জাপায় ভাঙন আসন্ন

ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯ | ৯ ভাদ্র ১৪২৬

এরশাদের মৃত্যুর ১০ দিন

জাপায় ভাঙন আসন্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক ১১:০৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৩, ২০১৯

print
জাপায় ভাঙন আসন্ন

জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর ১০ দিন পেরুতে না পেরুতেই গভীর সংকটের মুখে জাপা। দলের চেয়ারম্যান নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এরশাদের স্ত্রী ও জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ জানিয়েছেন, চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদেরকে মানেন না তিনি। অন্যদিকে এরশাদের ভাই ও জাতীয় পার্টির সদ্যনির্বাচিত চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেছেন, রওশন এরশাদের নামে পাঠানো বিবৃতিটি কাঁচা হাতের, এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। এরশাদের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে না উঠতে দুই নির্ভরশীল ও জ্যেষ্ঠ নেতার মধ্যকার এই অবস্থান জাতীয় পার্টির জন্য অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন দলের নেতাকর্মীরা। আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন জাপায় ভাঙন আসন্ন।

গত ১৪ জুলাই ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যু হয় এরশাদের। মৃত্যুর আগে দলের উত্তরসূরি কাকে বানাবেন তা নিয়ে টানাপড়েনে ছিলেন তিনি। বারবার সিদ্ধান্তও বদলান। কেননা, জাতীয় পার্টিতে বেশ কয়েক বছর ধরেই দুই শিবিরে বিভক্তি দৃশ্যমান ছিল।

এরশাদের সিদ্ধান্তের পেন্ডুলাম তাই একবার হেলেছে রওশনপন্থীদের দিকে, আরেকবার হেলেছে জি এম কাদেরপন্থীদের দিকে। তাই কার হাতে দেবেন জাতীয় পার্টির দায়িত্ব তা নিয়ে দুশ্চিন্তাতেই ছিলেন এরশাদ। কয়েকবার সিদ্ধান্ত অদলবদল করে ছোট ভাই জি এম কাদেরকেই দলের উত্তরসূরি করে যান তিনি। জীবিত অবস্থায় সব ঠিকঠাকই ছিল। আপাত শান্তি বিরাজ করছিল জাতীয় পার্টিতে। কিন্তু এরশাদের মৃত্যুর পর গত ১৮ জুলাই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মনোনয়ন করা হয় জি এম কাদেরকে। বনানী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা ছিলেন কাদেরের পাশেই। সে সময় জি এম কাদের বলেন, জাতীয় পার্টিতে কোনো দ্বন্দ্ব, মতভেদ ও বিভেদ নেই। জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধ।’ ভাবী রওশনের দোয়াও নিয়ে আসেন তিনি।

চেয়ারম্যান হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার চার দিন পেরুতে না পেরুতেই শুরু হয়েছে জাতীয় পার্টিতে নতুন নাটকীয়তা। এরশাদ বেঁচে থাকাকালে বারবার জাতীয় পার্টি আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে এমন সব নাটকীয় ঘটনায়। এ ধারার পুনরাবৃত্তিই ঘটল গতকাল। তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি তো সব সময় একই হয় না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাপা এবার ভাঙবে। নিকট অতীতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) যেভাবে ভেঙে দুই ভাগ হয়েছে সেই একই পরিণতি বরণ করতে যাচ্ছে দলটি।

জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান মানেন না রওশন
এরশাদের ভাই জি এম কাদেরকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মানেন না দলটির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতার প্যাডে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল রওশন এ কথা জানান। রওশন বলেন, জি এম কাদেরকে জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান ঘোষণা করার আগে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মতামত নেওয়া হয়নি। ফলে জি এম কাদের এখনো ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানই আছেন।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে রওশন বলেন, সম্প্রতি তিনি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে জানতে পেরেছেন, জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তার দাবি, এ নিয়ে আদৌ কোনো যথাযথ ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।

