বনগ্রামের কোঁচ সম্প্রদায়

ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০ | ১১ কার্তিক ১৪২৭

বনগ্রামের কোঁচ সম্প্রদায়

সাইফ-উদ-দৌলা রুমী ১২:০৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০২০

print
বনগ্রামের কোঁচ সম্প্রদায়

ভারতের কোচবিহার থেকে বাংলাদেশে আগমন কোচ সম্প্রদায়ের। ভাওয়াল রাজার হাত ধরে এ দেশে আসলেও কোচরা বসবাস শুরু করেন টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও গাজীপুর জেলায়। গাজীপুরের শালবনে বসবাস করা কোঁচ সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন তানজেরুল ইসলাম। সম্পাদনা করেছেন সাইফ-উদ-দৌলা রুমী

গাজীপুরে কোঁচদের আগমন

জনশ্রুতিতে আছে, ভাওয়াল রাজা একবার বোকা মানুষ দেখার ইচ্ছা পোষণ করেন। তার ইচ্ছা পূরণে অনুগতরা অনেক খোঁজাখুঁজির পর বিহার থেকে কোঁচদের নিয়ে আসেন। পরে খাজনার শর্তে কোঁচদের জমি দান করেন ভাওয়াল রাজা। কিন্তু বোকা কোঁচরা অনেকেই বুঝতে পারেন না নিজেরা চাষ করে রাজাকে কেন খাজনা দিতে হবে। এ কারণে রাজাকে খাজনা দিতে রাজি হননি কোঁচ সম্প্রদায়ের অনেকেই। পরে তারা রাজার দেওয়া জমি ছেড়ে গাজীপুর জঙ্গলে বসতি গড়ে তোলে।

এর কিছুদিন পর কোঁচরা জঙ্গল ধ্বংস করছে এমন সংবাদ পেয়ে রাজার নির্দেশে কোঁচদের ধরে আনা হয়। কোঁচরা রাজার কাছে বনে বসবাসের কথা স্বীকার করলে তাদের একজনকে রাজা ফাঁসির আদেশ দেন। পরে রাজা অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে আটক ব্যক্তি সেই স্থানেই দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন।

এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে ধৃত কোঁচরা দ-প্রাপ্ত ব্যক্তির দ্রুত ফাঁসি কার্যকরের দাবি জানিয়ে রাজাকে বলেন, ‘রাজা ওকে দ্রুত ফাঁসি দিয়ে দিন, গরুগুলো বন থেকে গোয়ালে নিতে হবে।’ কোঁচদের এমন আজব দাবি এবং বোকামি দেখে ফাঁসির দ-প্রাপ্তকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন ভাওয়াল রাজা।

এরপর থেকেই গাজীপুর মহানগরীর ২৩ নম্বর ওয়ার্ডস্থ শালবনে কোঁচ সম্প্রদায় বসতি গড়ে তোলে। ওই এলাকাটি প্রথমে কুইচামারা এবং পরে বনগ্রাম নামে পরিচিতি পায়। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কোঁচ সম্প্রদায়ের সঙ্গে গাজীপুরের কোঁচ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় রীতিনীতির ক্ষেত্রে কিছু অমিল থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

মূলত কোচ সম্প্রদায় আটটি দলে বিভক্ত। দলগুলো হলো ওয়ানাং, হরিগাইয়া, সাতপাড়ি, দশগাইয়া, চাপ্রা, তিনথেকিয়া, শংকর ও মারগান। এ দলগুলো আবার অনেক গোত্রে বিভক্ত। কোঁচরা গোত্রকে বলে নিকিনি। কোঁচ সম্প্রদায়ের নিজ গোত্রের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া নিষিদ্ধ।

কোঁচ সম্প্রদায়ের প্রবীণদের মতে, সম্প্রদায়টি এক সময় উচ্চবংশীয় ক্ষত্রিয় ছিল। রাজা পরশুরামের সময় চীন থেকে একটি সম্পদশালী সম্প্রদায় ভারতে বসতি গড়ে তোলে। ওই সম্প্রদায় নিজেদের ক্ষত্রিয় বলে দাবি করলে রাজা পরশুরামের সঙ্গে ক্ষত্রিয়দের বিরোধ শুরু হয়। ক্ষিপ্ত রাজা পরশুরাম ক্ষত্রিয় নিধনের পরিকল্পনা করেন। পরবর্তীতে পরিকল্পনা মতে রাজা তার সৈন্যবাহিনী দিয়ে ক্ষত্রিয়দের হত্যা শুরু করেন। তবে এ হত্যাকা-ের সময় ক্ষত্রিয় এক গর্ভবতী নারী ও তার বোনকে ছেড়ে দেয় সৈন্যরা।

