বেদেদের যাযাবর জীবন

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১ | ২ বৈশাখ ১৪২৮

বেদেদের যাযাবর জীবন

বিবিধ ডেস্ক ৩:০৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০২, ২০২১

print
বেদেদের যাযাবর জীবন

বিচিত্র জাত বেদে। জাত জিজ্ঞাসা করলে বলে, বেদে। তবে ধর্মে ইসলাম। আচারে হিন্দু; মনসা পূজা, মঙ্গলচ-ী, ষষ্ঠীর ব্রত করে, কালী-দুর্গাকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে। হিন্দু পুরাণ-কথা তাদের কণ্ঠস্থ। বিয়ে মুসলিমদের সঙ্গে হয় না, নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যেই আবদ্ধ। বিয়ে হয় মোল্লার কাছে ইসলামী পদ্ধতিতে, কিন্তু মরলে পোড়ায় না কবর দেয়। থাকার জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। আজ এখানে তো কাল ওখানে। এভাবেই দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে জীবিকার সন্ধানে ছুটে বেড়ান বেদেরা। যাযাবর এ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে লিখেছেন লিটন ঘোষ জয়। সম্পাদনা করেছেন সাইফ-উদ-দৌলা রুমী

নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় ও ইতিহাস

নৃ-তাত্ত্বিক বিবেচনায় কিন্তু বেদেরা অনার্য। তাদের মধ্যে আরবদের সেমিটিক কোনো বৈশিষ্ট্যই নেই। বেদেরা সুঠাম দেহ, গভীর কালো গায়ের রঙ, কোঁকড়ানো চুল, আয়ত ও কালো চোখের অধিকারী। শারীরিক বৈষিষ্ট্য অনুযায়ী তারা আদি অস্ট্রাল বংশোদ্ভুত। তাদের এদেশে আসা নিয়ে অবশ্য অনেক ধরনের তত্ত্ব প্রচলিত আছে। কারও মতে, তারা আরাকানের মনতং মান্তা নৃগোত্র থেকে এসেছে। কেউ বলে থাকেন, বেদেরা সাঁওতালদের বিচ্ছিন্ন অংশ। যারা পারস্যের সঙ্গে বেদেদের সম্পর্ক খোঁজেন তাদের মতে, বেদেরা সাত শতকে আরবের আলবাদিয়া নামক স্থান থেকে এদিকে এসেছে। অনেকের ধারণা, খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে পূর্ব ভারত থেকে বেদেরা সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং কালক্রমে এ অঞ্চলে আসে। সে যা-ই হোক, বেদেরা কোনো একসময় সামাজিক, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় প্রতিকূলতার জন্যই ঘরবাড়ির মায়া ছেড়ে বাধ্য হয় যাযাবর জীবন বেছে নিতে। শত শত বছর ধরে নদীর জীবনে অভিযোজিত হয়ে আজও তারা টিকে আছে এ ভূমিতে।


ভাষা ও ধর্মাচার

বেদেরা বাঙালিদের সঙ্গে বাংলায় কথা বললেও তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। নিজেদের মধ্যে তারা ঠেট বা ঠার ভাষায় কথা বলে থাকে। আগেই বলা হয়েছে, বেদেরা অস্ট্রালগোত্রীয়। কিন্তু তাদের ভাষা তিব্বতি-বর্মি (সাক-লুইশ) ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এ ভাষার কোনো লিপি নেই। ১৯৯১ সালের হিসাব অনুযায়ী ঠারভাষী বাংলাদেশি বেদের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। সমাজকল্যাণ দফতরের জরিপ মতে, বাংলাদেশে শতকরা ৯৯ ভাগ বেদে মুসলিম। বেদেদের ধর্মাচার অবশ্য মিশ্র। অনেকে পীরের অনুসারী, আবার কেউ কেউ মনসা বা বিষহরির ভক্ত। ধর্মে সাধারণত বেদেদের আগ্রহ নেই। হিন্দু দেবদেবীর প্রশস্তি রচনা, বিভিন্ন পার্বণে অংশ নিলেও বেদেরা পূজা অর্চনা করে না। বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক নেই বললেই চলে। বিয়ে মুসলিম ধর্মীয় মতে হলেও বিয়ের বিভিন্ন রীতিনীতি আছে। গোষ্ঠীভেদে এসব রীতিনীতির পার্থক্য দেখা যায়। আগের দিনে মারা গেলে তাদের লাশ কলাগাছের ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হতো। এখনও তাদের মৃতদেহের ঠাঁই হয় কোনো পরিত্যক্ত স্থানে কিংবা নদীর কিনারায়।


