সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে অদম্য

ঢাকা, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২০ | ২৩ চৈত্র ১৪২৬

সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে অদম্য

খোলা কাগজ ডেস্ক ৭:৫৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০২০

print
সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে অদম্য

শারীরিক সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে অদম্য হয়ে উঠেছেন তারা। দেখিয়েছেন প্রতিভার ঝলক। বুঝিয়ে দিয়েছেন ইচ্ছা থাকলে কোনো সমস্যাই প্রকৃতপক্ষে সমস্যা নয়। চিত্রশিল্পী থেকে ব্যাংকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তাও হয়েছেন তারা। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় বিশেষ সাফল্য অর্জন করেছেন। সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছেন ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়! অদম্য প্রতিবন্ধীদের নিয়ে বিবিধ’র এবারের আয়োজন। লিখেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

মাউথ পেইন্টার ইব্রাহীমের জীবনযুদ্ধ

দুই হাত নেই। কনুইয়ের আগে থেকে কাটা। পা থাকলেও তা অবস। সচল বলতে তার মাথা আর ঘাড়। মাথা ও ঘাড় ঘুরিয়ে মুখ দিয়ে ছবি আঁকেন তিনি। ফুল, পাখি, প্রাণী, প্রকৃতির ছবি। অসম্ভব সুন্দর সে সব ছবি সকলের দৃষ্টি কাড়ে। ইব্রাহীমের মনের জোরের কাছে শারীরিক সীমাবদ্ধতা যেন হার মেনেছে। এমদাদুল মল্লিক ইব্রাহীম পড়াশোনা করছেন এইচএসসি পর্যন্ত। পিতার নাম নজর আলী। জন্মের বছর তিনেক পরেই ইব্রাহীম বাবাকে হারান। দু’ভাই, তিন বোন। বৃদ্ধ মাকে নিয়ে নিয়ে বসবাস করছেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার পরানপুর ইউনিয়নের চককেশব (বালুবাজার) এলাকায়।

ইব্রাহীম খুব ভালো ফুটবলার ছিলেন। জেলা পর্যায়ে খেলেছেন। অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন বলে জানান। ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে তার এলাকায় খুব নামযশ ছিল। কাজ করতেন পল্লী বিদ্যুতের লাইনম্যান হিসেবে। ২০০৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর। কাজ করতে গিয়ে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। ইব্রাহীম বলেন, বৈদ্যুতিক শট খেয়ে খুঁটি থেকে পড়ে যাই। দীর্ঘ আট মাস চিকিৎসা চলে। কিছুটা সুস্থ হলেও হাত দুটি কেটে ফেলতে হয়। দুই পা হারায় চলাচলের শক্তি। সুস্থভাবে চলাচলের সব শক্তি তিনি হারিয়ে ফেলে। হুইল চেয়ার হয় তার জীবনের সঙ্গী।

চিকিৎসার খরচ পল্লী বিদ্যুৎ বহন করলেও তার জীবনের দায়িত্ব কেউ নেয়নি। চিকিৎসার জন্য দীর্ঘদিন ইব্রাহীমকে হাসপাতালে থাকতে হয়।

ইব্রাহীম বলেন, সিআরপিতে থাকা অবস্থায় শুনলাম। লাভলী নামে একজন মুখ দিয়ে ছবি আঁকেন। লাভলীকে ইব্রাহীম কখনও দেখেননি। তবুও লাভলী যেন তাকে পথ দেখালেন। অনুপ্রেরণা হলেন। নিজের পায়ে বেঁচে থাকার স্বপ্নটা তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। ইব্রাহীম এও ভাবলেন, হাত-পা নেই। মুখ দিয়ে যদি কিছু করে জীবিকা নির্বাহ করা যায়। সে কথাই শোনা গেল তার মুখেÑ হাত-পা নেই। আমি মুখ দিয়ে কর্ম করে চলার পথ বেছে নিলাম। নিজের কর্ম নিজে খুঁজে নিলাম।

