ভাঙনই নিয়তি জাপার

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৫ আশ্বিন ১৪২৬

দুই মাসও টিকল না দেবর-ভাবির সংসার

ভাঙনই নিয়তি জাপার

শফিক হাসান ১০:২৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৯

print
ভাঙনই নিয়তি জাপার

দুই মাস যেতে না যেতেই নড়বড়ে হয়ে পড়ল দেবর-ভাবির সংসার! জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর দলের এমন দ্বিখণ্ডিত চেহারা দেখা যাবে আগে-পরে তা ছিল ‘প্রত্যাশিত’। জাপার শীর্ষ দুই নেতা এরশাদ-পত্নী রওশন এরশাদ এবং ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের পুরনো বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে আবার। প্রয়াত এরশাদের সমাধির মাটি শুকিয়েছে কি শুকোয়নি তার আগেই শুরু হয়েছে ক্ষমতার প্রশ্নে দেবর-ভাবির বিরোধ!

এরশাদ জীবিত থাকা অবস্থাতেই এ বিরোধ ছিল অদৃশ্য। সে সময় এরশাদের নাটকীয় সব সিদ্ধান্ত এবং ‘এরশাদীয়’ আচরণে বোঝা গিয়েছিল ক্যান্টনমেন্ট-সৃষ্ট দল জাপার ভবিষ্যৎ কলহমুখর হওয়ার আশঙ্কার বিষয়। জি এম কাদের জাপা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও গত বৃহস্পতিবার আকস্মিকভাবে দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন দলের একাংশের নেতারা। এর এক ঘণ্টা পর পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে জি এম কাদের জানান তিনিই দলের বৈধ চেয়ারম্যান।

অন্যদিকে দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাকে বৃহস্পতিবার কোনো পক্ষেই দেখা যায়নি। তিনি ছিলেন বিআরটিএর একটি সভায়; আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের পাশে। তার এ ‘অনুপস্থিতি’ এবং ‘উপস্থিতি’ অন্য কোনো বার্তা দিচ্ছে কিনা তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

কেউ কেউ এও বলছেন, রাঙ্গার অনুপস্থিতির পেছনে রয়েছে সরকারের একটি পক্ষের ইন্ধন। তাদের পরামর্শেই রাঙ্গা সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি কার হবেন- কাদেরের, রওশনের নাকি অন্য কারও!

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শুক্রবার প্রেস ব্রিফিংয়ে জাপার শীর্ষ নেতারা জানান, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যান হবেন পার্লামেন্টারি দলের নেতা। এরশাদের মৃত্যুর পর রংপুরে তার আসনে উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে এ নাটক। এ আসনে কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তা নিয়ে সৃষ্ট প্র্রশ্নের আকস্মিক প্রকাশ এ নাটক। এরশাদের

জীবিত অবস্থায়ও দেবর কাদেরের পদ-পদবি মেনে নেননি রওশন; অন্যদিকে কাদের বরাবরই ‘মাতৃজ্ঞানে’ আখ্যায়িত করেছেন ভাবিকে। দেবর-ভাবির দৃশ্যমান এ দ্বন্দ্ব অপ্রত্যাশিত ছিল না; বরং একটি ‘বিস্ফোরণের’ অপেক্ষায় ছিলেন অনেকেই।

গত মঙ্গলবার জি এম কাদের তাকে বিরোধীদলীয় নেতা করতে স্পিকারকে চিঠি দেন। এর পরপরই চরমে ওঠে দ্বন্দ্ব। পরদিন বুধবার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে পাল্টা চিঠি দিয়ে কাদেরের চিঠি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন। এর পরদিনই গত বৃহস্পতিবার রওশনের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনে জাপার চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয় তাকে। এর ঠিক ঘণ্টাখানেক পর পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে জি এম কাদের ঘোষণা দেন রওশনপন্থী নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। যদিও এ হুমকিতে টলেননি রওশনপন্থী নেতারা।

রংপুর-৩ আসনে লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী ঠিক করতে নতুন পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠনের ঘোষণাও দেন রওশনপন্থীরা। এদিকে জি এম কাদেরের নেতৃত্বে একটি পার্লামেন্টারি বোর্ড আগে থেকেই গঠিত ছিল; মনোনয়ন প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়ে রেখেছেন তারা। ইতিপূর্বে এ নির্বাচনে জাপার প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে নিজের নাম উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) চিঠি দিয়েছেন জি এম কাদের। নতুন করে রওশনের ‘আবির্ভাবে’ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কী হবে মনোনয়নের ক্ষেত্রে, কে দেবেন মনোনয়ন, কাকে দেবেন!

