হাতে লেখা পত্রিকার ইতিবৃত্ত

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

হাতে লেখা পত্রিকার ভেতর-বাহির

হাতে লেখা পত্রিকার ইতিবৃত্ত

খন্দকার মাহমুদুল হাসান ১:১৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৫, ২০২০

print
হাতে লেখা পত্রিকার ইতিবৃত্ত

পৃথিবীর প্রথম পত্রিকা বা প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল ছাপাখানা আবিষ্কারেরও ঢের আগে। তাই প্রথম দিককার পত্রিকাগুলো যে হাতে লিখেই প্রকাশিত হত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ধাতু বা পাথরে খোদাই করা রোমান সম্রাটদের ঘোষণাপত্রগুলোকে বিবেচনায় নিলে সংবাদপত্রের সেসব নিদর্শন আজ বিশ্বসভ্যতার সম্পদ। অবশ্য সেগুলোতে সংবাদ থাকলেও আজকের দিনের মতো সংবাদপত্র সেগুলো ছিল না। এখনকার সংবাদপত্রের পূর্বসূরি হিসেবে বরং খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকের চীন দেশীয় দৈনিক কাইয়ুয়ান ঝা বাও-এর কথা বলা যায়। বলাই বাহুল্য, এটিও ছিল হাতে লেখা পত্রিকা। বাবর ও আকবরের মতো সম্রাটদের আমলে রাজকীয় সংবাদপত্র ছিল বলে জানা যায়। তারা সেসবে প্রকাশিত সংবাদকে গুরুত্বও দিতেন। দিল্লি থেকে প্রকাশিত ফারসি সংবাদপত্র ‘পয়গামে হিন্দ’-এ সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুসংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। (সূত্র : দূর্গাচন্দ্র সান্যাল, বাঙ্গালার সামাজিক ইতিহাস, মডেল পাবলিশিং হাউস)। এই সবই মধ্যযুগের হাতে লেখা পত্রিকার উদাহরণ।

তাছাড়া দেয়াল পত্রিকার কথা তো আমরা জানি। এই দেয়াল পত্রিকা কিন্তু হাতে লেখা পত্রিকার একটি আদর্শ উদাহরণ। অতীতের হাতে লেখা পত্রিকার ঘ্রাণই যেন আমরা পাই দেয়াল পত্রিকায়। আমরা যারা ষাটের দশকে বিদ্যালয়ে পড়েছি তারা জানি, দেয়াল পত্রিকা কী জিনিস। আমি নিজে বিংশ শতকের সত্তরের দশকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। তবে একই শতকের গোড়ার দিকে বিদ্যালয়ের উঁচু ক্লাসের ছাত্র ছিলাম। আমাদের সময় স্কুলে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশের রেওয়াজ ছিল। দেয়াল পত্রিকায় লেখা প্রকাশকে গৌরবের বলে মনে করতাম। আমার শুরুর দিকের অনেক লেখাই প্রথম প্রকাশিত হয়েছে দেয়াল পত্রিকায়। আমরা রাত জেগে হাতে মোটা কাগজের ওপর রঙ-বেরঙের কালিতে লিখে দেয়াল পত্রিকা সাজাতাম। প্রধান বিষয় থাকত ছড়া, কবিতা, ধাঁধাঁ, কৌতুক। তবে মনীষীদের বাণী, নিবন্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ যেমন, কোনো ছাত্র বা বিদ্যালয়ের কৃতিত্ব প্রভৃতি এতে থাকত। আর থাকত ছবি। ভালো আঁকিয়েদের কদর ছিল তাই খুবই। অবশ্য দেয়াল পত্রিকার সেই কদর আজ আর নেই।