দশ বছর পেরিয়ে গেছে ইব্রাহীম মুখ দিয়ে ছবি আঁকেন। মুখ দিয়ে ছবি আঁকা খুব কঠিন ছিল। প্রথম দিকে বমি করতেন। মাথা ঘোরাত। গায়ে জ্বর আসত। তবুও আমি চেষ্টা অব্যাহত রাখি। পরে আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যায়।

ছবি আঁকার প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা তার নেই। তবে মাধব স্মৃতি ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট থেকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। হুইল চেয়ারের সঙ্গে বিশেষ উপায়ে লাগানো আছে ক্যানভাস। মুখ দিয়ে ছবি আঁকার সব কলাকৌশল তিনি নিজে নিজে শিখেছেন বলে জানান। এক গ্লাস পানি খেতে হলেও অন্যের সাহায্য লাগে। সাহায্যকারী হিসেবে আছেন তার মা। ইব্রাহীম বললেন, মা আমাকে সাহায্য করে। যখন যা লাগে এনে দেন। মাকে ইব্রাহীম খুব ভালোবাসেন। মাকে ছেড়ে ইব্রাহীম কোথাও যান না। ইব্রাহীম বলছিলেন, মাও অসুস্থ । কয়েকবার অপারেশন হয়েছে তার।

বর্তমানে অসুস্থ ইব্রাহীমের ছবি এঁকে কোথাও গিয়ে বিক্রি করার মতো শক্তি নেই। মানুষজন এসে ছবি নিয়ে যায়। খুশি হয়ে যা দেয় তাই নেই। আবার কেউ কেউ ছবি পাঠিয়ে দিতে বললে তিনি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। অনেক বিদেশি তার কাছে এসে ছবি নিয়ে যায়। কিছুদিন আগে ক্যারোলিন নামে এক কানাডিয়ান তার কাছ থেকে বেশ কিছু ছবি নেন। সিআরপিতে থাকা অবস্থায় তার আঁকা ছবি দিয়ে অনেক প্রদর্শনী হয়েছে।

সব সময় তো ছবি বিক্রি হয় না। গ্রামে বসে ছবি বিক্রি করার সুযোগ খুব কম। তাই আর্থিক অভাব অনটন তার পিছু লেগেই থাকে। একটানা বসে ছবি আঁকার মতো শরীরের অবস্থা তার নেই। সরকার কর্তৃক প্রতিবন্ধী ভাতা ও মায়ের বিধবা ভাতায় টেনেটুনে কোনো রকম চলে যাচ্ছে বলে জানালেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি তার কাছ থেকে ২০টি ছবি নিয়ে এক লাখ টাকা দিয়েছিলেন বলে তিনি জানান। ইব্রাহীম মুখ দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অঙ্কন করে প্রশংসিত হয়েছেন।

মানুষের মনের জোরটাই আসল। মনে জোর থাকলে অনেক কিছুই করা সম্ভব বলে মনে করেন ইব্রাহীম। পেন্সিল ও রঙ তুলি দিয়ে তার আঁকা ছবিতে প্রাণবন্ত সচল জীবনের গল্প থাকলেও তার নিজের জীবনটা প্রায় অচল। এক হাত যেতে তার কারো না কারো সাহায্য লাগে। রঙ তুলির আঁচড়ে জীবনের সব হারানোর কষ্টকে ভুলে থাকতে চান তিনি।

আশরাফুন নাহার মিষ্টি প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের (ডব্লিউডিডিএফ) নির্বাহী পরিচালক। প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করছেন। মিষ্টি তার অফিসের একটি বইয়ের প্রচ্ছদ ইব্রাহীমকে দিয়ে করিয়েছেন। মিষ্টি বলেন, তাকে আমি চিনি, সে প্রতিভাবান মানুষ, আমার প্রতিষ্ঠানের একটি বইয়ের প্রচ্ছদ তাকে দিয়ে করিয়েছি।

