দাবানলে পুড়ছে অস্ট্রেলিয়া

ঢাকা, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২০ | ২১ চৈত্র ১৪২৬

দাবানলে পুড়ছে অস্ট্রেলিয়া

বিবিধ ডেস্ক ২:১৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৫, ২০২০

print
দাবানলে পুড়ছে অস্ট্রেলিয়া

দাবানল অস্ট্রেলিয়ার জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। স্থানীয়রা একে ডাকে বুশফায়ার নামে। সাধারণত গ্রীষ্মকালে তাপদাহের কারণে প্রতি বছরই সেখানকার জঙ্গলে দাবানল হয়। তবে এবারের দাবানল আগের মতো নয়। সব রেকর্ড ও তীব্রতা ছাড়িয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে, পুড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে দুই হাজারের বেশি বসত বাড়ি ও ৫৫ লাখ হেক্টর জমি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এই আগুনের তীব্রতা বাড়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে।

আগুনের আতঙ্ক
অস্ট্রেলিয়ায় গত সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে দাবানল। কার্যত আস্ত একটা দেশ যেন আগুনের গ্রাসে পরিণত হয়েছে। আগুনে ভস্মিভূত হয়ে গেছে সাধারণ মানুষের ঘর বাড়ি। বহু মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন সমুদ্রের ধারে। ভয়াবহতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। আগুনের গ্রাসে একের পর এক বসতি শেষ হয়ে গেছে। সমুদ্র সৈকতে আটকে শয়ে শয়ে মানুষ। তবু মুক্তি নেই ভয়ের হাত থেকে। মানুষ থেকে নিয়ে পশুপাখি সবাই আগুনের আতঙ্কে দিশেহারা।
গত বছরের ডিসেম্বরে দক্ষিণ পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার মালাকুটা অঞ্চলে একটি সমুদ্র সৈকতে প্রায় চার হাজার মানুষের আটকে পড়ার খবর পাওয়া যায়। দেশটির স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য মতে, পুরো অঞ্চলটাই কার্যত দাবানলের কবলে চলে গিয়েছে। ফলে প্রাণ বাঁচাতে এলাকার মানুষ সমুদ্রের ধারে পৌঁছে গিয়েছেন। কিন্তু সমুদ্র সৈকত থেকে বার হওয়ার কোনও রাস্তা খোলা নেই। আগুনের বলয় ক্রমশ ধেয়ে আসছে সৈকতের দিকে। এই অবস্থায় নৌকো এবং বিমানে সেখানকার মানুষকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। গোটা অঞ্চল ঘিরে রেখেছেন দমকল কর্মীরা। কিন্তু তাতেও আশ^স্ত হওয়া যাচ্ছে না। মালাকুটার যখন এই অবস্থা, তখন নিউ সাউথ ওয়েলস অঞ্চলে আগুনের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে এক দমকল কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এই পরিস্থিতে আচমকাই ওই অঞ্চলে শুরু হয় টর্নেডো। আগুনের গোলা সমেত সেই টর্নেডো আস্ত একটা দমকলকে হাওয়ায় তুলে দেয়। সেই গাড়ির ভিতরেই ছিলেন একজন কর্মী। ঘটনাস্থলেই ঝলসে মৃত্যু হয় তার।
নিউ সাউথ ওয়েলসেও বহু মানুষ গৃহহীন হয়ে সমুদ্রের ধারে আশ্রয় নিয়েছেন। ঘর বাড়ি সব আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩০ জনের মৃত্যু খবর পাওয়া গিয়েছে। সব হারিয়ে সাধারণ মানুষ টুইট করে বলছেন, তাদের আর কিছু নেই।

নেভাতে
পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবীর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অস্ট্রেলিয়াকে। আগুনের নিকটবর্তী বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মোতায়েন করা হয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও নিউজিল্যান্ডও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আগুন নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। আগুনের ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চল ও মানুষের আবাসস্থলের মাঝে দূরত্ব তৈরি করতে হবে। মাঝে একটি বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ভবন তৈরির নীতিমালাও জোরদার করা দরকার। এছাড়া আগুন মোকাবিলা পদ্ধতির সংস্কার দরকার। স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর ভরসা না করে অর্থ খরচ করে নতুন পদ্ধতি শুরু করতে হবে। সেখানকার আদিবাসীরা যেই পদ্ধতি অনুসরণ করে সেটাতেও জোর দেওয়া যেতে পারে।

