অর্জন না বিসর্জন

ঢাকা, রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯ | ২ ভাদ্র ১৪২৬

ড. কামালের সঙ্গে ঐক্য

অর্জন না বিসর্জন

কোন পথে বিএনপি ১

নিজস্ব প্রতিবেদক ১১:১৪ অপরাহ্ণ, জুন ০৯, ২০১৯

print
অর্জন না বিসর্জন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিপরীত মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে চমক সৃষ্টি করে বিএনপি। ঐক্যফ্রন্টের পথ ধরে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দুবার সংলাপে বসে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনা তৈরি করে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি। দীর্ঘদিনের মিত্র যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের সঙ্গ ছেড়ে আওয়ামী বলয়ের দল গণফোরাম নেতা ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে জোট গড়ায় ঢাকার কূটনীতিক মহলেও গ্রহণযোগ্যতা পায় বিএনপি। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসতে শুরু করে ততই দিশাহীন অবস্থায় পড়ে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট।

নির্বাচনে জিতলে কে ঐক্যফ্রন্টের প্রধানমন্ত্রী হবেন তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়। কামাল হোসেন জানিয়ে দেন তিনি নিজে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে কিংবা প্রধানমন্ত্রী হতে আগ্রহী নন। বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকেও এ নিয়ে পরিষ্কার কিছু বলা হয় না। এতে সাধারণ মানুষ, বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মী-সমর্থক এবং বিদেশি কূটনীতিক মহলে ধন্দ আরও বেড়ে যায়। প্রায় নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় নির্বাচনে এসে মাঠেই নামতে পারেনি বিরোধী শিবির। নির্বাচনী ভরাডুবির পর এ কৌশল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে খোদ বিএনপির সর্বস্তরে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাঁচ মাস পরে ড. কামালের সঙ্গে ঐক্য বিএনপির অর্জন না বিসর্জন-এ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

এ নিয়ে দুই মতই আছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে। একপক্ষ মনে করছে, ড. কামালের মতো আওয়ামী মতাদর্শের রাজনীতিকদের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার ইতিহাসে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, প্রবীণ এ রাজনীতিকের সূত্র ধরেই বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন মহলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে বিএনপির। দীর্ঘদিন মুখ ফিরিয়ে রাখা বিদেশি কূটনীতিকরাও বিএনপির দিকে আগ্রহী হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ভালো কাভারেজও মেলে তাদের। জামায়াতের কারণে ডানঘেঁষা যে দুর্নাম তা থেকেও অনেকটাই মুক্তি মেলে বিএনপির। সাধারণ জনগণের মাঝেও ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়। বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝেও দেখা দেয় উদ্দীপনা। নানা বাধা-বিপত্তির পরও উৎসবমুখর পরিবেশে তিনশ’ আসনে সাড়ে চার হাজার নেতা বিএনপির মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।

এদিকে অন্যমতের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ড. কামাল বয়োবৃদ্ধ মানুষ। রাজনৈতিক স্পৃহা, আন্দোলনের তেজস্বী মানসিকতা, আপসহীনতা-এর কোনোটিই তার থাকার কথা নয়। উপরন্তু অতীতে চরম আপসকামিতা বা মধ্যমাঠ থেকে সটকে পড়ার ইতিহাস রয়েছে তার। ফলে তার ওপর বিএনপির ভর করাটা ছিল ঐতিহাসিক ভুল। তার প্রমাণ হাতেনাতে মিলেছে নির্বাচনের পর। যে নির্বাচনের ফল বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট প্রত্যাখ্যান করল, বলা হলো- এ সংসদ একতরফা ও অবৈধ, সে সংসদে যাওয়ার আগ্রহ প্রথম প্রকাশ করেছিলেন ড. কামাল। যদিও জোটের চাপে সে অবস্থান থেকে কয়েকদিনের জন্য সরে এলেও শেষ পর্যন্ত তার দল থেকে নির্বাচিত দু’সদস্য সংসদে যোগদানের পরপর গোটা অঙ্কটাই পাল্টে যায়। বিএনপির চার সদস্যও সংসদে যোগদানের ব্যাপারে মরিয়া হয়ে উঠে। শেষতক দলের ঐক্য টিকিয়ে রাখতে এবং কৌশলগত কারণে বিএনপিকে সংসদে যাওয়ার ঘোষণা দিতে হলো। এর মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে বড় ধরনের নৈতিক পরাজয় ঘটে বিএনপির।

রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী খোলা কাগজকে বলেন, নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি বেশ কয়েকটি ভুল করেছে। তার মধ্যে প্রথম ভুলটি ছিল, ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব ড. কামালের হাতে দেওয়া। কারণ ড. কামালের মতো মানুষের ওপর কারো আস্থা ছিল না, এখনো নেই। দ্বিতীয় ভুলটি ছিল নির্বাচনে যাবে না বলে নির্বাচনে যাওয়া। তৃতীয় ভুল সংসদকে অবৈধ বলার পর সে সংসদে শপথ নেওয়া। দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মী যে জুলুম-হুলিয়া সহ্য করে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে তারা তো দলের নীতি ও মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে সংসদে যাওয়ার জন্য আন্দোলন করেনি। সংসদে গিয়ে বিএনপির তো নৈতিক পরাজয় ঘটেছে। চতুর্থ ভুল ছিল, যেসব সদস্য সংসদে শপথ নিতে গিয়েছিল তাদের বহিষ্কার না করা এবং পঞ্চম ভুল উপনির্বাচনে তাদের অংশ নেওয়া। বিএনপি সবচেয়ে লাভবান হতো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে না গেলে। এতে সরকার ধরাশায়ী হতো। কিন্তু বিএনপি স্থির সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ঐক্যফ্রন্ট করে, ড. কামালকে সামনে রেখে দলটির লাভের খাতা একেবারেই শূন্য। ড. কামালের কারণে বিএনপির ভুলের সংখ্যা আরো বেড়েছে।

অধ্যাপক দিলারা বলেন, বিএনপি এখন যেসব আন্দোলনের কথা ভাবছে তাতে কোনো সফলতা আসবে না। তারা মিছিল-মিটিংয়ের কথা ভাবছে। মনে রাখতে হবে-নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে আবার সংসদে গিয়ে সে নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার কারণে জনগণ বিভ্রান্ত হয়ছে। জনগণ বিএনপির ওপর আর আস্থা রাখবে না। বিএনপির উচিত ছিল এ সরকারের অধীনে নির্বাচন বর্জনের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা।

সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ অবশ্য বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে রাজনীতির ময়দানে খাদে পড়া বিএনপিকে টেনে তোলার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন গণফোরাম সভাপতি, জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার নেতা ড. কামাল হোসেন; যিনি পরবর্তীতে নির্বাচনী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা হন। দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি রাজনীতির মাঠে টানা পাঁচ বছর বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন ছিল। নানা ভুল কর্মসূচি, হঠকারিতা এবং সরকারি দমনপীড়নের কারণে রীতিমতো কোণঠাসা অবস্থায় ছিল দলটি। সে অবস্থায় জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে কি না তা নিয়েও ছিল দ্বিধাগ্রস্ত। সরকারও সাফ জানিয়ে দিয়েছিল বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপে তারা বসবে না। ঠিক সেই সময় বিএনপির সামনে আশার আলো হয়ে এসেছিলেন ড. কামাল।

জাতীয় ঐক্য গড়ে বিএনপির জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের মওকা তৈরি করেছিলেন। কারণ সেসময় অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, বিএনপি যদি একাদশ নির্বাচনও বর্জন করে তাহলে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। কারণ দলটি নির্বাচনমুখী দল এবং তার নেতাকর্মীরা অধীর আগ্রহে বসে ছিলেন, নির্বাচনে যাওয়ার জন্য। অথচ রাজনৈতিক বাস্তবতা বিএনপিকে নির্বাচনের ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুকূল পরিস্থিতি দিচ্ছিল না। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিজেদের সরকার ও সংসদ বলবৎ রেখে নির্বাচনের ব্যাপারে অটল ছিল। আর বিএনপি সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের মাধ্যমে নির্বাচনের কথা বলছিল। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে দূরত্ব এবং নির্বাচন বর্জনের আরো একটি নতুন পরিস্থিতি হাজির করছিল বিএনপির সামনে।

একদিকে কারান্তরীণ দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন, অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচন-সব মিলিয়ে চরম সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল বিএনপি। সে সময় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মধ্যদিয়ে ড. কামালের নেতৃত্বে বিএনপি সংসদ নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রাজপথে এবং সংসদে দু’দিকেই আন্দোলনের নীতি নিয়ে তারা নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু ৩০০ আসনের মধ্যে ঐক্যফ্রন্ট জয়লাভ করে মাত্র ৮টি আসন। যার মধ্যে বিএনপি পায় ৬টি এবং গণফোরাম পায় ২টি আসন।