জীবনকে ভালোবাসতে শেখায় ‘কণ্ঠ’

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৭ আশ্বিন ১৪২৭

জীবনকে ভালোবাসতে শেখায় ‘কণ্ঠ’

কুমার অরবিন্দ ১২:১৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২২, ২০২০

print
জীবনকে ভালোবাসতে শেখায় ‘কণ্ঠ’

অর্জুন মল্লিক জনপ্রিয় রেডিও জকি। তার কণ্ঠের অনুরাগী বহু শ্রোতা। অর্জুনের স্ত্রী পৃথাও একজন কণ্ঠশিল্পী। সেরা সঞ্চালকের পুরস্কার নিতে মঞ্চে ওঠে অর্জুন। রেডিওতে যে কথার জাদুতে সবাইকে মুগ্ধ করে রাখে মঞ্চে উঠে সে কিছুই বলতে পারে না। পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সে বুঝতে পারে গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক বিষয়টা তাৎক্ষণিকভাবে সামলে নিলেও অর্জুন-পৃথার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। কারণ খুঁজতে তারা ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে কঠিন এক সত্যের মুখোমুখি হয়। ডাক্তার জানান, অর্জুনের ল্যারিংক্সে বাসা বেঁধেছে মারণব্যাধি কর্কট। চতুর্থ স্টেজ চলছে। এখনই অপারেশন করে পুরো স্বরযন্ত্রটাকেই বাদ দিতে হবে। তাতে অর্জুনের জীবন বাঁচবে কিন্তু কথা বলার ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলবে।

কণ্ঠই যার অস্তিত্ব সেটা বাদ দিয়ে বেঁচে থাকা আর মারা যাওয়া একই কথা। তবু স্ত্রী-পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে অপারেশনের সিদ্ধান্ত অর্জুনকে নিতেই হয়। বাদ দিতে হয় স্বরযন্ত্র। অপারেশনের পরে কথা না বলতে পারার যন্ত্রণা অর্জুন পদে পদে অনুভব করে। একদিন ছেলে ঘুড়ি ওড়াতে ছাদের কার্নিশে চলে যায়। যে কোনো মুহূর্তে সে নিচে পড়ে যেতে পারে। অর্জুন ছেলেকে দেখে নেমে আসার কথা বলতে চায় কিন্তু পারে না, হাততালি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। 

অর্জুনের প্রিয় রেডিও-শো করতে বন্ধ হয়, বাসায় কিছু ছেলেমেয়েকে আবৃত্তি শেখাত সেটাও পারে না। স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে তার মেজাজ সবসময় ঠিক থাকে না। ছেলেটা তার আচরণে ভয় পেয়ে কাছে আসা বন্ধ করে। আপন লোকজন থেকে ক্রমশ দূরে সরতে থাকে। হতাশা অর্জুনকে গ্রাস করে, জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। শুভাকাক্সক্ষীদের পরামর্শে রোমিলা নামে একজন ¯িপচ থেরাপিস্টের সঙ্গে অর্জুন দেখা করে।

তিনি কণ্ঠনালি না থাকলেও খাদ্যনালি দিয়ে কীভাবে কথা বলা যায় তা শেখান। শুরু হয় অর্জুনের খাদ্যনালি দিয়ে নতুন করে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ শেখা। কঠোর অধ্যবসায়ের ফলে এবং রোমিলার তত্ত্বাবধানে অর্জুন খাদ্যনালি দিয়ে কথা বলতে শেখে। কণ্ঠ আগের মতো না হওয়ায় পুরনো রেডিও-শো সে করতে পারে না। নতুন স্বরে বাচ্চাদের জন্য একটা শো করে। নকল স্বরযন্ত্র দিয়ে আবার শ্রোতাদের মোহিত করে অর্জুন। স্বাভাবিক হতে থাকে অর্জুনের জীবন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া একজন মানুষের ফিরে আসার গল্পই কণ্ঠ চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য। জীবন থেকে সবকিছু শেষ হয়ে গেলেও জীবনীশক্তি হারিয়ে ফেলা উচিত নয়।

ছবির দুই পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় সফলভাবেই বিষয়টিকে ‘কণ্ঠ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। অর্জুনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ছবির দুই পরিচালকের একজন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। পৃথার চরিত্রে পাওলি দাম, রোমিলার চরিত্রে জয়া আহসান। এছাড়াও ছিলেন কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, চিত্রা সেন প্রমুখ। চমৎকার একটি চিত্রনাট্যকে সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন সিনেমাটির প্রধান চরিত্রগুলো। শিবপ্রসাদ, পাওলি দাম ও জয়া আহসান আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তারা সেরা।

পরিচালকদ্বয় বোধহয় রোমিলা চরিত্রে জয়া আহসানকেই নির্বাচন করবেন বলে আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলেন। জয়া আহসানের উচ্চারণ, কথা বলার ভঙ্গি যাতে স্বাভাবিক মনে হয় তাই তাকে বাংলাদেশের ফরিদপুরের মেয়ে করা হয়েছে। ছবিটির কিছু কিছু মুহূর্ত মনে রাখার মতো।

বরিশালের পিসিমার সঙ্গে ফরিদপুরের রোমিলার (জয়া) আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা, অর্জুন-পৃথার ‘কর্ণ-কুন্তী সংবাদ’-এর অংশ, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর ভূতের রাজার মঞ্চ পরিবেশনা ছিল অন্যতম। ‘কণ্ঠ’ চলচ্চিত্রে যারা অভিনয় করেছেন সবার অভিনয়ই ছিল মুগ্ধ হওয়ার মতো। অবশ্য দু’এক জায়গায় ওভার অ্যাক্টিং মনে হয়েছে। অনুপমের সঙ্গীতও ছিল কাহিনির প্রয়োজনে মানানসই, কখনও আরোপিত মনে হয়নি। সফল চিত্রনাট্যের সার্থক রূপায়নই ঘটেছে। ‘কণ্ঠ’ জীবনবাদী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে জীবনকে ভালোবাসতে শেখায়।