খাগড়াছড়ি টু সাজেক

ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ | ৫ কার্তিক ১৪২৭

খাগড়াছড়ি টু সাজেক

রুমানা নাওয়ার ১:৪৫ অপরাহ্ণ, জুন ১৭, ২০২০

print
খাগড়াছড়ি টু সাজেক

সাজেক মেঘের উপত্যকায় জীবন। মেঘের ভুবনে স্বাগতম বলে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি পাহাড় ডাকে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে। নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত মানুষজন হাঁপিয়ে ওঠে। যান্ত্রিকতায় সীসা আর ধোঁয়ায় মেশানো অক্সিজেন গ্রহণ করতে করতে। আর তখনই দু’দ- শান্তির আশে ছুটে পাহাড় পর্বত সমুদ্রে। প্রকৃতির কাছাকাছি কোনো জায়গায়। যেখানে গেলে শান্তি মেলে কিছুটা হলেও। হতাশা বিষাদ দৈনন্দিন টানাপোড়নের রোজনামচার একগুয়েমির ডায়েরিটা উল্টে ছুটতে মন চায় সবুজে, মেঘেদের দেশে।

পায়ের নিচে মেঘ আর নিচে সবুজের বিছানা। এরকম একটা জায়গা সাজেক ভ্যালি। পনেরজনের পারিবারিক ট্যুরে আমরা ভ্রমণে বের হলাম। অনেক দুর্গম এবং পাহাড়ি জনপদ হওয়ায় সবাই একটু ভয়ে ভয়ে ছিলাম। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রথমে খাগড়াছড়ি। ওখানে রাতটা অবস্থান করে সকাল সকাল সাজেক যাব এ আশায় রওনা দিলাম। পাহাড়ের পাশ ঘেঁষা খাড়া ঢালু রাস্তায় গাড়ি যখন সাঁ সাঁ করে ছুটছিল তখন চারপাশের নৈসর্গিক দৃশ্য মুগ্ধতায় ঘিরে রেখেছিল সবাইকে। ভয়টা দূর হয়ে গেল। সিনিয়র যারা ছিলেন ভ্রমণসঙ্গী, বারবার বলতে লাগলেন আল্লাহর নাম স্মরণ করতে। আল্লাহ না করুন এখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলে ‘পাহাড় সমাধি’ হবে সবার। রাতেই পৌঁছে গেলাম খাগড়াছড়িতে। ছিমছাম সুন্দর শহর। উপজাতিদের জীবনযাত্রা সহযোগে সুন্দর একটা ছোট্ট শহর। তবে অনেক বাঙালির বসবাসও আছে। জীবন-জীবিকার তাগিদে স্থায়ীভাবে বসবাস করে অনেকে। জীবনযাত্রার মানও অনেক ভালো এখানে।

সাজেক যাওয়ার একমাত্র নিরাপদ বাহন চাঁদের গাড়ি পাওয়া গেল না সকালে। ভাগ্য সহায় হল না আমাদের। তাই খাগড়াছড়ির দর্শনীয় স্থান আলুটিলা, রিসাঙ ঝর্ণা, হর্টিকালচার পার্ক ঘুরে এলাম সবাই মিলে। জায়গাগুলো দারুণ সুন্দর। হাজার হাজার দর্শনার্থীর ভিড় এসব জায়গায়। এখানকার স্থানীয় কাঁচাবাজারগুলোতে বেশিরভাগ উপজাতীয় মহিলা পুরুষ নিজস্ব ক্ষেতের উৎপাদিত জিনিসপত্র নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসে ভোর হতে না হতেই। আমরা যে আবাসিক হোটলটায় উঠলাম তার নিচেই রাস্তার দু’পাশে তারা নানা শাকসবজি নিয়ে বসে পড়ল দোকান সাজিয়ে। চোখ জুড়িয়ে গেল এসব পসরায়। ঘুরে ঘুরে দেখলাম পুরো বাজার।

