সংসদে যোগদান ভুল না সঠিক

ঢাকা, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৬ আশ্বিন ১৪২৬

সংসদে যোগদান ভুল না সঠিক

কোন পথে বিএনপি ৩

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৪৩ অপরাহ্ণ, জুন ১১, ২০১৯

print
সংসদে যোগদান ভুল না সঠিক

২০১৪-এর দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে বিএনপি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে বড় প্রশ্ন তৈরি করে দিয়েছিল বিশ্বমহলে। সে নির্বাচনকে একতরফা ও বিনাভোটের নির্বাচন বলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রচারণাও চালায় বিএনপি। এর ফলে টানা পাঁচ বছর এক ধরনের অস্বস্তি ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রচ্ছন্ন চাপের মধ্যে থাকতে হয়েছে মহাজোট সরকারকে। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের সে অস্বস্তি তো কেটে গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাফল্য এবং নির্বাচিত সব প্রতিনিধিদের সংসদে নিতে পারার কৃতিত্ব।

আওয়ামী লীগের এ সাফল্য ও কৃতিত্ব যেখান থেকে শুরু সেখান থেকেই বিএনপির নতুন পর্যায়ের ব্যর্থতা ও পরাজয়ের যাত্রাও শুরু। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোট জাতীয় এক্যফ্রন্টের অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে একাদশ জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি। ৩০০ আসনের বিপরীতে ঐক্যফ্রন্ট থেকে বিএনপি পেয়েছে মাত্র ছয়টি আর গণফোরাম পেয়েছে দুটি আসন। অপরদিকে স্বতন্ত্র তিনটি আসন ছাড়া আওয়ামী লীগ, মহাজোটের শরিক ও মিত্ররা পায় ২৮৯টি আসন।

আওয়ামী লীগের এ ‘অতি বিজয়’ নির্বাচনকে এক ধরনের প্রশ্নের মুখেই ফেলে দিয়েছিল। সে অবস্থায় নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান এবং পুনর্নির্বাচনের দাবিতে ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচি রাজনীতির মাঠে প্রচ্ছন্ন উত্তাপ ছড়াচ্ছিল। বিশ্লেষকদের মতে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের ৮ সদস্যই তখন জোটটির জন্য ‘তুরুপের তাস’ হয়ে হাজির হয়েছিল। কেননা শেষ পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্টের এই আট সদস্যই গোটা সংসদের প্রকৃত বিরোধীদলীয় শক্তি। কিন্তু তারা এ তাস শেষ পর্যন্ত নিজেদের হাতে রাখতে পারেনি। ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির নির্বাচিত সদস্যরা নিজেদের দল বা জোটের বদলে আওয়ামী লীগের ‘তুরুপের তাসে’ পরিণত হয়ে যায়।

নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যানের পর নির্বাচন বাতিল ও নতুন নির্বাচনের দাবিতে ঐক্যফ্রন্ট সারা দেশে কর্মসূচি দেয়। এপ্রিল মাস থেকে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে সভা-সমাবেশ, গণশুনানির মতো কর্মসূচি ঠিক করেছিল তারা। বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের পরের দিন থেকেই বলে আসছিল তারা ভোট ডাকাতি ও জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদে যোগ দেবে না।

বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের এ অবস্থানের ফলে রাজনীতিতে কী হচ্ছে-কী হবে- এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। কারণ বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের সদস্যরা যদি শেষ পর্যন্ত সংসদ বর্জন করে তা হলে আওয়ামী লীগ ফের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশ্নের মুখে পড়বে। নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে কথা উঠবে সর্বত্র। ফলে আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই চাইছিল না বিরোধী আট সদস্য আরও পাঁচ বছরের ‘অস্বস্তি’ হয়ে থাকুক। তারাও নানামাত্রিক তৎপরতা শুরু করে। চেষ্টা করে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টকে সংসদে নিতে। অপরদিকে সংসদে যোগদানের ডেডলাইন ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত বিএনপি সংসদে না যাওয়ার ব্যাপারে অটল থাকে। কিন্তু দিন যতই গড়াতে থাকে বিএনপির গণেশ ততই উল্টে-পাল্টে যেতে থাকে।

