আলোচিত ঘটনা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০ | ১৬ চৈত্র ১৪২৬

আলোচিত ঘটনা

বিবিধ ডেস্ক ৪:৩১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০১, ২০২০

print
আলোচিত ঘটনা

ভালো-মন্দ মিলিয়ে শেষ হয়ে গেল আরও একটি বছর। আজ থেকে শুরু নতুন বছর। দেখে নেওয়া যাক গত বছরের আলোচিত কিছু ঘটনা। যেসব ঘটনা দেশের প্রত্যেক মানুষের হৃদয়কে নাড়িয়ে দিয়েছে। কাঁপিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রকে। আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ, ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি, হত্যাকাণ্ড, গুজব, পেঁয়াজ। এ ছাড়া ছেলেধরাসহ আছে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যু। সমস্ত ধকল সয়ে আমাদের দুয়ারে এসেছে আরেকটি বছর। নতুন বছরে খোলা কাগজ পরিবারের পক্ষ থেকে সব পাঠককে শুভেচ্ছা-

সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ

গত ৩ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে শুরুতে শপথ নেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। পরে সংসদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। শপথ নেওয়ার সময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা। পরে সদস্যদের শপথের কাগজে স্বাক্ষর করতে বলেন। পরবর্তী কার্যক্রম হিসেবে সাংসদদের রেজিস্ট্রারে স্বাক্ষর করতে বলা হয়।

আওয়ামী লীগের সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, তরিকত ফেডারেশন, জাতীয় পার্টি-জেপির সদস্যরা শপথ নেন। এরপর শপথ নেন জাতীয় পার্টির সদস্যরা। এর আগে, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হয়। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পায় আওয়ামী লীগ। এতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৮৮ আসনে জয়লাভ করে। আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ৭টি আসনে জয়ী হয়। তবে তখন শপথ নেননি বিএনপির ৫ ও গণফোরামের ২ নির্বাচিত প্রতিনিধি। বাকি দুটি আসনের মধ্যে গাইবান্ধা-৩ আসনে একজন প্রার্থী মারা যাওয়ায় সে সময় সেখানে নির্বাচন হয়নি। এ ছাড়া ব্রাক্ষণবাড়িয়া-২ আসনের তিনটি কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচন হবে বলে ফল স্থগিত থাকে।

এরশাদের মৃত্যু
একাধারে নিন্দিত, একাধারে নন্দিত। একদিকে স্বৈরাচার, অন্যদিকে ‘হামাক ছাওয়াল’। ৮৯ বছরের দীর্ঘ জীবন নানা চড়াই-উৎরাইয়ে ঘটনাবহুল। বিতর্কও পিছু ছাড়েনি কখনোই। বাংলাদেশের রাজনীতির আনপ্রেডিক্টেবল বলে পরিচিত এরশাদের দাফন নিয়েও চলে নানা নাটকীয়তা। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জন্ম ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, অবিভক্ত ভারতের কোচবিহার জেলার দিনহাটায়। পড়াশোনা ভারতের কোচবিহারেই শুরু। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে এমএ ক্লাসে পড়ার পাশাপাশি ভর্তি হন ল’ কলেজে। বিশ^বিদ্যালয়ের ক্রীড়া দলের তিনি ছিলেন কৃতী খেলোয়াড়। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে নিয়োগ লাভ করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি লাভের পর ১৯৬৯-৭০ সালে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় অর্থাৎ ১৯৭১-৭২ সালে সপ্তম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন এরশাদ।

১৯৭৩ সালে এরশাদকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৯ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৬ সালে তার উদ্যোগে ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় জাতীয় পার্টি। দলের চেয়ারম্যান হন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়ার ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে এরশাদের নেতৃত্বে ২২টি আসন পায় জাতীয় পার্টি। ৮৯ বছর বয়সে জেনারেল এরশাদ এই সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হন।

শেষ মাসখানেক ছিলেন বিছানাতেই। উঠে বসলেও হুইলচেয়ার ছাড়া চলাফেরা করতে পারেননি। ১৪ জুলাই সকাল পৌনে ৮টায় এরশাদের মৃত্যুর ঘোষণা দেন হাসপাতালের ডাক্তাররা।


ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি
ক্যাসিনো এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। রাজধানী ঢাকায় এর বিশালকার অস্তিত্বের খবর জেনে চমকে গেছেন সবাই। আয়ের উৎস হিসেবে দেশের অনেক ফুটবল ক্লাবে ‘হাউজি’ খেলা শুরু হয় আশির দশকের দিকে। তবে নব্বইয়ের দশকে জুয়ার আসরও জমে ওঠে। গত কয়েক বছরে তা আরও ভয়াবহ মাত্রা পায়। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের অনেক ক্লাবেই গড়ে ওঠে ক্যাসিনো। জাতীয় দৈনিকে ক্যাসিনো নিয়ে প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রতিবেদন হয় ২০১৩ সালে।

