একার লড়াইয়ে বিএনপি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

একার লড়াইয়ে বিএনপি

তুষার রায় ১০:৪৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০১৯

print
একার লড়াইয়ে বিএনপি

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দলটি অভ্যন্তরীণ নীতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। হারের পর তাদের সঙ্গী ২০ দলীয় জোট থেকে কয়েকটি দল বেরিয়ে গেছে। সর্বশেষ গত ৮ জুলাই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দীকী আরেক জোট ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার ঘোষণা দেন। আস্থাভাজন শরিক এলডিপি জামায়াতনির্ভর একটি প্লাটফর্মও গড়েছে। আর প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও ‘নিষ্পৃহ’ দূরত্ব বাড়িয়েছে বিএনপির।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে এ সব তথ্য জানা গেছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতের সঙ্গে থাকতে রাজি নন দলের স্থায়ী কমিটির অনেক সদস্য। এ ছাড়া গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ওপরও তেমন ভরসা পাচ্ছে না বিএনপি হাইকমান্ড।

দেশে জোটভিত্তিক রাজনীতির বাস্তবতা থাকলে গত নির্বাচনে বিএনপির জন্য তা অকার্যকর প্রমাণ হয়েছে। এজন্য তৃণমূলে দলটির ব্যাপক জনসমর্থনকে ভিত্তি করে নতুন ধারার রাজনীতির পথে এগুতে চাইছে দলটি। পরনির্ভরতা ঝেড়ে ফেলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ফের সংগঠনকে চাঙ্গা করার পরিকল্পনা করছেন তারা।

জাতীয় নির্বাচনে শুরুতে বেসুরো গাইলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে নামে বিএনপি। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে ভোট করাটা তাদের জন্য ছিল অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এ সময় দলটি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের অন্তর্ভুক্ত হয়। এতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিকরা ক্ষুব্ধ হয়। তবে ভালো ফলের আশায় শরিকরা ড. কামালের তর্জন গর্জন মুখ বুজে হজম করে। কিন্তু শোচনীয় হারের পর শরিক নেতারা মুখ খুলতে শুরু করেন। ভোটের আগেই ১৬ অক্টোবর জোট ছাড়েন বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি।

গত ৬ মে বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থও জোট ছেড়ে যান। এদিকে গত ২৭ জুন এলডিপি প্রধান অলি আহমদ নতুন প্লাটফর্ম ‘জাতীয় মুক্তিমঞ্চ’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এতে এলডিপির সঙ্গে রয়েছে ২০ দলীয় জোট শরিক কল্যাণ পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা, খেলাফত মজলিশ ও ন্যাশনাল মুভমেন্ট। তবে তারা ২০ দলীয় জোটেও থাকছেন বলে জানান অলি আহমদ। ওই জোটে জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে এলডিপি প্রধান বলেন, ‘একাত্তরের জামায়াত আর বর্তমানের জামায়াত এক নয়। আজকের জামায়াত দেশপ্রেমিক শক্তি।’ এরপর থেকে জামায়াত নেতৃত্বের সঙ্গে অলির গোপন বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন বিশ্লেষকরা। কাদের সিদ্দীকীও বেরিয়ে গেলেন। আরও কয়েকটি ছোট শরিক দল ২০ দলীয় জোট ছাড়তে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। ফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরাম সভাপতি ড. কামালের সঙ্গেও বিএনপির বোঝাপড়া আগের মতো অটুট নেই।

বিএনপির বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, এসব ঘটনার পর থেকেই নিজের মতো করে চলার চেষ্টা শুরু হয়েছে। দলটির নীতি-নির্ধারকদের উপলব্ধি, ২০ দলীয় জোট শরিকদের জনভিত্তি খুবই নগণ্য। এসব দল মূলত একব্যক্তি নির্ভর। বিএনপির সমর্থন ছাড়া কারও পক্ষে এককভাবে জিতে আসা সম্ভব নয়। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে এসব নামমাত্র শরিকরা অনেক সুবিধা নিয়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত প্রতিদান দিতে নারাজ তারা। উল্টে দুঃসময়ে বিএনপি ছেড়ে যাচ্ছে এসব শরিক।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে খোলা কাগজ বলেন, দুঃসময়ে শরিকদের ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি আমাদের আহত করেছে। জামায়াত সম্পর্কেও আমাদের মনোভাবে পরিবর্তন এসেছে। আমরা মনে করছি, বদলে যাওয়া বাংলাদেশে ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি আগের মতো কার্যকর নয়। বিগত বছরগুলোতে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নব জাগরণ ঘটেছে। নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোনো কিছুই বিবেচনায় আনতে চায় না। তা ছাড়া একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দলটির শীর্ষ কয়েকজন নেতার ফাঁসি কার্যকর ও বিচারের পর জনগণ জামায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। দীর্ঘদিন একসঙ্গে চলায় আন্তর্জাতিকভাবেও মুখ পুড়েছে বিএনপির। এসব বিবেচনায় শুধু ভোটব্যাংকের বিবেচনায় দলটি আর জামায়াতকে আগের মতো গুরুত্ব দিতে নারাজ। এমনকি জামায়াত যদি বিএনপিকে ছাড়তে চায় তাহলেও আপত্তি নেই বিএনপির।

