আলোর দিশারী লুৎফর রহমান

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০ | ১৪ কার্তিক ১৪২৭

আলোর দিশারী লুৎফর রহমান

লিটন ঘোষ জয় ২:৫৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২০

print
আলোর দিশারী লুৎফর রহমান

মোহাম্মদ লুৎফর রহমান ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, সম্পাদক, শিক্ষক, চিকিৎসক এবং সমাজকর্মী। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় রয়েছে তার অবাধ বিচরণ। বাস্তবিক সময়ের সঙ্গে ছুটে চলতে চলতে সাহিত্য ভাণ্ডারে জমা হয়েছে অজস্র সৃষ্টিশীল রচনা সম্ভার। তবে ডাক্তার মোহাম্মদ লুৎফর রহমান নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন তিনি। পরাধীন ব্রিটিশ ভারতে জন্মগ্রহণ করেও জাতির পশ্চাৎপদতা দূর করার জন্য লড়ে গেছেন। তাকে নিয়ে আজকের প্রতিবেদন তৈরি করেছেন লিটন ঘোষ জয়।

 

সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় রয়েছে তার অবাধ বিচরণ। বাস্তবিক সময়ের সঙ্গে ছুটে চলতে চলতে সাহিত্য ভাণ্ডারে জমা হয়েছে অজস্র সৃষ্টিশীল রচনা সম্ভার। যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এক অনবদ্য নিয়ামক হিসাবে কাজ করছে। তাই তো আজও পাঠক মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হচ্ছে। তার প্রতিটি রচনায় রয়েছে আলাদা রকমের আর্কষণ যা পাঠককে দিচ্ছে অনাবিল আনন্দ ও অভিজ্ঞতা। তার প্রতিটি লেখার বৈচিত্র্যময়তা এবং বাস্তবতা জানান দিয়ে যায় তিনি কতটা আদর, ভালোবাসা মায়া আর যত নিয়ে সেগুলোকে হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন। একেকটি রচনা যেন একেকটি বাস্তব জীবন্ত গল্পের প্রতিচ্ছবি।

প্রতিটি রচনায় যেন কথা বলে মানুষের সাত্ত্বিক প্রেম ভালোবাসার, জীবনের বাস্তবতার, দেশ, এই সমাজ সংস্কৃতি তথা আপামর মানুষের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে তার লেখনিতে। যার লেখায় শুরু থেকে শেষ অবধি প্রতিটি লাইনেই খুঁজে পাওয়া যায় জীবন্ত প্রাণের অস্তিত্ব।

যিনি নারী সমাজের উন্নতির জন্য নারীতীর্থ নামে একটি সেবা প্রতিষ্ঠান গঠন এবং নারীশক্তি নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। নারী সমাজের উন্নয়নের সমাজসেবার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। আর এ কারণেই পথভ্রষ্ট ও সমাজ পরিত্যক্ত নারীদের সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে নিজ আবাসস্থলেই গড়ে তোলেন নারীতীর্থ নামের সেবা প্রতিষ্ঠানটি।
এ প্রতিষ্ঠানের সভানেত্রী ছিলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এবং সম্পাদক ছিলেন তিনি নিজেই। আমাদের সমাজে যারা অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে বিত্তবান হতে চান তাদের উদ্দেশ্যে তিনি তার লেখনিতে বলেছেন, ‘চাকরি করে অন্যায়ভাবে পয়সা রোজগার করে ধনী হওয়ার লোভ রাখ? তোমার চেয়ে মুদি ভালো। মুদির পয়সা পবিত্র।’ অন্য আরেকটি বাণীতে তিনি লিখেছেন, ‘সৎ, জ্ঞানী ও মহৎ যিনি, তিনি নিজেকে ব্যক্তিত্বহীন করতে ভয়ঙ্কর লজ্জাবোধ করেন, তিনি তাতে পাপবোধ করেন।’

