প্রাপ্তির গানে অপ্রাপ্তির সুর

ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯ | ৬ বৈশাখ ১৪২৬

রাজনীতির হালখাতা ১৪২৫

প্রাপ্তির গানে অপ্রাপ্তির সুর

খোলা কাগজ ডেস্ক ১১:১৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০১৯

print
প্রাপ্তির গানে অপ্রাপ্তির সুর

আজ চৈত্রসংক্রান্তি। বিদায় নিচ্ছে বঙ্গাব্দ ১৪২৫। বছরটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। রাজনীতিতে যেমন মেরুকরণ ঘটেছে আবার সহিংসতার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে গুণগত পরিবর্তনের আভাসও দেখা দিয়েছে। জনগণের মাঝে ভোটের প্রতি অনাগ্রহও দেখা দিয়েছে

রেকর্ড বিজয়েও দূরত্ব মহাজোটে
রহমান মুফিজ
ইংরেজি বর্ষকে ধরে দেশের সমস্ত দাপ্তরিক কার্যক্রম চললেও বাঙালির চিরায়ত হালখাতা তৈরি হয় বাংলা নববর্ষকে ঘিরে। তাই বিদায়ী বছরের শেষ দিনের শেষ হিসাবটা করতে ভুল করে না বাঙালি। ব্যক্তি, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোও এ সময় মিলিয়ে নেয় প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব। গত এক বছরে প্রাপ্তির খাতা যথেষ্ট পূর্ণ হলেও কিছু কিছু অপ্রাপ্তি বা ক্ষেদ রয়ে গেছে দেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মধ্যে। বিদায়ী বছরের মধ্য পৌষ প্রকৃত অর্থেই আওয়ামী লীগের জন্য ‘পৌষ মাস’ হয়ে এসেছিল। ১৬ পৌষ অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বর-২০১৮-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো বিজয় লাভের রেকর্ড গড়ে আওয়ামী লীগ।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করা দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ দল বিএনপি নির্বাচনে আসবে কী আসবে না- এমন এক অনিশ্চিয়তার মধ্যে হঠাৎই জাদুর কাঠির স্পর্শ পায় দেশের রাজনীতি। নতুন জোট ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। ফলে চরম অনিশ্চয়তাকে তুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনের চ্যালেঞ্জেও জিতে যায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। এমন প্রাপ্তির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষেদ হয়ে আছে কেবল ‘প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন’ নামক বাক্যবন্ধটি। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভোট ডাকাতি ও নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ তুলে ঐক্যফ্রন্ট ও বামপন্থি জোট।

তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি সফল দলের অভ্যন্তরে বিদ্রোহী প্রার্থী দমনে। তার পাশাপাশি তাদের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারেও দক্ষতা দেখিয়েছে দলটি। নির্বাচনে আসন বণ্টন, নির্বাচন-পরবর্তী মন্ত্রিসভায় কোনো ধরনের স্থান না দিয়ে শরিকদের ম্যানেজ করতে পারাটাকে আওয়ামী লীগের অন্যতম কৃতিত্ব হিসেবেই ধরছেন কেউ কেউ। যদিও নির্বাচন-পরবর্তী মহাজোটের শরিকদের মধ্যে নানা ধরনের মতভেদ ও দূরত্ব তৈরি হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে- যা আওয়ামী লীগের অপ্রাপ্তি বা ক্ষেদের খাতায় যুক্ত হতে পারে।

জাতীয় নির্বাচনের আড়াই মাস পর অর্থাৎ গত ১০ মার্চ থেকে শুরু হওয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিদায়ী বছরে বড় ধরনের প্রশ্ন হয়ে থাকবে আওয়ামী লীগের জন্য। কারণ স্মরণকালের শোচনীয় ভোটার উপস্থিতির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে পঞ্চম ধাপের মধ্যে চার ধাপের উপজেলা নির্বাচন। নির্বাচন নিয়ে এতটা অনীহা আগে কখনো দেখা যায়নি।

উপজেলা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে বিব্রত খোদ নির্বাচন কমিশনও। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ তৈরিতেই নয়, দলের প্রার্থীদের মধ্যে ঐক্য রক্ষা করতেও ব্যর্থ হয়েছে আওয়ামী লীগ। এ নির্বাচনে অধিকাংশ উপজেলাতেই দলটির ছিল একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী। যদিও বলা হচ্ছে, বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় আওয়ামী লীগ কৌশলে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের উৎসাহিত করেছে নির্বাচনী মাঠে থাকতে। এরপরও এবারের উপজেলা নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য বড় ধরনের প্রশ্ন হয়েই থাকছে।

তবে নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুতে স্প্যানের পর স্প্যান স্থাপনসহ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় আওয়ামী লীগ নিঃসন্দেহে প্রাপ্তির খাতা ভরিয়ে তুলেছে-এমনই মত পর্যবেক্ষকদের।

 

ঐক্যফ্রন্টে নতুন আশা ২০ দলে ‘বিচ্ছেদ’
এস এম শিপন
বিদায়ী বছরের সূর্যকে আজ বিদায় জানাবে বাঙালি। কেননা আজ চৈত্রসংক্রান্তি। কাল পহেলা বৈশাখ, নতুন বাংলা বর্ষ-১৪২৬। গত একটি বছরে বিএনপির রাজনীতির হালখাতায় কি জমা পড়েছে তা নিয়ে নেতারা চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। হিসাব চলছে তাদের কত লাভ-ক্ষতি হয়েছে। খাতা-কলম নিয়ে জটিল এ হিসাব কেউ না করলেও মনের ক্যালকুলেটরে দলের সব নেতাই হিসাব মেলাচ্ছেন।

১৪২৫ বঙ্গাব্দে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি, দলীয় প্রধানের জামিন না হওয়া-এসব অপ্রাপ্তির মাঝেও বেশ কিছু প্রাপ্তিও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এক. তারা প্রমাণ করতে পেরেছে যে, নির্বাচনটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। দুই, ড. কামাল হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পেরেছে।

বিএনপি নেতারা বলেছেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আওয়ামী লীগ না মানায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। তখন বিএনপিকে বিদেশিরাসহ অনেকেই বলেছিল নির্বাচনে অংশ না নেওয়া ছিল বিএনপির একটি ভুল সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিএনপির যুক্তি ছিল দলীয় সরকারের অধীনে কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তারপরও বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়াই ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিএনপি মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি করলেও আওয়ামী লীগ তা প্রত্যাখ্যান করে পাঁচ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করে। পরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া যে বাংলাদেশে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, তা গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। কেননা ওই নির্বাচনের পর মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মানবাধিকার প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, গত ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের মতো জয়লাভ করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। কিন্তু এই নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে বিবেচনা করা হচ্ছে না। এই নির্বাচনে ভোটবাক্সে ব্যালট ভরা, বিরোধী দলের পোলিং এজেন্ট ও সাধারণ ভোটারদের হুমকি দেওয়াসহ নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তা ছাড়া নির্বাচনের পর কূটনীতিকদের কাছে ভোটে অনিয়মের ১১ অভিযোগ করে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। গত জানুয়ারিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে বেরিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, তাদের সঙ্গে ভালো আলোচনা হয়েছে। ভোটের দিন যা ঘটেছে, তা তাদের তুলে ধরা হয়েছে। বৈঠকে নির্বাচনে ভোটের নানা অনিয়মের ১০টির বেশি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়েছে। এসব ভিডিওসহ তথ্য-প্রমাণাদি সম্পৃক্ত কাগজপত্র কূটনীতিকদের সরবরাহ করা হয়।

অপ্রাপ্তির মধ্যে রয়েছে এক. বিএনপির সঙ্গে ২০ দলীয় জোটের দূরত্ব বেড়েছে। দুই. বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বেড়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে কর্মসূচি নির্ধারণে বিএনপি সঙ্গে ২০ দলীয় জোটের দূরত্ব বাড়ছে। ২০ দলীয় জোট মনে করছে বিএনপি তাদের কম গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ অন্যদলগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, নির্বাচনের পর বিএনপি ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যতবার বৈঠক করেছে, সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিংবা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, ততবার জোটের সঙ্গে কথাও বলা হয়নি। তাদের মতামতও নেওয়া হয়নি। এমনকি এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ ও অন্যান্য শীর্ষ নেতার সঙ্গে শলা-পরামর্শ করার প্রয়োজনও মনে করেনি বিএনপির হাইকমান্ড। এসব বিষয়কে ভালোভাবে দেখছেন না শরিক দলের নেতাকর্মীরা।

তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান জানান, জোটের সঙ্গে তাদের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই। বড় রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে নানা মতামত থাকাই স্বাভাবিক।

অন্যদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করায় অনেক নেতাই দলের আচরণে হতাশ। নারায়ণগঞ্জে তৈমূর আলম খন্দকারের মতো ত্যাগী নেতা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হন। তৈমূর আলম খন্দকার দল ত্যাগ না করলেও নির্বাচনের পর ইতোমধ্যে অনেক নেতা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। নির্বাচনের আগে বেশ কয়েকজন নেতা দল ত্যাগ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন- বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী, শমসের মবিন চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলী আসগর লবি, কেন্দ্রীয় নেতা মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়া, কণ্ঠশিল্পী মনির খান, কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিনসহ আরও অনেকে।

 

ভোটে অনাগ্রহ বেড়েছে ভোটারের
শফিক হাসান
বঙ্গাব্দ ১৪২৫-এ রাজনীতির হালখাতার পাতা উল্টালে যে চিত্রের দেখা মেলে, তাতে সুখ থাকলেও স্বস্তি নেই। বিগত দিনে গণতান্ত্রিক বাতাবরণ সৃষ্টি এবং বজায় থেকেছে কতটুকু- চুলচেরা হিসাবে হোঁচট খেতে হবে। বিগত এক বছরে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের সাফল্য যেমন রয়েছে, তেমনি ছায়ার মতো লেগে ছিল বিতর্কও। বড় বিতর্কের জায়গায় রয়েছে ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত বেশ কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠান। এসব নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট ভোটারের অনাগ্রহ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে উপর্যুপরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

আজ শনিবার বাংলা বছরের শেষ দিন। চলতি বাংলা বঙ্গাব্দে অনুষ্ঠিত হয়েছে বেশ কয়েকটি নির্বাচন। তার মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত-সমালোচিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচনও ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নির্বাচনকে ঘিরে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকের পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ। জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট। অন্যদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট-বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচন বর্জন করে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়েছে।

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি দশম নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। দলটির দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকার তাতে সায় দেয়নি। দশম জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ভুল থেকে বেরিয়ে একাদশ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জন করেছে দলটি।

বিএনপি ও সংশ্লিষ্টদের অনাস্থা সরকারের জন্য এক ধরনের অস্বস্তিই বয়ে এনেছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন- বর্তমানেও সরকার নানা চেষ্টা রয়েছে বিএনপিকে কাছে টানার। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবাস জীবনযাপন করছেন। সব মিলিয়ে দলটির অবস্থা বিপর্যস্ত। এ অবস্থার জন্যও অনেকেই অভিযোগের অঙ্গুলি তুলছেন আওয়ামী লীগ তথা সরকারের দিকে। রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে এ ‘যুদ্ধ’ চললেও সমস্যা আরও গভীরে প্রোথিত। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামীকে ত্যাগ করার দাবি জানিয়েছে আওয়ামী লীগসহ প্রগতিশীল অন্যান্য রাজনৈতিক দল। তরুণ প্রজন্মও বিএনপির এ মিত্রতাকে ভালোভাবে নেয়নি। ফলে নানা কারণেই বিতর্কিত ও সমালোচিত হয়েছে বিএনপি। এ অবস্থার মধ্যেও ‘বিতর্কমুক্ত’ একটি নির্বাচন উপহার দিতে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে নির্বাচনমুখী করার চেষ্টা করেছে।

নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল জিতলে গণতন্ত্র জেতে না, জনগণ জেতে না। দেশে যখন গণতন্ত্র ও সাম্যের চর্চা থাকে, পরমতসহিষ্ণুতা বিরাজমান থাকে তখনই গণতন্ত্রের ফুল ফোটে। সম্মিলিত অংশগ্রহণে সেটা সুগন্ধ ছড়ায়। বিগত দশম ও একাদশ নির্বাচন আইনিভাবে সিদ্ধ হলেও নৈতিকভাবে কতটা সিদ্ধ সে প্রশ্ন অসংখ্যবার রেখেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশে নির্বাচন ভোট উৎসব হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। অসংখ্য ভোটারের কাছেই নির্বাচন মানেই ছিল ‘ঈদের দিন’। সেই ঈদের আনন্দ ফিকে হয়ে গেছে তাদের। জাতীয় নির্বাচনের অব্যবস্থাপনা ও অভিযোগের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উপজেলা নির্বাচনে। অনেক নির্বাচন কেন্দ্রই ছিল ফাঁকা। ভোট দেওয়ার আগ্রহ দেখাননি ভোটাররা। ভোটাধিকার হরণের অভিযোগে কেন্দ্রমুখী হননি তারা। বিদ্যমান অবস্থাকে সাধারণ মানুষের নিজেদের ‘অপমান’ ও ‘পরাজয়’ হিসেবেই ধরে নিয়েছে। যে কারণে ‘তৃতীয়বার’ তারা ‘বেলতলা’য় যায়নি।

রাজনীতির অনিশ্চয়তা ও নানা রকম দুর্বৃত্তপনার মধ্যেও নির্বাচন কমিশনার (ইসি) অন্তত একটি দিকে প্রশংসিত হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে যে হানাহানি ও কোন্দলে প্রাণহানির অপসংস্কৃতি চালু ছিল বিগত জাতীয় নির্বাচনে সেটা দেখা যায়নি। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এমনই হওয়া উচিত। এ নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সরকার ও ইসি যেমন প্রশংসিত হয়েছে তেমনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ কয়েকটি নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে সমালোচনাও কম হয়নি।

ভোটের প্রতি ভোটারদের অনাগ্রহ সৃষ্টিকে গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন একাংশ। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে যদি ভোটারের উপস্থিতিই না থাকে সেটা অর্থবহ হয়ে ওঠে না। পাঁচ ধাপে বিভক্ত উপজেলা নির্বাচনের চারটি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ১৮ জুন সম্পন্ন হবে পঞ্চম ও শেষ ধাপ। শেষ ধাপের আগেই বিগত চার ধাপের নির্বাচনী পরিবেশে ভোটাররা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। যে কারণে কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। ভোট গ্রহণ হয়েছে ঢিলেঢালাভাবে।

জাতীয় নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর ডাকসু নির্বাচনও হতাশ করেছে অনেককেই। অভিযোগ ছিল, বিগত নির্বাচনগুলোর মতো ডাকসু নির্বাচনেও আগে থেকেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা হয়েছিল। সেটাও সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সমালোচিত হয়েছিল দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শেষমেশ একটা ‘রফা’ করা গেলেও সেটা কতদিন শান্তিপূর্ণ ও বিরোধমুক্ত থাকবে তা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। বিদ্যমান পরিস্থিতিও শান্তির আভাস দেয় না।

এভাবে অনেক বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম হয়েছে একের পর এক। জাতীয় পার্টিকে সংসদে বিরোধী দলের ‘মর্যাদা’ দিয়েও সরকার হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে। দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ঘনঘন ‘অসুস্থ’ হওয়া এবং শেষমেশ দলের অন্যতম শীর্ষ পদে একের পর এক পরিবর্তন আনার নেপথ্যেও সরকারের ‘ইন্ধন’ ও ‘চাপ’ খুঁজছেন অনেকেই।

বর্তমানে আওয়ামী সরকার নানামুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত করছে। কাজ চলছে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের। উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক ওতপ্রোত। উন্নয়ন চলমান থাকলে এবং সেটার ফল জনগণ ভোগ করবে। এক সময় গণতন্ত্র সঠিক পথে ফিরবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।


অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের একটি থিওরি রয়েছে, যে দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আছে সে দেশে দুর্ভিক্ষ হয় না। কারণ দুর্ভিক্ষের খবর সংবাদপত্রে ছাপা হলে অন্যরা সেখানে ত্রাণ নিয়ে যাবে। এভাবে রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রই একটির সঙ্গে অন্যটি নির্ভরশীল।

আগামীকাল রোববার দেশের অনেক জায়গাতেই ব্যবসায়ীরা হালখাতা খুলবেন, হালনাগাদ করবেন লেনদেন। রাজনীতির হালখাতায় জমে আছে যেসব বকেয়া হিসাব- তা ধীরে ধীরে পরিষ্কার ও সহনশীল হলে অনেক প্রাপ্তির মাঝে থাকবে অপ্রাপ্তির সুরের অভিযোগ কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে। সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক বাতাবরণ সৃষ্টির জন্য দ্বন্দ্ব-সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠাই হতে পারে ব্রত। পারস্পরিক অনৈক্য লাভ-লোভের ঘেরাটোপ ডিঙাতে পারলেই সুর হয়ে উঠবে মধুর থেকে সুমধুর!