দলীয় গঠনতন্ত্রের ধারা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালনকালে জাপার গঠনতন্ত্রের ধারা ২০ (২)-এর খ-এ দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। মনোনীত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রেসিডিয়ামের সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করবেন। চেয়ারম্যানের অবর্তমানে ধারা ২০ (২)-এর ‘ক’-কে উপেক্ষা করা যাবে না। তিনি আশা করেন, বর্তমানে যিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তিনি দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, জাপার অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা রওশন এরশাদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত। বিজ্ঞপ্তিতে দলের নয়জন নেতার নামও উল্লেখ করা হয়। তারা হলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ফখরুল ইমাম, সেলিম ওসমান, নাসরিন জাহান রত্না, মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী, প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আবদুস সবুর আসুদ ও দেলোয়ার হোসেন এবং সংসদ সদস্য রওশন আরা মান্নান ও লিয়াকত হোসেন খোকা।

রওশনের বিবৃতিটি কাঁচা, বিশ্বাসযোগ্য নয় : কাদের
রওশন এরশাদের বিবৃতি ‘বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য’ নয় বলে মন্তব্য করেছেন কাদের। তিনি বলেছেন, ‘জাতীয় পার্টিতে কোনো বিভেদ নেই। জাতীয় পার্টি ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করছে। নেতৃত্বের প্রশ্নে জাতীয় পার্টিতে কোনো দ্বন্দ্ব নেই।’ তিনি বলেন, রওশনের বিবৃতিটি হাতে লেখা ও কাঁচা। এটা বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্য নয়।’

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়ে উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে অনির্ধারিত আলোচনায় জি এম কাদের এ কথা বলেন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন দলের চেয়ারম্যানের উপ প্রেস সচিব খন্দকার দেলোয়ার জালালী।

জিএম কাদের জানান, ‘চিঠিতে যে লোকগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে, তাদের দু-তিনজনের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, এর সঙ্গে তারা একমত নন। অনেকে বলেছেন, আমরা জানিই না।’ বিবৃতির ভাষাও ‘টেকনিক্যালি কারেক্ট নয়’ বলেও মন্তব্য করেন এরশাদের সহোদর জিএম কাদের। তার ভাষায়, ‘ইট ওয়াজ নট প্রপারলি সাইনড, নট প্রপারলি টাইপড।’ ভাবী রওশন এর মধ্যে জড়িত এটাও মনে করেন না দেবর জি এম কাদের। জড়িত থাকলেও দলের জন্য কোনো ‘ক্রাইসিস’ হবে না বলেও মন্তব্য তার। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়া প্রসঙ্গে জিএম কাদের বলেন, ‘উনি (এরশাদ) যখন মারা গেলেন, উনার চিঠিতে যে আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের গঠনতন্ত্রে একটি ধারায় উনার ওভাররাইটিং পাওয়ার, বিধিতে যাই থাকুক (গঠনতন্ত্র) এই বিধি কার্যকর হবে। এ ধরনের একটি কথা থাকাতে এবং উনার অর্ডার থাকাতে সবাই বলল, এখন আর আপনাকে ভারপ্রাপ্ত বলা যায় না। অফিসিয়ালি, ইউ আর চেয়ারম্যান।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটার মধ্যে কোনো কনফিশউন ছিল না, এখনো নেই। কাজ চলছে। পার্টি ইউনাইটেড। আমাকে যে নামেই ডাকা হোক, আমি যে কাজ করছিলাম সে কাজই করছি। সে কাজই ভবিষ্যতে করব। এটাকে আমি বিরাট কোনো সমস্যা মনে করছি না।’

রওশন এরশাদের সঙ্গে কোনো মান অভিমানের সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন জিএম কাদের। নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক বেশ ভালো বলেও দাবি তার। কাদের বলেন, ‘আমার ভাই আমাকে ছোটবেলা থেকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। বাবার মতো দেখতাম তাকে। ওই হিসেবে উনার ওয়াইফকে আমরা মায়ের মতো দেখি।’

কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে : মশিউর রহমান রাঙ্গা
পুরো ঘটনাকে ভিন্ন চোখে দেখছেন দলটির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা। তার দাবি কেউ ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘এটা আসলে রওশন এরশাদের থিওরি নয়। যদি থাকত, উনি ডাকলেই সবাই হাজির হতো। কিংবা জি এম কাদেরকে বলতে পারতেন।’