এখনো রংতুলির স্বপ্ন

ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১ | ৬ বৈশাখ ১৪২৮

এখনো রংতুলির স্বপ্ন

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিত্রশিল্পী মো. আজিজুর রহমান আজিজ

লিটন ঘোষ জয় ২:১৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ২২, ২০২১

print
এখনো রংতুলির স্বপ্ন

নীরবে নিভৃতে চিত্রশিল্পকে নিয়ে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিত্রশিল্পী মো. আজিজুর রহমান আজিজ। ৮৩ বছর বয়সেও ছুটে বেড়ান নগর থেকে গ্রামগঞ্জে। শিশুদের শেখান ছবি আঁকা, গল্পের মাধ্যমে শোনান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। গুণী এই আলোর মানুষটিকে নিয়ে লিখেছেন লিটন ঘোষ জয়। 

আলোর বাতিঘর
মাগুরা সদরের রাউতড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিত্রশিল্পী মো. আজিজুর রহমান আজিজ। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কোমরে চাকু নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন এবং বুক পকেটে রাখতেন কলম। কেননা ছবি আঁকা ছিল তার নেশা। একটা কলম পাওয়া আজকের দিনের মতো সে সময় এত সহজ ছিল না! তাই তো মাঝে মধ্যেই তিনি ছবি আঁকতেন কয়লা অথবা ভাঙা ইটের টুকরো দিয়ে। আজিজুর রহমানের বয়স এখন ৮৩ বছর। তবুও কোনো ক্লান্তি ছুঁতে পারেনি সৃষ্টিশীল এই মানুষটিকে। তার কল্পনাতে সবকিছু ধরা দেয় ছবি হয়ে। ছবি নিয়েই তার যত রকম স্বপ্নের ক্যানভাস। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশর অদ্বিতীয় স্কেচ শিল্পী মোস্তফা আজিজের সংস্পর্শে কাটান তিনি। ১৯৬৯ সালে প্রখ্যাত শিল্পী এস এম সুলতানের সংস্পর্শ লাভ করেন এবং তার কাছ থেকে বেশ কিছুদিন চিত্রশিল্পের বিষয়ে শিক্ষা নেয়। দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান বলেছিলেন- ‘আজিজ আমি একটি আর্ট স্কুল করব তুমি সেখানে শিক্ষকতা করবে এবং আমার কাছে শিখবে।’ এস এম সুলতানের সেই কথাগুলো আজও তার জীবনে সোনালি স্মৃতি হয়ে আছে, ফিরে আসে বারংবার। স্কেচ শিল্পী মোস্তফা আজিজ ছিলেন তার গুরু এবং শিক্ষক।

শিল্পী জীবন
আজিজুর রহমানের ছবি আঁকার হাতেখড়ি হয় প্রাইমারি স্কুলে ছাত্র থাকা অবস্থায়। সে স্বপ্ন দেখেনÑ অপরূপ বাংলার ফুল, পাখি, পাহাড়, নদী, অরণ্য, নীল আকাশ, সোনাধানের হাসি, বর্ণিল প্রজাপতি, শিশির সিক্ত শিউলি এবং নীল জোনাকি। আর এসবই যেন তার তুলিতে ফিরে পায় প্রাণ। ছবি পাগল এই মানুষটি সারাক্ষণ মেতে থাকেন রংতুলি, কাগজ কলম নিয়ে। খোলা আকাশের নিচে, নদীর কূল, বাড়ির পাশের ছোট পেয়ারা বাগান, ধান সবুজের মাঠসহ যেখানে সেখানে বসে যান ছবি আঁকতে। তিনি যে রংতুলি আর ছবির মানুষ! তার বাড়িতে গেলে যে কেউই খুব সহজে বুঝতে পারবেন তা। তার সবখানে ছবির হাট-বাজার, নানা রঙের ছড়াছড়ি; এখানে সেখানে পড়ে আছে পেন্সিল, কগজ-কলম, রংতুলি। আঁকিয়ে এই মানুষটির কাছ থেকে তার বাড়ির রাস্তাটিও বাদ পড়েনি রং মাখতে। ছোটবেলা থেকেই তার শখ ফুল বাগান করা। ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সুদক্ষ ফুটবল খেলোয়াড় হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন। ১৯৮৯ সালে আলমখালি বাজারে একক চিত্র প্রদর্শনী করা হয় তার। চিত্রশিল্পী হিসাবে তিনি মাগুরা, ঝিনাইদহ, যশোর ও খুলনা অঞ্চলে পরিচিত একজন গুণী শিল্পী।