২০১৭ সালে আরেকটি দৈনিকে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে তুলে ধরা হয় ক্লাবভিত্তিক রেস্টুরেন্টগুলোতেও পশ্চিমা ধাঁচের অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা জমে ওঠার তথ্য। বলা হয়, প্রশিক্ষিত জুয়াড়ি আনা হচ্ছে বিদেশ থেকে, তাদের কাজে লাগিয়ে ক্লাবগুলোতে প্রতি রাতে বসানো হচ্ছে জুয়ার আসর। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দু-একটি ক্লাবে অভিযান চালালেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বরং ক্যাসিনোর বিস্তার আরও বেড়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের সহযোগী সংগঠন যুবলীগের নেতাদের কঠোর সমালোচনা করেন।

তারপর যুবলীগ নেতারা ৬০টি জুয়ার আখড়া বা ক্যাসিনো চালাচ্ছেন বলে কয়েকটি সংবাদপত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরপরই ক্যাসিনোতে অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, মদসহ আরও অনেককিছু।


অগ্নিকাণ্ড
২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। রাত পৌনে ১১টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এতে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। জানা যায়, সেখানে কেমিক্যালের গোডাউন থাকায় আগুন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এ অগ্নিকাণ্ডে ৭৮ জন নিহত হন। এছাড়া অগ্নিদগ্ধ ও আহত অন্তত ৬০ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। মর্মান্তিক এ মৃত্যু মিছিলের বীভৎসতা চোখে দেখার মতো ছিল না। কোনো ব্যাগে লাশের নিচের অংশ আছে, আবার উপরের অংশ নেই। হাত আছে, পা নেই। হতাহত হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের ভিড় দেখা যায় হাসপাতালে। প্রিয়জনের খোঁজে ছোটেছেন জরুরি বিভাগ থেকে মর্গে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পড়ে থাকা লাশের সারি থেকে প্রিয়জনকে অনেকে চিনতেও পারেন না। মোবাইল ফোনে ছবি দেখিয়ে খোঁজেন স্বজনদের। কেউ প্রিয় সন্তান, কেউবা বাবা এবং অনেকে ভাইকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। স্বজনদের কান্নায় হাসপাতাল ও চকবাজারের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তাদের সান্ত্বনা দিতে গিয়েও অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সে এক হৃদয়-বিদারক দৃশ্য। দুর্ঘটনাকবলিত ভবনের দ্বিতীয় তলায় কেমিক্যাল কারখানা থাকায় আগুন দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টায় চকবাজার এলাকা রূপ নেয় ‘মৃত্যুপুরীতে’।

পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ৩৬ দিনের মাথায় বড় ধরনের আগুন লাগে অভিজাত এলাকা বনানীর বহুতল ভবন ফারুক-রূপায়ণ (এফআর) টাওয়ারে। চলতি বছরের ২৮ মার্চের ঘটনা। দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটের দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এতে ২৫ জনের মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিস, সেনা, নৌ, বিমান এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ৬ ঘণ্টা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহতের মধ্যে কারও মৃত্যু হয়েছে আগুনে পুড়ে, ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে। শ্রীলঙ্কার এক নাগরিকসহ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে বাঁচার চেষ্টায় লাফিয়ে পড়ে।

অগ্নিকাণ্ডের সূচনার ঘণ্টাখানেক পেরিয়ে যাওয়ার পর সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর উদ্ধারকর্মীরাও অভিযানে যোগ দেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবীরা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও স্বেচ্ছাসেবীর ভূমিকায় নামেন। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের অ্যাম্বুলেন্স আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দেয়। হেলিকপ্টার থেকেও ওই ভবনের ওপর পানি ছিটাতে দেখা যায়। উদ্ধার কাজে থাকা ফায়ার সার্ভিস কর্মী সোহেল রানা মারাত্মকভাবে আহত হন। তিনি সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে মারা যান।


হত্যাকাণ্ড
নুসরাত জাহান রাফী। প্রতিবাদী এক নাম। এবার আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন নুসরাত। ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিমের পরীক্ষার্থী ছিলেন রাফী। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন তিনি। নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এ সময় তাকে কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে দিয়ে আগুন দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ নুসরাত পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হার মানেন। ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান তিনি।

বছরের আরেকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে, ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ার জেরে গত ৬ অক্টোবর রাতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী। দেশব্যাপী আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে বুয়েটে দুই মাসের বেশি একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকে। পরে আবরার হত্যার আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়ার পর বুয়েট কর্তৃপক্ষ ২৬ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করলে গত ৪ ডিসেম্বর থেকে একাডেমিক কার্যক্রমে যোগ দেন শিক্ষার্থীরা।