বিএনপি নীতি-নির্ধারকরা মনে করছেন, দেশের তৃণমূল স্তরে এখনো বিপুল সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে তাদের। শত মামলা নির্যাতনেও এসব সমর্থকরা দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। এর সঙ্গে রয়েছে সরকারবিরোধী প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া। এই দুটো সমর্থন যদি অটুট রাখা যায় তাহলে বিএনপিকে অন্য কোনো জোট বা শক্তির দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। তারা মনে করছেন, ক্ষমতায় যেতে হলে দলীয় সমর্থক ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন সদস্য সংগ্রহ করতে হবে। জনইস্যুতে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। পেছন থেকে কাউকে সমর্থন না করে নিজেদের ভরসাতে এগুতে হবে। তাহলেই গণআন্দোলনের মাধ্যমে দলের ‘প্রাণভোমরা’ খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করা সম্ভব হবে।

স্থায়ী কটিমির ওই সদস্য আরও বলেন, আগের মতো ভারত বিরোধিতাও আর কার্যকর নয়। কারণ গত ১০ বছরে বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট অনেক বদলে গেছে। আমেরিকা, চীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাতে এখন আগ্রহী নয়। পাকিস্তানও নানা ঝামেলায় লেজেগোবরে অবস্থা, মধ্যপ্রাচ্যের কট্টর গোষ্ঠীগুলো থেকে পাওয়া লজিস্টিক সাপোর্টও কাজে আসছে না। তা ছাড়া ক্রমশ বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ছে ভারতের। ভারতকে পাশ কাটিয়ে অন্য কোনো দেশ এখানে নাক গলাতে চায় না। ফলে প্রতিবেশী দেশটিকে আক্রমণের লক্ষবস্তু বানিয়ে আর বিরাগভাজন হতে চায় না বিএনপি। বরং নরেন্দ্র মোদি সরকারের সঙ্গে সদ্ভাবের চেষ্টায় দেশটির বিভিন্ন থিঙ্কট্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে দলের পররাষ্ট্র উইং।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এসব হিসাব-নিকাশের পর বিএনপি তাদের অন্যতম সংগঠন ছাত্রদলকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিতর্কমুক্ত নিবেদিত নেতাদের হাতে দায়িত্ব দিয়ে সংগঠনটিকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করছে বিএনপি হাইকমান্ড। এ ছাড়া যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল, মহিলা দলসহ বিভিন্ন ইউনিটে আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ চলছে।

দলের হাইকমান্ড মনে করছে, বাস্তবিকঅর্থে বিএনপির এখনো বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের এক ছাতার নিচে আনা গেলে বিএনপির যৌক্তিক দাবি আমলে নিতে বাধ্য হবে সরকার। এজন্য এখন পাখির চোখ করা হচ্ছে দলের নিজস্ব ভোটব্যাংককে। হিসাবের খাতায় এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে বিএনপি সমর্থক নন কিন্তু আওয়ামী লীগ ও সরকারবিরোধী গোষ্ঠী। ভবিষ্যতে এ দুইয়ের ম্যাজিকের অপেক্ষায় নতুন করে নিজেদের গুছিয়ে নিতে চায় দলটি।

ঘুরে দাঁড়াবে বিএনপি : লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান
রাজনীতিতে শরিক দলগুলোর আসা-যাওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। অলি আহমদ বিএনপি ছেড়েছেন বহু আগে। তার দল নিয়ে আমাদের সঙ্গে জোটে আছেন। তিনি নিজের মতো করে নতুন মঞ্চ করেছেন। কাদের সিদ্দিকী বাইরে থেকে এসেছিলেন, পার্থও আগে জোটে ছিলেন এখন চলে গেছেন। তারা মনে করেছেন এসেছেন, আবার চলেও গেছেন। এসব আসা-যাওয়া রাজনীতিতে খুব স্বাভাবিক ঘটনা। এগুলো তো আর কোনো বন্ধন না যে, চিরদিন সবাই একসঙ্গে থাকবেন। পারস্পরিক স্বার্থে রাজনৈতিক জোট গড়ে ওঠে আবার নানা কারণে তা ভেঙেও যায়। এগুলো নিয়ে বিএনপি চিন্তিত নয়।

বিএনপি একটি বিশাল জনভিত্তিসম্পন্ন দল। জনসমর্থনের নিরিখে আওয়ামী লীগের সঙ্গে একমাত্র বিএনপিই সমানে সমানে টক্কর দিতে পারে। নির্বাচনের পর আমরা আবার নতুন করে বিশ্লেষণ শুরু করেছি। বিএনপিকে সাংগঠনিক দিক থেকে শক্তিশালী করতে কাজ চলছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেখানে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন তা চিহ্নিত করছি। যেহেতু বিএনপি একটা বিশাল দল। তাই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু অসুবিধা হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে এসব অসুবিধা দূর হয়ে যাবে। সে লক্ষ্যে দলে কাজ চলছে। বিএনপি কারও ওপর নির্ভর করে রাজনীতি করে না। তৃণমূলে আমাদের বিপুল সমর্থক, নেতা-কর্মী রয়েছেন, তাদের সঙ্গে নিয়েই আগামী দিনে এগিয়ে যাবে দল। নুতন করে ঘুরে দাঁড়াবে বিএনপি।

আর জামায়াত যে আদর্শের রাজনীতি করে, যে পদ্ধতিতে রাজনীতি করে সে বিষয়ে আমি একমত নই। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে রাজনীতি করে। তাই একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে জামায়াতের আদর্শের সঙ্গে আমার আদর্শের কোনো মিল নেই। তারা তাদের মতো করে রাজনীতি করে। তাদের রাজনীতির বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।