যদি সে নিয়মিত বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকার কাজ পায় তাহলে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারবে। ইব্রাহীম বলেন, বেশি সমস্যায় পড়লে মিষ্টি আপুকে জানাই। উনি সাধ্যমতো সাহায্য করেন। ইব্রাহীমকে নিয়ে মিডিয়ায় প্রচুর নিউজ হয়েছে। অসংখ্য মানুষ তাকে আশ^াস দিয়েছে। তবে বাস্তবে কেউই তার পাশে নেই। বিচ্ছিন্নভাবে দু’একজন সাহায্য করেছে। ছবি বিক্রি করে জীবন চালাতে চান ইব্রাহীম। তিনি বলেন, দুঃখের কথা সবার কাছে বলেছি।

বিনিময়ে শুধু আশ্বাস মিলেছে। সরকার থেকে বাসগৃহ নির্মাণ করে দেওয়ার কথা ছিল। তবে সেটাও এখনো তিনি বুঝে পাননি। ইব্রাহীম বলেন, অনুদানের অর্থ নয়, আমি সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে চাই। আমার আঁকা ছবিগুলো যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয় তাহলে ছবি বিক্রির অর্থেই চলতে পারব।

অদম্য ফাল্গুনী সাহা

দুটি হাত নেই। কনুইয়ের নিচ থেকে। এ অবস্থায় জীবন থেমে যাওয়ার কথা। অথচ তার জীবন একটুও থেমে যায়নি। নিজের অক্লান্ত চেষ্টার কাছে শরীরের অসম্পূর্ণতা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স পরীক্ষায় সফলভাবে পাস করেছেন। মাস্টার্স পড়ছেন। কাজ করছেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে। অদম্য এ প্রতিবন্ধী মানুষটির নাম ফাল্গুনী সাহা। গলাচিপা পৌরসভার বটতলা এলাকার জগদীশ চন্দ্র সাহা ও ভারতী রানী দম্পতির সন্তান প্রতিবন্ধী ফাল্গুনী। চার ভাই বোনের মধ্যে ফাল্গুনী তৃতীয়। ২০০২ সালের ঘটনা। পাশের বাসার বন্ধুদের নিয়ে ছাদে খেলছিলেন তিনি। তখন বিদ্যুতের তারে শক লেগে হাত কনুই পর্যন্ত পুড়ে যায়। এরপর বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করানো হলেও শেষ রক্ষা হয়নি।

পচন ধরায় হাত কনুইয়ের আগে থেকে কেটে ফেলা হয়। তখন ফাল্গুনী ছিল দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। হাত নেই তাতে কী। পড়াশোনার প্রতি তার ছিল তীব্র আগ্রহ। কাটা হাত নিয়েই চেষ্টা করতে লাগলেন। একসময় কাটা জায়গায় ইনফেকশন হল। তবু ফাল্গুনী চেষ্টা থামালেন না। ফাল্গুনীর বাবার ছিল ছোট একটি মুদি দোকান। ছোট বোন স্কুলে পড়ে তখন। মা ভারতী সাহা। বিশ^বিদ্যালয়ে তখন সবে ভর্তি হয়েছেন। তখন বাবা মারা যান। দুই মেয়েকে নিয়ে ভারতী সাহা তখন প্রায় পথে বসলেন। তিনি মিষ্টির বাক্স বানাতেন। তা বিক্রি করে কোনোমতে সংসারের হাল ধরেন। বিশ^বিদ্যালয় পড়তে খরচপাতির ব্যাপার আছে।

ফাল্গুনী বলেন, ‘মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’থেকে প্রতি মাসে যা পেতাম তা দিয়ে খরচ মিটে যেত। সত্যি বলতে কী, ওই সময় বৃত্তি না পেলে হয়ত পড়াশোনায়ও ইস্তফা দিতে হত। খেয়ে না খেয়ে থেকেছেন। তবুও ফাল্গুনী হাল ছাড়েননি। নিজের প্রতি তার ছিল অগাধ বিশ্বাস। অন্যে যা পারে তিনিও তা পারবেন।