বাংলাদেশে আবাসস্থল

প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৬৩৮ সালে বেদেরা আরাকান রাজ বল্লাল রাজার সঙ্গে এ দেশে আসার পর বিক্রমপুরে প্রথম বসতি গড়ে তোলে। পরে সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে। বাংলাদেশের বগুড়া, পাবনা, ময়মনসিংহ, বাখরগঞ্জ, নোয়াখালীতে বেদে সম্প্রদায়ের মানুষদের পাওয়া যায়। সাভার, মুন্সীগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, গাজীপুরের জয়দেবপুর, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, মিরসরাই, তিনটুরী, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চান্দিনা, এনায়েতগঞ্জ, ফেনীর সোনাগাজী ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বেদেদের আবাসের কথাও জানা যায়। সাভারে যে বিশাল প্রান্তিক গোষ্ঠী রয়েছে, তাদের অধিকাংশ নিজেদের মান্তা বলে পরিচয় দেয়। মান্তারা পেশায় মৎস্যজীবী। এদের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মাচার বেদেদের মতোই।


জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি

বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ। সমাজসেবা অধিদফতরের জরিপ মতে, বাংলাদেশে প্রায় ১৩ লাখ ২৯ হাজার ১৩৫ জন অনগ্রসর জনগোষ্ঠী এবং ৭৫ হাজার ৭০২ জন বেদে জনগোষ্ঠী রয়েছে। জেলে, সন্নাসী, ঋষি, বেহারা, নাপিত, ধোপা, হাজাম, নিকারী, পাটনী, কাওড়া, তেলী, পাটিকর, বাঁশফোর, ডোমার, রাউত, তেলেগু, হেলা, হাড়ি, লালবেগী, বাল্মিগী, ডোম ইত্যাদি তথাকথিত নিম্নবর্ণের জনগোষ্ঠী এ অনগ্রসর সম্প্রদায়ভুক্ত। যাযাবর জনগোষ্ঠীকে বেদে সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। বেদে জনগোষ্ঠীর শতকরা ৯৯ ভাগ মুসলিম এবং শতকরা ৯০ ভাগ নিরক্ষর। আটটি গোত্রে বিভক্ত বেদে জনগোষ্ঠীর মধ্যে মালবেদে, সাপুড়িয়া, বাজিকর, সান্দার, টোলা, মিরশিকারী, বরিয়াল সান্দা ও গাইন বেদে ইত্যাদি। এদের প্রধান পেশা হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, তাবিজ-কবজ বিক্রি, সর্প দংশনের চিকিৎসা, সাপ ধরা, সাপের খেলা দেখানো, সাপ বিক্রি, আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যসেবা, শিঙ্গা লাগানো, ভেষজ ওষুধ বিক্রি, কবিরাজি, বানর খেলা, যাদু দেখানো প্রভৃতি।

২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে পাইলট কর্মসূচির মাধ্যমে সাতটি জেলায় বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়। পাইলট কার্যক্রমভুক্ত সাতটি জেলা হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, পটুয়াখালী, নওগাঁ, যশোর, বগুড়া এবং হবিগঞ্জ। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে বরাদ্দ ছিল ৬৬ লাখ টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে নতুন ১৪ জেলাসহ মোট ২১টি জেলায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয় এবং জেলাগুলো হচ্ছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, পাবনা, নওগাঁ, দিনাজপুর, নীলফামারী, যশোর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী এবং হবিগঞ্জ। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে বরাদ্দ ছিল সাত কোটি ৯৬ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে পূর্বের ২১ জেলায় এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ৯ কোটি ২২ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ৬৪ জেলায় সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ১৮ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৬৪ জেলায় বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ৫০ কোটি তিন লাখ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ৬৪ জেলায় বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ৫৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।


