পথিকৃৎ আলোকচিত্রী সাইদা খানম

ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০ | ১১ কার্তিক ১৪২৭

পথিকৃৎ আলোকচিত্রী সাইদা খানম

আলতাফ হোসেন ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২০

print
পথিকৃৎ আলোকচিত্রী সাইদা খানম

সাইদা খানম লড়াকু এক নারীর নাম। শিল্পের প্রেমে উৎসর্গ করেছেন জীবনকাল। ক্যামেরা ও সাহিত্যকে ভালোবেসেছেন আমৃত্যু। সিনে পত্রিকা থেকে নারীদের ম্যাগাজিন ‘বেগম’, বাংলা ইংরেজি দৈনিক সবখানেই ছিল স্বচ্ছন্দ বিচরণ। নারীদের সাংবাদিকতা ও আলোকচিত্রকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা রেখেছেন। বরেণ্য এ ক্যামেরাশিল্পী ও কথাসাহিত্যিককে নিয়েই এবারের আয়োজন। গ্রন্থনা করেছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আলতাফ হোসেন।

 

নারী আলোকচিত্রীদের অনুপ্রেরণার নাম সাইদা খানম। তিনি ১৯৪৯ সালে, মাত্র ১২ বছর বয়সে ছবি তুলতে শুরু করেন। যে সময়ে নারীরা ঘর থেকে বের হত না, ঠিক সে সময়েই তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন ক্যামেরা হাতে। ফ্রেমবন্দি করেছেন অসংখ্য দৃশ্য। সব বাধা অতিক্রম করে ছবি তুলে খ্যাতি অর্জন করেন। আলোকচিত্রে অনন্য অবদানের জন্য পেয়েছেন একুশে পদকসহ নানা সম্মাননা।

কালের সাক্ষী এ আলোকচিত্রী প্রচারবিমুখ হওয়ায় তার পরিচিতি তুলনামূলক কম। তবে আলোকচিত্রী সাইদা খানমকে দৃষ্টিসীমার বাইরে রাখা যায়নি। ৮২ বছরে বর্ণাঢ্য জীবন পার করেছেন তিনি। ক্যামেরার সঙ্গে কাটিয়েছেন প্রায় ৬৪ বছর। বিয়েও করেননি। পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) তিনিই ছিলেন একমাত্র ও প্রথম নারী আলোকচিত্রী।


বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক কিছুর সাক্ষী সাইদা খানমের ক্যামেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি নেওয়ার পথেই সাইদা খানম ক্যামেরায় ধারণ করতে থাকেন সময় আর মানুষের মুখ, ইতিহাস আর জীবনের আখ্যান। দেশের মুক্তি সংগ্রামে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণের যে অনবদ্য ছবি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়ে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে সাইদা খানমই তা ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন। তার ক্যামেরায় ধরা পড়েছে রুগ্ন শিশুকে স্নেহরত মাদার তেরেসা, অভিবাদন গ্রহণরত বঙ্গবন্ধু থেকে বিজয়ের বাংলাদেশে আনন্দিত মানুষের ছবি। দেখিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের নিহত হওয়ার নির্মম দৃশ্যাবলি।

আলোকচিত্রী হিসেবে পেশা গ্রহণের জন্য প্রথম থেকেই সাইদা খানমকে সামাজিকভাবে বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি পাড়ি দিতে হয়েছে। পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর এমনকি আশির দশকেও এই পেশায় নারীর কাজ করাটা অনুৎসাহিতই ছিল। সে সময় তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন খালা মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, বড়বোন অধ্যক্ষ হামিদা খানম ও মহসিনা আলীসহ অনেকে। এছাড়া তাকে কাজ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন এদেশের নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন ও ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদিকা নূরজাহান বেগম।

আলোকচিত্রকে সাইদা খানম শিল্প হিসেবে মনে-প্রাণে গ্রহণ করেছেন। যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই প্রদর্শনী দেখেছেন। কলকাতায়, দিল্লিতে, ঢাকায় আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আলোকচিত্র প্রদর্শনী দেখে মুগ্ধ হয়েছেন এবং বুঝেছেন দর্শকের মন ছুঁয়ে যাওয়ার জন্য শিল্পীর তুলির চেয়ে কোনো অংশেই কম আবেদনশীল নয় আলোকচিত্রী ক্যামেরা। আলোকচিত্রও জাদু জানে। দর্শকের মনে শিল্পপ্রেম জাগিয়ে তুলতে পারে। এই আত্মোপলব্ধি সাইদা খানমকে আলোকচিত্র শিল্পের জগতে নিবিষ্ট রাখতে পেরেছে।

