কৌশল না হঠকারিতা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

হাতছাড়া সংসদের বিরোধীদলীয় আসন

কৌশল না হঠকারিতা

কোন পথে বিএনপি ২

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৫৩ অপরাহ্ণ, জুন ১০, ২০১৯

print
কৌশল না হঠকারিতা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চরম হতাশাজনক ফল করলেও সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের সুযোগ এসেছিল বিএনপির সামনে। কিন্তু সংসদে যাওয়া নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। বিএনপির ভুলের কারণেই সংসদে এখন বিরোধী দল হিসেবে নাম লিখিয়েছে সরকারি জোটের শরিক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। যদিও নির্বাচনের পর সংসদে না যাওয়ার বিষয়টিকে রাজনৈতিক কৌশল বলেই মনে করছেন বিএনপি নেতারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট থেকে আটটি আসন পেলেও স্বতন্ত্র আরও তিনটি আসনসহ বিরোধীপক্ষে ১১টি আসন ছিল, যার নেতৃত্ব দিতে পারত বিএনপি। মহাজোট শরিক জাতীয় পার্টির সরকারি শিবিরে থেকে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করার বিষয়টিকে কখনই ইতিবাচকভাবে নেয়নি জনগণ।

বিশেষ করে দশম জাতীয় সংসদে একইসঙ্গে বিরোধী দল ও সরকারে থাকার যে নীতি জাতীয় পার্টি নিয়েছিল তা থেকে দেশ, গণতন্ত্র এবং মানুষ কিছুই পায়নি। মূলত ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল হিসেবেই দলটিকে বিবেচনা করা হতো। এ অবস্থায় একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি এবং তার নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট নেহায়েত কম আসন নিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেলেও জনমনে এই আশার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল যে, সংসদে অন্তত বিরোধীপক্ষে কথা বলার মতো দু-চারজন মানুষ নির্বাচিত হয়েছে। তাদের হাত দিয়ে অন্তত দীর্ঘদিন পর কার্যকর ও প্রাণবন্ত সংসদ পাবে জনগণ। কিন্তু বিএনপি সে জনআকাক্সক্ষাকে অনুধাবন করতে পারেনি।

রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি তার রাজনৈতিক কৌশলে পটু ও পারদর্শী হলে সংসদে প্রধান বিরোধী দলও হতে পারত। কারণ তার নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টই নির্বাচনী ময়দানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক জোট ছিল। নির্বাচনের ফল ঘোষণা থেকে সংসদ গঠন পর্যন্ত জাতীয় পার্টিও অপেক্ষা করছিল বিএনপির গতিবিধি জানার জন্য। ২২ আসন নিয়ে সরকারে থাকবে না বিরোধী দলে থাকবে এ নিয়ে এক ধরনের সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল জাতীয় পার্টি। বিএনপি সংসদে গেলে দলটির অধিকাংশই সরকারে থাকার পক্ষে ছিল। আবার অনেকেই জাতীয় পার্টি, বিএনপি এবং স্বতন্ত্র আসনগুলো নিয়ে সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ) গঠনের সম্ভাবনাও দেখেছিলেন। সংসদে আসনপ্রাপ্তির হিসাব বাদ দিলে বিএনপি এখনো রাজনীতিতে প্রধান বিরোধী শক্তি। সে হিসেবে কপের নেতৃত্ব বিএনপির হাতে থাকার সম্ভাবনাও নিছক অমূলক ছিল না। কিন্তু নির্বাচনের ফল বর্জন এবং পুনঃনির্বাচন দাবি এবং সংসদে শপথ নেবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়ার পর সুযোগ বুঝে জাতীয় পার্টি ফের প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে নেয়। দশম জাতীয় সংসদে এরশাদপত্নী রওশন সংসদের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা হলেও এবারের সংসদে সে আসনে স্থলাভিষিক্ত হন এরশাদ নিজেই। যদিও পরবর্তীতে তার অসুস্থতার কারণে ওই চেয়ারে এরশাদের উত্তরসূরি হিসেবে বসানো হয় দলের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি জি এম কাদেরকে।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের মতো বৃহত্তর ঐক্য গড়েও এত কম সংখ্যক আসন বিএনপির ভাগ্যে জুটবে তা ছিল অকল্পনীয়। যদিও আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের শরিক ছাড়া সবকটি দলই প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচনের ফল। তারা এ নির্বাচনকে স্মরণকালের সবচেয়ে জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচন বলে আখ্যা দেয়। রাতের মধ্যেই ভোট হয়ে যাওয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার, ক্ষমতাসীনদের আধিপত্য বিস্তার, প্রতিপক্ষের ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে না দেওয়া, ভোট ডাকাতি ও চুরিসহ নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তোলে দলগুলো।