পরে ওই দুই নারী বিহারের ঋষি বিশ্বামিত্রার স্বরণাপন্ন হলে তিনি তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেন। প্রাণ বাঁচাতে ওই দুই নারী নিজেদের ক্ষত্রিয় পরিচয় না দিয়ে জঙ্গলে আদিবাসী পরিচয়ে বসবাস করতে থাকে। পরবর্তীতে ক্ষত্রিয় থেকে কোঁচ সম্প্রদায় বলে পরিচিত পায় তারা। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস শুরু করে।


ধর্মীয় রীতি, বিশ্বাস ও খাবার

দেশের কিছু অঞ্চলে কোঁচ সম্প্রদায়ের আদি ধর্মের প্রধান দেবদেবী হলেন ঋষি এবং তার পতœী যোগমায়া। সম্প্রদায়টির এ মতাদর্শের লোকজন ওই দুজনকে সৃষ্টিকর্তা এবং পালনকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করে আসছেন। দেউসী ও আজেং নামে অভিহিত পুরোহিতগণ ঋষিপূজা এবং গোত্রপূজাগুলো পালনের দায়িত্বে থাকেন। তবে গাজীপুরে কোঁচ সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজা। এ ছাড়া তারা কালী পূজা, লক্ষ্মী পূজা ও স্বরসতী পূজা পালন করে থাকেন। পূজার দায়িত্বে থাকেন পুরোহিত। বর্তমানে দারিদ্রতার কারণে গাজীপুরে কোঁচ সম্প্রদায়ের পূজা উৎসবের জৌলুস অতীত স্মৃতি হয়ে রয়েছে।

কোচদের বিশ্বাস জঙ্গলে বসবাসকালে বোদাইবুচি’ বা বুড়াবুড়ি তাদের রক্ষা করে থাকেন। এ কারণে প্রতি বছরে একবার কোঁচরা আনুষ্ঠানিকভাবে বোদাইবুচি পূজার আয়োজন করে থাকেন। এ পূজা গ্রাম পূজা, গোসাই পূজা, বনোদুর্গা পূজা নামেও পরিচিত। বোদাইবুচি পূজায় সবকিছুই কাঁচা খাওয়ার নিয়ম। এ পূজায় বিশেষ খাবারের নাম লেবা।

কাঁচা মাছ চালের গুড়ার সঙ্গে মিশিয়ে তাতে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ ও আদা দিয়ে তেল ছাড়া রান্না করা করা হয় লেবা। পূজার শুরুতেই দুটি মুরগি জবাই করে কাঁচা রক্ত মাটির টিবির চারিদিকে ছিটিয়ে মন্ত্র পড়া হয়। মূলত, বুড়াবুড়িকে এই রক্ত উৎসর্গ করা হয়। পূজা শুরুর আগে কোঁচরা মাটির বেদি বানিয়ে মাটির দিয়ে একটি কচ্ছপ তৈরি করে। মাটির টিবির উপর কুটিশ্বর গাছের ডাল চেছে চটি বানিয়ে বাম ও ডানদিকে মোট সাতটি কাঠি বসানো হয়। বাম দিকে থাকে বুড়া এবং ডানদিকে থাকে বুড়ির প্রতীমা। পূজায় আগুনে পুড়িয়ে বড় পিঠা তৈরি করা হয়।

কোঁচদের ভাষায় এ পিঠার নাম পুসরা পিত্তা। এ ছাড়া পূজার আগে গ্রামের মান্যগণ্যদের কাছ থেকে আতপ চাল দান হিসেবে নিয়ে তৈরি করা হয় মদ। পূজার রান্নায় অংশগ্রহণকারীরা সারাদিন উপবাস করে রান্না শেষে দেবতাকে উৎসর্গ করে উপবাস ভাঙে। পূজার রান্না হওয়া বাড়িতে রান্না শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেয়া হয় না। বোদাইবুচি পূজায় কোঁচ সম্প্রদায় ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ অংশ নিয়ে উৎসবের আমেজ বাড়িয়ে তোলে।