জাপার এ গৃহদাহে একটি বাংলা সিনেমার নাম হতে পারতো ‘ভাই বড় না বউ বড়?’ কিন্তু সেটি হওয়ার জো নেই; কারণ জাপায় যা হচ্ছে তা হাজার কিংবা লাখ পর্বের ধারাবাহিক নাটক, এর সঙ্গে তুলনা হতে পারে বছরের পর বছর যাবৎ সম্প্রচারিত ‘অন্তহীন কাহিনী’র ভারতীয় বাংলা সিরিয়ালকে! ‘যুগের পর যুগ’ কেটে গেলেও যেমন ভারতীয় সিরিয়ালের ‘তল’ পাওয়া যায় না, তেমনি জাপার দ্বন্দ্ব, ক্ষমতালিপ্সা এবং ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ানোর প্রবণতাও একসূত্রে গাঁথা। ‘পল্টিবাজ’ হিসেবে নাম ছিল এরশাদের, সে ঐতিহ্যের ধারা বহনকারী জাপার নতুন চরিত্র কী হবে সেটা দেখার আগেই সামনে এলো ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, পদ-লিপ্সা। এ দ্বন্দ্বে জাপা দ্বিখণ্ডিত হবে কিনা এমন সংশয় রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। দ্বন্দ্বটা শুধু জাপায় সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতিও। রংপুরে জাপার দুর্গ বলে পরিচিত এ আসনে প্রায় অর্ধশতাব্দী নিয়ন্ত্রণ নেই আওয়ামী লীগের; দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে দলটি চেষ্টা করছে বলয় শক্তিশালী করার। সেখানকার আওয়ামী লীগ নেতারাও তক্কে তক্কে রয়েছেন জাপা দুর্গে হানা দেওয়ার।

জাপার দ্বন্দ্ব বাড়লে তা রূপ নিতে পারে সংঘাতে। সেক্ষেত্রে বানরের পিঠা ভাগের গল্পের মতো হানা দেবে অন্য দলগুলো। রংপুরে শক্ত ঘাঁটি গাড়তে এ আসনই হতে পারে আওয়ামী লীগের ‘ট্রাম্প কার্ড’। জাপাকে দুর্বল করে দেওয়ার মাধ্যমেই শক্তি সঞ্চয় করতে পারে আওয়ামী লীগ। সেক্ষেত্রে ক্ষমতার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন জাপাকে ব্যবহার করে আসা দলটির যদি নতুন কোনো খেলায় জড়াতে হয় তাতেও পিছপা হওয়ার কথা নয়। অবশ্য জাপার ভাঙন নতুন নয়। ইতিপূর্বে কয়েকবার ভেঙেছে দলটি।

এরশাদের জাপা ছাড়াও ইসিতে নিবন্ধিত জাপার আরও তিনটি হচ্ছে- আন্দালিভ রহমান পার্থের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি (নিবন্ধন নম্বর ১৮); প্রফেসর ডা. এমএ মুকিত (চেয়ারম্যান), এএনএম সিরাজুল ইসলামের (ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব) নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (নিবন্ধন নম্বর ২৮) ও জাতীয় পার্টি-জেপি (নিবন্ধন নম্বর ০২)। এ অংশের চেয়ারম্যান বর্তমান সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে রয়েছেন। এছাড়া অনিবন্ধিত অবস্থায় রয়েছে জাতীয় পার্টি (মোস্তফা জামাল হায়দার)।