শিক্ষা জীবন
আজিজুর রহমান আজিজ মাগুরা সদর উপজেলার রাউতড়া গ্রামে ১৯৩৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ৫ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। রাউতড়া প্রাইমারি স্কুল এবং রাউতড়া হাইস্কুল থেকে তার পড়াশোনা শুরু। ১৯৫৯ সালে আলোকদিয়া পুখরিয়া হাইস্কুলে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। কিন্তু ১৯৬০ সালে লেখাপড়া চলাকালীন অবস্থায় আর্থিক সমস্যার কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। পুনরায় ১৯৬৩ সালে রাউতড়া হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস ও পরবর্তী সময়ে মাগুরা কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ১৯৫৪ সালে পিতৃ বিয়োগের পর অসহায় অবস্থায় নানা টানাপড়েন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তার পথ চলা শুরু হয়।

ব্যক্তিগত জীবন
তিনি ১৯৭৮ সালে ছায়েরা পারভীনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের তিন সন্তান, মো. আতিকুর রহমান মুকুল (এসআই), আনিসুর রহমান পিকুল (ব্যবসায়ী), শফিক মাহমুদ চিত্রশিল্পী ও শিক্ষক।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
১৯৭১ সালের একেকটা রাতদিন ছিল- উৎকণ্ঠা, উত্তেজনা আর হায়েনার আক্রমণ মিশ্রিত কালো রাত। তবুও বাঙালি হাল ছাড়েনি, বুনেছে রঙিন স্বপ্ন। বাঙালি বীরের জাতি, ইতিহাস তার সাক্ষী আছে। বাঙালির সাহস ও বীরত্বপূর্ণ সেইসব ইতিহাস গোটা বিশ্ববাসী জানে। নিজের জীবনের সেই দুঃসহ স্মৃতিগুলো আজও চোখের সামনে জ¦লজ¦ল করে ভেসে ওঠে। কেননা, মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলো ছিল কতটা ভয়ঙ্কর তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর তিনি বুঝে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ আসন্ন। ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ মাগুরা ও ঝিনাইদহের সুঁতলিয়া নামক স্থানে প্রথম যে মুক্তিযুদ্ধ হয় সেখানে আজিজুর রহমানের ভূমিকা ছিল ব্যাপক। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তিনি ধরাও পড়েছিলেন। কিন্তু নিজের বুদ্ধিমত্তার কারণে প্রাণে বেঁচে যান। মাগুরা মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসারির একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তিনি। এই মুক্তিযোদ্ধা ও চিত্রশিল্পীর সংগ্রহে আছে মুক্তিযুদ্ধের অনেক ইতিহাস, ছবি এবং মহান মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে লেখা তার স্মৃতির ডায়েরি।

মোস্তফা আজিজ আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা
আলমখালি বাজারের নিকটে ১৯৮৫ সালে একদল কোমলমতি শিশুদের নিয়ে শুরু করেন মোস্তফা আজিজ আর্ট স্কুল নামের একটি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের। পরবর্তী সময়ে ২০০২ সাল হতে মাগুরা সদরের রাউতড়া গ্রামের বিশ্বরোড সংলগ্ন ৬ শতক জমির ওপর গড়ে উঠেছে আর্ট স্কুলটি। অর্ণব, মৃত্তিকা, ফাতেমা, মিলন, লিজা, রিয়া, সুজন, জীবন, চম্পা, জাকারিয়া, তালহা, তিথি, তামান্না, ফরহাদ, অংকন ও অন্তরার মতো ছেলেমেয়েরা শুক্রবার সকাল হলেই ছুটে আসেন ছবি আঁকা শিখতে। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক। কোনো ছাত্র-ছাত্রীর কাছ থেকে টাকা পয়সা নেওয়া হয় না। পুরো কার্যক্রমটি চলে স্বেচ্ছাশ্রমে। এই কাজের সঙ্গে স্বেচ্ছাশ্রমে শিক্ষক হিসাবে যুক্ত হয়েছেন চিত্রশিল্পী, রবিউল ইসলাম, প্রেম কুমার, গোলাম রসুল, মফিজুর রহমান, আসমা নাসরীন ও মুক্তাদির উক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যক্ষ হিসেবে এখন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছেন আজিজুর রহমান। দেখতে দেখতে মোস্তফা আজিজ আর্ট স্কুলটি ৩৬ বছরে পা রেখেছে। নিজে বড় শিল্পী হতে পারেননি কিন্তু স্বপ্ন দেখেন তার ছোট ছোট কোমলমতি আঁকিয়েদের নিয়ে। স্বপ্ন দেখেন ওরা একদিন হবে- এস এম সুলতান, জয়নুল, কামরুল হাসান, মোস্তফা মনোয়ার, কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, রফিকুন নবী, শহিদ কবীর, বীরেন সোম, শিশির ভট্টাচার্য। ওরা একদিন দেশের নাম ছড়িয়ে দেবে বিশ্বের বুকে। বাংলাদেশের জন্য ছিনিয়ে আনবে আরও অনেক বিজয়। আজিজুর রহমানের অত্যন্ত কাছের মানুষ ও একই দলের মুক্তিযোদ্ধা এটিএম মহব্বত আলী বলেন- মুক্তিযোদ্ধা ও চিত্রশিল্পী আজিজ ভাইয়ের যত স্বপ্ন এই আর্ট স্কুলটিকে ঘিরেই। এই বয়সেও তিনি মাগুরার রাউতড়া, আলমখালি, ইচ্ছাখাদা, মির্জাপুর, আলাইপুর, হাজিপুর, হাজরাপুর, সাইত্রিশ, আলোকদিয়া, বিনোদপুর, জগদল, গোপালগ্রামসহ বিভিন্ন গ্রাম শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিশুদের কাছে গিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের গল্প ও ছবি আঁকানো শেখান। আর এই কাজটি বছরের পর বছর ধরে তিনি করে যাচ্ছেন মনের আনন্দে। আজিজ ভাইয়ের মতো এমন নিঃস্বার্থ মানুষ আজকের দিনে খুঁজে পাওয়া কঠিন।