এ বাস্তবতায় নির্বাচন বাতিল করে পুনঃনির্বাচন দাবি এবং সংসদে যাবে না বলে সাফ ঘোষণা দেয় বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট। ৩১ ডিসেম্বর থেকে সংসদে যোগদানের ডেডলাইন ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত বিএনপি চরম সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে কাটায়। এর মধ্যে সরকার গঠন করে ফেলে আওয়ামী লীগ; যার মন্ত্রিসভায় দলটির কোনো শরিককেই রাখা হয়নি। বিএনপি সংসদে না গেলে আওয়ামী লীগ জোটের শরিক ও মিত্ররা যাতে বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখে তার পথ তৈরি করে রাখেন তারা।

এই সুযোগকে মওকা হিসেবে কাজে লাগায় জাতীয় পার্টি। তারা যখন বুঝতে পারে যে, এবারের সরকারে তাদের কোনো জায়গা হচ্ছে না তখন বিরোধী শিবিরের জায়গাটিকেই শক্তপোক্ত করায় মনোযোগ দেয় জাপা। তারা সংসদে ফের প্রধান বিরোধী দল হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করে। এর মধ্যে জল গড়িয়ে যায় অনেক দূর। মার্চের প্রথম দিকে হঠাৎ করে সংসদে শপথগ্রহণ করেন গণফোরাম থেকে নির্বাচিত সুলতান মনসুর। এর পর দলের আরেক সদস্য মোকাব্বির খানও সংসদে শপথ নেন। দুজনের শপথের পরপরই ঐক্যফ্রন্টের নীতিগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রশ্ন উঠে ড. কামালের ভূমিকা নিয়েও।

এ বাস্তবতায় বাইরে থেকে অভিযোগ উঠেছিল গণফোরামের ওই দুই সদস্যকে চাপ প্রয়োগ করে শপথ নিতে বাধ্য করা হয়েছে। একই অভিযোগ তোলা হয় বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রেও। বিএনপি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে নিজেদের সংসদ সদস্যদের সংসদে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে। কিন্তু সে যাত্রায়ও ব্যর্থ হয় দলটি। এপ্রিলের ২৫ তারিখ ঠাকুরগাঁও-৩ থেকে নির্বাচিত বিএনপির জাহিদুর রহমান এবং ২৯ এপ্রিল বিকাল সাড়ে ৫টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আব্দুস সাত্তার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশীদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল ইসলাম ও বগুড়া-৪ আসনের মোশাররফ হোসেন শপথ নেন। ওইদিন রাতে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে এবং দলের সিদ্ধান্তে বিএনপি সংসদে গেছে। কিন্তু কৌশলগত কারণে সংসদে শপথ নেননি মির্জা ফখরুল।

বিএনপির সংসদে যাওয়ার পর পরই এ প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলে চাড়া দিয়ে উঠে- তা হলে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রথম থেকে নিয়ে বিরোধী শিবিরের নেতৃত্ব কেন নিল না বিএনপি? কেন দলটি বা তাদের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট তাদের খেলার মাঠটি অবলীলায় দিয়ে দিল জাতীয় পার্টিকে? বিএনপি কি সংসদে ফিরে সে জায়গাটি উদ্ধার করতে পারবে?