নতুন কমিটি নিয়ে চরম অসন্তোষ ছাত্রলীগে

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

নতুন কমিটি নিয়ে চরম অসন্তোষ ছাত্রলীগে

নিজস্ব প্রতিবেদক ১০:২০ অপরাহ্ণ, মে ১৪, ২০১৯

print
নতুন কমিটি নিয়ে চরম অসন্তোষ ছাত্রলীগে

সদ্য ঘোষিত ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে চরম অসন্তোষ শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, যোগ্যদের মূল্যায়ন না করে শীর্ষ নেতাদের অনুসারীদের দেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অসম পদ বণ্টনের অভিযোগও করছেন বঞ্চিতরা। তাদের অভিযোগ আন্তর্জাতিক সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের ভাই রাকিনুল হক চৌধুরী ছোটন। সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর নিজ জেলা মাদারীপুর থেকে পদ পেয়েছেন ২২ জন।

অন্যদিকে একদমই সুবিধা করতে পারেননি সাবেক সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের অনুসারীরা। পদবঞ্চিত নেতারা বলেন, ছাত্রলীগের সাম্প্রতিককালের ইতিহাসে এবার রেকর্ড পরিমাণ বিবাহিতদের পদ দেওয়া হয়েছে। যদিও সংগঠনটির গঠনতন্ত্রের ৫-এর গ ধারা অনুযায়ী বিবাহিত ব্যক্তি ছাত্রলীগের কমিটিতে স্থান পাবেন না। তবে এ ধারাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অন্তত ছয়জন বিবাহিতকে সহ-সভাপতির পদ দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাকারী পরিবারের অন্তত ১৩ জন ঠাঁই পেয়েছেন কমিটিতে। অস্ত্র নিয়ে সংবাদের শিরোনাম হয়েও সহ-সভাপতির পদ পেয়েছেন একজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ আয়োজিত পহেলা বৈশাখের কনসার্টে আগুন দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত অন্তত ২০ জন গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন। যাদের অধিকাংশ সভাপতি শোভনের অনুসারী বলে জানা গেছে। কমিটিতে সবচেয়ে বেশি পদ দখল করেছে সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর নিজ জেলা মাদারীপুর। এ জেলার ২২ জনকে পদ দেওয়া হয়েছে। দলীয় কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাকিনুল হক চৌধুরী ছোটন আন্তর্জাতিক সম্পাদকের পদ দখল করেছেন। তিনি সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের ভাই। অন্যদিকে অপরিচিত মুখ আশিক খান পেয়েছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানের ছেলে। ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে উপ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদ দেওয়া হয়েছে মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশে অংশ নেওয়া আলোচিত আফরিন লাবণীকে।

সম্মেলনের এক বছর পর গত সোমবার (১৩ মে) ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটি ঘোষণার পরপরই গত কমিটির উপ-মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক এবং নতুন কমিটিতে উপ-কর্মসূচি ও পরিকল্পনা পদ পাওয়া আল মামুন পদত্যাগ করার ঘোষণা দেন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বর থেকে পদবঞ্চিত ছাত্রনেতাদের বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি মধুর ক্যান্টিনের সামনে গেলে নতুন কমিটির পদপ্রাপ্তরা তাদের ওপর চড়াও হয়। এ সময় রোকেয়া হলের সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী দিশা, ডাকসুর ক্যাফেটরিয়া সম্পাদক লিপি আক্তারসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীরা এ হামলা চালিয়েছেন বলে দাবি করেছেন আহতরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাত্রলীগের কমিটি গঠনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষিত হয়েছে। বর্তমান সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের ছাড় না দেওয়ার মানসিকতার কারণে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ ছিল, গত কমিটির নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কমিটি করার। সে লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান, জাহাঙ্গীর কবীর নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং বিএম মোজাম্মেল হককে দায়িত্ব দেন কমিটি করতে। কিন্তু সে উদ্যোগ ভেস্তে যায় বর্তমান নেতৃত্বের অসহযোগিতায়। সদ্য ঘোষিত কমিটিতে সাবেক নেতাদের অনুসারীদের রাখা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে গত কমিটির এক সহ-সম্পাদক খোলা কাগজকে বলেন, বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের পছন্দের লোক দিয়ে কমিটি করেছে। এই কমিটির বেশির ভাগ মানুষকে যে পদ দেওয়া হয়েছে, তারা সে পদের যোগ্য না। অন্যদিকে আমাদের মতো রাজপথের কর্মীদের বঞ্চিত করা হয়েছে।

৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম, গণপদত্যাগের হুমকি
এদিকে সোমবার মারধরের শিকার হওয়া পদবঞ্চিত নেতারা মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করেছে মধুর ক্যান্টিনে। এ সময় কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন পদবঞ্চিতরা। তা না করা হলে একযোগে পদত্যাগের হুমকিও দেন তারা। এ সময় হামলার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতি অনাস্থা জানান পদবঞ্চিত আহতরা। এর আগে সদ্য গঠিত কমিটির সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়, আইন বিষয়ক সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন সাহাদাত এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক পল্লব কুমার বর্মণকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে।

তদন্ত কমিটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সভাপতি ও নবগঠিত কমিটির উপ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক বিএম লিপি আক্তার বলেন, সোমবার সংবাদ সম্মেলনে হামলাকারীদের দিয়েই তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আমরা এ কমিটি মানি না।

তবে কমিটি নিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা মিললে তাদের বহিষ্কার করা হবে বলে জানিয়েছেন ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। তিনি বলেন, যেহেতু কমিটির কিছু সদস্যের বিষয়ে অভিযোগ এসেছে, আমরা এ বিষয়ে ছাত্রলীগের যে সাবেক নেতৃবৃন্দ আছে তাদের দ্বারা সমন্বয় করে একটি কমিটি গঠন করে দেব। যদি সত্যি এগুলো প্রমাণিত হয়, তাহলে সেই পদ শূন্য ঘোষণা হলে সেখানে আমরা যোগ্যতা অনুযায়ী পূরণ করব।

তবে ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে অসন্তোষ এবং মধুর ক্যান্টিনে নারী কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাকে ছোট্ট ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। তিনি বলেছেন, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ঘোষণা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে যা ঘটেছে তা একটি ছোট্ট সাধারণ ঘটনা। এটি নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।