কোচদের প্রধান খাদ্য ভাত। কোঁচদের মধ্যে আমিষভোজী আছেন। কোঁচরা শাকসবজি, ডাল, মাছ ও মাংস আহার হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। কোঁচরা গোমাংস খায় না। শুকরের মাংস কোঁচদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। এ ছাড়া পাখি, সজারু, কচ্ছপ, খরগোশ, কুইচা কোঁচদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে।


সমাজে নিগৃহীত

দেশের সর্ববৃহৎ সিটি করপোরশেন গাজীপুর। শিল্প অধ্যুষিত এই নগরীর উত্তরের এক প্রান্তে অজপাড়া গাঁয়ের নাম বনগ্রাম। আধুনিকতার ছাপবিহীন গ্রামটি উন্নয়ন বঞ্চিত। নূত্যতম নাগরিক সেবা জোটেনি বনগ্রামের শতাধিক পরিবারের। কোঁচদের মতে, তাদের আধুনিক সভ্যতা থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। এ কারণে তারা সমাজে নিগৃহীত। বিগত দিনে স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচনের পূর্বে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি শেষে হাজারো অঙ্গীকার বনগ্রামের ঝোপঝাড়ে মিলিয়ে গেছে।

বনগ্রাম থেকে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর দূরত্ব অন্তত দশ কিলোমিটার। কারখানাগুলোতে বনগ্রামের অধিবাসীরা চাকরি নিতে গেলে এলাকার নাম শুনেই আপত্তি করার অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এ কারণে কোঁচ সম্প্রদায়ের অনেকেই দিনমজুরের পথ বেছে নিয়েছেন। তবে কেউ কেউ দূর-দূরান্তের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রুজি রুটির ব্যবস্থা করেছেন। পরিবার ছেড়ে তারা বসবাস করছেন কর্মস্থলের কাছেই।

গত এক দশকে তাদের অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা অবহেলার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বিভিন্ন সময় বনগ্রামে উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে অপ্রতুল বাজেটের কারণে সেই উন্নয়ন নামমাত্র উন্নয়নে রূপ নিয়েছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পোড়াবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে আট কিলোমিটার দূরে হাতিয়াব গ্রাম হয়ে বনগ্রাম প্রবেশের একমাত্র সড়ক। গ্রামে প্রবেশের একমাত্র সেই সড়কটির হাতিয়াব প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বনগ্রাম পর্যন্ত চার কিলোমিটার বেহাল অবস্থা। গাড়ি চলাচল তো দূরের কথা সড়ক পথে পায়ে হেঁটে চলাচল করাও দুষ্কর।

বনগ্রামের শতাধিক কোঁচ সম্প্রদায়ের পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের জন্য নেই কমিউনিটি ক্লিনিক। অথচ পার্শ্ববর্তী চার কিলোমিটার দূরের গ্রাম হাতিয়াবতে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক। অর্ধশত বছরেও সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীদের পায়ের ছাপ পড়েনি গ্রামটিতে। বনগ্রামে শতাধিক শিশু থাকলেও ওই এলাকায় পোলিও কিংবা ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়নি কখনও।

বনগ্রামের একমাত্র মন্দিরটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সরকারি কিংবা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মন্দিরটি সংস্কার কাজে এগিয়ে আসেনি কেউ।

অভাবের তাড়নায় বিগত দিনে কোঁচ সম্প্রদায়ের কেউ কেউ খ্রিস্টান ধর্ম বেছে নিয়েছেন। তারা নিজ গ্রাম, নিজ সম্প্রদায় ছেড়ে অন্য এলাকায় বসতি গড়ে তুলেছেন।


বাসস্থান, বিয়ে ও পোশাক

মাটির ঘরে থাকে কোঁচরা। ঘরের ছাউনিতে ঢেউটিন। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মাটির ঘরের মতো সাদামাটা কোঁচদের ঘরবাড়ি। ঘর সাজুনিতে অনেকটাই সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় গারোদের ঘরের সঙ্গে। এক সময় কোঁচ সম্প্রদায়ের পুরুষরা লেংটি পড়তো। তবে গাজীপুরে কালের বিবর্তনে আধুনিকিকায়নে কোঁচ সম্প্রদায় থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে পুরুষদের লেংটি পরিধানের পারিবারিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য। পরবর্তীতে তারা পোশাক হিসেবে বেছে নেয় ধুতি, শাল এবং পাগড়ি।

কোঁচ সম্প্রদায়ে একসময় পুকফুতি জুতার প্রচলন ছিল। নারীদের পোশাক ছিল, এক খ- কাপড় কোমরে জড়িয়ে পিঠ হয়ে সামনের দিকদিয়ে আবার কোমরে গিয়ে শেষ হওয়া তাতের কাপড়।

তবে গাজীপুরে কোঁচ সম্প্রদায়ের নারীরা এখন সালোয়ার কামিজ এবং শাড়ি পরিধানে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। নববর্ষে কোঁচ সম্প্রদায় বিহু উৎসব এবং বৈশাখিতে বাস্তু পূজার আয়োজন করে থাকে। তবে দারিদ্রতার কারণে কোঁচ সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ বা বিহু উৎসব বর্তমানে সংকুচিত হয়ে এসেছে। কোচ সম্প্রদায় পিতৃপ্রধান।

সম্প্রদায়টির এক পুরুষের একাধিক বিয়ের ঘটনা বিরল।

কোঁচ সম্প্রদায়ের মেয়েরা বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে অবস্থান করে। বিয়ের পর মেয়েরা পিতার বাড়ির সম্পত্তির অংশীদার হতে পারে না।

কোঁচ সম্প্রদায়ে নবজাতক শিশুর নাম সাধারণত মায়ের নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা হয়। সম্প্রদায়টির বিবাহিত নারীরা সিঁথিতে সিঁদুর ব্যবহার করে থাকেন।

 

কোঁচদের নিয়ে নাগরিক ভাবনা

বহু বছর ধরেই কোঁচ সম্প্রদায়ের লোকজন ভাওয়াল বনে বসবাস করে আসছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের বনগ্রাম, হাতিয়াব, কুমারকাদা এবং সালনা এলাকায় এ সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর বসবাস। ভাওয়াল রাজার আমল থেকে বনে এ সম্প্রদায়ের বসবাস। কোঁচদের অতীত ইতিহাস এবং ঐতিহ্যর সঙ্গে মিশে আছে বন এবং বন্যপ্রাণী। তবে বন ও বনপ্রাণী রক্ষায় সরকারের বহুমুখি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কারণে সঙ্কুচিত হয়েছে পড়েছে কোঁচদের অবাধ বিচরণের সীমানা।

বন বিভাগের জাতীয় উদ্যান রেঞ্জের পার্ক বিটের অধীন বনগ্রাম। গ্রামটি কোর জোনে অবস্থিত। ফলে বনগ্রামে গাছ কর্তন, শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, ঘরবাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব নয়। একই চিত্র পার্শ্ববর্তী গ্রাম হাতিয়াবতে। ওই এলাকাতেও কোঁচ সম্প্রদায়ের অর্ধ শতাধিক পরিবার বনে বসতী গড়ে তুলেছে। ঢাকা বন বিভাগের সালনা বিটের অধীন বিস্তীর্ণ বনভূমি রয়েছে হাতিয়াব গ্রামে।

জেলার সচেতন মহল এবং পরিবেশবিদদের মতে, গাজীপুরের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যর অন্যতম সাক্ষী কোঁচ সম্প্রদায় টিকিয়ে রাখতে, সমাজে সাবলম্বী করতে হলে সরকারি বহুমুখি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন জরুরি। বিশেষ করে বন এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় কথিত ‘বনবাসী’ তকমা থেকে কোঁচদের মুক্তি দিয়ে তাদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় ভিন্ন এলাকায় বাসস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি।

এর পাশাপাশি তাদের স্বাবলম্বি করতে কৃষি এবং গাবাদি পশু পালনে সহায়তা করাও জরুরি। সুশীল সমাজের মতে, বনগ্রাম এবং হাতিয়াব থেকে বিভিন্ন গার্মেন্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দূরত্ব অন্তত ৮-১০ কিলোমিটার। এতে ওই দুই গ্রামের অগণিত নারী বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বনাঞ্চলে বসবাসরত কোঁচ সম্প্রদায়ের ভাগ্যোন্নয়ন করা দুরূহ বলে মনে করছে সুশীল সমাজ।


অপরাধী বানানোর অপচেষ্টা

গাজীপুরে কোঁচ সম্প্রদায়ের লোকজনদের অপরাধী বানানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বহু বছর ধরেই। অপরাধ না করেও মামলার আসামি হওয়ায় অভিযোগ অগণিত। বনে বসবাস করায় বনে সংগঠিত অধিকাংশ অপরাধের সঙ্গে কোঁচ সম্প্রদায়ের লোকজনদের জড়ানোর অভিযোগও দীর্ঘদিনের। যদিও অভাব অনটনে অতীতে কোঁচ সম্প্রদায়ের কয়েকজন দেশীয় মদ তৈরি ও বিক্রি ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল।

তবে এ অবৈধ কর্মকা- বন্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে খোদ কোঁচ সম্প্রদায়ের সচেতন মহল।পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি গ্রামবাসীদের নিয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সহযোগিতায় বনগ্রাম মাদকমুক্ত করা হয়। তবে তাদের জীবনমান উন্নয়নে কেউ এগিয়ে আসেনি।

যদিও মহামারী করোনায় গাজীপুরে লকডাউন চলাকালীন সময়ে বনগ্রামের কোঁচ সম্প্রদায়কে দুই দফায় ত্রাণ সহযোগিতা করেছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ। ত্রাণ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন গাজীপুর সিটি করপোরেশন ২৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর।

বিগত দিনে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে বনগ্রামের চারজনকে চারটি রিকশা, চারটি সেলাই মেশিন এবং একজনকে একটি দোকান তৈরি করে দেওয়া হয়। এর বাইরে তাদের ভাগ্যোন্নয়নে কেউ এগিয়ে আসেনি।

 

পেশা ও ভাষা

বনগ্রামে শতাধিক পরিবারের মধ্যে অধিকাংশই কোঁচ সম্প্রদায়ের। গ্রামটির জনসংখ্যা প্রায় ৪৫০। গ্রামে শিশু সংখ্যা শতাধিক। অর্ধশত বছর পূর্বেও কোঁচ সম্প্রদায়ের শিকারিরা জীবন ও জীবিকার তাগিদে বন জঙ্গল থেকে বিভিন্ন ধরনের বন্য পশুপাখি, কচ্ছপ, কুইচা শিকার করে বাজারে বিক্রি করতেন।

এর পাশাপাশি জমি বর্গা নিয়ে কৃষিকাজে নিয়জিত ছিলেন অনেকেই। তবে বন্যপ্রাণী রক্ষায় আইন প্রণয়নের পর থেকে কোঁচ সম্প্রদায়ের শিকারি খেতাব অতীত ইতিহাস হয়ে রয়েছে।

বর্তমানে এ সম্প্রদায়ের অনেক নারী ও পুরুষ দিনমজুর হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বনগ্রামের মাত্র দুজন সরকারি চাকরিজীবী। কিছু সংখ্যক মানুষ নিয়োজিত আছেন প্রায় ১০-১৫ কিলোমিটার দূরের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে। কোচদের নিজস্ব ভাষার নাম ‘থার’। তবে এ ভাষার কোনো বর্ণমালা নেই। অতীতে শিশুরা মা-বাবার মুখ থেকে থার ভাষা শিখে নিত।

গাজীপুরে কোঁচ সম্প্রদায়ের লোকজন সাধারণত বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকে। বাঙালি শিক্ষার্থীর সঙ্গে একই স্কুলে কোঁচ সম্প্রদায়ের শিশুরা বাংলা ভাষায় অধ্যায়ন করছে। বর্তমানে থার ভাষা চর্চায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে কোঁচ সম্প্রদায়ের শিশু কিশোররা। কোঁচ সম্প্রদায়ের প্রবীণদের মতে, বহু বছর আগে তাদের ভাষা ছিল থারগেরোফা মিথিলা।