বেদে পুরুষ ও নারীরা

বেদে পুরুষরা সাধারণত কাজ করে না। মেয়েরা যখন রোজগারে বাইরে যায় তখন সংসার ও সন্তান সামলায় তারা। বেদেনীরা কিন্তু তাদের এই অলস স্বামীদের ভীষণ ভালোবাসে। স্বামীকে দেবতার মতো মানে, সব সময় আগলে রাখে। স্বামীকে বশে রাখতে কখনও শরীরে মালিশ করে দেয় সাপের চর্বির তেল, কখনও আবার করে রাখে তাবিজ-কবজ। বেদেনীদের পছন্দের সাপ হলো ভয়ঙ্কর, উগ্র মেজাজের কালনাগিনী। তারা চালচলন আর স্বভাবে যেন এ কালনাগিনীরই অনুকরণ করে। সাজতে ভীষণ ভালোবাসে এই মেয়েরা। কপালে টিপ আর উঁচু খোপায় ফুল গুঁজে দিয়ে, রঙিন শাড়ি পরে বেরিয়ে পড়ে দল বেঁধে। হাঁসুলি, বালা, বাজু, নোলক, পায়ের মল বা খাড়–, বিছা এসব অলঙ্কার যুগ-যুগান্তরে আজও তাদের অঙ্গে শোভা পায়। অপূর্ব মায়াবী এ সাজের পিছে আরেকটি কারণ হচ্ছে পেশাদারিত্ব। মানুষকে আকৃষ্ট করতে তারা এই প্রসাধনের আশ্রয় নেয়।


সমাজ ব্যবস্থা

বেদেরা কৌম সমাজের রীতি পালন করে আসছে শুরু থেকেই। তাদের জীবনযাত্রা, সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন গোত্রের মধ্যেই আবদ্ধ। প্রতিটি বেদে পরিবারের আছে নিজস্ব নৌকা। কয়েকটি নৌকা নিয়ে তৈরি হয় একটি দল। আর কয়েকটি দল নিয়ে একেকটি বহর। প্রতিটি বেদে বহরে একজন সর্দার থাকেন। বহরের নিয়মনীতি, প্রত্যেক দলের বাণিজ্যপথ ও এলাকা এসবই নির্ধারণ করেন সর্দার। বিয়ে এবং অন্যান্য উৎসবে সর্দারকে দিতে হয় অর্থ কিংবা বিশেষ উপহার।

বেদে সম্প্রদায়ের উপগোত্রীয় ও গোত্রীয় সর্দারও আছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বেদেরা আটটি গোত্রে বিভক্ত। এইগোত্রগুলো হলো মালবেদে, সাপুড়িয়া, বাজিকর, সান্দার, টোলা, মিরশিকারী, বরিয়াল সান্দা ও গাইন বেদে। বেদেরা সাধারণত কার্তিক মাসের ৫ তারিখ থেকে অগ্রাহায়ণের ১৫ তারিখ, এ সময়ের মধ্যে মুন্সীগঞ্জ বা চট্টগ্রামে একত্রে মিলিত হয়। তখন সমস্ত বহরের নেতারা মিলে গোত্রীয় সর্দার নির্বাচন করে থাকেন। বেদে জনগোষ্ঠীর গোত্রপ্রীতি প্রবল। তারা আজও সমগ্র দেশজুড়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে।


