জাপা কি তাসের ঘর

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

জাপা কি তাসের ঘর

কাউন্সিল ৩০ নভেম্বর

শফিক হাসান ১১:১৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০১৯

print
জাপা কি তাসের ঘর

নদীর একূল ভাঙলে ওকূল গড়ে, জাতীয় পার্টি (জাপা) ভাঙলে কী হয়! দলটি কি তাসের ঘরের মতো শুধু ভাঙতেই থাকবে- এমন প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের। জাপায় ভাঙনই নিয়তি, তাই গা-সওয়া হয়ে গেছে অনেকের। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতায় থাকাবস্থায়-সৃষ্ট দলটির যে ভূমিকা তাতে এ ভাঙনে খুব বেশি বেদনাবোধও করছেন না কেউ। জাপার ব্র্যাকেটবন্দি হওয়ার ইতিহাস দীর্ঘ। প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের এক সময়কার ঘনিষ্ঠজন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।

১৯৯৮ সালে দল থেকে বহিষ্কারের পর তার নেতৃত্বে দলটি ভাঙে প্রথমবারের মতো। জাতীয় পার্টির নামের পাশে ব্র্যাকেটে যুক্ত হয় মঞ্জুর নাম। এ অংশের নাম হয় জাতীয় পার্টি (জেপি)। এরপর নাজিউর রহমান মঞ্জুরের নেতৃত্বে ২০০১ সালে আরেকবার ভাঙে। এ অংশের নাম হয় বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। এ বিজেপি ভেঙে দ্বিখণ্ডিত হয় ২০০৪ সালে, ডা. এম এ মতিনের নেতৃত্বে।

ঘটনা প্রবাহে ২০১৩ সালে জাপা ভাঙে কাজী জাফরের নেতৃত্বে। সর্বশেষ গত ৫ সেপ্টেম্বর শুরু হয় নতুন দফায় ভাঙন। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়ান দেবর জি এম কাদের ও ভাবি রওশন এরশাদ। এ ভাঙন শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, কী হবে জাপার নিয়তি তা নিয়ে চলছে জল্পনাকল্পনা। ‘সুষ্ঠু সুরাহা’ হলেও সেটা কত দিন থাকবে, আবার কবে ভাঙবে জাপা- আগ থেকেই এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। জাপা হচ্ছে এমন দল, যে দল না ভাঙলেই সাধারণের মনে হবে অস্বাভাবিক বিষয়!

১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম হয় জাতীয় পার্টির। এরশাদ তখন দখল করে রেখেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা। তার বিরুদ্ধে ছিল নানা অভিযোগ। কবিখ্যাতির জন্য লালায়িত, স্বৈরশাসকের তকমা পাওয়া এরশাদকে ক্ষমতা থেকে হঠানোর আন্দোলনে নামে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো, ছাত্র-জনতাসহ শিল্পী-সাহিত্যিকরা। আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে বিতর্কিত নানা অধ্যায়ের জন্ম দেন এরশাদ। একপর্যায়ে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। দেশে পুনরায় গণতান্ত্রিক ধারার প্রত্যাবর্তন ঘটলে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আসে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ।

নব্বই দশকে দুর্নীতির অভিযোগে কারাবরণ করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। কয়েকটি বড় মামলা ‘জিইয়ে’ রেখে তিনি ছাড়া পান জেল থেকে। পর্যায়ক্রমে হয়ে ওঠেন ‘আলু’। আলু এমন তরকারি, মাছ কিংবা মাংস সবখানেই সমানভাবে খাপ খেয়ে যায়। সব রাজনৈতিক দলেই এরশাদ ছিলেন আদরণীয়। যে কারণে জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনি ভানুমতির খেল দেখানোর ‘সুযোগ’ পেতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এরশাদ ছিলেন ক্ষমতার কাছাকাছি; ভোগ করেছেন সব ধরনের ‘রাজনৈতিক সুবিধা’।

এরশাদের প্রথম স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ছোট ভাই জি এম কাদেরের বিরোধ সর্বজনবিদিত। তার জীবদ্দশায়ও দ্বন্দ্ব ছিল তুঙ্গে। এরশাদ কর্তৃক জি এম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচন, আবার দলের অন্যদের আপত্তির মুখে ব্যর্থতার তকমা দিয়ে পদ থেকে অপসারণ, কিছুদিন পর ফের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে পুনর্বহাল- ক্ষমতার এমন ‘আসা-যাওয়া’ রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিল মুখরোচক সংবাদ।