দগ্ধ ক্যাঙ্গারু
অস্ট্রেলিয়ার দাবানল থেকে প্রাণে বাঁচতে ছুটে চলা এক ক্যাঙ্গারু শাবকের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ওই ছবির বর্ণনায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, আগুন থেকে বাঁচতে প্রাণান্তকর চেষ্টায় ছুটে চলা এক ক্যাঙ্গারু শাবক কাটাতারের জালে আটকে আছে। ওই অবস্থাতেই জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা গেছে অবলা এই প্রাণীটি।
ছবিটি ভেটপো নামে এক সংস্থার ইনস্টাগ্রাম পেজ থেকে শেয়ার করা হয়েছে। যার নিচে লেখা, দেখুন কী মর্মান্তিক! এটা আসল ছবি। এই ক্যাঙ্গারুর শাবক আগুন থেকে বাঁচতে পালাতে গিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ও তারের জালে জড়িয়ে যায়। আর জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যায়। ওই পেজটিতে বন্যপ্রাণী রক্ষায় আবেদন জানিয়ে বলা হয়, বন্যপ্রাণী রক্ষায় আমাদের এখনই নজর দিতে হবে। আমরা বন্যপ্রাণীর এই কষ্ট বুঝতে পারছি না। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানবজাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের শস্যবিমার টাকা দিতে উদ্যোগী হয়েছে দেশটির সরকার। পোড়া শস্য ও মৃত গবাদি পশুর ছবি তুলে পাঠাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি যেসব বন্যপ্রাণী ও গবাদি পশু এই দাবানল থেকে রেহাই পেয়েছে, তাদের ছবিও তুলে পাঠাতে বলা হয়েছে। গত প্রায় ৪ মাস ধরে পুড়ছে অস্ট্রেলিয়ার বনসম্পদ। আগুনের তীব্রতা এতটাই যে তা শহরের দিকে এগোতে শুরু করেছে।

সহায়তার হাত
দাবানলে অনেক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন অস্ট্রেলিয়ার এখন প্রয়োজন অনেক সাহায্য। তাই নিজের ব্যাগি গ্রিন টুপিটি নিলামে তোলার মাধ্যমে এগিয়ে এসেছিলেন শেন ওয়ার্ন। নিলামের একদম শেষমুহূর্তে সিডনির ‘এমসি’ নামক এক কোম্পানি ১০ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি বিড করে টুপিটি কিনে নিয়েছে।
রেকর্ড পরিমাণ অর্থমূল্যে বিক্রি হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি ক্রিকেটার শেন ওয়ার্নের ঐতিহ্যবাহী ‘ব্যাগি গ্রিন’ টুপিটি। ২০০৩ সালে বিক্রি হওয়া স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের টুপির দ্বিগুণেরও বেশি মূল্যে নিজের টুপিটি বিক্রি করতে পেরেছেন ওয়ার্ন। ব্র্যাডম্যানের ব্যাগি গ্রিন টুপি বিক্রি হয়েছিল সোয়া ৪ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলারে। অন্যদিকে নিলামে তোলার ওয়ার্নের টুপির দাম গিয়ে ঠেকেছে ১০০৭৫০০ (দশ লাখ সাত হাজার পাঁচশত) অস্ট্রেলিয়ান ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৬ কোটি (৫৮৭২৮৬৭৭) টাকার সমান।
বিশাল অঙ্কের একটি টাকাও নিজের কাছে রাখবেন না ওয়ার্ন। কেননা তিনি যে মহৎ কাজের জন্য নিলামে তুলেছিলেন নিজের ঐতিহ্যবাহী ‘ব্যাগি গ্রিন’ টুপিটি সেখানে দান করে দিবেন।
ওয়ার্নের দেখাদেখি অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার জেফ থমসনও নিজের শেষ ব্যাগি গ্রিন টুপিসহ ক্রিকেট সরঞ্জাম নিলামে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওয়ার্নের মতোই নিলাম থেকে পাওয়া টাকা তহবিলে দান করবেন ৫১ টেস্টে ২০০ উইকেট পাওয়া এ গতি তারকা।
এদিকে শুধু নিলামের মাধ্যমেই নয়, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররা বিগ ব্যাশ লিগের মাধ্যমেও এগিয়ে আসছেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। টুর্নামেন্টে প্রতিটি ছক্কা ও উইকেটের জন্য ২৫০ ডলার করে দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার। এছাড়া দাবানলের তহবিলের জন্য একটি প্রদর্শনীমূলক ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের কথাও ভাবা হচ্ছে।
এছাড়া তারকা নিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন তিন মিলিয়ন ডলার সাহায্যের জন্য তুলে দেবেন এই খাতে। লিওনার্দো ছাড়াও সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন আরও অনেকে। আগুন নেভাতে প্রথম থেকেই তৎপর প্রশাসন।

