খসে পড়ছে রঙিলা দালানের চুন সুড়কি

ঢাকা, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০ | ৩১ আষাঢ় ১৪২৭

খসে পড়ছে রঙিলা দালানের চুন সুড়কি

হাসনাত মোবারক ১২:৫১ অপরাহ্ণ, মার্চ ০৪, ২০২০

print
খসে পড়ছে রঙিলা দালানের চুন সুড়কি

মন পবনের দোলায় ঘুরে ফিরে একশ’ কয়েকটা কুঁড়ি এখনো কুড়ানো হয়নি বুঝি! আমার পরিব্রাজক জীবনের ডানায় ভর করে আছে কত শত আবদার। কত কিছুই তো দেখা হয়নি! ঘুরছি, দেখছি, ফিরছি ও লিখছি। ছেঁড়া পাল ও ভাঙা হালে আর পানি ধরে না। নৌকা গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা।

উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম নৌ-বন্দর, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা বাঘাবাড়ি ঘাট থেকে আমাদের গ্রামের বাড়ির পথে রাউতারা গ্রাম। ওই পথে কতবার যে গিয়েছি। তার কী ইয়ত্তা আছে! যাতায়াত পথে দেখে ফিরেছি রাউতারার জমিদার বাড়ি।

রাউতারার পশ্চিমপাশে ইটাখোলার ভিটা। পরিত্যক্ত ওই ভিটার নাম শুনলে এখনো গভীর রাতে চমকে উঠি। ওটাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কত শত ভয় আর ভীতির মিথ। বিস্তীর্ণ জলরাশি পেরিয়ে রাউতারা, পোতাজিয়া ও বাড়াবিল গ্রাম। এরপরই ইতিহাসধন্য শাহজাদপুর উপজেলা সদর।

ইউসুফশাহী পরগোনার অন্তর্ভুক্ত ছিল এ অঞ্চল। ১৮৭২ সালে প্রজা বিদ্রোহের যে সূত্রপাত ঘটে সেটা এ শাহজাদপুর থেকেই। গত শতাব্দী অবধি এ সুবিশাল পাথর ও জলাভূমির কর্তৃত্ব ছিল জমিদার ও জোতদারদের অধীনে।

কথিত আছে। চতুর্দশ শতকের প্রাক্কালে সুদূর ইয়ামেন থেকে আগত সুফি সাধকদের আগমন ঘটে এ অঞ্চলে। পোতাজিয়া নামক গ্রামে তাদের নৌ-বিহার পোতাশ্রয় করে। এ জন্য নাকি গ্রামের নাম পোতাজিয়া। পোতাজিয়া গ্রামের পাশেই রাউতারা গ্রাম। বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরের একটি গ্রাম। বড়াল নদীর জলাধারা বয়ে গেছে এ গ্রামের বুক চিরে। পাখির কলকাকলি আর গরুর হাম্বা ডাকে ঘুম ভাঙে এতদাঞ্চলের মানুষের।

এদের প্রভাব আর প্রতাপের কথা প্রচলিত আছে। সেকালেও এমন একজন প্রতাপশালী জমিদার ছিল। নাম তার রুধেষ বাবু। তিনিই তার গ্রাম রাউতারাতে ১০ একর জায়গা জুড়ে নির্মাণ করেন একটি জমিদার বাড়ি। যেটি রাউতারা জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত। এলাকার মানুষ রুধেষ বাবুর জমিদার বাড়ি নামেই চেনে।

মজার ঘটনা একটা ঘটে। এ জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে যখন নৌকা, পাল তোলা নৌকা ডিঙি, কোষাসহ বাহারি সাজের বাইচের নৌকার বহর। বাইচের বাহারি নৌকা দেখার জন্য যুবতী কন্যারা ওই জমিদার বাড়ির ছাদে ওঠে। তখন মাঝিরা সমস্বরে সারি গেয়ে ওঠে, ‘তারায় জ¦লে ঝিকমিক ঝিকমিক চান্দে দ্যায় আলো/ রাউতারার ছেরিরা প্রেম জানে ভালো/ ও হায় প্রেম জানে ভালো।’

যাই হোক। জমিদার বাড়িটি নদীর ধারে হওয়ায় কুমিরের ভয় ছিল। তাই ১০ ফুট উঁচুর দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল বাড়িটি। বর্তমানে সেসব ভগ্নপ্রায়ে দেয়ালের গায়ে গজিয়ে উঠেছে কাঁটা শ্যাওলা লতা। আর অবশিষ্ট অংশ গরুর গোবর শুকানোর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

৫ তলা বিশিষ্ট এই জমিদার বাড়িটিতে ২৫টিরও বেশি কক্ষ ছিল। একটি জলসা ঘর ও কাছারিঘর ছিল। নদীতে গোসলের জন্য গোপন সুড়ঙ্গ পথ ছিল। বর্তমানে সেসব ব্যবহারের অনুপযোগী।

দৃষ্টিনন্দন এ লাল ইট সুড়কির ভাঁজপত্রে এখনো চাপা পড়েনি অত্যাচারী জমিদার রুধেষ বাবুর নাম। যদিও ১৯৫৭ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর জমিদার বাড়ির জমিদারিরও ইতি ঘটে। এরপর জমিদার ও তার বংশধররা ভারতে পাড়ি জমায়।

উল্লেখ্য যে জমিদার বাড়িটি, এ এলাকার মানুষের গরু ছাগল খড় ও পতিত বাড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অনন্য স্থাপনাটিতে দর্শনার্থীদের পদচারণা নেই। কেননা ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। এ বেহাল দশা উতরাতে পারলে পর্যটকবান্ধব হয়ে উঠবে।