তবে শুধু সেকাল নয়, একালেও কিন্তু দেয়াল পত্রিকার মতো হাতে লেখা পত্রিকা বের হয়। ভারতের চেন্নাই থেকে প্রকাশিত একটি হাতে লেখা পত্রিকা তো বছর সাতেকের মধ্যে শতবর্ষ পূর্ণ করতে চলেছে। পত্রিকাটির নাম ‘দ্য মুসলমান’। এটি ভারতের তো বটেই গোটা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো টিকে থাকা হাতে লেখা পত্রিকা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এটি বর্তমান পৃথিবীর একমাত্র হাতে লেখা দৈনিকের মর্যাদাও পেয়েছে। ১৯২৭ সালে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এ পর্যন্ত পত্রিকাটি পেয়েছে তিনজন সম্পাদক। প্রথম সম্পাদকের নাম সাইয়েদ আজাতুল্লাহ। মৃত্যুর পর তার ছেলে সাইয়েদ ফাজালুল্লাহ সম্পাদক হন। ২০০৮ সালে তিনি মারা গেলে ছেলে সাইয়েদ আরিফুল্লাহ সম্পাদক হন। এটি একটি উর্দু সান্ধ্য দৈনিক। সকাল দশটা থেকে দুপুর একটার মধ্যে লেখা ও ক্যালিগ্রাফির কাজ শেষ হয়। তারপর হাতে লেখা পত্রিকাটির চিত্র মুদ্রণের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন শহরের প্রায় বাইশ হাজার গ্রাহকের কাছে পাঠানো হয়। এ পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদকের নাম চিন্নাস্বামী বালাসুব্রামোনিয়াম। তিনজন কাতিব বা লেখনশিল্পীর মধ্যে প্রধান রাহমান হোসেইনী ১৯৮০ সাল থেকে এই কাজে নিয়োজিত আছেন। অন্য দুই কাতিব হলেনÑ শাবানা বেগম ও খুরশিদ বেগম। চার পাতার এই পত্রিকার দাম ৭৫ পয়সা। কিছু বিজ্ঞাপনও এতে পাওয়া যায়। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় থাকে সম্পাদকীয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ ছাপা হয় প্রথম পৃষ্ঠায়। তৃতীয় পৃষ্ঠায় স্থানীয় সংবাদ ও চতুর্থ পৃষ্ঠায় খেলাধুলার সংবাদ ছাপা হয়। ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে এই অলাভজনক পত্রিকাটিকে চালিয়ে নিচ্ছেন সাইয়েদ পরিবারের সদস্যরা। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল অসাধারণ লেখনশৈলী। (সূত্র : জাকিয়া সুলতানা প্রীতি, একমাত্র হাতে লেখা পত্রিকা, আগামী ডেস্ক, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮)।

নিয়মিত দৈনিক পত্রিকা না হলেও হাতে লেখা হাতেগোনা দুয়েকটি বাংলা পত্রিকা এখনো প্রকাশিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের রায়নার আনগুমা গ্রাম থেকে তেমন একটি হাতে লেখা পত্রিকা প্রায় ষাট বছর ধরে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। কুমুদ রঞ্জন মল্লিক, কাজী নজরুল ইসলাম ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বিখ্যাত অনেক সাহিত্যিকদের লেখাই এ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এটির নাম ‘প্রভাত’। এর একটি করে শারদ সংখ্যা প্রতি বছর লক্ষ্মীপূজোর দিন সকালবেলা গ্রামবাসীর জমায়েতে প্রকাশিত হয়। কয়েক মাস ধরে চলে এর আয়োজন। প্রভাত স্মৃতি সংঘের উদ্যোগে এটি প্রকাশিত হয়। তারপর সংঘের কার্যালয়ে তা সংরক্ষিত থাকে। পাঠকরা সেখানে গিয়েই পত্রিকাটি পড়েন। সুনীতি কুমার মুখোপাধ্যায় এই পত্রিকার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। মোটামুটিভাবে দুইশ’ পৃষ্ঠার এই পত্রিকার পাতাগুলো ভরা থাকে রঙ-বেরঙের ছবি আর চমৎকার হস্তাক্ষরে। ছাপা পত্রিকার সব বৈশিষ্ট্যের চেয়েও বাড়তি কিছু থাকে এতে। আর্ট পেপার কাটিং করে তার ওপর লিখে বানিয়ে ফেলা হয় ‘প্রভাত’ নামের এই হাতে লেখা সাহিত্য পত্রিকাটি। (সূত্র : সৌমেন দত্ত, কোজাগরীর দিনে বেরোয় হাতে লেখা সাহিত্য পত্রিকা, আনন্দবাজার পত্রিকা, অনলাইন সংস্করণ, ১২ অক্টোবর, ২০১৯; পত্রলেখা চন্দ্র, ২০০ পাতার শারদীয়া, পুরোটাই লেখা হয় হাতে। ২৮ আগষ্ট, ২০১৬)।