দুর্দিনে বেদেরা

তাবিজ-কবজ বিক্রি, জাদুটোনা আর সাপ খেলা দেখিয়ে যাদের জীবন সংগ্রামে টিকে থাকা সেই ছিন্নমূল, অসহায় ও অধিকারবঞ্চিত বেদে সম্প্রদায়। যারা রাস্তার পাশে, ফাঁকা মাঠে বা পরিত্যক্ত জমি, খাসজমি, রাস্তার ধার, স্কুলের মাঠে রেললাইনের পাশে অথবা নদীর তীরে অতিথি পাখির মতো অস্থায়ী আবাস গড়ে। আবার এক দিন উধাও হয়ে যায়, কেউ খবর রাখে না তাদের। সময়ের আবর্তে উন্নতির পরিবর্তে বেদে সমাজের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্দিন। নদীর রূপ বদলের সঙ্গে সঙ্গে তাদের চলার পরিধিও ছোট হয়ে আসছে। অনেকেই ছাড়তে শুরু করেছে নদী। নদী ছেড়ে কোথায় যাবে এসব বেদে। তাদের নেই কোনো শিক্ষা, নেই কোনো কাজের বিশেষ যোগ্যতা। বাংলাদেশের সমাজে শ্রেণী বিভাজন না থাকলেও বেদেদের দেখা হয় কিছুটা আলাদা চোখে। আর তাই সমাজের মূলস্রোতে মেশাটাও খুব একটা সহজ নয় তাদের জন্য।


কাজের ধরন

বেদেরা কৃষিশ্রম এবং অন্যান্য কায়িক শ্রমকে অমর্যাদার মনে করে। মেয়েরাই প্রধানত কাজের উদ্দেশ্যে বাইরে যায়। এ মেয়েরা এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে ছুটে বেড়ায়। তাদের আদি সার্বজনীন পেশা হলো কবিরাজি আর ভেষজ ওষুধ বিক্রি করা।

এছাড়া ঝাড়ফুঁক, শিঙ্গা লাগানো (কাপিং থেরাপি), ব্যথা দূর করতে গরুর শিং দিয়ে রক্ত টেনে আনা, দাঁতের চিকিৎসা, বানর খেলা, যাদু দেখানো এসব কাজ করে থাকে। গোত্রভেদে কাজের ধরন আলাদা হয়ে থাকে। সাপুড়েরা সাপ ধরে, সাপের খেলা দেখায়। বর্তমানে অনেকেই শুটিংয়ের কাজে সাপ ভাড়া দেয়।


বর্তমান অবস্থা

দিন বদলের সঙ্গে বেদেদের কাজেও আসছে পরিবর্তন। চুড়ি-ফিতা, খেলনা বিক্রি, ছোটখাট ব্যবসা এসবে জড়িয়ে পড়ছে অনেকে। আবার অনেকের বিরুদ্ধেই রয়েছে মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ। বেদেদের বিরুদ্ধে চিকিৎসার নামে প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া যায় প্রায়ই। বর্তমানে শহরের রাস্তাতেও এদের দেখা যায় মানুষকে বিব্রত করে টাকা তুলতে। বাংলাদেশে প্রায় ৭.৮০ লাখ বেদে জনগোষ্ঠী রয়েছে। বিশ্বায়নের যুগের সঙ্গে এই মানুষগুলো তাল মিলিয়ে উঠতে পারেনি। মাত্র ২০০৮ সালে বেদেদের একটি বিশাল অংশকে ভোটাধিকার দেওয়া হয়। নাগরিক অধিকার পেলেও তাদের শিক্ষা ও চিকিৎসার নেই কোনো সুব্যবস্থা। সরকারিভাবে তাদের জন্য বৃত্তি, ভাতা ও প্রশিক্ষণোত্তর পুনর্বাসন ব্যবস্থা থাকলেও বেদেরা শতকরা ৯০ ভাগই নিরক্ষর। সামাজিকভাবেও এরা চরম অবহেলিত। নির্বাচনের সময় ছাড়া জনপ্রতিনিধিদের সময় হয় না এই উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীর কথা ভাবার।

লক্ষ্য রাখা উচিত, জীবিকার তাগিদে এই মানুষগুলো যেন অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে না পড়ে। বেদেরা তাদের স্বাতন্ত্র রক্ষা করতে চায়। তাদের এই স্বাতন্ত্র আর বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে আমাদের সমাজের সঙ্গে মিশে পরিণত হয়েছে এক ঐতিহ্যবাহী অংশে।
বেদে সম্প্রদায়কে তাদের ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র রক্ষার্থে সহায়তার পাশাপাশি নতুন জীবিকা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্পের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।