এরশাদ-পরবর্তী দলে কাদেরকে জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ ও মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা প্রথম থেকেই মেনে নেননি। পরিস্থিতি বুঝে মুখ বন্ধ রাখলেও গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে যে নাটক, তা অপ্রত্যাশিত ছিল না। বস্তুত, এরশাদের জীবদ্দশাতেই ধারণা করা হয়েছিল রওশন-কাদেরের সম্পর্কের মেরুকরণ স্বাভাবিক থাকবে না। গত ১৪ জুলাই মারা যান এরশাদ। দুই মাস না যেতেই ফের দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন দেবর-ভাবি। ক্ষমতার প্রশ্নে কেউ কাউকে একচুলও ছাড় দিতে নারাজ।

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও এরশাদের শূন্য আসনে রংপুরে উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে এ দ্বন্দ্ব। বৃহস্পতিবার রওশনপন্থী একটি অংশ সংবাদ সম্মেলন করে তাকেই চেয়ারম্যান হিসেবে দাবি করেন। অন্যদিকে এর এক ঘণ্টা পর পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে কাদের জানান, তিনিই জাপার বৈধ চেয়ারম্যান। অসন্তোষের সূত্রপাত রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচনে প্রার্থী দেওয়াকে কেন্দ্র করে। এ আসনে কে দেবেন প্রার্থী- রওশন নাকি কাদের? প্রকাশ্য এ বিভক্তির নেপথ্যেও ছিল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও লিপ্সা।

রওশন চান ছেলে শাদ এরশাদকে প্রার্থী করতে। জাপার রাজনীতিতে উত্তরাধিকার হিসেবে শাদকে প্রতিষ্ঠাই তার লক্ষ্য। ছেলেকে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করতে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানোই বর্তমানে ‘মোক্ষম অস্ত্র’। অন্যদিকে জি এম কাদের চান না ভাতিজাকে ক্ষমতার টানা-হেঁচড়ায় আনতে। পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে জাপার দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুরসহ সারা দেশে শুরু হয়েছে অনিশ্চয়তার দোলাচল। জাপার রাজনীতি নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।

দলটি এখন মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত। এ দলের নির্বাচিত ২৫ জন এমপির একাংশের প্রত্যাশা, কাদেরই চেয়ারম্যান হিসেবে থাকুন; অন্যদিকে আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ কয়েকজন এমপির মনোবাঞ্ছা রওশনকে চেয়ারম্যান হিসেবে দেখার। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ভাঙন তথা দলে ফাটল ধরানোর মধ্য দিয়ে কেউ কেউ ঘোলা জলে মাছ শিকারের পাঁয়তারা করছেন, চেষ্টা করছেন ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির।

জাপার নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সভাপতিম-লীর সদস্য এবং সংসদীয় দল- উভয় ক্ষেত্রেই জি এম কাদেরের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন রয়েছে। ইতিমধ্যে জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা নিযুক্ত করার জন্য স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে দেওয়া চিঠিতে দলের ২৫ এমপির মধ্যে ১৫ জন স্বাক্ষর করেছেন। জি এম কাদের স্পিকারকে মঙ্গলবার চিঠি দেন, এর পরদিন বুধবারে পাল্টা চিঠি দেন রওশন। তার পরদিন গত বৃহস্পতিবার ঘটে বড় বিস্ফোরণ- রওশনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করতে মাঠে নামে একটি পক্ষ। রওশন নিজেও চেয়ারম্যান হতে মরিয়া। দলের গঠনতন্ত্রের দোহাই দিয়ে খারিজ করে দিয়েছেন কাদেরকে। অন্যদিকে কাদের নিজেকে বৈধ উত্তরাধিকারী দাবি করে সপদে অটল রয়েছেন।

পাল্টাপাল্টির মধ্যেই গতকাল শনিবার তিনি ঘোষণা দিয়েছেন দলের কাউন্সিলের। কাদের জানান, আগামী ৩০ নভেম্বর জাপার কাউন্সিল হবে। দলের প্রেসিডিয়াম ও সংসদ সদস্যদের যৌথসভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। গতকাল দুপুরে জাপার চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়ে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। এর আগে তার হাতে ফুল দিয়ে জাপায় যোগ দেন জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) প্রেসিডিয়াম সদস্য আহমদ সেলিম।