৫০ কোটি প্রাণীর মৃত্যু
অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ দাবানলে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৫০ কোটি প্রাণী প্রাণ হারিয়েছে। দাবানলের ভয়াবহতার মাত্রা এতটাই চরম আকার ধারণ করেছে যে, নিউজিল্যান্ডের আকাশও কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে। ইউনিভার্সিটি অব সিডনির বাস্তুবিদদের আশঙ্কা, এই দাবানলে প্রায় ৪৮০ মিলিয়ন (৪৮ কোটি) প্রাণী মারা গেছে। এদের মধ্যে অন্তত ৮ হাজার কোয়ালা রয়েছে। দেশটির নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রায় এক কোটি একর ভূমির গাছপালা দাবানলে পুড়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় মোট কোয়ালার প্রায় ৩০ শতাংশের আবাস নিউ সাউথ ওয়েলসে। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা এসব কোয়ালার অধিকাংশই দাবানলে মারা গেছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃতি সংরক্ষণ পরিষদের বাস্তুবিদ মার্ক গ্রাহাম সংসদে বলেছেন, দাবানলের লেলিহান শিখা থেকে পালিয়ে বাঁচার মতো দৌড়ের গতি কোয়ালার নেই। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। আগুনের লেলিহান শিখায় গাছে থাকা পশুপাখির বেশি প্রাণহানি ঘটছে। স্বেচ্ছাসেবক ট্রেসি বার্গেস বলেন, আমাদের এখানে অসংখ্য আহত প্রাণী আসার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। আমাদের উদ্বেগের কারণ হল, সম্ভবত দাবানল প্রবণ এলাকার পশুপাখি, প্রাণীরা বেঁচে নেই। তাসমান হিমবাহের চূড়ায় উঠে এক পর্যটক একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন। এতে তিনি বলেছেন, আমরা এখানে ক্রাইস্টচার্চে পোড়া গন্ধ পাচ্ছি। তোমাদের জন্য চিন্তা হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের বিশাল বরফাচ্ছাদিত হিমবাহের প্রায় ৩ হাজার চূড়া বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে গলে গেছে। চলতি শতাব্দীর শেষের দিকে এই হিমবাহ পুরোপুরি গলে যেতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ এই দাবানলের সূত্রপাত হয়েছে গত সেপ্টেম্বরে। তখন থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ২০ লাখ একর ভূমি পুড়ে গেছে। নিউ সাউথ ওয়েলসের সড়ক পরিবহন মন্ত্রী অ্যান্ড্রু কনস্ট্যান্স আগুনের ভয়াবহতা নিয়ে টেলিভিশনে লাইভ সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। বুধবার এবিসি নিউজকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় তিনি বলেন, এটা ঠিক নয়। আমি গতকাল গ্রামীণ ফায়ার সার্ভিসের অন্তত চারজন কর্মীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি, যাদের বাড়ি-ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমার সুন্দর প্রতিবেশিরা তাদের বাড়িঘর হারিয়েছে। এটা মেনে নেয়া অত্যন্ত কঠিন।

ঘর পুড়ে ছাই
অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ দাবানলে প্রায় দুই হাজার বাড়ি-ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। গত কয়েক মাস ধরে দেশটির বিশাল এলাকাজুড়ে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। বিরাট ঝুঁকির মধ্যে আছে দেশটি। দাবানলের কারণে সেখানকার তাপমাত্রাও বেড়ে গেছে। গত কয়দিন আগে নিউ সাউথ ওয়েলসের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেখানে আগুনে এক হাজার ৫শ ৮৮ বাড়ি-ঘর আগুনে পুড়ে গেছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও ৬শ ৫৩ বাড়ি-ঘর। প্রতিবেশী ভিক্টোরিয়াতে প্রায় ২শ বাড়ি আগুনে ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া অন্যান্য রাজ্যে আরও প্রায় শতাধিক বাড়ি-ঘর আগুনে পুড়ে গেছে।

