নান্দাইলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘বঙ্গবাণী’

ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৩ আশ্বিন ১৪২৭

হাতে লেখা পত্রিকার ভেতর-বাহির

নান্দাইলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘বঙ্গবাণী’

এম. ইদ্রিছ আলী ১:২২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৫, ২০২০

print
নান্দাইলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘বঙ্গবাণী’

বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষে তথ্যপ্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটেছে অনেক আগেই। অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে এসে প্রযুক্তির সুতার বাঁধনে পৃথিবী পরিণত হয়েছে ভিন্ন এক গ্রামে। তথ্য এখন হাতের নাগালে। আর এর পেছনে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মিডিয়ার আদি রূপ হচ্ছে সংবাদপত্র। এর শুরুটা ছিল হাতে লিখে। প্রযুক্তির উন্নয়ন ধারাবাহিকতায় হাতের লেখা থেকে কাঠের অক্ষর, সীসার অক্ষর সাজানো, লেটার প্রিন্টার, অফসেট নানা ধাপ পেরিয়ে কম্পিউটার, ইন্টারনেটের এ যুগে এসে অনলাইন ভার্সনসহ নানাভাবে বহুদূর এগিয়েছে সংবাদপত্র। পত্রিকার প্রিন্ট ভার্সনের টিকে থাকা না থাকার বিষয় নিয়ে যখন চিন্তার ভাঁজ পড়ার অবস্থা সেই একবিংশ শতাব্দীতে এসে হাতে লিখে সংবাদপত্র প্রকাশ করা নিশ্চয়ই বড় এক আশ্চর্যেরই বিষয়। দুই শতাব্দীর যুগসন্ধিক্ষণে সেই আশ্চর্যের কাজটি নির্বিঘ্নে করতেন ময়মনসিংহের একজন সম্পাদক আফেন্দি নুরুল ইসলাম।

পেশায় কলেজ শিক্ষক আফেন্দি নুরুল ইসলামের বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইল ইউজেলার শেরপুর গ্রামে। শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখি ও নানামুখী সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে ব্যতিক্রমী ধারায় সক্রিয় এই শিক্ষক এলাকায় আফেন্দি স্যার হিসেবে খ্যাত। তার নিজ হাতে লিখে প্রকাশিত পত্রিকার নাম ‘বঙ্গবাণী’। সম্পাদক, প্রকাশক এবং অধিকাংশ আর্টিকেলের লেখক তিনি নিজেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে আফেন্দি নুরুল ইসলাম কর্মজীবন শুরু করেন নিজ এলাকায় ময়মনসিংহের নান্দাইল শহীদ স্মৃতি আদর্শ কলেজের শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। লেখালেখির অভ্যাস তার অনেক আগে থেকেই ছিল। তার দুটি গল্প, দুটি কাব্য ও একটি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশের অপেক্ষায় পাণ্ডুলিপিও রয়েছে বেশ কয়েকটি।

গ্রামে থেকে শিক্ষকতার পাশাপাশি অবহেলিত এলাকার বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন কর্মকা-ে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার পাশাপাশি সমাজকে এগিয়ে নিতে নানামুখী কর্মকা- পরিচালনা করেন। নানা বিষয়ে জাতীয় পত্রিকায় লেখা পাঠাতেন। সেগুলোর কোনোটি ছাপা হত আবার কোনোটি হত না। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যেত তিনি যা লিখছেন আর যা ছাপা হচ্ছে তার মধ্যে থেকে যাচ্ছে সামঞ্জস্যহীনতা। নিজের চিন্তা ফুটিয়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে ভাবলেন, নিজেই একটি পত্রিকা বের করবেন। কিন্তু প্রযুক্তির সুযোগ না থাকা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তার সম্ভব হচ্ছিল না। সিদ্ধান্ত নিলেন হাতে লিখেই পত্রিকা করবেন। নাম স্থির করলেন ‘বঙ্গবাণী’।

