উৎসব-শঙ্কায় ভোটার

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

উৎসব-শঙ্কায় ভোটার

কুন্তল দে ১০:২৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৮, ২০১৮

print
উৎসব-শঙ্কায় ভোটার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে। ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ভোট। নির্বাচনের বাকি আর ৪৫ দিন। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, প্রত্যাহারের জন্য যাবে ২২ দিন। এরপর প্রচার-প্রচারণা ঘিরেই ভোটের মূল উৎসব। এর জন্য থাকবে ২৩ দিন। সবশেষে ভোটে জয়-পরাজয় নির্ধারণ।

অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে ভোট মানেই উৎসব। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোট পর্যন্ত প্রার্থীদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। সেই সঙ্গে নেতাকর্মী-সমর্থকদেরও নাওয়া-খাওয়ার হিসাব গরমিল হয়ে পড়ে। প্রার্থী ও প্রতীকের পক্ষে পোস্টারিং, মিছিল, মাইকিং, পথসভা, হাটসভা, শোভাযাত্রা দিনরাত সরগরম এলাহিকাণ্ডে। ভোটারদের মন-জয় ও তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বিচিত্র সব প্রচারণা। পাঁচ বছরের মধ্যে এ একবারই কদর বাড়ে জনগণের। ভোটারদের দ্বারে গিয়ে প্রার্থীদের ভোট প্রার্থনা।

কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী-সমর্থকদের মাঝে উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়; যা বাড়িয়ে দেয় উত্তাপ। শুধু প্রার্থী-সমর্থকদের মঝে নয়, নির্বাচনের এ উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে জনগণের মাঝেও। গ্রামগঞ্জে, পাড়ায় পাড়ায় ঝড় ওঠে চায়ের কাপে। কাকে ভোট দেবে তা নিয়ে পরিবারের মধ্যেও দেখা দেয় বিভক্তি। ভোট নিয়ে বাঙালির আগ্রহ, উদ্দীপনা, উত্তেজনা, প্রচারণা সবকিছুই রূপ নেয় উৎসবে। রেষারেষি সত্ত্বেও পাশাপাশি থেকেই চলে এ উৎসব।

চূড়ান্ত ফলাফলে হার-জিত তো থাকবেই। বিচ্ছিন্ন কিছু সংঘাত ছাড়া ভোটের পর সারা দেশের পরিস্থিতি শান্তই থাকে। অনেক সময় বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকরা পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকদের সান্ত্বনা দেন। চোখ থেকে মুছিয়ে দেন অশ্রুর রেখাও। আবেগি বাঙালির এ যে চিরন্তন ভালোবাসাবাসির প্রকাশ।

তফসিল ঘোষণা হলেও এবারের নির্বাচন বরাবরের মতো উৎসবমুখর হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। এখন পর্যন্ত বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দুই দফা সংলাপে কোনো ফলাফল না আসায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। আজ রাজশাহীতে নতুন এ জোটের সমাবেশ থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়া নিয়ে বক্তব্য আসতে পারে। সগতকাল সন্ধ্যায় বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট তাদের করণীয় নির্ধারণে বৈঠকও করেছে। ওই বৈঠকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়া নিয়ে দুই অবস্থানই ব্যক্ত করেছে শরিক দলগুলো।

ক্ষমতাসীন ১৪ দলের সঙ্গে দুই দফা সংলাপে ৭ দফা দাবি জানায় ঐক্যজোট। সংসদ ভেঙে দেওয়া, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের একটি রূপরেখা দেয় জোটটি, যেখানে ১১ জন উপদেষ্টা নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনা করবেন। এ ছাড়া তারা নির্বাচন পিছিয়ে ফেব্রুয়ারি বা মার্চে করারও দাবি জানায়। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে জোটের এ দাবি অসংবিধানিক বলে নাকচ করে দেওয়া হয়। এরপর বিরোধী জোটের নেতারা নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে আন্দোলন চালিয়ে যাবার ঘোষণা দেন। পরে অবশ্য ঘোষিত রোডমার্চ কর্মসূচি স্থগিত করেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে যাতে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেজন্যই বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি বিরোধী দল মিলে এ জোট গঠন করা হয়েছে। ফলাফল না এলেও নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংলাপে বসাটাকে তারা রাজনীতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক বলে মনে করছেন। জোট গঠনের পর তারা ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামে বড় সমাবেশ করেছেন। সংলাপ ও সমাবেশের মাধ্যমে তাদের বার্তা ও নির্বাচন নিয়ে সদিচ্ছা জনগণের কাছে পৌঁছতে পেরেছেন। বর্তমান সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা। তবে এ মুহূর্তে বড় আন্দোলনও গড়ে তোলা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়া নিয়ে এখনো তারা দ্বিধায় রয়েছেন। সংলাপ শেষ হলেও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখতে চান জোটের নেতারা।

এদিকে নির্বাচনে জিতে টানা তৃতীয় দফা ক্ষমতায় আসতে চায় আওয়ামী জোট। ক্ষমতায় থেকেই তারা ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জয়ন্তী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করতে চায়। গত ১০ বছরে দেশে যে উন্নয়ন হয়েছে সেটার ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যই ফের ক্ষমতায় আসা প্রয়োজন বলে মনে করছে দলটি। এবারের নির্বাচনকে ঘিরে এ বছরের শুরু থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে আওয়ামী লীগ। দলের নেতাকর্মী ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা গত তিন মাস ধরেই নিজের নির্বাচনী এলাকায় প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন। দুই দফা ক্ষমতায় থাকার পরও দলটির সাংগঠনিক অবস্থা বেশ শক্তিশালী। নেতাকর্মীরাও উজ্জীবিত ও নির্বাচনমুখী। তবে প্রতি আসনেই প্রার্থীজট রয়েছে দলটির। অনেক আসনেই বিরোধীদের মোকাবেলা করার চেয়েও বিদ্রোহী প্রার্থীদের বাগে আনাটাই হবে দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

গতবারের মতো এবার একতরফা নির্বাচন চান না আওয়ামী লীগের নেতারা। তারা চাইছেন ঐক্যজোট যেন নির্বাচনে আসে। শেষপর্যন্ত বিরোধী এ জোট নির্বাচনে এলে জাতীয় পার্টির সঙ্গে একসঙ্গে মহাজোট গড়ে তারা নির্বাচন করবে। আর না এলে ভিন্ন সমীকরণ। তবে দলটির নেতাকর্মীদের মাঝে ভোট নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনার কমতি নেই।

দুই জোটের দুই সমীকরণ থাকলেও, তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে পুরোদস্তুর ভোটের পথে দেশ। একাদশ নির্বাচনে উৎসবের আমেজ থাকবে না তার রং ফিকে হবে তা নির্ভর করছে রাজনীতিকদের ওপরই। উৎসব ও শঙ্কার মাঝেই শুরু হলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাত্রা।