উদ্ধারে সেনা বাহিনী
কিছুতেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না অস্ট্রেলিয়া সরকার। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে কোয়েলা, প্লাটিপাসের মতো প্রাণী। এমতাবস্থায় আগুন নিয়ন্ত্রণে তিন হাজার সেনা মোতায়েন করে দেশটির সরকার যা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এই প্রথম ঘটতে যাচ্ছে। এক সংবাদ সম্মেলনে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন এ ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন্ডা রেনল্ডস বলেছেন, দুর্যোগ মোকাবেলায় সেনা মোতায়েনের ঘটনা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এ প্রথম ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে অস্ট্রেলিয়ার দাবানলে ভয়ঙ্কর সব ভিডিও। কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, আগুনের লেলিহান থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলবর্তী অঞ্চলের ক্যাঙ্গারুরা। নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের মধ্য-দক্ষিণ উপকূলবর্তী অঞ্চলে অসংখ্য কোয়ালার পোড়া মৃত দেহ দেখা গেছে। বিভিন্ন স্থানে কাকাতুয়া, বাদুড়সহ অন্য অনেক পাখি মরে গাছের নিচে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। আগুন থেকে বাঁচতে আশ্রয় নেয়া কৃষকদের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

আশার আলো
দাবানলে কয়েক মাস ধরে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাবানলে প্রায় সাড়ে ছয় মিলিয়ন হেক্টর জমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু এলাকায় ধ্বংসস্তুপ ভেদ করে প্রাণের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অল্প অল্প করে গজিয়ে উঠতে শুরু করেছে ঘাস ও গাছের চারা।
ফটোগ্রাফার মারি লোয়ে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস অঞ্চলের কাছে সমুদ্র তীরবর্তী কুলনারা এলাকায় গিয়ে এমন কিছু ছবি তুলে এনেছেন। এসব এলাকায় মাটির ওপর জমে থাকা আগুনের ছাইয়ের ওপর হেঁটে হেঁটে সবুজ ঘাস এবং পুড়ে যাওয়া গাছের গুড়িতে নতুন করে গজিয়ে ওঠা গোলাপি রঙের কুঁড়ি দেখতে পেয়েছেন তিনি। আর সঙ্গে সঙ্গেই ছবি তুলে রেখেছেন।
৭১ বছর বয়সী এই ফটোগ্রাফার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার তোলা ছবি পোষ্ট করার পর তা হাজার হাজার শেয়ার হয়েছে। ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের মাঝেই মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে এসব ছবি।

উট হত্যা
অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় খরাপ্রবণ এলাকায় ১০ হাজারের বেশি উটকে গুলি করে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় আদিবাসীরা বলছে, বন্য উট বেশি পরিমাণে পানি পান করে। তাদের ফাঁপা পেট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী। সে কারণে হেলিকপ্টার থেকে পেশাদার শ্যুটার দিয়ে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তথ্য মতে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের আনানজু পিতজানৎজাতজারা ইয়ানকুনিৎজাতজারা ল্যান্ডস (এওয়াইপি) এলাকার আদিবাসী নেতারা উটগুলোকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। ৮ জানুয়ারি হেলিকপ্টার থেকে উটগুলোকে গুলি করে হত্যার কাজ শুরু করা হয়। এজন্য পেশাদার শ্যুটারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এওয়াইপি নির্বাহী বোর্ডের সদস্য মারিতা বেকার সংবাদমাধ্যম দ্য অস্ট্রেলিয়ানকে জানিয়েছেন, ‘আমরা দুর্গন্ধময় গরম, অস্বস্তিকর অবস্থা ও অসুস্থ পরিবেশের মধ্যে আটকে আছি। কারণ উটগুলো এখানে আসে, আমাদের বেড়া ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে এবং পানি পাওয়ার চেষ্টা করে।’
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছে, পানির জন্য বিভিন্ন স্থানে হানা দিচ্ছে ওই বন্য উটগুলো।

