গান : হৃদয়ের কোমল অনুভূতি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৭ আশ্বিন ১৪২৭

গান : হৃদয়ের কোমল অনুভূতি

রুমানা নাওয়ার ১২:৩৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২০

print
গান : হৃদয়ের কোমল অনুভূতি

গান হৃদয়ের এক কোমল অনুভূতির নাম। গান বললেই সুখ দোলা দেয় হৃদয়ে। গুনগুন করে অজান্তেই আমরা গেয়ে উঠি প্রিয় কোনো গান। সেটা আনন্দে হোক কিংবা বিরহে। একেক জায়গায়, ভিন্ন পরিবেশে গানের আবেদন ভিন্ন ভিন্ন। গানের সুরে উদ্বেল হয় না এমন মানবপ্রাণ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। পথে পথে ঘুরে বেড়ায় যে পাগল তারও গলায় সুর ভাসে। হরেক সুরে সে গান বাঁধে। অথবা রাত প্রহরী যে পাহারা দেয় রাতভর- তারও আশ্রয় মেলে গানে। নানা ঢঙে নানা ভঙে সে সুরে সুরে সতর্ক সংকেত দেয় জনে জনে। আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই আশ্রয় নেয় এ গানে।

গান মনের খোরাক। বিনোদনের সেরা মাধ্যম। ভালোবাসা প্রকাশ করে এ গানে গানেই। তেমন বিরহটা প্রেমের পরিসমাপ্তি সব কিছুই গানে প্রকাশ। বৃষ্টি দিনে অঝোর বরিষণে গুনগুন করে গেয়ে ওঠে না কেউ কি এমন আছে? 

আজি ঝরো ঝরো মুখরো বাদলো দিনে/ জানিনে জানিনে কিছুতে কেন যে মন লাগে না।

অথবা বসন্তের মাতাল হাওয়ায় মনটা আকুল হয়ে গেয়ে উঠে- আহা আজি এ বসন্তে/ এত ফুল ফোটে এত বাঁশি বাজে এত পাখি গায়...।

প্রকৃতির নানা রূপে নানা রঙে প্রতিটি মানবপ্রাণ গেয়ে উঠে অজান্তে। প্রচণ্ড ভালোলাগায়, ভালোবেসে। গানকে আশ্রয় করে রোজকার দিনযাপন। মনের সূক্ষ্ম, কোমল অনুভূতিগুলো প্রকাশ পায় গানে। গলায় সুর থাকুক না থাকুক মানব মাত্রই গলায় গানকে ধারণ করে। তার মনের আকুলতা ভাবাবেগে তা প্রকাশ পায় এতে। হৃদয়ের অজানা অনুভূতিগুলো ধরা দেয় মানবপ্রাণে।

অজানাকে জানার অদেখাকে দেখার আকুলতায় বিভোর তখন মানবজন্ম। কী এক অনাস্বাদিত জীবন তার সামনে। প্রিয়কে কাছে পাওয়ার বাসনায় প্রেমকে দু’হাতের অর্ঘ্যে তুলে দেওয়ার আকুলতা সমস্ত দেহমনের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে। আর তখনই গানের মাধ্যমে প্রকাশ পায় তার ভেতরকার ভালোলাগা মন্দলাগার অনুভূতিগুলো।

সুরে সুরে কথার জাদুকরী ছোঁয়ায় ভাবাবেগগুলো প্রাণ পায়। অদৃশ্য থাকা অনুভবগুলো মূর্ত হয়ে ওঠে প্রিয়ার কাছে। হাসি আনন্দে হুল্লোড়িত হয় মুহূর্ত। যখন প্রেমিক মন গেয়ে ওঠে- ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখে তোমার মনের মন্দিরে...। তখন আর কিছু ভাবার অবকাশ কি থাকে! দুকূল প্লাবনে ভেসে যায় প্রেমিক মন। বিশ্ব চরাচরে হংস মিথুন হয়ে খেলা করে।

দূরদ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি/ দারুচিনির দেশে/ তুমি বিদেশিনী গো সুমন্দভাসিনী...।

কী অদ্ভুত সুন্দর ভালোবাসার প্রকাশ। দারুচিনি দ্বীপের মেয়েটির জন্য। বুকের ভেতর হাহাকারটা এভাবেই গানে গানে প্রকাশ পেয়েছে। অদেখা প্রিয়ার জন্য তার মনের অভিব্যক্তিটা তুলে ধরেছেন। শুধু কি প্রেমে? বিপ্লব-বিদ্রোহেও কবিরা সোচ্চার। লেখায় উজ্জীবিত করেছেন মানবজাতিকে। কাজী নজরুল ইসলাম যুদ্ধের দামামায় কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন রণসঙ্গীত- চল চল চল/ ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল/ নিম্নে উতলা ধরণী তল/ চল চল চল।/ ঊষার দুয়ারে হানি আঘাত/ আমরা আনিব রাঙা প্রভাত/ আমরা টুঁটাব তিমির রাত/ বাধার বিন্ধ্যাচল।

অথবাÑ মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি/ মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি...।

এরকম হাজারও গান দেশমাতৃকার স্বাধীনতা রক্ষার্থে উজ্জীবিত করেছিল মুক্তিপাগল জনতাকে। জীবনের মায়া তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেশের ডাকে।

যুগে যুগে কালের পরিক্রমায় সময় বদলালেও গানের আবেদন অনস্বীকার্য। গানকে আশ্রয় করে মূর্ত হয়ে ওঠে আমাদের ষড়ঋতু। তাই তো বলা হয়, ধানের দেশ গানের দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। প্রকৃতির রূপ রস গন্ধ খুঁজে নেয় বাউল মন এই গানে। গানকে আশ্রয় করে ভালোবাসা আমাদের বাঁচার আশা। নতুন স্বপ্ন বিভোর হয় গানে গানে। নব সূর্যোদয়ে পৃথিবী আলোকিত হোক গানে গানে।

এই মাটির রূপ রস সুধা পান করে বেড়ে উঠা বাঙালি মাত্রই দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত হয় গানে গানে সুরের খেলায়। মাতোয়ারা হয় দোয়েল কোয়েল ময়নার অপূর্ব সুরে। এই দেশের পাখিরাও গলায় সুর বাঁধে। তাদের মিষ্টি মধুর সুর আলোড়িত করে সবাইকে। কোকিলের ডাক সেরকম সুমিষ্ট। বসন্তের জানান দেয় কোকিল। কুহুকুহু ডাকে সরব হয় রিক্ত প্রকৃতি। মানবমনও তখন উচাটন হয় ঘরের বাইরে যাওয়ার তাড়ায়। থমকে যায় অচেনা পথিক। পথ হারিয়ে ফেলে কুলবধূ। কালে কালে মানুষ নানা রঙে নানা ঢঙে গানকেই বেছে নেয় তার আনন্দের অনুষঙ্গ হিসেবে।