মার্চ মাসে গণফোরামের দুই সংসদ সদস্য- সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খান দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদে শপথ নিয়ে গোটা বিরোধী শিবিরের আন্দোলন ও রাজনৈতিক অবস্থানকে নড়বড়ে করে তোলে। গণফোরামের নির্বাচিতদের বিএনপি করায়ত্ত করতে না পারলেও নিজেদের ছয় সদস্যকে অন্তত নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছিল বিএনপি। বলছিল গণফোরাম গেলেও বিএনপির সংসদে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু বিএনপি সে অবস্থানে অটল থাকতে পারেনি। ২৫ এপ্রিল সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত বিএনপির সদস্য জাহিদুর রহমান দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদে শপথ নিয়ে বসেন। দিন যত ঘনিয়ে আসতে থাকে ততই বিএনপির সদস্যদের নিয়ে রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি তৈরি হওয়া শুরু করে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ সময় জানান, সংসদে যোগদানের ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে তাদের ওপর চাপ রয়েছে। যদিও সরকারের তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি এ অভিযোগ নাকচ করেন।

জাহিদুর রহমান শপথ নিয়ে দ্বিতীয় অধিবেশনে যোগ না দিয়ে গণমাধ্যমকে জানান, তিনি তার দলের অপর সদস্যদের সঙ্গে নিয়েই অধিবেশনে যাবেন। তিনি তাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। এতে বিএনপির অন্য সদস্যরাও যে সংসদে যাচ্ছেন তা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়। যদিও শেষ পর্যন্ত বিএনপি চেষ্টা করছিল তার সদস্যদের সংসদে শপথ নেওয়া থেকে বিরত রাখার। কিন্তু বিএনপি পারল না। সংসদে যাওয়ার ব্যাপারে মির্জা ফখরুল ছাড়া বাকি পাঁচ সদস্যই মরিয়া ছিল। দলের বৈঠকেও তারা সে কথা জানান। কঠোর সিদ্ধান্ত দিয়ে নিজেদের নির্বাচিত সদস্যদের সংসদে যাওয়া ঠেকাতে গিয়ে দলের অভ্যন্তরে ভাঙনের পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয় বিএনপিতে। এ নিয়ে চরম অস্থিরতার মধ্যেই ২৯ এপ্রিল সংসদে শপথ নেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশীদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল ইসলাম ও বগুড়া-৪ আসনের মোশাররফ হোসেন। ওই দিন রাতেই সংবাদ সম্মেলন ডেকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে এবং দলের সিদ্ধান্তে বিএনপি সংসদে যোগদান করেছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন তারা সংসদ এবং রাজপথে সমানতালে চালাতে চায়। তাই কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপি সংসদে অংশ নিয়েছে। তবে দলের মহাসচিব এবং বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। শেষ পর্যন্ত ফখরুল সংসদে যাননি। এরই মধ্যে ফখরুলের বাতিল হওয়া আসন বগুড়া-৬ আসনে পুনর্নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।

এদিকে সংসদে যোগদান নিয়ে বিএনপির এ নাটকীয় পরিস্থিতি গোটা রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সংসদে গিয়ে বিএনপি কী পাবে, না গেলে কী হতো-এমন নানা সমীকরণ মেলাতে থাকে বিএনপির নানা পর্যায়ের কর্মী-সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীরা। তাদের অনেকে মনে করেন, খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ায় দলটি অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিটি পরিস্থিতিতেই তারা লেজেগোবরে অবস্থায় পড়ে যাচ্ছে। দলের ভেতরে-বাইরে কোনো পরিস্থিতিই সামাল দেওয়ার মতো ক্ষমতা নেই শীর্ষনেতাদের।

এ ব্যাপারে রাজনীতি বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরী বলেন, বিএনপির সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা চরম ভুল। কারণ নির্বাচনের ফল বর্জন করে আবার সংসদে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দলটি তার চরম দেউলিয়াপনা ও ভঙ্গুর অবস্থার পরিচয় দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আলাপকালে খোলা কাগজকে তিনি বলেন, মূলত বিএনপিতে এখন প্রচণ্ড নেত্বত্বের অভাব চলছে। তার চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। ফলে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দলকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার মতো কোনো অবস্থা দলের মধ্যে নেই। একবার একেক কথা বলা এবং সংসদে যাওয়ায় দলটির প্রতি মানুষের আস্থা উঠে গেছে। সেই সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ ও অনৈক্য দেখা দিয়েছে।