বর্তমান বাংলাদেশ ভূখ-েও কিন্তু হাতে লেখা একটি পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। পত্রিকাটির নাম ‘আন্ধারমানিক’। খুবই দুর্গম একটি গ্রাম থেকে এটি প্রকাশিত হয়। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের সোনাতলা নামের গ্রাম থেকে। আঁধারে মানিকের সন্ধানে এটি প্রকাশিত হচ্ছে বলে জানা যায়। পত্রিকাটির সম্পাদক মো. হাসান পারভেজ। তিনি একজন প্রতিবন্ধী যুবক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত দুর্গম উপকূলীয় এলাকার গ্রাম থেকে সেখানকার সমস্যা তুলে ধরার মানসে প্রকাশিত পত্রিকাটি নিঃসন্দেহে অভিনবত্বের দাবি রাখে। ২০১৯ সালের ১ মে তারিখে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। (সূত্র : বাংলাদেশ জার্নাল, ১ মে, ২০২৯)।

বাংলা ভাষার একাধিক বিখ্যাত সাহিত্যিক হাতে লেখা পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩) ননসেন্স ক্লাব গড়েছিলেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ১৯০৬ সালে তিনি একটি হাতে লেখা পত্রিকা বের করেছিলেন। এটির মলাট, ছবি এবং বেশিরভাগ লেখাও ছিল তারই। পত্রিকাটির নামটাও ছিল খাসা, ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’। কবি সুকান্ত (১৯২৬-১৯৪৭) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে ‘সঞ্চয়’ নামের একটি হাতে লেখা পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। বিদ্যালয়টির নাম ছিল ‘কমলা বিদ্যামন্দির’। পরে যখন তিনি দেশবন্ধু হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র তখন যুগ্মভাবে সম্পাদনা করে একটি হাতে লেখা পত্রিকা বের করেছিলেন। পত্রিকাটির নাম ‘সপ্তমিকা’। অন্য সম্পাদকের নাম ছিল অরুণাচল বসু।

হাতে লেখা পত্রিকার মতো হাতে লেখা বইয়ের চলও কিন্তু এদেশে ছিল। আমি নিজে ছোটবেলায় হাতে লেখা বই পড়েছি। আমার এক খালা খুব ভালো আঁকতেন। তার হাতের লেখাও ছিল খুব সুন্দর। আমার জন্য তিনি একটা বই বানিয়ে ফেলেছিলেন। বইটায় ছিল রঙ-বেরঙের ছবি ও ছড়া। বড় খাতার আকারের সেই বইটা বহুদিন যত্ন করে রেখেছিলাম। আর আমার নিজের প্রথম বইটাও ছিল হাতে লেখা। তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। যেহেতু বই ছেপে প্রকাশ করতে পারিনি তাই বাধ্য হয়ে হাতে লেখা বই বের করতে হয়েছিল। তবে এর পেছনেও আছে লম্বা ইতিহাস। সে কথা আরেক দিন বলা যাবে।

টাইপ রাইটারে টাইপ করে এবং সাইক্লোস্টাইল করে পত্রিকা প্রকাশের চল ছিল ষাটের দশকেও। আমি ছোটবেলায় ডাকটিকিট, ভিউ কার্ড ইত্যাদি জমাতাম এবং বিদেশে পত্রমিতালি করতাম। এসব প্রয়োজনে বিভিন্ন দেশের পত্রিকা জোগাড় করে ছোটবেলায়ই পড়তাম। স্পষ্ট মনে আছে, জাপানের ফুজি স্ট্যাম্প ক্লাবের কাছ থেকে আসা একটি পত্রিকার কথা। সেটা ছিল সাইক্লোস্টাইল পত্রিকা। বাংলাদেশে তখনো ফটোস্ট্যাট মেশিন পর্যন্ত আসেনি। কম্পিউটারের তো প্রশ্নই নেই। কাজেই সাইক্লোস্টাইল পত্রিকাও যথেষ্ট আধুনিক ছিল। আশির দশকেও আন্দোলনকারী ছাত্ররা গোপনে সাইক্লোস্টাইল করে পত্রিকা/ বুলেটিন বের করত। আমি নিজে তেমন পত্রিকা দেখেছি, পড়েছি। তবে হাতে লেখা পত্রিকা বের করে তা বাঁচিয়ে রাখার আশা করা আজকের দিনে সহজ নয়।

হাতে লেখা পত্রিকা এখন ঐতিহ্যের স্মারক। ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবং ব্যতিক্রমী কিছু করতেই হাতে লেখা পত্রিকা চালু করতে বা বাঁচিয়ে রাখতে সচেষ্ট আছেন কেউ কেউ। আমরা জানি না এই ধারা ভবিষ্যতে আর কতদিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে।