হাতে লেখা সংকলন সম্পাদনার স্মৃতি

ঢাকা, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১১ আশ্বিন ১৪২৭

হাতে লেখা পত্রিকার ভেতর-বাহির

হাতে লেখা সংকলন সম্পাদনার স্মৃতি

উৎপলকান্তি বড়ুয়া ১:১৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৫, ২০২০

print
হাতে লেখা সংকলন সম্পাদনার স্মৃতি

দিন-বার ঠিক মনে আছে। যদিও প্রায় তেত্রিশ বছরেও কিছুটা আগের বিষয়। ১৯৮৭ সালের ১০ এপ্রিলের বিকেলবেলা। সরাসরি বাসায় এলেন শিশুসাহিত্যিক ফারুক হাসান এবং সাঈদুল আরেফীন। আগ্রাবাদ থেকে চকবাজার, নতুন বাসা বদলেছি। গোছানো হয়নি বাসা তেমন ভালো করে। মাত্র একবছরের নতুন সংসার। বাসায় অগোছালো এলোমেলো অবস্থায় দুই প্রিয় সুহৃদকে বেড রুমের পালঙ্কেই বসতে দিলাম। ফারুক হাসান এবং সাঈদুল আরেফীন কোথায় বসলেন বা বসতে দিলাম, তাদের সেই দিকে ঠিক মনোযোগের চেয়ে আমার প্রতিই বেশি মনোযোগী ছিলেন। খুব বিনয়ের সঙ্গে কথাটা বললেন সাঈদুল আরেফীন। ফারুক হাসান সংকলন করবেন। আপনার সহযোগিতা চাই।

বাহ! খুব ভালো কথা। লেখা দিতে হবে সংকলনের জন্য? তখনকার দেশের জাতীয় দৈনিক থেকে বিভিন্ন সংকলনসহ প্রায় সবখানে আমার ছড়া-কবিতা-গল্প প্রকাশিত হচ্ছে সমানভাবে। এর অনেক আগে থেকেই লেখকবন্ধু হিসেবে ফারুক হাসান এবং সাঈদুল আরেফীন ঘনিষ্ঠজন। 

বললেন, লেখা তো দেবেন, তারও আগে যেটা করতে হবে, তা হল- আপনার হাতের লেখা তো সুন্দর। সংকলনটা করতে চাই পুরোটা আপনার হাতের লেখা দিয়ে।
-কী বললেন! এটা কী সম্ভব! কী বলছেন এসব!

-আপনি পারবেন। আপনাকে দিয়েই সম্ভব। যেভাবে দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাসহ নানাস্থানে আপনার হাতের লেখা প্রকাশিত হচ্ছে, অবশ্যই আপনি পারবেন, ফারুক হাসানও নাছোড়বান্দা।

তখন ঢাকার জাতীয় দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক খবর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক নয়াবাংলাসহ বিভিন্ন পত্রিকার ছোটদের পাতায় আমার হাতের লেখা সরাসরি প্রকাশিত হচ্ছিল। সঙ্গে নানান সংগঠন-ক্লাব স্কুল-কলেজের নানান সংকলন, বার্ষিকী, দেয়ালিকা লিখে চলেছি, যা প্রায় অনেকেরই জানা। সেসব ভরসা থেকেই ফারুক হাসান এবং সাঈদুল আরেফীন ধরে বসলেন, আপনার হাতের লেখা দিয়েই সংকলনটা করতে চাই। আসার সময় ওরা সঙ্গে করে লেখার জন্য পেলিক্যান কালির ছোট্ট প্যাকটাসহ ১০০ গ্রাম অফসেট কাগজ সিট নিয়ে এসেছেন। সংকলনটির নাম ঠিক করা হল ‘কথন’। এই ‘কথন’ সংকলনটি পরবর্তী সময়ে ছোটদের শিশু-কিশোর সংকলন হিসেবে আজ অবধি প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে।

ফারুক হাসান ও সাঈদুল আরেফীনের তাগিদেই অনেকটা সাহস করে হাতে লিখেই তার কাজ শেষ করলাম ঊনত্রিশ পৃষ্ঠার ‘কথন’ সংকলনের কাজ। সম্পাদক ফারুক হাসান এবং সহযোগী সম্পাদক সাঈদুল আরেফীনের সম্পাদনায় মাত্র দু’দিনের সময় নিয়ে অবশেষে ১৫ এপ্রিল ১৯৮৭, ১ বৈশাখ ১৩৯৪ বাংলা ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা ‘কথন’ বের হল। এ সংখ্যায় লিখেছেনÑ কবি স্বপন দত্ত, শিশির দত্ত, ময়ুখ চৌধুরী, মহীবুল আজিজ, শায়ীম চৌধুরী, রুশো ফরিয়াদী, ফারুক হাসান, ইকবাল বাবুল, নূর মোহাম্মদ রফিক, শাহাবুদ্দিন নাগরী, জসীম মেহবুব, উৎপলকান্তি বড়–য়া, রমজান আলী মামুন, শ.ম. শহীদ, শিমুল মাহমুদ, রেজা মাহমুদ, দেবাশীষ দেব দেবু ও মোস্তফা আনোয়ার। এতে একমাত্র গল্প ‘প্রতিক্ষীত প্রতিচ্ছবি’ লিখেছেন সাঈদুল আরেফীন।