অপর আলোচিত হত্যাকাণ্ড গত ২৬ জুন বরগুনায়। বরগুনা সরকারি কলেজ রোডে স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে জখম করা হয় রিফাত শরীফকে। পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার সেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে তা পুরো দেশবাসীকে নাড়িয়ে দেয়। হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত নয়ন বন্ড গত ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।


ঘূর্ণিঝড়
ফণী বছরের একটি আতঙ্কের নাম। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপ এক সপ্তাহ আগে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। নাম হয় ফণী। ঘূর্ণিঝড়টির নাম দিয়েছে বাংলাদেশ, এর অর্থ সাপ (ফণা আছে যার)। ১৯৭৬ সালের পর এপ্রিল মাসে ভারতীয় মহাসাগরীয় অঞ্চলে এত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি হয়নি ভারত।

২৬ এপ্রিল ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় মহাসাগরে সুমাত্রার পশ্চিমে গঠিত একটি ক্রান্তীয় নিম্নচাপ থেকে সৃষ্টি হয়। এর আগে যৌথ টাইফুন সতর্কতা কেন্দ্র (জেটিডব্লিউসি) উত্তর ভারত মহাসাগরে গঠিত একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় নিম্নচাপ পর্যবেক্ষণ করছিল এবং একে ০১বি শনাক্তকারী দিয়ে চিহ্নিত করে। ফণী ধীরে ধীরে পশ্চিমাভিমুখে সরে যায় এবং আরও শক্তিশালী হতে থাকে। নামকরণের দুই দিন পর, মৌসুমের দ্বিতীয় নামাঙ্কিত ঘূর্ণিঝড় ফণী তীব্রতর হয়ে ওঠে। ফণী উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে, এই সময়ে মাঝারি উল্লম্ব বায়ুর বিভক্তি একে তীব্রতর হতে বাধা দিচ্ছিল। বায়ু বিভক্তি থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর, ফণী দ্রুত তীব্রতর হতে শুরু করে এবং ৩০ এপ্রিল, ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে একটি অত্যন্ত তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়, যা মৌসুমের প্রথম তীব্র ঘূর্ণিঝড়। ফণী প্রবলমাত্রার ঘূর্ণিঝড় হিসেবে ২ মে এর তীব্রতার শিখরে পৌঁছায়, যা চতুর্থ শ্রেণির হ্যারিকেনের সমতুল্য। উপকূলে আঘাত হানার আগে পর্যন্ত ফণীর তীব্রতা বজায় রেখে চলে, উপকূলে আঘাত হানার পর ফণীর তীব্রতা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। পরদিন, ফণী দুর্বল হয়ে ক্রান্তীয় ঝড় হিসেবে কলকাতা ও পরে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যায়।

ঘূর্ণিঝড় ফণী উপকূলে আঘাত হানার পূর্বে, ভারত ও বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ ঘূর্ণিঝড়ের অভিক্ষিপ্ত গতিপথ থেকে উচ্চতর স্থল এবং ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে লক্ষাধিক মানুষকে সরিয়ে নেন। ১২ মে, ২০১৯ অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশে মোট ৮৯ জনের মৃত্যু হয়। ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে প্রায় ১,৫২,৮৩,২৭,৮০,০০০ টাকার ক্ষতি হয়, যায় বেশিরভাগই হয় ওড়িশায়।

বছরের দ্বিতীয় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের ঘটনা ঘটে নভেম্বরে। উত্তর আন্দামান সাগরে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের উৎপত্তি ঘটে। ৫ নভেম্বর প্রথমে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়, যা পরদিন অর্থাৎ ৬ নভেম্বর গভীর নিম্নচাপ এবং ৭ নভেম্বর দুপুরে নিম্নচাপ শক্তিশালী হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। ঐদিন রাতেই এটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী রাষ্ট্রগুলো নিয়ে গঠিত ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিল ফর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিকের (এসক্যাপ) ৮ সদস্যের প্যানেল সবার সম্মতির ভিত্তিতে নতুন ঘূর্ণিঝড়ের নাম বছরের শুরুতেই নির্ধারণ করে থাকে। সে মতে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের নামকরণ প্রস্তাব করে পাকিস্তান।

বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে গাছ পড়ে, ঘর ধসে এবং অসুস্থতাজনিত কারণে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল চলমান সময়ে আটজন ব্যক্তির মৃত্যু সংবাদ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে আহত হন পনেরো জন। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে ৯, ১১ ও ১২ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শ্রেণির পরীক্ষা, সব জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ তিনটি সমুদ্রবন্দর ও সকল প্রকার নৌপরিবহন বন্ধ ঘোষণা করে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে সৃষ্ট বিরূপ আবহাওয়ার কারণে যশোর, বরিশাল, কক্সবাজার, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের সকল উড্ডয়ন বাতিল করা হয়।