এ সময় কাদের বলেন, পদ-পদবি বা ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের জন্য আমি রাজনীতি করি না। দেশ, দেশের মানুষ ও জাতীয় পার্টির জন্য আমাদের রাজনীতি। কোনো লোভ-লালসার জন্য নয়। জাপার দেশ পরিচালনায় অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য রয়েছে। রাজনৈতিক শূন্যতায় দেশের মানুষ এখন আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। নতুন প্রজন্মের সামনে রাজনীতি করার অন্যতম প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে জাপা। এখনই দলকে আরও শক্তিশালী করতে পারলে আগামী দিনের রাজনীতিতে এবং দেশ পরিচালনার প্রতিযোগিতায় আমরা এগিয়ে যাব।

জি এম কাদের আরও বলেন, সারা দেশে দলকে আরও শক্তিশালী করতে ৮ বিভাগে ৮টি সাংগঠনিক টিম করা হয়েছে। দলের গঠনতন্ত্র এবং প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশনায় চলছে। দলে বিভেদের অবকাশ নেই, বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই। বিশৃঙ্খলার সুযোগ জাতীয় পার্টিতে থাকবে না বলে দাবি করেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন- প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ, আব্দুল মান্নান, সুনীল শুভ রায়, মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, আলমগীর সিকদার লোটন, নাজমা আখতার, মেজর (অব.) রানা মোহাম্মদ সোহেল প্রমুখ।

গতকাল রংপুর-৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণার নির্ধারিত দিন ছিল। দলের একাংশের চেয়ারম্যান রওশন এরশাদপুত্র শাদ এরশাদের নাম ঘোষণা করবেন এমন কানাঘুষা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ঘোষণা স্থগিত করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ নেতা ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ শাদের নাম ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল। পরে প্রেসিডিয়াম সদস্য এসএম ফয়সল চিশতী গতকাল জানান, অনিবার্য কারণে সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তারিখ জানিয়ে দেওয়া হবে। এদিকে জি এম কাদেরের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। উপনির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন রংপুর মহানগরের সাধারণ সম্পাদক এসএম ইয়াসির।

ভাঙনকবলিত বিবদমান জাপার বর্তমান সবেধন নীলমণি মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। বস্তুত, তিনি যেদিকে ঝুঁকবেন সেটাই নতুনভাবে মূল্যায়িত হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট। কিন্তু রাঙ্গাকে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও, মোবাইল ফোনের কলও ধরছেন না। বিদ্যমান ইস্যুতে নিজের মতামতও জানাননি এখনো। একটি পক্ষ জানিয়েছে, শাদ এরশাদকে জাপার রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করায় তার সম্মতি রয়েছে। এদিকে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, রাঙ্গা সরকারের উপর মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। বস্তুত, সেদিক থেকে ইঙ্গিত এলেই ‘বাঁশি’ বাজাবেন। জানাবেন তিনি কোন পক্ষের! গত শুক্রবার এ বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতা কাজী ফিরোজ রশীদকে। জবাবে তিনি বলেন, রাঙ্গা কোন পক্ষে, তাকেই জিজ্ঞেস করুন না! অন্যদিকে রাঙ্গার রহস্যময় নীরবতাও জন্ম দিচ্ছে গুঞ্জনের।

জাপা ভাঙলে কার লাভ- এমন গুঞ্জন চলছে চারদিকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জি এম কাদেরের রয়েছে সরকারবিরোধী অবস্থান। বিএনপিপন্থী হিসেবেই পরিচিত তিনি। অন্যদিকে সরকারের জন্য কিঞ্চিৎ স্বস্তির রওশন এরশাদ। বিগত দিনে এরশাদের পল্টিবাজির সময়গুলোতে ঠাণ্ডা মাথায় রওশন সমর্থন দিয়ে গেছেন আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনাকে। রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের কোন্দল পরবর্তী ভাঙনের পরবর্তী তাস কোনটি, কে কোন আশায় বাঁধতে যাচ্ছেন খেলাঘর- বোঝার জন্যও রাঙ্গার অবস্থান জানা জরুরি!