যিনি তার মানব জীবন প্রবন্ধে বলেছেন- ‘মানবচিত্তের তৃপ্তি অর্থ, প্রাধান্য; ক্ষমতা এবং রাজ্য লাভে নাই।
আলেকজান্ডার সমস্ত জগৎ জয় করেও শান্তি লাভ করেন নাই। মানুষ অর্থের পেছনে ছুটছে অপরিমিত অর্থ দাও তাকে, সে আরও চাইবে। তার মনে হয় আরও পেলে সুখী হবে। সমস্ত জগৎ তাকে দাও তবুও সে সুখী হবে না।
জাগতিকভাবে যারা অন্ধ, তারাই জীবনে সুখ এইভাবে খোঁজে। দরিদ্র যে, সে আমার জীবন ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে ঈর্ষা করছে, সে আমার অবস্থার দিকে কত উৎসুকনেত্রে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু আমি নিজে কত অসুখী। পরম সত্যের সন্ধান যারা পায় নাই, মানব-হৃদয়ের ধর্ম কি, তা যারা বুঝতে পারে নাই, তারাই এইভাবে জ্বলে পুড়ে মরে, এমন কি এই শ্রেণির লোক যতই মৃত্যুর পথে অগ্রসর হতে থাকে, ততই এদের জীবনের জ্বালা বাড়ে।

প্রতিহিংসাবৃত্তি, বিবাদ, অর্থ-লোভ আরও তীব্রভাবে তাদেরকে মত্ত ও মুগ্ধ করে। তখনও তারা যথার্থ কল্যাণের পথ কী, তা অনুভব করতে পারে না।’ এমন বাস্তববাদী ও যুক্তিবাদী মানুষটি আর কেউ নয়। বলছিলাম মাগুরা হাজীপুর গ্রামের চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী, মানবতাবাদী সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক ডা. মোহাম্মাদ লুৎফর রহমান এর কথা। যিনি আমরণ কাজ করে গেছেন। নারী সমাজের উন্নতির জন্য। তার লেখনির অন্যতম বিষয় ছিল মানবতা ও বাস্তবতা। সাহিত্যের এই কালজয়ী মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেই তুলে ধরছি তার বিস্তারিত।


পরিচিতি
মোহাম্মদ লুৎফর রহমান ছিলেন একজন বাঙালি সাহিত্যিক, সম্পাদক ও সমাজকর্মী। তিনি ‘ডাক্তার মোহাম্মদ লুৎফর রহমান’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি মাগুরা মহাকুমার (বর্তমান মাগুরা জেলা) পারনান্দুয়ালি গ্রামে ১৮৮৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতা শামসুন নাহার এবং পিতা সরদার মইনউদ্দিন আহমদ। লুৎফর রহমানের পিতা পেশায় একজন স্টেশন মাস্টার ছিলেন। এই দম্পতির চার পুত্র ও এক কন্যার মধ্যে মোহাম্মদ লুৎফর রহমান একজন। তার পৈত্রিক নিবাস ছিল মাগুরার হাজিপুর গ্রামে। লুৎফর রহমানের পিতা ছিলেন এফ.এ পাস। ইংরেজি ভাষা ও ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তার পিতার অনুরাগ ছিল। সম্ভবত একারণেই পিতার অনুরাগ লুৎফর রহমানের মাঝে প্রতিভাস হয়েছিল।
মোহাম্মদ লুৎফর রহমান নারী সমাজের উন্নতির জন্য নারীতীর্থ নামে একটি সেবা প্রতিষ্ঠান গঠন এবং নারীশক্তি নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন তিনি এবং একজন চিন্তাশীল ও যুক্তিবাদী প্রাবন্ধিক হিসেবে পরিচিত হয়ে ছিলেন। তার প্রবন্ধ সহজবোধ্য এবং ভাবগম্ভীর। মহান জীবনের লক্ষ্য সাহিত্যের মাধ্যমে মহান চিন্তাচেতনার প্রতি আকৃষ্ট হতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি। গভীর জীবনবোধ, মানবিক মূল্যবোধ, উচ্চ জীবন, সত্য জীবন, মানব জীবন, সূক্ষ্ম বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি তার রচনার প্রসাদগুণ। প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি কবিতা, উপন্যাস ও শিশুতোষ সাহিত্য রচনা করেছেন।