তিন তিনবার বড় ধরনের ভাঙন ধরলেও শক্তি-সামর্থ্য অনেকাংশে হারিয়ে টিকে আছে জাপা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ফের ভাঙন ধরলে জাপা যে আরও দুর্বল হবে বলার অপেক্ষা রাখে না। জাপার দুর্বল হওয়া মানে দর কষাকষির রাজনীতিতে আরও ‘মূল্যহীন’ হওয়া।

জাপা ভাঙলে কার লাভ? প্রাথমিক অবস্থায় পাল্লাটা রওশনের দিকেই কাত হয় বেশি! আরেক টুকরো হলে অনুগত নেতাদের সঙ্গে নিয়ে চেয়ারম্যান হবেন তিনি। দুই পক্ষই বর্তমান মহাসচিব রাঙ্গাকেই যার যার ‘দলে’ রাখতে চাইলেও রাঙ্গা নিয়েছেন কৌশলী ভূমিকা। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি হবেন এ খেলার তৃতীয় শক্তি। রওশনের সঙ্গে কাদেরের দ্বন্দ্ব নতুন নয়। নব্বই দশকের শুরু থেকে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তা ছিল দৃশ্যমান। ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি রংপুরে জাতীয় পার্টির কর্মী-সম্মেলনে এরশাদ জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ফের চাগিয়ে ওঠে দুজনের দ্বন্দ্ব। এরপর রওশন এরশাদকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করেন এরশাদ।

গত বছর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয় কাদেরকে। সে সময়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগে ছোট ভাই জিএম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন এরশাদ। নানা নাটকীয়তার পর গত ২২ মার্চ পার্টির কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দেন জিএম কাদেরকে। সর্বশেষ চূড়ান্তভাবে গত ৪ মে মধ্যরাতে সাংবাদিকদের ডেকে এরশাদ জানান, জিএম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত ১৪ জুলাই এরশাদ মারা যান। মৃত্যুজনিত শোক ও আনুষ্ঠানিকতা স্তিমিত হলে ফের চাঙ্গা হয় অস্বীকারের রাজনীতি ও না মানার প্রবণতা।

ভাঙনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে গত বৃহস্পতিবারই। রওশন তার গুলশানের বাড়িতে এবং জি এম কাদের বনানীতে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করার সময় বাইরে থাকা নেতাকর্মীরা স্লোগান দিয়েছেন ‘দলকে ভাঙতে দেব না, দেব না’ বলে। অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই রওশন বলেন, ‘পার্টি এখন উদ্বিগ্ন আছে। পার্টিতে কী হচ্ছে? জাপা অতীতেও ভাগ হয়েছে, এবারও কি সেটি হচ্ছে নাকি? হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এত কষ্ট করে পার্টি গড়ে তুলেছেন, এখন সেই পার্টিটা ভালোভাবে চলুক, মান-অভিমান ভুলে যারা চলে গেছে, তারা ফিরে আসুক। আমি চাই পার্টির সবাই মিলেমিশে জনগণের সেবা করব।’

রওশনকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করে সংবাদ সম্মেলনে রাঙ্গা মহাসচিব থাকার কথা বলেছেন সভাপতিম-লীর সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদও। এ সংবাদ সম্মেলনে জাপা নেতাদের মধ্যে ছিলেন- আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, সেলিম ওসমান, গোলাম কিবরিয়া টিপু, লিয়াকত হোসেন, এস এম ফয়সল চিশতী, ফখরুল ইমাম, মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, খালেদ আখতার, নূরুল ইসলাম ও মীর আবদুস সবুর আসুদ। অন্যদিকে জিএম কাদেরের সঙ্গে ছিলেন- জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সালমা ইসলাম, এস এম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর, মোস্তাফিজার রহমান মোস্তাফা, রানা মোহাম্মদ সোহেল প্রমুখ।