ইতোমধ্যে জানাজানি হয়ে গেল, হাতে লিখেও সংকলন হয়। আর এই কর্মটি সম্পাদন করে উৎপলকান্তি বড়ুয়া।

অধ্যাপক পংকজ দেব অপু একদিন সকালে বলে বসেন, দাদা আমার গানের সংকলনটা আপনার হাতে লিখে করে দিতেই হবে। ২৫টা গান। অপু আমার খুবই সুহৃদজন। তাকে ‘না’ করার কোনো জো-ই ছিল না। সেই সুবাদেই বর্তমান বাংলাদেশ টেলিভিশন-বেতারের অন্তর্ভুক্ত প্রথম শ্রেণির অত্যন্ত জনপ্রিয় গীতিকার ও শিল্পী কবি ছড়াকার পংকজ দেব অপুর ‘গীতি সম্ভার’ নামে ২৫টি গানের সংকলন হাতের লেখায় বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালের ১৫ অক্টোবরে।

এরপর প্রায় দু’বছরের মাথায় এসে বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক অমিত বড়ুয়া, নীলরতন বড়ুয়া, সুপলাল বড়–ুয়া প্রমুখের একই আবদার। তাদের জন্ম-জনপদ বাঁশখালী জলদী গ্রামের ‘আমরা কজন সাহিত্য সংস্কৃতি সংগঠন’­-এর পক্ষ থেকে প্রকাশ করবে ‘নির্ঝর’। দাদা, আপনার হাতে লেখা সংকলন করতে চাই। সঙ্গত কারণেই অমিত বড়ুয়াদেরও আর না করতে পারলাম না। বলে রাখা ভালো, আমার হাতের লেখায় সবার এই সংকলন করতে চাওয়াকেই আমি বেশ এনজয়ই করেছি সবসময়। একটা ভালো লাগার তাগিদ অনুভব করতাম ভেতর থেকে। আমার কাছে তাদের এই চাওয়াটাতে আমি বরাবরই অনুপ্রাণিতই হয়েছি বটে।

অমিত বড়ুয়া’র সম্পাদনায় ‘নির্ঝর’ বের হল। প্রকাশকাল ১৪ অক্টোবর ১৯৮৯ ইং, ২৯ আশ্বিন ১৩৯৬ বাংলা। বর্তমানেও অত্যন্ত সক্রিয় জলদী গ্রামের ‘আমরা কজন সাহিত্য সংস্কৃতি সংগঠন’ এর বর্ষপূর্তি ও মহান প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে প্রকাশিত মোট ২৪ পৃষ্ঠার সংকলন ‘নির্ঝর’-এ লিখেছেন- সুকুমার বড়ুয়া, শতদল বড়ুয়া, প্রশান্ত বড়ুয়া, রমজান আলী মামুন, নীলরতন বড়ুয়া, মনীন্দ্র বড়ুয়া, সুপলাল বড়ুয়া, সুবল বড়ুয়া, দর্পণ বড়ুয়া, উৎপলকান্তি বড়ুয়া, অপু বড়ুয়া, ইকবাল বাবুল, রহীম শাহ, সংগীতা বড়ুয়া, রাশেদ রউফ, অমিত বড়ুয়া প্রমুখ।

ঠিক এর অল্প কিছু সময় পরে বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক মসউদ-উশ-শহীদ এর সম্পাদনায় ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা প্রথম ছড়া সংকলন ‘কর্ণফুলি’ ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে। কর্মসূত্রে ঢাকা অবস্থানকালে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা ছড়া সংকলনটি হাতে লিখে একরাতেই শেষ করতে হয়েছিল মসউদ-উশ-শহীদভাইসহ নির্ঘুম রাত কাটিয়ে।

উল্লেখ্য যে প্রত্যেকটা সংকলনের প্রচ্ছদ বা প্রচ্ছদ পরিকল্পনাও আমার নিজের করা।

এর আগে থেকেই আমার নিজের সম্পাদনায় ‘ঝিনুক’ সংকলনটা করে আসছি। ভাবলাম এটাকেই হাতে লিখে করি না কেন! যেই ভাবা সেই কাজ। শুরু হলো হাতে লিখে ‘ঝিনুক’ প্রকাশনা। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নানান সময় বিভিন্ন সংকলন করতে হয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় রাজাকারবিরোধী ছড়া, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ছড়া, শেখ মুজিবের ছড়া, লিমেরিক, বাংলাদেশ লিমেরিক সোসাইটি’ প্রকাশনা ‘লিমেরিক’ (পাঁচ সংখ্যা), স্বাধীনতার ছড়া, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় লেখা আমার সম্পাদনায় ছড়া সংকলন ‘চেরাগ’ পাঁচ সংখ্যা পর্যন্ত এ যাবত প্রকাশিত হয়েছে।

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংকলন-পত্রিকার ছোটদের পাতায় লেখকদের লেখার নামকরণ ও নাম-এর হেডিং হাতে লেখা হয়েছে অনেকবার, অনেকসময়। যার ধারাবাহিকতা ঠিক আগের মতো তেমনটি না হলেও চলমান রয়েছে। কথায় আছে না ‘ঢেঁকি চাঁদের দেশে গেলেও বারা বাধে’। অনেকটা এমনই!