আলোকচিত্রী ও লেখকরূপে সাইদা খানম নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। তিনি ছিলেন একজন সচেতন দেশপ্রেমিক ও সমাজসেবী। যদিও সক্রিয়ভাবে তিনি রাজনীতির সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন না কিন্তু পরোক্ষভাবে ছাত্র গণআন্দোলনে ও অন্যান্য সরকারবিরোধী আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। বুভুক্ষু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তৎকালীন নেত্রী সেলিনা বানুর আহ্বানে। সে সময় পাক-সামরিক সরকারবিরোধী আন্দোলনের গোপন কাগজপত্র লুকিয়ে রেখেছেন অনেকের অনুরোধে।

সমাজসেবামূলক কাজে তিনি বেশি তৃপ্তি পেতেন। ভালোবাসেন অসহায়, অসুস্থ মানুষের সেবা করতে। সেবামূলক কাজেও তার যথেষ্ট অবদান আছে। মুক্তিযুদ্ধের পর হাসপাতালে নার্স সংকট দেখা দিলে তিনি হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবী নার্সিংয়ের কাজ করেছেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় তিনি সেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।
সাইদা খানম বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি ও বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া তিনি বাংলা একাডেমি এবং ইউএনএবির আজীবন সদস্য ছিলেন। শুধু আলোকচিত্রী নয়, তিনি বাংলাদেশ লেখিকা সংঘের সাধারণ সম্পাদিকার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অনেক লেখা ছোট গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ফিচার, সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়।

প্রাথমিক জীবন
সাইদা খানমের জন্ম ২৯ ডিসেম্বর ১৯৩৭ সালে, পাবনায়। তার বাবা আবদুস সামাদ খান এবং মা নাছিমা খাতুন। পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙায়। দুই ভাই, চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। বড় বোন মহসিনা আলী ছিলেন আর্ট কলেজের প্রথম মহিলা আর্টিস্ট। সাইদা খানমের ডাকনাম বাদল। শৈশব কেটেছে পাবনার ইছামতির তীরে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে। খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন ছোটবেলা থেকেই। তার বাবা মৌলভী আবদুস সামাদ খান শিক্ষা বিভাগে কাজ করতেন। বাবা আবদুস সামাদ খান ছবি তোলার ক্ষেত্রে মাত্র দুটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। বিবাহ আসরে ও স্টেডিয়ামে গিয়ে ছবি তোলা সমর্থন করেননি। বাবার প্রথম নির্দেশটি পালন করতে পারলেও তিনি দ্বিতীয়টি মানতে পারেননি। স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলাধুলার ছবি তুলতেই হয়েছে।


শিক্ষাজীবন
ছবি তোলার পাশাপাশি পড়াশোনার দিকেও দারুণ মনোযোগী ছিলেন সাইদা খানম। যে সময় মেয়েরা ইন্টারমিডিয়েট পাস করেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফেলত, সে সময় তিনি দু-দুটো মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে পুনরায় লাইব্রেরি সায়েন্সে স্নাতকোত্তর করেন।


কর্মজীবন
‘বেগম’ পত্রিকার মাধ্যমে আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে ১৯৫৬ সালে কাজ শুরু করেন। ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করেছেন। প্রেস ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। দুটো জাপানি পত্রিকাসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার তোলা আলোকচিত্র মুদ্রিত হয়েছে। তার ছবি ছাপা হয় ‘অবজারভার’, ‘মর্নিং নিউজ’, ‘ইত্তেফাক’, ‘সংবাদ’সহ বিভিন্ন পত্রিকায়। আলোকচিত্রী হিসেবে দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নেন সাইদা খানম। অস্কারজয়ী সত্যজিৎ রায়ের ছবিও তোলেন সাইদা খানম। সত্যজিতের তিনটি ছবিতে আলোকচিত্রী হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। ১৯৫৬ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেন। ওই বছরই জার্মানিতে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড কোলন পুরস্কার পান তিনি। ভারত, জাপান, ফ্রান্স, সুইডেন, পাকিস্তান, সাইপ্রাস ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশে তার ছবির প্রদর্শনী হয়। ১৯৬২ সালে ‘চিত্রালী’ পত্রিকার হয়ে একটি অ্যাসাইনমেন্টে গিয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও অস্কারজয়ী সত্যজিৎ রায়ের ছবি তুলে সমাদৃত হন।


আলোচিত কাজ
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে দেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী ঢাকার আজিমপুর এলাকায় অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণরত নারীদের ছবি তোলেন। ১৬ ডিসেম্বর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের (পরে শেরাটন ও রূপসী বাংলা) সামনে পাকিস্তানি সেনারা গোলাগুলি শুরু করে। খবর পেয়ে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সেখানকার ছবি তুলতে যান তিনি। প্রচ- গোলাগুলির কারণে সেদিন অবশ্য ছবি তুলতে পারেননি।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পুরস্কৃত হন। শুধু বিদেশে নয় দেশেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হন। ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড কোলন লাভ করেন। ১৯৬০ সালে ‘অল পাকিস্তান ফটো প্রতিযোগিতা’য় প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৮০ সালে সাইপ্রাসে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ ফটো প্রতিযোগিতায় সার্টিফিকেট লাভ করেন। এ ছাড়াও ইউনেস্কো অ্যাওয়ার্ড-জাপান, অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কার, বেগম পত্রিকার ৫০ বছর পূর্তি পুরস্কার, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সম্মানসূচক ফেলোসহ বিভিন্ন স্বীকৃতি পান। এ ছাড়া আলোকচিত্রে অনন্য অবদানের জন্য সরকার ২০১৯ সালে শিল্পকলা শাখায় সাইদা খানমকে একুশে পদকে ভূষিত করে।


ফটোগ্রাফির প্রথম শিক্ষক
১৯৪৯ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম প্রাইভেট স্টুডিও ‘জায়েদী স্টুডিও’, যার স্বত্বাধিকারী ছিলেন ক্যাপ্টেন এসএএইচ জায়েদী। ঢাকার সেই জায়েদী স্টুডিওতে নিজের তোলা ছবি প্রিন্ট করাতে যেতেন এক কিশোরী।
কিশোরীর ছবি তোলার ধরন দেখে চমৎকৃত হলেন জায়েদী। ভাবলেন, একে ঠিকঠাক গড়ে তুলতে পারলে দেশের স্বনামধন্য আলোকচিত্রী হয়ে উঠবে। জায়েদী সাহেব সেই কিশোরীকে ছবি তোলার নানা টেকনিক সম্বন্ধে ধারণা দিতে শুরু করলেন। দিলেন ফটো কম্পোজিশন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা। শেখালেন অ্যাপারচার এবং এক্সপোজার কীভাবে কাজ করে।
পড়তে দিলেন নিজের সংগ্রহের বিদেশি আলোকচিত্রের বইপত্র, সাময়িকী। কিন্তু একান্ন সালের দিকে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় স্টুডিওটির কার্যক্রম। সেই শিক্ষাকে পুঁজি করে বাকিটা পথচলার রসদ পান সাইদা খানম। নিজের আগ্রহ তো ছিল বটেই, জায়েদী সাহেবের অনুপ্রেরণা তাকে আমূল বদলে দেয়।


পেছনের চোখ
বাংলাদেশে যা হয়, যিনি জীবনভর অকাতরে দিয়েই গেলেন তাকে বাসা-বাড়ির আশপাশসহ দেশের অনেক লোক চেনে না। ক্রীড়াঙ্গনের তারকা, নাটক বা চলচ্চিত্র তারকা হলে ভিন্ন কথা। কথা হচ্ছে, টেলিভিশন বা সিনেমাপর্দায় যাকে দেখা যায়, সংবাদপত্রের পাতায় ঘনঘন যাদের ছবি ছাপা হয় তারাই কি সত্যিকারের তারকা? এর বাইরে অন্য কারও অস্তিত্ব নেই! সাধারণ মানুষ তারকা বলতে মূলত ‘গ্ল্যামার’কেই বোঝে; যে কারণে চারপাশের অনেক গুণী মানুষকে অবলীলায় উপেক্ষা করে চলে তারা। অফিসিয়াল (সাবেক) সিদ্ধান্ত হল, বাংলাদেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী সাইদা খানমের সাক্ষাৎকার ছাপা হবে আগামী সংখ্যায়। এখন প্রয়োজন বাসার ঠিকানা ও তার ফোন নম্বর। আশপাশের যাকেই বলি, নেই! কেউ কেউ নামও শোনেনি! অবশেষে নাসির আলী মামুন সহায়তার হাত বাড়ালেন। যোগাযোগ করে একদিন মিজান মিজানুর রহমান ও আমি এলাম সাইদা খানমের বনানীর বাসায়। সাক্ষাৎকারের শেষপ্রান্তে প্রশ্ন করলাম, ‘আপনার ঘর-সংসার নিয়ে কিছু বলুন।’

স্মিত হেসে বললেন, ‘আমি বিয়ে করিনি তো!’ এমন উত্তর শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। পরক্ষণে তিনি নিজেই খোলাসা করলেন, ‘বিয়ে করলে ছবি তোলা হত না।’ শিল্পের জন্য মানুষের অনেক ত্যাগ থাকে। যে ত্যাগের মূল্য রাষ্ট্র কিংবা সাধারণ মানুষ কেউই বোঝে না। ধূপ-ধুনোর মতো শিল্পী নিজেকে পুড়িয়েই সুগন্ধী বিলিয়ে যান।