দুই সংবাদ সম্মেলনে দুই পক্ষ একে অন্যকে দলে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত করেছে। জি এম কাদেরকে ইঙ্গিত করে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘তিনি দলে বিভক্তি সৃষ্টির জন্য কাজ করছেন। দলের গঠনতন্ত্রের ২০ এর উপধারা ২-এর খ’তে বলা হয়েছে, দলের চেয়ারম্যান যদি দীর্ঘদিন অসুস্থ বা অনুপস্থিত থাকেন, তবে সে সময়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বা কো-চেয়ারম্যান। তবে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন, প্রেসিডিয়ামের মতামতের ভিত্তিতে।’

কাদেরের সমালোচনা করে আনিসুল আরও বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান হতে গেলে পার্লামেন্টারি কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত আসতে হবে। কিন্তু সেই পার্লামেন্টারি কমিটিতে জ্যেষ্ঠ সদস্যদের মতামতও নেওয়া হয়নি। জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে রওশন ম্যাডাম ১ নম্বর।’

রওশনকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করে তার সপক্ষে আনিসুল বলেন, ‘প্রেসিডিয়ামের অধিকাংশ সদস্যের মতামত নেওয়া হয়েছে। এর আগে কোনো মিটিং ছাড়াই সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান, কো-চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পদে সিলেকশনও কোনো মিটিং ছাড়াই হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে দলের কাউন্সিল করে রওশন এরশাদের চেয়ারম্যান হওয়ার বিষয়টি আরও পাকাপোক্ত করা হবে।’

অন্যদিকে জি এম কাদের বলেন, ‘দলের ২৫ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৫ জন সংসদ সদস্য আমার পক্ষে রয়েছেন। তারা সবাই আমার পক্ষে মত দিয়েছেন। আলাদা করে পার্লামেন্টারি কমিটির মিটিং করে সিদ্ধান্ত দিতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। এর আগে পার্টিতে যেসব পরিবর্তন এসেছে, পার্লামেন্টারি কমিটির কোনো মিটিং করে করা হয়নি। ২৫ এমপির ১৩ জন যদি কারও পক্ষে থাকে; তাহলে সেটাকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বলা যায়। এই ১৫ জন বলেছেন যখন, গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে আমরা বিরোধীদলীয় নেতা দেখতে চাই, তখন আমি পত্রটি স্পিকারের কাছে পাঠিয়েছি।’

এ সময় সত্বর কাউন্সিল করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন জি এম কাদের। ২০১৬ সালে সর্বশেষ হয়েছিল জাপার কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হয়েছিল। সেই কাউন্সিলের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত মে মাসে।

এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচন হবে আগামী ৫ অক্টোবরে। ১৯৯১ সাল থেকে এ আসনে নির্বাচিত হয়ে আসছেন এরশাদ। ৩০ বছরের একচ্ছত্র আধিপত্যের পর উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাপা থেকে পাঁচজন, আওয়ামী লীগ থেকে ১৬ জন, বিএনপি থেকে পাঁচজন প্রার্থী দলের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। কে হতে যাচ্ছেন এ আসনের এমপি। বস্তুত, এ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই মোড় ঘুরতে পারে দীর্ঘদিনের একটি ঐতিহ্যের! আসনটি পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখছে আওয়ামী লীগ। বিএনপির মধ্যেও রয়েছে যথেষ্ট আগ্রহ-উদ্দীপনা।

জাপার নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব তথা ভাঙনের পেছনে দলীয় কোন্দল যেমন রয়েছে, তেমনি আছে ক্ষমতাসীনদের বিভক্তির আকাক্সক্ষাও। দলটিকে দুর্বল করতে এটিই হতে পারে বড় অস্ত্র। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ভরা। এর ফলে ছোট ছোট দলগুলো জাপায় যোগ দিতে পারে। বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়েই সরকারে থাকবেন জাপার কোনো কোনো নেতা। মুখে ‘জাপা নিয়ে আগ্রহ নেই’ বললেও সরকারের পক্ষ থেকে উভয়পক্ষকেই সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে শিগগিরই।

দেবর-ভাবির সম্পর্কের ফাটলে মোট কত পক্ষ লাভবান হবে, ক্ষতিই বা কার, কী ধরনের- দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন!
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের : কাজী ফিরোজ রশীদ : জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেছেন, দলের গঠনতন্ত্রের ২০/১-ক উপধারা অনুযায়ী পার্টির চেয়ারম্যান যে কাউকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করতে পারবেন। দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ঘোষণা অনুযায়ী তার মৃত্যুর পরে জি এম কাদের দলের চেয়ারম্যান।