আলোর পথযাত্রী আশরাফুন নাহার মিষ্টি

প্রতিবন্ধী মানুষ। একা চলাফেরা করতে পারে না। এমন মানুষদের নিয়ে সমাজে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যই বেশি। শারীরিক অক্ষমতাকে সহজভাবে সবাই নেয় না। হুইল চেয়ারে চলা মানেই থেমে যাওয়া জীবনের গল্প নয়। মনের জোর থাকা চাই। তাহলে হুইল চেয়ারে বসেই অনেক কিছু করা সম্ভব। অনেক কিছু অর্জন করা যায়।

যশোরের মেয়ে আশরাফুন নাহার মিষ্টি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের (ডব্লিউডিডিএফ) নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ২০০৭ সাল থেকে। প্রতিবন্ধীদের নারীদের নিয়ে কাজ করছেন ১৯ বছর। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অস্ট্রিয়া, আয়ারল্যান্ড, জাপান, পাকিস্তান থেকে বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন । বাংলাদেশে উইমেন্স ফোরাম পুরস্কার, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ থেকে সম্মাননা এবং অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কারও রয়েছে তার ঝুলিতে।

প্রতিবন্ধী মানুষ হয়ে এত কিছু কীভাবে সম্ভব? মিষ্টি বলেন, ইচ্ছাশক্তি ও একাগ্রতা থাকলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই বাধা হতে পারে না। প্রতিবন্ধিতা নিয়েও মানুষ এভারেস্ট জয় করতে পারে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে এক দুর্ঘটনায় তাকে প্রতিবন্ধিতা বরণ করে নেন। মিষ্টি জানালেন, ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ছাদে কাপড় আনতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যান।

স্পাইনাল কডে আঘাতজনিত কারণে বুকের কাছ থেকে নিচের অংশ প্যারালাইজড হয়ে যায়। চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছিলেন মিষ্টিকে বাকি জীবন হয় বিছানায় শুয়ে নয়ত হুইল চেয়ার ব্যবহার করে কাটাতে হবে। মিষ্টির বাবা ডা. আজহারুল ইসলাম, মা আমিরুন নেছা। এ দম্পতির ১১ সন্তানের মধ্যে মিষ্টি ১০ম।

পা ওদের হাত

তারা কেউই স্বাভাবিক মানুষ নন। স্বাভাবিক মানুষের মতো সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তাদের নেই। কারো দুটো পা নেই। কিংবা একটি হাত নেই। একা চলাফেরা করতে পারেন না। অন্যের সাহায্যের অপেক্ষায় থাকতে হয় সবসময়। এত বড় সীমাবদ্ধতাকেও তারা জয় করেছেন। নিজেদের অদম্য মনোবল পাল্টে দিয়েছে তাদের জীবন। হাত নেই তো কী, পা আছে না! পা যেন ওদের হাত।

তামান্না আক্তার

তামান্নার তো জন্ম থেকেই দুটো হাত, একটি পা নেই। একটি পা যেন তার হাত। পা দিয়ে লিখে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা পর্যন্ত মেধা তালিকায় শীর্ষে ছিল তামান্নার অবস্থান। ২০১৩ সালে প্রাথমিক সমাপনী (পিইসি) ও ২০১৬ সালে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায় সে। তামান্না আক্তার যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামের রওশন আলী ও খাদিজা পারভীনের মেয়ে। তামান্না পা দিয়ে কেবল লেখা নয়।

ছবিও আঁকতে পারে। যদিও একদিনে সে এটা রপ্ত করতে পারেনি। তামান্নার মা খাদিজা বেগম বলেন, ছয় বছর বয়সে ওর পায়ে কাঠি দিয়ে লেখানোর চেষ্টা করলাম। কলম দিলাম। কাজ হল না। এরপর মুখে কলম দিলাম। তাতেও কাজ হল না। পরে সিদ্ধান্ত নিলাম, ওকে পা দিয়েই লেখাতে হবে।