কর্মজীবন
১৯৬২ সালে তার কর্মজীবন শুরু হয় দৌলতপুর জুটমিল (খুলনা) এ চাকরির মাধ্যমে। তবে তা খুব বেশিদিন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তিনি আবার ফিরে আসেন শিল্পের টানে নিজ গ্রামে। ১৯৬৭ সালে রাউতড়া পোস্ট অফিসের পোস্ট মাস্টার হিসাবে যোগদান এবং কয়েক বছর উক্ত পদে কাজ করেন। ১৯৬৯ সালে রাউতড়া নিজ গ্রামে শিশু বিদ্যালয় স্থাপন পূর্বক নিজ গ্রামের স্বর্গীয় জিতেন্দ্র নাথ সরকার এবং পরিমল কুমার সেনসহ তিনজন মিলে শিশু বিদ্যালয় পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গৌরীচরণপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তীতে সরকারিকরণ হলে চাকরি ছেড়ে দেয়। ১৯৬৯ সালে ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে কৃতকার্য হয়। ২০০২ সালে মাগুরা পুলিশ লাইন প্রি-ক্যাডেট অ্যান্ড হাইস্কুলে আর্টের শিক্ষক হিসাবে যোগদান ও পরবর্তী সময়ে কথা সংগীত কেন্দ্রে আর্টের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ লাভ ও ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠান দুটিতে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ৫ নং হাজরাপুর ইউনিয়নের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত দুটি ইউনিয়নের যুবকদের সংগঠিত করে যুব কমিটি ও নেতৃত্ব দান। কমার্শিয়াল শিল্পী হিসাবে একটানা ২০ বছর কৃষি বিভাগ এবং সড়ক ও জনপদ বিভাগ মাগুরা ও ঝিনাইদহ কর্মে নিয়োজিত ছিল। বর্তমানে মোস্তফা আজিজ আর্ট স্কুলটি নিয়ে সময় কাটে তার।

বোয়াল খাবি খা
মুক্তিযোদ্ধা ও চিত্রশিল্পী আজিজুর রহমানের ডায়েরি থেকে...
“আমাদের রাউতড়া গ্রামের উত্তর পাশ দিয়ে নবগঙ্গা নদী প্রবাহিত। নদীর উত্তর পাশ ঘেঁষে দ্বারিয়াপুর গ্রাম। এই দ্বারিয়াপুর গ্রামে অন্যান্য সম্পদায়ের মতো রাজবংশীও একটা সম্প্রদায়। কিছু লোক কৃষিকাজ করলেও নদীর মাছ মেরে তা বিক্রি করেই এদের জীবিকা নির্বাহ হতো। ১৯৭১ সালেও ধারাবাহিকতা ভেবে মাছ বিক্রির জন্য হাট বাজারে যেত। যদিও জীবনের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। জঠরের জ¦ালা বড় জ¦ালা। পাক সেনা ও রাজাকারদের কুদৃষ্টিতে পড়ে গেল এরা। টাকা পয়সা না দিয়েই বড় বড় মাছগুলো রাজাকাররা নিয়ে নিত। ৬ অক্টোবর ১৯৭১ সালে (বুধবার) রাজাকাররা রাজবংশীদের বলে দিল আগামীকাল সকালে ৫ থেকে ৭ কেজি ওজনের একটি বোয়াল মাছ দিতে হবে। আমরা নিয়ে আসব। কড়া নির্দেশ। হয় বোয়াল মাছ দিতে হবে নতুবা জীবন দিয়ে দিতে হবে। রাজবংশী মহলে বিষাদের ছায়া পড়ল। কয়েকজন এসে নির্দ্বিধায় সমস্ত কথা বলে বসল।