খাগড়াছড়ি শাপলা চত্বর থেকে চাঁদের গাড়িতে আমরা পরদিন রওনা দিলাম সাজেক ভ্যালির উদ্দেশে। আঁকাবাঁকা রাস্তা। এত উঁচুতে উঠতে হয় গাড়িকে, মনে হয় পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উপরে উঠছে তো উঠছে! চক্রাকারে গাড়ি ঘুরে ঘুরে চলতে থাকে পাহাড়ের পাদদেশে। দু’পাশের পাহাড়ি জনজীবন আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে দেখে আমরা নয়ন জুড়াই আর বিস্মিত হই। পাহাড়ি ছোট ছোট শিশুরা দল বেঁধে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। হাত নেড়ে পাহাড়ি ভাষায় অভ্যর্থনা জানায়। চকলেট, চিপস দেয় দর্শনার্থীদের কেউ কেউ। খুশিতে হাততালি দেয় নিষ্পাপ বাচ্চাগুলো। পাহাড়ে উৎপাদিত কলা, পেঁপে, বাদাম, আখ ফেরি করে বেড়ায় বাচ্চাগুলো। খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। আর দীঘিনালা থেকে প্রায় ৪৯ কিলোমিটার। সহজ যাতায়াত মাধ্যম হল জিপ, মোটরসাইকেল। কাউকে কাউকে দেখলাম সিএনজি অটোরিকশায় করে যেতে। ব্যক্তিগত গাড়িতে যারা গেছেন পথিমধ্যে দেখলাম তাদের ভোগান্তিতে পড়তে। যে দেশের যে ভাও সেভাবেই যাওয়া উচিত।

সাজেক নামক নদী হতে সাজেক ভ্যালির নামকরণ মূলত। এটি বাংলাদেশের রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত সাজেক ইউনিয়নের পর্যটক আকর্ষক এলাকা। সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলার সর্ব উত্তরের মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত। সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, দক্ষিণে রাঙামাটির লংগদু, পূর্বে ভারতের মিজোরাম, পশ্চিমে খাগড়াছড়ি দীঘিনালা অবস্থিত। সাজেক হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন, যার আয়তন ৭০২ বর্গমাইল। এখানে সাজেক বিজিবি ক্যাম্প অবস্থিত। সাজেকের বিজিবি ক্যাম্প বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উঁচুতে অবস্থিত বিজিবি ক্যাম্প। রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত সাজেক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন হিসেবে খ্যাত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যার উচ্চতা ১৮০০ ফুট। সাজেক যেতে হলে অবশ্যই বাঘাইহাট পুলিশ আর্মি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিতে হবে।

চারপাশে মনোরম পাহাড় সারি, সাদা তুলোর মতো মেঘ মুগ্ধ হওয়ার মতো। সাজেক এমন এক জায়গা যেখানে একই দিনে প্রকৃতির তিন রকম রূপের দেখা মেলে। কখনো বা খুব গরম তারপর হঠাৎ বৃষ্টি কিংবা নিমেষেই মেঘের ঘন কুয়াশায় চাদরে ঢেকে যাবে চারপাশ। প্রাকৃতিক নিসর্গ আর তুলোর মতো মেঘের পাহাড় থেকে পাহাড়ে ওড়াওড়ির খেলা দেখতে সাজেক আদর্শ লোকেশন। কলাংক পাহাড় হচ্ছে সাজেকের প্রধান আকর্ষণ। সাজেক ভ্যালির শেষ গ্রাম কলাংকপাড়া লুসাই জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত। কলাংকপাড়া থেকেই কর্ণফুলী নদী উৎপত্তিস্থল ভারতের লুসাই পাহাড় দেখা যায়। এখানে রুইলুই পাড়া থেকে দুই ঘণ্টা ট্রেকিং করে আমরা কমলক ঝর্ণা দেখে এলাম। সুন্দর ঝর্ণাটি অনেকের কাছে পিদাম তৈসা ঝর্ণা, সিকাম তৈসা ঝর্ণা নামে পরিচিত।

দিন কিংবা রাত সাজেক শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মতো। সময় গড়ায় তবু সাজেক পুরাতন হয় না। সাজেকে গেলে অবশ্যই ভোরের সময়টা মিস করা যাবে না। মেঘের খেলা আর সূর্যোদয়ের আলোর মেলা এই সময়েই বসে। এই জন্য খুব ভোরে উঠে চলে যেতে হবে হ্যালিপ্যাডে। সেখান থেকে সুন্দর সূর্যোদয় দেখা যায়।