বাঁকড়া আজমাইন এডাস স্কুলে ভর্তি হয় তামান্না। প্রবল ইচ্ছা, মনোবল আর লেগে থাকলে কী না হয়। সেটাই প্রমাণ করে তামান্না। মাত্র দুই মাসের মাথায় পা দিয়ে লিখতে শুরু করে। শুধু এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ নয়। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায়ও জিপিএ ৫ পেয়েছে। তামান্নার বাবা রওশন আলী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তিন ভাইবোনের মধ্যে তামান্না সবার বড়। ২০০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর তামান্নার জন্ম। প্রতিবন্ধী, তাও আবার নারী! রাজ্যের চিন্তা ভর করেছিল তার মা-বাবার মাথায়। চিন্তিত ছিলেন তারা প্রতিবন্ধী মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কারণ অন্যের সাহায্য ছাড়া সে একটা মশাও তাড়াতে পারে না। এক গ্লাস পানি খেতেও তার অন্যের সাহায্য লাগে। বিভিন্ন রকম প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমরা মেয়ের পাশে ছিলাম। সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে সাহায্য করেছি। বলেন তামান্নার বাবা রওশন আলী।

ফলাফল সর্ম্পকে তামান্না বলে, পরীক্ষার ফলাফলে আমি খুব খুশি। আমার ইচ্ছা ভালো মানুষ হওয়ার। আমি মানুষের সেবা করতে চাই। মা-বাবা ছাড়াও স্কুলের স্যার ও বন্ধুরা আমাকে সহযোগিতা করেছেন। সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। স্কুল যাওয়া আসার মাধ্যম তার হুইল চেয়ার। পা দিয়ে শুধু লেখা নয়। পাশাপাশি তামান্না বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানো, পায়ের আঙুলের ফাঁকে চিরুনি, চামচ দিয়ে খাওয়া, চুল আঁচড়ানোর কাজ করতে পারে। এমনকি নিজের ব্যবহৃত ঠেলাগাড়িটি এক পা দিয়ে চালানো শিখেছে। তামান্না অত্যন্ত মেধাবী। সে কথাই বললেন শিক্ষক হেলাল উদ্দীন। তিনি বাঁকড়া জনাব আলী খান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। এ শিক্ষক বলেন, ওর লেখা স্পষ্ট, দৃষ্টিনন্দন। তামান্না বিদ্যালয়ে কেজি, প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণির প্রতিটি ফলাফলে মেধা তালিকায় প্রথম হয়েছে। তামান্না বড় হয়ে চিকিৎসক হতে চায়। চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করতে চায়।

ফারজানা ইয়াসমিন মনি

একজন মানুষের উচ্চতা মাত্র ৩৩ ইঞ্চি। ভাবা যায়! পা দুটিও অচল, হাঁটতে পারে না। মানুষের কোলে করে তাকে চলতে হয়। একা চলতে ফিরতে পারে না। শিশুর মতো লালনপালন করতে হয়। মুখে তুলে খাইয়ে দিতে হয়। এমন কঠিন সব প্রতিবন্ধকতা, সীমাবদ্ধতা। তবুও সে অদম্য। হার না মানা এক মানুষ। নাম তার ফারজানা ইয়াসমিন মনি। এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে মনি। জেএসসিতে ‘এ’গ্রেড পেয়ে পাস করেছিল।

মা-বাবার কাছে এখনো শিশু ফারজানা। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার গাগলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। ফারজানার বাবা ফরমান আলী। উত্তর পনতাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মা রাবেয়া বেগম। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে মনিই সবার ছোট। নাগেশ্বরী পৌরসভা এলাকার কুটি বাগডাঙ্গা গ্রামে ফারজানার বাড়ি। বাড়ি থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দূরত্বও তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। কখনো বাবা সঙ্গে, কখনো চাচা শফিউর রহমান, বড় ভাই আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে স্কুলে যায়।

জন্মের পরই মনির শরীরে কিছু অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। ২০০৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মনির জন্ম। জন্মের সময় শারীরিক চেহারা কিছুটা অস্বাভাবিক থাকলেও রূপবতী হবে সে, বলেছিল অনেকে। তার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই তার অঙ্গহানি; হাঁটতে পারে না। নিজের কোনো কাজই তেমন করতে পারে না সে। ভাত তুলে খাওয়ান তার মা। বাবা ফরমান আলী বলেন, সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মনি পড়ালেখায় বেশ মনোযোগী। মনি যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ইউনুছ আলী বলেন, মনি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হলেও স্কুলে লেখাপড়ায় ছিল মনোযোগী। অনেক স্বাভাবিক শিক্ষার্থীর চেয়েও সে ভালো ফল করে আসছে। আশা করি, এসএসসিতেও ভালো ফল করবে।

