ইফতার রাজনীতি এবার ঢিলেঢালা

ঢাকা, রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৬ আশ্বিন ১৪২৬

ইফতার রাজনীতি এবার ঢিলেঢালা

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:৫৩ অপরাহ্ণ, মে ৩০, ২০১৯

print
ইফতার রাজনীতি এবার ঢিলেঢালা

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কয়েক দশকে ‘ইফতার রাজনীতি’র আলাদা ধারা তৈরি হয়েছে। ফলে রোজার এক মাস মাঠের কর্মসূচির চাইতে ঘরোয়া কর্মসূচিতেই বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে রাজনৈতিক দলগুলো। বিশেষ করে ইফতার পার্টিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত সম্মিলন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তাছাড়া ঈদ-পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুতিমূলক কর্মিসম্মেলনও ঘটে এই ইফতারকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এ বছর ইফতার রাজনীতিতে যেন ভাটা পড়েছে।

ঢিলেঢালা আয়োজনের মধ্য দিয়েই ইফতার পার্টি সারছে রাজনৈতিক দলগুলো। নির্বাচনী বছর হওয়ায় গত রোজায় ইফতার রাজনীতি ছিল জমজমাট। প্রতিটি দলের কেন্দ্র থেকেই তৃণমূল নেতাদের প্রতি নির্দেশনা ছিল- সম্ভাব্য প্রার্থীরা যেন নিজ নিজ এলাকায় ইফতার পার্টি আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় ভোটার, রাজনীতিক ও সুধীজনের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়িত করে। কেন্দ্রেও ছিল প্রতিটি দলের ইফতার পার্টির জমজমাট আয়োজন।

ক্ষমতাসীন থেকে শুরু করে ক্ষমতার বাইরে থাকা প্রতিটি দলেই ‘ইফতার রাজনীতি’ নিয়ে ছিল আলাদা আগ্রহ। তাই নির্বাচনকেন্দ্রিক ইফতার রাজনীতি কিছুটা বেশিই জমে উঠেছিল গতবার। তবে শুধু নির্বাচন কেন্দ্রিকই নয়, ইফতার আয়োজনের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক গাঢ় করার একটি সামাজিক রেওয়াজই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। কিন্তু এবার রোজার মাস প্রায় শেষ হয়ে এলো- এরপরও ‘ইফতার রাজনীতি’তে আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সরব কর্মসূচি চোখে পড়েনি। চোখে পড়েনি ইফতার কেন্দ্রিক রাজনৈতিক বাহাস, রাজনীতির জবাব-পাল্টা জবাব।

তবে ‘রুটিন’ হিসেবে এরই মধ্যে কয়েকদফা ইফতার পার্টির আয়োজন হয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় গণভবনে। দেশের রাজনীতিবিদদের সম্মানে গত ২৫ মে অনুষ্ঠিত হয় প্রধানমন্ত্রীর ইফতার আয়োজন। কিন্তু আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে কোনো ইফতার পার্টির আয়োজন করেনি এখনো। অপরদিকে বিএনপি গত ২৮ মে ইস্কাটন গার্ডেনের লেডিস ক্লাবে কারান্তরীণ চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার সম্মানে ‘৩০ টাকার ইফতার’ আয়োজন করে; যেখানে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং বিশিষ্ট নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন। গণফোরামসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল অনাড়ম্বরভাবে ইফতার পার্টির আয়োজন করেছে। অন্যান্য বারের মতো ব্যাপকভিত্তিক ইফতার আয়োজন কোথাও হয়নি। শুধু কেন্দ্র নয় জেলা শহরগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে এবার।

সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ বলছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে ইফতার রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ কমেছে, কারণ- তাদের বিরোধী শক্তি রাজপথে নেই। তা ছাড়া ঈদ-পরবর্তী বড়সড়ো কোনো রাজনৈতিক সংকটের সম্ভাবনাও তারা চোখে দেখছে না। তাই জনমত তৈরি বা জনসমাবেশ প্রদর্শন করার জন্য বড় আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা কমেছে।

অপরদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পর থেকে বিএনপির ইফতার রাজনীতিতে তৎপরতা কমেছে। অন্যান্যবার খালেদা জিয়া নিজেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করতেন, এতিমদের সঙ্গে সময় কাটাতেন কিন্তু ১৫ মাসের বেশি সময় তিনি রাজনীতির মাঠে অনুপস্থিত। তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিএনপিতে। বিএনপি যেমন খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে তেমনি ‘ইফতার রাজনীতি’ জমিয়ে তুলতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে দলটিকে। অথচ দলটির শীর্ষনেতাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে আওয়াজ তুলেছেন ‘ঈদের পরে’ খালেদার মুক্তির দাবিতে ফের আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। ২০১৪ সাল থেকে বিএনপি ‘ঈদের পরে আন্দোলন’ গড়ে তোলার কথা বলে আসছে। এর মধ্যে বহু ঈদ চলে গেছে, বিএনপি আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। ঈদের পর আন্দোলন গড়তে হলে গোটা রোজার মাসে ইফতারকেন্দ্রিক নানা ঘরোয়া কর্মসূচি থাকার প্রয়োজন বলে মনে করেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা। অথচ বিএনপির সে ধরনের ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচি নেই।

চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অসুস্থ হওয়ায় জাতীয় পার্টির তরফ থেকে এবার ইফতারের বড় কোনো আয়োজন ছিল না। জামায়াতের মতো দল এখন ভগ্নদশায় পড়েছে। তার ওপর গোপনে বা প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিই দিতে পারছে না দলটি। ফলে আগের মতো জৌলুসপূর্ণ ইফতার রাজনীতিতে একদমই অনুপস্থিত তারা।

এসব কারণে ইফতার রাজনীতিতে ভাটার টানই চলছে- বলছেন রাজনীতি সচেতন নাগরিকরা। তবে এর মধ্যে যে কয়েকটি ইফতার পার্টি হয়েছে তাতে দেশের দলগুলোর মধ্যকার নানা মাত্রিক আন্তঃসম্পর্কের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

২৬ মে রাজধানীর রাজমণি-ঈশা খাঁ হোটেলে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে গণফোরাম। সেখানে দলের সভাপতি ড. কামাল হোসেন দাবি করেছেন, তিনি ইফতার পার্টি করলেও ‘ইফতার পলিটিক্স’ করেন না। গণফোরামের এ ইফতার পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিডিপি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, সরকারি দলের ইফতারে বিরোধী দল, এবং বিরোধী দলগুলোর ইফতারে যদি সরকারি দলের লোকজন ইফতার করতে আসেন তা হলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ভালো হতো। অন্তত রোজার মাসে তা সম্ভব। তার বক্তব্য শেষ হতে না হতেই অনুষ্ঠানস্থলে এসে হাজির হন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান।

এদিকে গণফোরামের ইফতারে ফারুক খান এলেও আগের দিন গণভবনে রাজনীতিকদের সম্মানে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ইফতারে আমন্ত্রণ জানানো হলেও বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের কেউ যাননি বলে হতাশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়া। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের সব নেতাকে আরামবাগের ঐক্যফ্রন্ট কার্যালয়ে আমরা কার্ড দিয়ে এসেছি এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমি বিশেষ সহকারী হিসেবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনসহ অন্য নেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে আমন্ত্রণের বিষয়টি অবহিত করি। তবে তারা আমাকে জানান, তারা দাওয়াত পেয়েছেন, কিন্তু তাদের পূর্ব-নির্ধারিত একটি কর্মসূচি থাকায় অনুষ্ঠানে আসতে পারবেন না।’

বিএনপি ২৮ মের ‘৩০ টাকার ইফতারে’ আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে। দলের একটি প্রতিনিধিদল ধানমণ্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে গিয়ে সে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেয়। এখন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ পাল্টা জবাব হিসেবে হাজির করছেন, প্রধানমন্ত্রীর ইফতারের যেহেতু বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট নেতারা যাননি তাই আওয়ামী লীগের কেউ বিএনপির ইফতার পার্টিতেও আসেননি।