গতকাল শুক্রবার রাতে বনানীর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ফিরোজ রশীদ আরও বলেন, এরশাদ জীবিত অবস্থায় বলে গেছেন, আমার মৃত্যুর পর জি এম কাদের দলের চেয়ারম্যান হবেন। পার্টির নেতাকর্মীরা তার নির্দেশ মতো চলবেন। কিন্তু একটি কুচক্রী মহল নানা রকম বিভ্রান্তি চড়াচ্ছে। এর ফলে জাপার বিভিন্ন জেলার নেতাদের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, জাপার গঠনতন্ত্রের বাইরে কারও পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়।

জাপার এ শীর্ষ নেতা আরও বলেন, পার্টির গঠনতন্ত্রের কোথাও লেখা নেই, দলের সংসদীয় কমিটি বৈঠক করে ঠিক করবে, কে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হবেন, কে উপনেতা হবেন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের চেয়ারম্যান ঠিক করবেন কে বিরোধীদলীয় নেতা হবেন, কে উপনেতা হবেন।

দলের সংসদ সদস্যদের ১৫ জন সমর্থন দিয়ে জি এম কাদেরকে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা করতে স্বাক্ষর করে স্পিকারকে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন ফিরোজ রশীদ। তিনি বলেন, ‘গত ১৭ আগস্ট দলের প্রেসিডিয়াম সভা ছিল, সেখানে ৩৪ জন উপস্থিতির মধ্যে ২৬ জন বক্তব্য দিয়েছেন। তারা সবাই বলেছেন, দলের সভাপতিই সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হবেন। সেই অনুযায়ী ১৫ জন সংসদ সদস্য চিঠিতে স্বাক্ষর করে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন।

জাপার মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাকে গত ২ দিন কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তিনি কোথায় আছেন- প্রশ্ন করা হলে ফিরোজ রশীদ বলেন, তিনি কোথায় আছেন, আমরা জানি না। তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কোথায় আছেন। তবে জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করতে স্পিকারকে দেওয়া ১৫ জন সংসদ সদস্যের চিঠির মধ্যে রাঙ্গা প্রথম স্বাক্ষর করেছেন।

জাপার আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) আমাদের দলের এক সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য (আনিসুল ইসলাম মাহমুদ) জাতীয় পার্টির একজনকে (রওশন এরশাদ) চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেছেন। যা গঠনতন্ত্রবিরোধী ও অবৈধ। তার মতো সিনিয়র নেতার কাছ জি এম কাদেরপন্থি নেতারা এমনটা আশা করেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রংপুর-৩ আসনে প্রার্থী ইয়াসির : রংপুর-৩ আসনের উপ-নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসিরকে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে প্রার্থী হতে সাক্ষাৎকার দেন তিনজন। জি এম কাদেরের নেতৃত্বে গঠিত দলের পার্লামেন্টারি বোর্ড তাদের সাক্ষাৎকার নেন। গতকাল শুক্রবার বিকালে জাতীয় পার্টির বনানী অফিসে রংপুর-৩ আসনের উপ-নির্বাচনের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ শুরু হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন না দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সালমা ইসলাম বলেন, আমরা রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছি। শনিবার (আজ) দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করতে পারেন।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম ও সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আজ শনিবার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। দলের প্রার্থী হতে দলীয় মনোনয়ন ফরম গ্রহণ করেছিলেন পাঁচজন। তারা হলেন- প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখর উজ্জামান জাহাঙ্গীর, রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদ, যুগ্ম মহাসচিব ও রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসির, পার্টির নির্বাহী সদস্য ড. মেহেজাবুন নেসা টুম্পা ও আবদুর রাজ্জাক। তবে সাক্ষাৎকার দিতে আসেননি সাদ এরশাদ ও মেহজাবুন নেসা টুম্পা।