কষ্ট তো হয়ই। তবুও কষ্টকে আর মনির কাছে কষ্ট মনে হয় না। তার দৃঢ় উচ্চারণ, কষ্ট হয়, তবে কষ্টকে কষ্ট মনে করি না। কষ্ট না করলে জীবনের সফলতা কীভাবে আসবে! উচ্চ শিক্ষিত হতে চায় সে। পড়াশোনা শেষে চাকরি করবে। ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন তার।

মনি বলল, পরিবারের সবাই আমাকে সাপোর্ট করে। আমি নিজে কিছু করতে পারি না। সবার ভালোবাসা আমার সবচেয়ে বড় প্রেরণা। এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ জোগায়। মনির মা রাবেয়া বেগম বলেন, ওর প্রতি আমাদের আদর-ভালোবাসার কমতি নেই। ওর যতœ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কোনো কাজ করে দিতে না পারলে খুব খারাপ লাগে। মা হিসেবে দুশ্চিন্তা তো থাকেই! আমাদের মেয়ে, ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হয়। প্রবল ইচ্ছাশক্তি, সবার সহযোগিতা থাকলে শারীরিক প্রতিবন্ধিকতাও জয় করা যায়। প্রত্যন্ত গ্রামের ফারজানা ইয়াসমিন মনি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ!

ব্যাংকার অন্তরা

একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ। নিজে চলাফেরা করতে পারেন না। তবু তার জীবন থেমে থাকেনি। ঊনত্রিশ বছর চাকরি শেষে এবি ব্যাংক থেকে অবসর নিয়েছেন। ১৯৮৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এতটা পথ কীভাবে পাড়ি দিলেন?

অন্তরা বলেন, নিজের প্রতি বিশ্বাস ছিল। মনোবল ছিল, আমি পারব। শত বাধা এলেও ভেঙে পড়িনি। তিনি জানালেন, চাকরির শুরুতে ব্যাংকের হেড অফিসে থাকলেও চাকরির বাকি সময় কারওরান বাজার শাখায় ক্লায়েন্ট সার্ভিসমূলক কাজ করেন। যেটা অনেক কঠিন বিষয় ছিল। চাকরির ইন্টারভিউ বোর্ডে তাকে দেখে অবাক হয়েছিল সবাই। মুখ চাওয়াচাওয়ি করে । প্রশ্ন এল, তুমি এ কাজ করতে পারবে তো? অন্তরা বলেছিলেন, পারব।

একসময় চাকরি হয়। সময় বয়ে যায়। তিনি নিয়োগপত্র পান না। বোর্ড মিটিংয়ে আবার সেই একই প্রশ্ন, তুমি কি পারবে? অন্তরার উত্তর ছিল আমি কলেজ, বিশ্বদ্যিালয়ে ক্লাস করেছি। নিজের পায়ে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারি না। তবে কাজ করতে পারি। কর্মজীবনে অন্তরা কাজ করেই দেখিয়েছেন। তিনি পারেন। অন্তরার অবসর উপলক্ষে সংবর্ধনার আয়োজন করে এবি ব্যাংক। সহকর্মীরা তার কাজের প্রশংসাই করেন।

এবি ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) তারিক আফজাল বলেন, তিনি একজন বিশেষ মানুষ। তাকে দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই। দীর্ঘ ২৯ বছরের চাকরিজীবনে তিনি কখনো অফিসে দেরি করে আসেননি। জুনিয়র থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়েছেন। অঙ্গের দুর্বলতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ১৯৯০ সালে এবি ব্যাংকের প্রধান কার্যলয়ে মতিঝিল এইচআর বিভাগে জুনিয়র এ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগদান করেন। প্রথমদিন বড় দুলাভাই তাকে অফিসে পৌঁছে দিয়েছিলেন।