সেই সাক্ষাৎকারের পরে সাইদা খানমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ল। তার বাসায় যিনিই যেতে চান, শর্ত হচ্ছে সেখানে গিয়ে খেতে হবে! সাইদা খানমের সহকারী ঝন্টু স্টার রেস্তোরাঁ থেকে অতিথির জন্য খাবার নিয়ে আসেন। আদর-যতেœর খামতি থাকে না কোথাও। যেন প্রিয়জন অনেক দিন পরে বেড়াতে এল! তার স্বর্ণহৃদয়ের যত কাছে গিয়েছি, মুগ্ধ হয়েছি। যতই তাকে জেনেছি, বিস্মিত বোধ করেছি। এমন মাটির মানুষটি অবশেষে চলেই গেলেন! মনে পড়ে, সর্বশেষ দেখায় তার বনানীর বাসভবনে উপহার দিলেন তার লেখা সংকলন ‘উপন্যাসত্রয়ী’। স্মিত হেসে দাবি জানালেন, ‘একটা রিভিউ লিখে দেবেন?’

পারা না-পারার দোলাচল মনে রেখেই বললাম, ‘অবশ্যই দেব’। কিন্তু জীবনযাপনে কত বগিজগি, শত ব্যস্ততা! চাইলেও অনেক কিছু করা যায় না। সেই রিভিউ লেখার আগেই তিনি চলে গেলেন ‘স্মৃতির পথ বেয়ে’। এই নামেই প্রকাশিত হয়েছে তার আত্মজীবনীমূলক বই। নিশাত জাহান রানার যুক্ত প্রকাশন থেকে। ব্যর্থতাহেতু সাইদা খানমের কাছে আমি অপরাধী হয়ে আছি। তার দেখানো পথেই নারীরা এখন ক্যামেরার পেছনে চোখ রাখছেন। আলোকচিত্রী হিসেবে পেশাগত সাফল্যের সাক্ষর রাখছে। ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকতায় ভূমিকা রাখছেন। নির্মাণ করছেন চলচ্চিত্র, নাটক, ডকুমেন্টারি। এই পথ নির্মাণের জন্য সংগ্রাম করে আসতে হয়েছে পূর্বসূরিদের। সাইদা খানমের মতো মানুষদের। তিনি পেশাজীবী নারীদের কথা ভাবতেন। স্বপ্ন দেখতেন তাদের নিয়ে। বলতেন, ‘মৌলবাদীরা যদি আমাদের নারীদের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, একদিন অনেক অগ্রগতি হবে দেশের।’ দেশ এগিয়েছে, আরও এগোবে নিশ্চয়ই; আমরাও সাইদা খানমের অবদানকে স্মরণ করব শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। সাইদা খানমের মতো রুচিস্নিগ্ধ মানুষের সঙ্গে আর দেখা হবে না, ভালোবাসার পরশ প্রাণ স্পর্শ করবে নাÑ ভাবতেই সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়।

গুণী ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে
সাইদা খানমের প্রায় ৩ হাজার ছবি প্রকাশিত হয়েছে। সব বাধা-বিঘœ অতিক্রম করে এগিয়ে গেছেন, সান্নিধ্য পেয়েছেন অনেক গুণী ব্যক্তিত্বের। ছবিও তুলেছেন অনেক গুণী ব্যক্তির। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, ইন্দিরা গান্ধী, কাজী নজরুল ইসলাম, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, রাণী এলিজাবেথ, মাদার তেরেসা, শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী, উত্তম কুমার, সত্যজিৎ রায়, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অড্রে হেপবার্ন প্রমুখের ছবি ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন।
এছাড়া চাঁদের দেশে প্রথম যারা নেমেছিলেন সেই নীল আর্মস্ট্রং, এ্যাড্রিন অলড্রিনস, মাইকেল কলিন্স-এর ছবিও তুলেছেন। দেশ-বিদেশের রাজনীতিবিদ, শিল্প ও সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনের বহু বরেণ্য স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বের ছবি তুলেছেন।

গ্রন্থতালিকা
ধুলোমাটি (১৯৬৪)
আমার চোখে
সত্যজিৎ রায় (২০০৪)
স্মৃতির পথ বেয়ে (আত্মজীবনী)
আলোকচিত্রী সাইদা খানম-এর উপন্যাসত্রয়ী (সংকলন)


মৃত্যু
সাইদা খানম ২০২০ সালের ১৮ আগস্ট রাজধানীর বনানীতে নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত খ্যাতিমান আলোকচিত্রী সাইদা খানমের বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। এই পথিকৃৎ আলোকচিত্রীর জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে একটি অধ্যায়েরও যেন সমাপ্তি ঘটে। সাইদা খানমের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশের নানা শ্রেণির মানুষ।