বাইরে থেকে ভাষণ শুনে বাড়ি এসে আমরা বলছি ‘আই জিয়াউর রহমান ডিক্লিয়ারিং দ্য লিবারেশন অব বাংলাদেশ’... এ কথা শুনে আমার বাবা বললেন, ‘এর ভেতরে একটা শব্দ মিসিং আছে তোরা জানিস’ আমি বললাম না তো। তখন বাবা বললেন, ‘অন বিহ্যাফ অব’ শব্দটা নেই, সেটা উঠিয়ে দিয়েছে। ছোটবেলা থেকেই রাজনৈতিক আদর্শ পেয়েছি। আমার দুই চাচা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিন চাচা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তাদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছি। এরপরে রাজনৈতিক কারণে আমার আত্মীয়স্বজনকে নির্যাতিত হতে দেখেছি। আমার মামাবাড়ি সাতক্ষীরা। মামার এক ছেলেকে বিএনপি আমলে তিনবার কিডন্যাপ করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা হার মানিনি।

আপনার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার খবরে পরিবারের প্রতিক্রিয়া কেমন?
এ অনুভূতি কখনো বলে বোঝানো যাবে না। আমার মনে হয় যারা ছাত্রলীগ করে, তাদের পরিবার একরকমের মনোকষ্টেও থাকে। আমার বন্ধু-বান্ধব যারা ছিল প্রায় সবাই স্টাবলিশড। আমি কিছুই করতে পারছি না। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিল। কিন্তু তাদের প্রত্যাশা মাফিক কিছুই করতে পারিনি। এখন যে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছি এর থেকে বড় কোনো পাওয়া আমার পরিবারের জন্য নেই।


খোলা কাগজকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ

খোলা কাগজ এবং আপনাকে ধন্যবাদ