বৈবাহিক রীতিনীতি

বেদে সমাজে সাধারণত বাল্যবিয়ে, বহুবিয়ে, যৌথ পরিবারের মতো প্রথাগুলো দেখা যায় না। বেদেনীরা স্বাধীনচেতা। বেদে যুবক-যুবতীরা স্বেচ্ছায় পরস্পরকে পছন্দ করে বিয়েতে সম্মত হয়। পারিবারিকভাবে বিয়ের আয়োজন করা হয়। বর-কনেসহ উপস্থিত সবাই নাচগানের মাধ্যমে উৎসবে মেতে ওঠে। বেদেদের বিয়ের চমৎকার এক রীতির কথা জানা যায়। হবু বর গাছের সবচেয়ে উঁচু ডালে গিয়ে বসে। তখন হবু বরকে নামাতে কনেকে কথা দিতে হয় শ্বশুর-শাশুড়ি আর সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার। তারপর বরকে আজীবন ভরণপোষণের ওয়াদা করলে তবে সে নিচে নেমে আসে। এরপর তাদের বিয়ে হয়। বহিরাগত কেউ থাকলে বেদে তরুণীরা তাদের বিয়েতে প্রলুব্ধ করে। বিয়ের পর তাকে গোত্রে রাখতে চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে বাইরের যুবক বেদে তরুণীকে বিয়ে করে নিয়ে গেলে তাকে দিতে হয় ক্ষতিপূরণ।

বিয়ে করতে গেলে কনেকে অর্থ দিতে হয় বরের। বিয়ের পর স্বামী যায় স্ত্রীর সংসারে। স্বামী-স্ত্রীতে কখনও ছাড়াছাড়ি হলে সর্দারের নির্দেশে সন্তান ও সম্পত্তি দুজনকে ভাগ করে দেওয়া হয়। বেদে সমাজে বিধবা বিবাহও প্রচলিত।


যাযাবর জীবন

খোলা আকাশের নিচে ছোট ছোট বাঁশ, চাটাই আর পলিথিন দিয়ে নৌকার ছোয়ের মতো করে বানানো পাশাপাশি অনেকগুলো ঘর। এক একটা ঘর থেকে অন্য আরেকটা ঘরের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়! আর এসব ছোট ছোট ঘরেই গাদাগাদি করে একসঙ্গে প্রায় দশ থেকে বারোজন মানুষের বসবাস। এখানেই ওরা প্রতিদিনের স্বপ্ন সঞ্চয় করে বেঁচে থাকার পথ খোঁজে। এমনই দৃশ্য দেখা যায় মাগুরা সদরের কাটাখালি এলাকার একটা মাঠে গিয়ে। গোটা মাঠেই যাযারব বেদেরা সারিবদ্ধভাবে তৈরি করেছে তাদের অস্থায়ী বেদেপল্লী। সবমিলিয়ে এখানে প্রায় চল্লিশটার মতো ছোয় আকৃতির ঘর রয়েছে।

কোনো ঘরেই নেই বিদ্যুৎ, নেই কোনো স্যানেটেশন ব্যবস্থা। এমন কি পান করার জন্য বিশুদ্ধ জলটুকু পর্যন্ত নেই। যে ঘরে বড়জোর তিন থেকে চারজন থাকা কষ্টসাধ্য; আর তার মধ্যেই ওরা কি না আট থেকে দশজন থাকে! ওদের যে পরিবারটা সবচেয়ে ছোট্ট, সে পরিবারের সদস্য সংখ্যাও কম করে আটজন। নৌকার ছোয়ের মতো এসব খুপরি ঘরেই কাটে ওদের জীবন। আধুনিকতার সবকিছুই যেন ওদের নাগালের বাইরে! ফেরিওয়ালা মেঘের মতো ওরা যেন ভাসমান জীবনের চির চেনা রূপ! আজ এখানে তো কাল ওখানে! আর এ জন্যই বেদেদের বলা হয় যাযাবর। ভবঘুরে জীবনের অনুরূপ দৃষ্টান্ত।