ভাবনামতো তিনি গ্রামের মানুষের দুঃখ, দুর্দশা, সমস্যা, সংকট ও নানা অনাচারের প্রতিবাদ জানানোর মাধ্যম হিসেবে হাতে লিখে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকা বের করতে শুরু করলেন। সময়টা ছিল ১৯৮৫ সাল। গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, নানা বাণীর সঙ্গে সেই বঙ্গবাণীর বুকজুড়ে থাকতো স্থানীয় বিভিন্ন খবর। সামাজিক নানা অসঙ্গতি তুলে ধরতেন। হাতে লিখে কার্বন কাগজ দিয়ে কপি পত্রিকা বের করে বিভিন্ন স্থানে বিতরণ করতেন।

পরে এক সময় হাতে লেখা পত্রিকায় ফটোকপি করেও বিলি করা শুরু করলেন। এভাবেই মনের অব্যক্ত কথা প্রকাশে অকুণ্ঠ সাহসী হয়ে ওঠে বঙ্গবাণী। এর প্রকাশনা বিশ শতকের শেষ প্রান্ত থেকে একুশ শতকের শূন্য দশক পর্যন্ত চলে। সর্বশেষ তিনি ২০১০ সালেও বঙ্গবাণী বের করেন এবং সেই আগের মতোই হাতে লিখে। ২০১০ সালের পঁচিশ মার্চের সংখ্যার পর বঙ্গবাণী আর প্রকাশিত হয়নি।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক আফেন্দি নুরুল ইসলাম বলেন, যখন বঙ্গবাণী বের করা হয় তখন একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে সমকালীন প্রয়োজনীয়তার পরিপ্রেক্ষিতেই করা হয়েছিল। প্রযুক্তির বিস্তার এখানেও ঘটে গেছে। কাজেই এখন হাতে লিখে পত্রিকা প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা এখানে আর নেই। তাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া এখন বয়স হয়েছে।

চাকরি থেকে অবসরে এসেছি। শরীরের অবস্থাও খুব একটা ভালো না। কাজেই নানা কিছু বিবেচনায় এখন আর হাতে লেখা পত্রিকা করা হয় না। তবে লেখালেখিটা চলমান রয়েছে।

বঙ্গবাণীর সম্পাদক মনে করেন, সময়ের সঙ্গে তাল রেখে পত্রিকার ভার্সন পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা কখনও ফুরোবে না। সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যম না থাকলে রাষ্ট্র বর্বর হয়ে যায়। সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যম দুটিকেই পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দিতে ব্যর্থ হলে সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি পৃথিবী সঠিকভাবে এগোতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরও মনে করেন, দেশের যেকোনো জায়গা থেকেই যেকোনো সময়ে প্রকাশিত হওয়া হাতে লেখা পত্রিকার ইতিহাস সংগ্রহ করা দরকার। কে, কী কারণে এসব হাতে লেখা পত্রিকা বের করতেন তারও সবিস্তার ইতিহাস লিপিবদ্ধ হওয়া দরকার। স্থানীয় সাংবাদিক ও গীতিকবি শামসুজ্জামান বাবুল বলেন, হাতে লিখে একটি পত্রিকা বের করা নিশ্চয়ই খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। অধ্যাপক আফেন্দি নুরুল ইসলাম এই নান্দাইল থেকে হাতে লিখে পত্রিকাটি বের করতেন। তা এলাকায় সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে। তিনি মূলত আজীবন প্রতিবাদী এবং অহিংস একজন মানুষ।

তার অবস্থান থেকেই বঙ্গবাণীতে চমৎকার প্রবন্ধ লিখতেন। যেগুলো পড়ার জন্য বঙ্গবাণী একজনের হাত হয়ে আরেকজনের হাতে ঘুরে বেড়াত।

সম্পাদক আফেন্দি নুরুল ইসলাম, তার সময়ের চারপাশের সমাজচিত্র তুলে ধরে জীবনকাহিনি লিখছেন। সেই সঙ্গে তার সময়ে সময়ে অনেক লেখা জড়ো হয়ে আছে। এসব পুস্তক আকারে প্রকাশের জন্য খোলা কাগজের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করেন।