পানাম নগরে একবেলা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

পানাম নগরে একবেলা

মো. রাকিবুল হাসান, গণবিশ্ববিদ্যালয় ৪:০৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২০

print
পানাম নগরে একবেলা

কোনো এক সময়ের ব্যস্ত নগরী। লোনা ইট কালো পাথরের ধূসর স্মৃতি ও হারানো জৌলুশ নিয়ে আজ নিপুণ দাড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। তবুও যেন চারদিকে ঘেরা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। প্রায় সাড়ে চার'শ বছরের এই নগরীর পথে হাঁটতে হাঁটতে আপনার মনে হতেই পারে কোনো প্রাচীন রহস্য জড়িয়ে আছে একে ঘিরে।

সাভার স্মৃতিসৌধের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা গণবিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা গিয়ে ছিলাম বাঙলার একসময়ের রাজধানী সোনারগাঁওয়ে। একদিনের জন্য আমরা হারিয়ে যাই দ্যা লস্ট সিটি পানাম নগরে। বলা হয় জমিদার ঈসা খাঁ বাঙলার প্রথম রাজধানী স্থাপন করেন এই সোনারগাঁওকে।

বড় নগর, খাস নগর, পানাম নগর প্রাচীন সোনারগাঁওয়ে এই তিন নগরের মধ্যে পানাম-ই ছিল বেশি আকর্ষণীয়। একসময় ধনী হিন্দু বণিকদের বসবাস ছিল এই পানামে। ছিল মসলিন শাড়ি ও নীলের জমজমাট ব্যবসা। যদিওবা এখন তার কিছুই নেই। ক্ষয়ে যাওয়া ইতিহাস। দুয়ার আছে, দালান নেই। ঐতিহাসিক নিদর্শনের কয়েকটি ভবনে বসেছে ভ্রাম্যমাণ দোকান। সময়ের সাথে সাথে এখনকার মানুষের মধ্যে এসেছে বড় পরিবর্তন।

রাস্তার একপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও কলকারখানা। তবে হারানো পানাম এখনো জানিয়ে যাচ্ছে তার প্রাচীন সমৃদ্ধির কথন। ছয়'শ মিটার দীর্ঘ রাস্তার দুপাশে রয়েছে সবমিলিয়ে বাহান্নটি ভবন। সারি সারি দুতল-ত্রিতল ভবনগুলো মূলত নির্মিত হয়েছিল ইউরোপীয় ও মুঘল স্থাপিতের মিশ্রণে।

পানামের প্রতিটি ধ্বংস স্তুপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক একটি কাহিনী। যদিও ধ্বংস স্তুপ বলছি তবুও এর আকর্ষণের কোনো কমতি নেই। পানাম নগর আর লোকশিল্প জাদুঘরের কোল ঘেঁষে ছড়িয়ে রয়েছে সোনালি অতীতের টুকরো টুকরো স্মৃতি। ভবনগুলোর নিখুঁত কারুকার্যে এখনো মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না।

ইট, সুরকি ও পাথরের পাশাপাশি রঙিন কাঠেরও ব্যবহার রয়েছে ইমারতগুলিতে। অধিকাংশ ভবনের মেঝে ধ্বংস হয়ে গেলেও টিকে আছে কয়েকটি। মেঝে গুলোর বেশি ভাগই লাল, সাদা-কালো মোজাইক করা। কয়েকটিতে দেখা যায় সাদা-কালো মারবেল।

পুরোনো হলেও পানাম নগরের পরিকল্পনা বেশ নিখুঁত ছিল। এখানে পানি সরবরাহের জন্য রয়েছে দুপাশে খাল ও পুকুর। লক্ষ করলে দেখা যাবে প্রায় প্রতিটি বাড়ির সাথেই আছে কুয়া বা পানির কুপ।

মোটা মোটা দেয়ালের তৈরি ভবনের সাথে রয়েছে ফাঁকা জায়গা। যা উঠান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। লাল ইটের ভবন ছাড়াও এখানে রয়েছে বেশ কিছু ধর্মীয় উপাসনালয়। কিছুটা ঘুরে দেখলে পাওয়া যাবে গোসল খানা, পান্থশালা, দরবার হল ও নাচ ঘরের অবশিষ্টাংশ।

ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে এক কাপ চা খেয়ে নিলাম। কথা হয় স্থানীয় চা দোকানীর সঙ্গে। তিনি বলেন, পানাম নগর একসময় সন্ধ্যা নামার পর নাচ-গান, সুর ও শাকের আয়োজনে মেতে উঠতো। নৃত্যের তালে তালে নুপুরের শব্দ ও তানপুরার সুরে শহরের সবচেয়ে দুঃখী বাইজীটিও মুখরিত করে তুলতো সোনারগাঁওয়ের বাতাস।

কিন্তু আজ সেই শহরে সন্ধ্যা নামতে নেমে আসে গা ছমছম নিরবতা। ফাটল ধরা দেয়ালে কান পাতলেও মনের অজান্তেই শোনা যায় শতবছরের অব্যক্ত ইতিহাস।

ঢাকার খুব কাছে হওয়ায় বাঙলার প্রাচীনতম শহর পানাম নগরী দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মুগ্ধ করছে রোজ। শহরে ইট পাথরে মিশে থাকা ইতিহাস ঐতিহ্যের গল্প জানতে ও পুরনো আর্কিটেকচার দর্শনে নিয়মিত ভীড় করতে দেখা যায় টুরিস্টদের। যে কেউ চাইলে প্রাইভেট কার, মাইক্রো বা বাসে করে খুব সহজে চলে আসতে পারেন এইখানে।

ঢাকা থেকে ৩০ কিলোমিটারের পথ পানাম নগর। গুলিস্তান থেকে নারায়নগঞ্জের বাসে সোনারগাঁও যাওয়া যাবে। মগড়া পাড়া মোড়ে নেমে ইজি বাইকে ১৫ টাকা ভাড়ায় একদম পানাম নগরীর প্রবেশ মুখে।

পনামের প্রবেশ মূল্য টিকিট ১৫ টাকা। বিদেশিদের জন্য ১০০ টাকা। তবে সাপ্তাহিক কোনো ছুটি নেই। পানামের আশেপাশে আছে আরও ঐতিহাসিক স্থান। পানামে ঢুকার পূর্বে সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর চোখে পড়বে। সেখানে প্রবেশ মুখেই দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক সাদা রঙের প্রাসাদটি এবং জাদুঘরের ভেতর রয়েছে প্রাচীন আসবাবপত্র, হাতিয়ার, নকশি কাঁথা আরও কতকি! তিন তলা জুড়ে সাজানো এই ঐতিহাসিক জাদুঘর। লোকশিল্প জাদুঘরের লেকে রয়েছে নৌকা ভ্রমণের সুযোগ। পুরো জায়গা জুড়ে সবুজ গাছপালা ও মাঝে মাঝে ঝুলন্ত সেতু দেখা যায়।

জনশূন্য হারানো নগরীতে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেলেও ক্যাম্পাসে ফেরার পথে কয়েকটি মোমেন্টাম আলোকচিত্র সাথে না নিয়ে এলে একটা শূন্যতা থেকেই যেত।