সাহিত্যকর্ম
লুৎফর রহমানের সাহিত্য সাধনা শুরু হয়েছিল মূলত কবিতা রচনার মাধ্যমে। ১৯১৫ সালে চল্লিশটি কবিতা নিয়ে তার প্রথম এবং একমাত্র কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ প্রকাশিত হয়। পরে তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছোটগল্প, কথিকা, শিশুতোষ সাহিত্য ইত্যাদি রচনা করেছেন। তার কিছু অনুবাদকর্মও পাওয়া যায়। ১৯১৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস সরলা, যেখানে তিনি একটি পথভ্রান্ত নারীর জীবনের সমস্যা এবং প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে তার জীবন সংগ্রামের বিবরণ তুলে ধরেছেন। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত হয়Ñ পথহারা এবং রায়হান নামে দুইটি উপন্যাস। আদর্শ নারীসমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ভিন্নধর্মী উপন্যাস ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রীতি উপহার। লুৎফর রহমান মুক্তবুদ্ধির অধিকারী ছিলেন যার প্রভাব তার সাহিত্যচর্চায় ফুটে উঠেছে। ১৯২০ সালে তিনি সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবার ব্রত নিয়ে কলকাতা যান। এ সময় অসহযোগ আন্দোলনের প্রাক্কালে তিনি বিভিন্ন পত্র- পত্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। নভেম্বর মাসের তৃতীয় বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা থেকে তিনি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক সম্পাদিত ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা প্রভৃতির প্রকাশ ভার গ্রহণ করেছিলেন। তৎকালীন বাংলা ভাষার বিখ্যাত পত্রিকা ও সাময়িকীগুলোতে তার রচনা সমূহ প্রকাশ হয় যা পরে একত্রে সংকলিত হয়েছে। বিশেষত সওগাত, প্রবাসী, হিতবাদি, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, মোসলেম ভারত, সাধনা, সোলতান, সহচর, সাম্যবাদী, সাহিত্যিক, মোয়াজ্জিন, মাসিক মোহাম্মদী প্রভৃতি বিভিন্ন পত্রিকায় তার রচনা প্রকাশ হত। ডা. লুৎফর রহমানের চমৎকার একটি ছোট গল্প হচ্ছে পলায়ন। গল্পের শুরুটা এমন,রোজই পুকুরের ধার দিয়া একটা আভরণহীনা যুবতী মেয়েকে যাইতে দেখিয়া হোসেন একদিন তার মাকে জিজ্ঞাসা করিল, মা, কে এই মেয়েটি?

মা বলিলেন, ওকে চেন না বাবা? ও যে নিয়ামতের মেয়ে। ওর স্বামী ওকে তালাক দিয়েছে। বালিকার নিঃসহায় অবস্থার কথা শুনিয়া হোসেন একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল। কেন এমন সুন্দরী মেয়েটিকে তাহার হতভাগা স্বামী ফেলিয়া দিয়াছে? এত সুষমার অনাদর করিয়া লক্ষ্মীছাড়া লোকটি হয়তো কোনো নতুন বালিকার সন্ধানে ছুটিয়াছে নারী তো সব জায়গায়ই এক, কেবল কল্পনাতে আমরা দুই করিয়া লই।

গল্পটি যেমন রয়েছে চিত্রকল্প, তেমনই রয়েছে চমৎকার উপমা ও সমাজের বাস্তব চিত্র। এইসব নারীর প্রতি লুৎফর রহমানের ছিল যর্থাথ সম্মান, শ্রদ্ধাবোধ ও অকৃত্রিম ভালোবাসা। এ কারণেই হয় তো তিনি! নারী সমাজের উন্নতির নারী সমাজের উন্নয়নের সমাজসেবার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন। পথভ্রষ্ট ও সমাজ পরিত্যক্ত নারীদের সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে নিজ আবাসস্থলেই গড়ে তুলেছিলেন নারীতীর্থ নামের সেবা প্রতিষ্ঠানটি। মোট কথা লুৎফর রহমান ছিলেন সমাজ পরিবর্তনের দূত। তিনি সারা জীবন চেয়েছেন, আমাদের এই জরাজীর্ণ সমাজ থেকে সব আবর্জনা ধুয়ে মুছে দিতে। তিনি চেয়েছেন, সমাজ থেকে ভেদাভেদ চিরতরে দূর করতে। তাই তো লুৎফর রহমান উন্নত জীবন প্রবন্ধে লিখেছেন, কোনো জাতিকে যদি বলা হয়, তোমরা বড় হও, তোমরা জাগো, তাতে ভালো কাজ হয় মনে হয় না। এক একটা মানুষ নিয়েই এক একটা জাতি। পল্লীর অজ্ঞাত, অবজ্ঞাত এক একটা মানুষের কথা ভাবতে হবে। মানুষকে শক্তিশালী, বড় ও উন্নত করে তোলার উপায় কী? তাকে যদি শুধু বলি, তুমি জাগো, আর কিছু না তাতে সে জাগবে না। এ উপদেশ বাণীর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত আছে। এইটে ভালো করে বোঝা চাই।

আবার বলি, কোনো জাতিকে যদি বাহির হতে বলি বরং তাতেও কাজ হবে না। মানুষকে এক একটা করেই ভাবতে হবে। মোট কথা প্রত্যেক মানুষের ভেতর জ্ঞানের জন্য একটা স্বাভাবিক ব্যাকুলতা জন্মিয়ে দেওয়া চাই। তবেই তো আমাদের দেশ তথা সমাজ হবে সত্যিকার অর্থে ভেদাভেদ, রেষারেষি মুক্ত। আর এমন একটা সমাজের স্বপ্নই দেখতেন চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী, মানবতাবাদী সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক লুৎফর রহমান।

চিন্তাধারা ও আদর্শ
লুৎফর রহমান বিশ্বাস করতেন, মানুষের শক্তির প্রধান উৎস হচ্ছে জ্ঞান এবং জীবনের সুন্দর বিশুদ্ধতম অনুভূতির নাম হচ্ছে প্রেম। উন্নত জীবন দর্শন মেনে চলতেন। লোক দেখানো এবং বংশগত সম্মানকে তিনি কখনো গ্রহণ করেননি। নামের সঙ্গে তিনি কখনো নিজ কৌলিক উপাধি জরদার ব্যবহার করতেন না। এ সম্বন্ধে উচ্চজীবন গ্রন্থের পিতৃমাতৃভক্তি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, প্রবন্ধ লেখকের বংশকে লোকে জরদার-বংশ বলে থাকেন। জরদার অর্থ স্বর্ণ অথবা ধন-সম্পত্তির মালিক। বড়লোক ছাড়া কারো এই উপাধি হয় না। নদীয়া জেলার এক ব্রাহ্মণের এ উপাধি আছে। সুতরাং এ উপাধি ব্যবহার করতে মনে গর্ব ছাড়া লজ্জা আসে না। কিন্তু বিবেকের কাছে অনুমতি চাইলে সে জিজ্ঞাসা করেছে তোমার অর্থ কই ? আর অর্থ যদিই থাকে, তবে তা লোকের কাছে প্রচার করা কী প্রকার ভদ্রতা?

কথা প্রসঙ্গে মাগুরা হাজিপুরের লুৎফর রহমান চর্চা কেন্দ্র ও ফাউন্ডেশনের সভাপতি, ইঞ্জি. সৈয়দ রেজা তরুণ জানান, লুৎফর রহমান বিশ্বাস করতেন, মানুষের শক্তির প্রধান উৎস হচ্ছে জ্ঞান এবং জীবনের সুন্দর বিশুদ্ধতম অনুভূতির নাম হচ্ছে প্রেম। উন্নত জীবন দর্শন মেনে চলতেন। আমরা তার দর্শনকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এই চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী, মানবতাবাদী সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিককে আমি মনে করি আরো বেশি করে কাজ করা উচিত। এ ব্যাপারে সরকার ও সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।

কর্মজীবন
লুৎফর রহমান প্রথমে শিক্ষক এবং পরবর্তীকালে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন। এফ.এ অধ্যয়নকালে, ১৯১৬ সালে সিরাজগঞ্জের ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলে অ্যাংলো-পারসিয়ান শিক্ষক পদে যোগ দেন তিনি। তবে সেখানে অন্যান্য বিষয়েও তিনি পাঠদান করতেন। স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এক মতান্তরের কারণে এ চাকরি ছেড়ে ১৯১৮ সালে তিনি চট্টগ্রামের জোরারগঞ্জ হাই স্কুলে একই বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯২০ সালে তিনি কলকাতায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শুরু করেন। ১৯২৫ থেকে ১৯২৬ সালের দিকে সম্ভবত অত্যধিক শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমে এবং অভাব-অনটনের কারণে তার শরীর ভেঙে পড়ে।

এক সময় যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন তিনি। তাকে নিজ গ্রাম হাজিপুর নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জনৈকা সন্নাসিনীর প্রদত্ত ওষুধে অনেকটা রোগমুক্ত হওয়ায় কবিরাজি ওষুধের গুণে মুগ্ধ হয়ে তিনি এর নামকরণ করেন যোগিনী পাচন। সুস্থ হওয়ার পর তিনি পার্শ্ববর্তী মির্জাপুর গ্রামে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা আরম্ভ করেন। এসময় তিনি কয়েকটি পেটেন্ট ওষুধ বিক্রয়ের বন্দোবস্ত করেন। এগুলোর মধ্যে যোগিনী পাচন, আনন্দ বটিকা, জ্বরবিজয়ী বটিকা, নয়ন শান্তি, মুখারি, ক্ষত-শান্তি উল্লেখযোগ্য। সে সময়ে তিনি চিকিৎসক হিসেবে সুনাম অর্জন করতে শুরু করেলেও স্থানীয় অন্য চিকিৎসকের ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি মির্জাপুর ছেড়ে চলে যান। পরবর্তীকালে মাগুরার স্টিমারঘাট সংলগ্ন পারনান্দুয়ালি গ্রামের একটি বাড়িতে ডাক্তারখানা খুলেছিলেন। ১৯৩১ সালে তিনি আবার নিজ গ্রাম হাজিপুরে ফিরে আসেন এবং সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন।

ব্যক্তিগত জীবন
এফ.এ অধ্যয়নকালীন সময়ে লুৎফর রহমান তার নিজ গ্রাম হাজিপুরের ‘আয়শা খাতুন’ নামে এক মহিলার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। আয়শা খাতুনের পিতা মোহাম্মদ বদরউদ্দীন মুন্সীগঞ্জ রেলওয়ের বুকিং ক্লার্ক ছিলেন। অন্যদিকে লুৎফর রহমানের পিতা এই বিবাহে অমত থাকায় তাকে ঘর ছাড়তে হয়েছিল।

শিক্ষা
লুৎফর রহমানের শিক্ষা জীবন শুরু হয় মাগুরা সদরের হাজিপুরের নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি মাগুরা শহরের মাগুরা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে (বর্তমান মাগুরা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়) ভর্তি হন এবং ১৯১৫ সালে প্রবেশিকা পাস করেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় যান, হুগলী মহসিন কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হন। কলকাতায় টেলর হোস্টেলে থাকাকালীন অবস্থায় তিনি সাহিত্যচর্চায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ কমতে থাকে এবং এফ.এ পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেন নি। পরবর্তীকালে ১৯২১ সালে কৃষ্ণনগর হোমিওপ্যাথিক কলেজ থেকে এইচএম-বি ডিগ্রি লাভ করেন।

কিছু বাণী
‘কোন সভ্য জাতিকে অসভ্য করার ইচ্ছা যদি তোমার থাকে, তাহলে তাদের বইগুলো ধ্বংস কর, সকল পন্ডিতকে হত্যা কর, তোমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।’
‘মানুষ যতই ছোট হোক, যতই সে অবজ্ঞাত হয়ে থাকুক, তার মাঝে অসীম ক্ষমতা...’
‘জাতি যখন দৃষ্টিসম্পন্ন ও জ্ঞানী হয়, তখন জাগার জন্য সে কারো আহবানের অপেক্ষা করে না। কারণ, জাগরণই তার স্বভাব।’
‘তুমি তোমার ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় করে তোল। কেউ তোমার ওপর অন্যায় আধিপত্য করতে পারবে না।’
‘যে সমাজে সাহিত্যের আদর নাই, তাহা সাধারণত বর্বর সমাজ।’
‘কোনো জাতি সাহিত্যকে অস্বীকার বা অবহেলার চোখে দেখে উন্নত হতে চেষ্টা করলে সে জাতি আদৌ উন্নত হবে না।’
‘তোমার ভেতরে যে শক্তি আছে, সেই শক্তির চর্চা কর, তুমি মহামানুষ হতে পারবে।’
‘তুমি মানুষ, তোমার ভেতরে আত্মা আছে, ইহাই যথেষ্ট। বিশ্বাস কর, তুমি ছোট নও।’

চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী, মানবতাবাদী সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক লুৎফর রহমানের অকালেই নিভে যায় জীবন প্রদীপ। তিনি চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হোন, যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মানবতাবাদী এই সাহিত্যিকের ১৯৩৬ সালের ৩১ মার্চ মাত্র ৪৭ বছর বয়সে বিনা চিকিৎসায় নিজ গ্রাম মাগুরার হাজিপুরে মৃত্যুবরণ করেন। মহান এই মানবতাবাদী সাহিত্যিকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও অশেষ ভালোবাসা।

তার গ্রন্থতালিকা : প্রবন্ধ উচ্চ জীবন (১৯১৯), মহৎ জীবন (১৯২৬), উন্নত জীবন (১৯২৭), মানবজীবন (১৯২৭), সত্য জীবন (১৯৪০), ধর্ম জীবন (১৯৭১), মহাজীবন (১৯৭৫), যুবক জীবন (১৯৮৫)। উপন্যাস, সরলা (১৯১৮), পথহারা (১৯১৯), রায়হান (১৯১৯), প্রীতি-উপহার (১৯২৭)। ছোটগল্প, বাসর-উপহার (১৯৩৬), পলায়ন, রানী, অহিংসা, রাজপথ, অমাবস্যা, রোমান্টিক বিষয়ে, ফিরে যাও-ফিরে যাও। শিশুতোষ, ছেলেদের মহত্ব কথা (১৯২৮), ছেলেদের কারবালা (১৯৩১), রানী হেলেন (১৯৩৪)। অনুবাদ, মঙ্গল ভবিষ্যৎ, দুঃখের রাত্রি (ভিক্টোর হুগোর লা মিজারেবল এর অনুবাদ), মুসলমান।

 

তথ্যসূত্র:
ডা. কাজী তাসুকুজ্জামান, গবেষক (মাগুরা ইতিহাস ঐতিহ্য গবেষণা কেন্দ্র, মাগুরা)।
কবি, বি এম এ হালিম, কবি, বিবেকানন্দ মজুমদার, মাগুরা।
শামীম খান, কবি ও সাংবাদিক (সাধারণ সম্পাদক, মাগুরা প্রেসক্লাব)
বাংলাপিডিয়া (বাংলা ভাষায়)। ঢাকা : এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ, মে ১৩, ২০১৬
কাজী শওকত শাহী (‘যশোরের যশস্বী, শিল্পী ও সাহিত্যিক’)।