সারা দেশ ওরা জীবন জীবিকার সন্ধানে পথে পথেই ঘুরে বেড়াই। যশোরের খাজুরা, মরিরামপুর, কেশবপুর, ফরিদপুরের, মধুখালী, কানাইপুর, নয়াকান্দি, গোয়ালনন্দ, রাজবাড়ি, মানিকগঞ্জ; টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কোথায়ও যেতে বাদ থাকে না যাযাবর বেদেদের।

ভরদুপুরে নৌকার ছোয়ের মতো ঘরে বসে লুডু খেলছিল এমনই এক সংসারের বাসিন্দা রোজিনা বেগম ও রেহেনা। শরীর খারাপ হওয়ার জন্য আজ তারা কাজে বের হননি। লুডুর দানে হঠাৎ ছক্কা পড়াতে চিৎকার দিয়ে পান খাওয়া দাঁত বের করে হাসিমুখে রোজিনা জানালেন, ‘তারা জীবিকা নির্বাহের জন্য বেছে নিয়েছেন সাপের খেলা দেখানো, বানরের নাচ দেখানো, জাদু খেলা দেখানো, তাবিজ বিক্রি, কবিরাজি চিকিৎসার মতো অনেক পেশা। তাদের এমন জীবনযাপনও অবশ্য এখন পুরনো হয়ে গেছে। কেউ তাদের দেখে অবাক হয় না। এমনকি এর ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে তাদের শত বছরের ঐতিহ্য, নিজস্ব সংস্কৃতি।’

বছরের প্রায় ১০ মাস দলবদ্ধ হয়ে ঘুরে বেড়ান বেদেরা। পথে পথে নামে আয়ের জন্য। আর বাকি দুই মাস তারা বিশ্রাম নেয়, বিয়েসাদীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান উদযাপন করে, নতুন বছরের পরিল্পনা নেয়। প্রতিটি গোত্রেরই নিজস্ব পেশা আছে। সন্দর গোত্র চুড়ি-ফিতা বিক্রি করে, মালবৈধ্যরা কবিরাজি করে আর সাপুড়েরা সাপের খেলা দেখায়।

ঐতিহ্য অনুযায়ী অবশ্য বেদে নারীরাই পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়। পুরুষরা সাধারণত ঘর-সংসার দেখে। কিন্তু ধীরে ধীরে এ নীতিও পরিবর্তিত হচ্ছে। অভাবের তাড়নায় দুজনকেই জীবিকার সন্ধানে নামতে হচ্ছে নানা রকম পেশায়।

হাতে থাকা বিড়িতে টান দিয়ে আব্দুলা বলেন, কেউ বলে তারা সাঁওতালদের বংশধর, কেউ বলে মিয়ানমার, কেউ বলে হিমালয় থেকে এসেছে। কোনটি সত্যি তা তিনি সঠিকভাবে জানেন না।

মিঠুন নামে এক বেদে জানান, আমার মূল দক্ষতা হচ্ছে পুকুর বা নদীতে কোনো কিছু হারিয়ে গেলে ডুব দিয়ে সেগুলো উদ্ধার করা। তিনি একজন কবিরাজও বটে! তার সংগ্রহে আছে বিচিত্র রকম পাখির পালক, হাড়গোড়, শিকড়বাকড়, শামুক, ঝিনুক, পাথর ইত্যাদি। এগুলোর মিশ্রণে মোটামুটি সব রকম রোগের ওষুধই বানাতে পারেন। যেমন পুরাতন হলদেটে মাছের কাঁটা দিয়ে উচ্চ রক্তচাপ মুহূর্তে কমিয়ে ফেলতে পারেন। তিনি জানান, এটা একটা প্রাকৃতিক জ্ঞান ও একটা আধ্যাত্মবাদের মিশ্রণ। কয়েকটি শামুকের খোল তুলে নিয়ে সেগুলোয় চুমু খেয়ে বললেন, বাহুতে বা হৃৎপি-ের কাছাকাছি বেঁধে রাখলে এগুলো আপনাকে সব অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করবে।

রূপার বয়স মাত্র ত্রিশ বছর; কিন্তু দেখলে মনে হচ্ছে তার চেয়েও অনেক বেশি। কঠোর জীবনযাপনের ছাপ পড়েছে তার চোখেমুখে।