বিএনপির চোখ পর্যবেক্ষণে

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

বিএনপির চোখ পর্যবেক্ষণে

রংপুর উপ-নির্বাচন

সুলতান মাহমুদ ১০:৫২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০১৯

print
বিএনপির চোখ পর্যবেক্ষণে

জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে তার আসন রংপুর-৩ শূন্য ঘোষণা করা হয়। পরে সেখানে উপ-নির্বাচনের জন্য ইতোমধ্যে তফশিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত তফশিল অনুযায়ী আগামী ৫ অক্টোবর ভোটগ্রহণ হবে। বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ নেবে কি-না সে ব্যাপারে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও দলটির প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হচ্ছে নির্বাচনে অংশ নেবে।

বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- এই দেশে নির্বাচন বলতে এখন আর কিছু নেই। রংপুরে হয়তো একটি নির্বাচন হবে। কিন্তু কেমন নির্বাচন হবে তা পর্যবেক্ষণ করার জন্যই বিএনপি রংপুর-৩ আসনের নির্বাচনে অংশ নেবে। জাতীয় পার্টির ঘাঁটি এরশাদের এই আসনটিতে কৌশলে আগাচ্ছে বিএনপি।

বিএনপি নেতারা বলছেন, জাপার এখন টালমাটাল অবস্থা। যে কোনো সময় দলটি দুইভাগে ভাগ হয়ে যেতে পারে। জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল তারা (আওয়ামী লীগ) যেন রংপুর-৩ আসনে প্রার্থী না দেয়। কিন্তু রাঙ্গার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে দলীয় ফরম বিক্রি করেছে এবং ১৬ জনের মতো আওয়ামী লীগ নেতা মনোনয়ন ফরম তুলেছেন। আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেয় কি-না, জাতীয় পার্টিতে ভাঙন দেখা দিলে কেমন পরিস্থিতি হয় এসব দেখে এবং বুঝে-শুনে বিএনপি রংপুর-৩ আসনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।

বিএনপি মূলত দুটি বিষয়কে টার্গেট করে রংপুরের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এক. নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ধারাবাহিকতা রক্ষা। দুই. এরশাদের মৃত্যু-পরবর্তী জাপার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক এবং নির্বাচন কেমন হবে তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য। এই নির্বাচনের ওপর ভবিষ্যৎ রাজনীতির অনেক কিছু নির্ভর করছে। তাই বিএনপি এই নির্বাচনকে অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন এই দেশে নির্বাচন বলতে এখন আর কিছু নেই। নির্বাচন ব্যবস্থাটাই নেই বলা যায়। রংপুরে নিশ্চয়ই একটা নির্বাচন হবে। হয়তো আমরা অংশগ্রহণও করব। সে ব্যাপারে আমরা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিইনি। আমাদের যে পার্লামেন্টারি বোর্ড আছে সে বোর্ডেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

জানা গেছে, গত ১৪ জুলাই এরশাদ মারা যাওয়ার পর তার আসনটি শূন্য হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি বলেছিল এই সরকারের অধীনে তারা কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। এরপর উপজেলা নির্বাচনে তারা দলীয়ভাবে কোনো প্রার্থী দেয়নি। কিন্তু পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে বিএনপি। বগুড়া-৬ আসনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া আসনে তারা অংশ নেয় এবং জিতে যায়। সামনের সিটি নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে দলটির অংশ নেওয়ার ব্যাপারে দলটির নেতাদের মনোভাব ইতিবাচক।

রংপুরের উপ-নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে বিএনপির নীতি নির্ধারকরা হিসাব-নিকাশ করে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এখনো আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়নি। যেহেতু বগুড়ায় আমরা ইলেকশন করেছি। সে ক্ষেত্রে এই আসনে ভোটে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আছে। সম্ভাবনাও বেশি।

রংপুরের এ আসনটিতে ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় পার্টিই জিতেছে। বিএনপি এটাও জানে এখানে জিততে হলে জাতীয় পার্টির সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে এরশাদের শেষ সময় থেকে জাতীয় পার্টিতে অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেতে থাকে। দলে রওশনপন্থি ও জিএম কাদেরপন্থি হিসেবে দুটি ভাগ রয়েছে। গত ১৮ জুলাই কাদেরকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন বলা হয় এতে রওশন এরশাদের ‘আশীর্বাদ’ আছে। পরে রওশন এরশাদ জিএম কাদেরের চেয়ারম্যান পদ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বিবৃতি দেন।

রওশনের বিবৃতিকে ‘বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য’ নয় বলে পাল্টা মন্তব্য করেন কাদের। পরে আবার রওশনকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন সাবেক মন্ত্রী ও দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। এর পরিপ্রেক্ষিতে জিএম কাদের বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিনি দলের চেয়ারম্যান। দলে কেউ বিশৃঙ্খলা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিএনপি নেতারা বলছেন- জাতীয় পার্টির মধ্যে যে অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছে, সে সুযোগটা কাজে লাগাতে চান তারা। রংপুরের উপ-নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধভাবে প্রার্থী নির্বাচন করতে পারে কি-না, সে বিষয়ে নজর রাখবে বিএনপি। অর্থাৎ জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও সরকারের মনোভাবের ওপর তাদের প্রার্থী নির্বাচন নির্ভর করবে।

রংপুরের আসনে বিএনপির যোগ্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে দলটির পক্ষ থেকে। দলের দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। তিনিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।

গত ১৪ জুলাই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ১৬ জুলাই আসনটি শূন্য ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করা হয়। পরে ওই আসনে উপ-নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এ নির্বাচনে প্রতিটি কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করা হবে।

মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, বাছাই হবে ১১ সেপ্টেম্বর, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৬ সেপ্টেম্বর। ৫ অক্টোবর হবে ভোটগ্রহণ।