আমি বললাম তোমরা এখনই চলে যাবে লিয়াকত আলীর নিকট। সে যেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এবং হাতিয়ার নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করে। লিয়াকত মাগুরা থানা মুজিব বাহিনীর কমান্ডার। তার সঙ্গে পরামর্শ করেই কিছু একটা করব। গ্রাম এবং ইউনিয়ন আলাদা হলেও এই রাজবংশী মহলটা আমার সঙ্গে একান্ত আপনজন হয়ে চলত। তাছাড়া অতুল, রবি, প্রফুল্ল, স্মরজিৎ, ইসরাইলসহ অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং নিত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের একস্থান থেকে অন্যস্থানে নৌকাযোগে পৌঁছে দিত। এছাড়াও সর্বরকম সহযোগিতা করত। বিভিন্ন রকম চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। লিয়াকতের নিকট সংবাদ পৌঁছাল কিনা, কয়জন আসবে, কখন আসবে, কোন ধরনের হাতিয়ার সঙ্গে আনবে, কোন স্থানে আক্রমণ করব, অ্যাম্বুসের স্থান, আত্মসমর্পন করানো যাবে কিনা ইত্যাদি। সকালবেলা রাজাকাররা গিয়ে যদি তাদের আশানুরূপ মাছ না পায় তাহলে রাজবংশী মহল্লার মানুষের কি করুণ পরিণতি হবে? যতই রাত হচ্ছে ততই চিন্তায় মুষড়ে পড়ছি। শুধু ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক কানে আসছে। কোন কায়দায় রাজাকারদের ফাঁদে ফেলা যাবে এবং স্থানও নিজে নিজে ঠিক করে ফেললাম। আমার পরিকল্পনার কথা বললে লিয়াকত অমান্য করবে না। এ বিশ্বাস আমার আছে। সকল মুক্তিযোদ্ধাই আমাকে খুব সম্মান করত এবং বিশ্বাস করত।

আনুমানিক রাত দুইটা বা আড়াইটা হবে। লিয়াকত আর নিহার নামের একজন মুক্তিযোদ্ধা রাতের অন্ধকার ভেদ করে আমার গোপন আস্তানায় এসে উপস্থিত হলো। অবশ্য এখানেই অঞ্চলের ছেলেদের ট্রেনিং দিতাম। একটা কথা না বললেই নয়। আমার গ্রামের হিন্দু-মুসলমান যাতে শত্রুর নিকট ধরা না পড়ে। আত্মগোপন করে যে বাড়ি থাকতাম এবং ছেলেদের ট্রেনিং দিতাম এরা সকলেই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই আমাদের জীবনের নিরাপত্তার চেষ্টা করত। লিয়াকত বলল ভাই, আরও দুই একজন হলে ভালো হতো। কারণ তিনজন হয়তো কাভার করা যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে নবগঙ্গা নদী সাঁতরিয়ে আলাইপুর গ্রামে গেলাম। কাউকে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ছাকেন ভাইকে ঘুম থেকে ডেকে নিয়ে আসলাম। কোথায় যেতে হবে এবং রাতে কি করতে হবে কিছুই ছাকেন ভাইকে জানালাম না। এ ধরনের কাজে অনেক সময় অনেক কিছুই গোপন রাখতে হয়। চারজন একত্রিত হয়ে আক্রমণের জন্য শলাপরামর্শ করতে লাগলাম। আমি আগেই পরিকল্পনা করে মানচিত্র এবং স্থান ঠিক করে রেখেছিলাম সম্পূর্ণ গেরিলা কায়দায় আত্রুমণের জন্য। প্রথমে চেষ্টা করতে হবে হ্যান্ডস আপ করে আত্মসমর্পন করানো। তাতে না হলে আক্রমণ। ফজরের আযানের পরপরই নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে অ্যাম্বুস করতে হবে। রাজাকারদের যাওয়ার পথের দুই পাশের জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে থাকব। মাঝামাঝি স্থানে আসলে লিয়াকত হ্যান্ডস আপ বলবে, সঙ্গে সঙ্গে আমরাও বলব। তাতে ওরা ঘাবড়ে যাবে এবং মনে করবে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। যাতে আমাদের কেউ চিনতে না পারে সেভাবেই নিজেদের তৈরি করে খোদার নাম ভরসা করে রওনা দিলাম নির্ধারিত স্থানে পৌঁছার জন্য। বাটুল ও রাজ্জাক ভাই আমাদের দেখে ফেলল কিন্তু চিনতে পারল না।