বৃষ্টির জন্য নামাজ
বৃষ্টির জন্য নামাজ আদায় করেছেন দেশটির সব ধর্মাবলম্বী মানুষ। ব্রিটিশ দৈনিক ডেইলি মেইল ও আমিরাতের দৈনিক খালিজ টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের আয়োজিত নামাজের জামাতে যোগ দিয়েছিলেন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষও। ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে বৃষ্টির জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছেন তারা।
আশ্চর্যজনক হলেও রোববার অ্যাডিলেডের বোনিথন পার্কে নামাজের পর দাবানলে জ্বলতে থাকা অস্ট্রেলিয়ায় নেমে আসে স্বস্তির বৃষ্টি। দেশটির কিছু অংশে বৃষ্টির কারণে সাময়িকভাবে তাপমাত্রা কমে গেলেও কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আগুন আবার জ্বলবে। সিডনি থেকে মেলবোর্ন পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে হালকা বৃষ্টি হয়েছে। ভয়াবহ দাবানলে জ্বলতে থাকা নিউ সাউথ ওয়েলসের কিছু অংশে হয়েছে ভারী বৃষ্টিপাত। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, বৃহস্পতিবার ফের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে ভিক্টোরিয়া এবং নিউ সাউথ ওয়েলসে আগুনের মাত্রা আরও তীব্র হতে পারে।

হাতি মিছিল
অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলে নিহত লক্ষ লক্ষ প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মৌন মিছিল করেছে থাই হাতি এবং স্কুল শিক্ষার্থীরা। ১৩ জানুয়ারি একটি থাই হাতি শিবিরে স্থানীয় পর্যটন কেন্দ্র এলিফ্যান্ট প্যালেস ও রয়্যাল ক্রালের আয়োজনে এ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে হাতি এবং তাদের মাহুতরা ‘অস্ট্রেলিয়ার জন্য প্রার্থনা করুন’ লেখা সংবলিত প্ল্যাকার্ড ধারণ করেছিলো। এ সময় বিভিন্ন প্রাণীর ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ডও দেখা যায় তাদের হাতে। বলে রাখা ভালো, থাইল্যান্ডের সংস্কৃতিতে হাতি একটি উল্লেখযোগ্য প্রাণী।

ভুয়া ছবি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওয়ালজুড়ে ভাসছে দাবানলের ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ সব ছবি। বিশেষ করে নানা ধরনের পশুপাখির দগ্ধ ছবি। সম্প্রতি এমনই অনেক ছবি নাড়া দিয়েছে পশুপ্রেমীদের। তবে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানাচ্ছে, এসব ছবির মধ্যে অনেকগুলোই ভুয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দগ্ধ একটি বাঘের ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। ইউনিভার্সিটি অব সিডনির সোর্স দিয়ে মি. ফ্লাপি পিএএইচ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ৫ জানুয়ারি ছবিটি পোস্ট করা হয়। এএফপি বলছে, গ্রাফিক ছবিটি ভুয়া। ২০১২ সালে ইন্দোনেশিয়ার একটি ছবি এটি। ওই সময় কর্তৃপক্ষ কিছু বাঘের মূর্তি আগুন দিয়ে ধ্বংস করে। আসল ছবিটি আন্তর্জাতিক ফটো এজেন্সি শাটারস্টক সম্পাদকীয়র তোলা একটি ছবি, যা ২০১২ সালের ১২ নভেম্বর প্রকাশিত হয়। সেই ছবি অস্ট্রেলিয়ার দাবানলের বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। এমন আরও অনেক ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার মধ্যে আছে, দাবানল থেকে কোয়েলা বাঁচাল ছোট্ট মেয়ে, উদ্ধারের পর ক্যাঙারুর কৃতজ্ঞতা, বৃষ্টিতে ফায়ার সার্ভিস কর্মীর আনন্দ।
এছাড়া আছে, দাবানল থেকে বাঁচতে পানিতে আশ্রয় নিয়েছে একটি পরিবার। চারদিকে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া, দাবানলের প্রভাবে লাল হয়ে আছে চারপাশ। একটি জেটির পাশে পানিতে নেমে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছেন এক নারী। ছবিটি আসলে ২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়ায় ঘটা দাবানলের সময় তোলা হয়েছিল।