নির্ধারিত স্থান থেকে দুইশত গজ দক্ষিণ দিকে ডা. নিত্য গোপালের বাড়ি। তার একটা পোষা কুকুর ছিল মনে হয় এই কুকুরটাও স্বাধীনতার স্বপক্ষে ছিল। ওই সময়ের জন্য তার কার্যকলাপ সত্যিই হতবাক করে দেওয়ার মতো। যখনই কোনো রাজাকার কিংবা পাকসেনা চোখে পড়ত তখনই পাগলের মতো হয়ে যেত। ঘেউ ঘেউ করে ডেকে মহল্লার লোকজনের সতর্ক করে দিত। এতে শুধু আমি নই সকলেরই যথেষ্ট উপকার হয়েছে। বেশ কিছু সময় যার যার পজিশনে অপেক্ষা করছি। হঠাৎ কুকুর ডেকে উঠল। আমিও সবাইকে সিগন্যাল দিয়ে দিলাম। ঝোপের ভিতর থেকে চোখে পড়ে গেল ওরা হাতিয়ারসহ বেশ কয়েকজন আসছে। কিন্তু খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম সঙ্গে আসছে আমাদের গ্রামের একটা শিশু, তাও এদের সামনে। সাদা হাফপ্যান্ট গায়ে গেঞ্জি সুন্দর চেহারা কচি বয়সের অজিৎ। রাজাকাররা আত্মসমর্পণ না করলে অবশ্যই আক্রমণ করতে হবে। মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, স্বাধীনতা যুদ্ধে অনেক ত্যাগ, ক্ষতি, অনেক জীবন দিতে হয় এবং এটা বরণ করে নিতে হয়। লিয়াকতের নিকট এস, এল, আর, আমার নিকট রাইফেল আর ছাকেন ভাই এবং নিহারের নিকট বেয়নেট। আমাদের মাঝ দিয়ে প্রায় পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু লিয়াকত আত্মসমর্পণের জন্য হ্যান্ডস-আপ না বলে ফায়ার করল। কয়েকজন দৌড় দিলে আর কয়েকজন হাতিয়ার দিয়ে আক্রমণ করার চেষ্টা করছে দেখে ফায়ার আরম্ভ করলাম। পড়ে গেল কয়েকজন। লিয়াকত, ছাকেন ভাই এবং নিহার দৌড় দিল নদীর দিকে। উদ্দেশ্য নদী পার হওয়া, নদী পার হয়ে গেল। জঙ্গলের মধ্যে অস্ত্রটা এমন অবস্থায় রাখলাম যাতে কারও দৃষ্টিতে না পড়ে। দেখতে দেখতে অনেক পাকসেনা এবং রাজাকার গ্রামে ঢুকে পড়ল। এদের দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে রাস্তা পার হয়ে দক্ষিণে চলে গেলাম। শিশু অজিৎ খোদার ইচ্ছায় বেঁচে গেল। পরপারে চলে গেল কয়েকজন রাজাকার।

৭ অক্টোবর, ১৯৭১ বৃহস্পতিবার, বোয়াল মাছ খাওয়া হয়ে গেল রাজাকারদের। কথায় বলে, লোভে পাপ আর পাপে মৃত্যু। আমরা দেশ স্বাধীন করব হৃদয়ে এ অবস্থা পোষণ করছি। তখন থেকে অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে রটে গেল ‘খাবি বোয়াল খা’ দেখ কেমন লাগে।”

পুরস্কার ও সম্মাননা
চিত্রশিল্পে অবদানের জন্য নবগঙ্গা সাহিত্যগোষ্ঠী সম্মাননা ২০১৫
কালের কণ্ঠ সাদা মনের মানুষ পুরস্কার ২০১৭
সমীকরণ সাহিত্য সংস্কৃতি পদক ২০১৮
সমকাল সুহৃদ সমাবেশ সম্মাননা ২০১৪
২০১৩ ও ২০১৫ সালে খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিদ্যোৎসাহী হিসাবে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রাপ্তি।
মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচিত গ্রন্থ
ছিটেফোঁটায় ৭১
ছোটদের প্রশ্নোত্তরে ৭১
বোয়াল খাবি খা
ভয়ংকর ৭১