পেঁয়াজ
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে মোড়ের চায়ের দোকান- পেঁয়াজ নিয়ে আলোচনা সর্বত্র। যেন একটা তুলকালাম কাণ্ড! নিত্যনৈমত্তিক এ পণ্যটির খুচরা মূল্য গিয়ে দাঁড়াল দু’শ টাকার উপরে! সাধারণ মানুষ বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি। তাই তারা এই বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তার প্রভাব পড়েছে সামাজিক মাধ্যমেও। সেখানে অনেকেই এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি রসিকতাও করতে করেছেন।

খুচরা বাজারে ভালো মানের দেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি ২৪০-২৫০ টাকা, মিয়ানমারের পেঁয়াজ ২২০-২৩০ টাকা এবং চীন-মিসরের বড় পেঁয়াজ ১৬০-১৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি করেছেন বিক্রেতারা। সব মিলিয়ে টিসিবির হিসাবে গত বছরের এ সময়ের তুলনায় পেঁয়াজের দাম ছিল ৪২৩ শতাংশ বেশি।

পেঁয়াজের এই সংকটের শুরু সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে। ভারত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রথম পেঁয়াজ রপ্তানিতে ন্যূনতম মূল্য ৮৫০ ডলার নির্ধারণ করে দেয়। এরপরের ধাক্কা আসে ২৯ সেপ্টেম্বর, ভারত রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এ ধাক্কায় ৫০ টাকার পেঁয়াজ ১৫০ টাকা ছাড়ায়, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দর। এরপর লাফ দিয়ে পেঁয়াজের দর প্রতি কেজি ২৫০ টাকায় ওঠে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতের পর। এরপর দাম কিছুটা কমেছিল। তারপর আবার বাড়ে। তারপর যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে পণ্যটির দাম বেড়েছিল। ঠিক একই ভাবে তার কমতে থাকে এবং অনুকূল মূল্যে চলে আসে পণ্যটি।


গুজব
কিছুদিন আগে ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনির হার এমনভাবে বেড়ে গিয়েছিল, যাতে পুরো দেশ কেঁপে উঠেছে। যে গুজবের বলি হয়েছেন নিরপরাধ সাধারণ মানুষ। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত সাতজন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। সব ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীকে ছেলেধরা হিসেবে সন্দেহ করে তার ওপর চড়াও হয়েছে একটি চক্র। গুজবটি এতই ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে ছিল যে, এটি নিরসনে সেতু কর্তৃপক্ষ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দু’দফায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। কিন্তু তারপরও তা সাধারণ মানুষকে সামান্য পরিমাণেও আশ্বস্ত করতে পারছিল না। বাংলাদেশে যেমন ছেলেধরা আতঙ্ক নতুন না, তেমনই গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনাও নতুন নয়।

পরিসংখ্যান যাচাই করলে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রতি বছরই সারা দেশে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে গণপিটুনিতে। ২০১১ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত গণপিটুনিতে দেশে প্রায় ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যেগুলোর কোনোটা ছেলেধরা বা ডাকাত সন্দেহে, আবার কোনো কোনো ঘটনায় সামান্য চোর সন্দেহেও পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরেও ছেলে ধরা গুজবে বেশ কয়েকটি গণপিটুনির ঘটনায় মৃত্যু ঘটে। তারমধ্যে গত ২০ জুলাই সন্তানের ভর্তির খোঁজ নিতে গিয়ে রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনিতে নিহত হন তাসলিমা বেগম রেণু। তাসলিমা মূলত ওই স্কুলে তার দুই সন্তানের ভর্তির বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন। পরে পিটিয়ে মারার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এর বাইরে, পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজে মানুষের কাটা মাথা লাগবে বলে সারা দেশে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। এই কিছুদিন আগেও এই গুজবকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের অবস্থা ছিল উত্তাল। গুজব প্রতিরোধে মাঠে নামতে হয়েছিল পুলিশকে। অপর আরেকটি হলো, ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নিখোঁজ’ শিরোনামের একটি গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল দেশময়। অবশ্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের ‘গুজব প্রতিরোধ ও অবহিতকরণ সেল’ সেটাকে সফলতার সঙ্গেই মোকাবেলা করেছে। এর বাইরে টাকা নিয়ে আরেকটি গুজব ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিযুক্ত একটি একশ’ টাকার নোট ভাইরাল হয়। অবশ্য সে খবরটিকে ভুয়া বলে উড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

অপর গুজবটি হলো, বাজারে চালু থাকা ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল হয়ে যাচ্ছে, এমন একটি গুজব বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে সম্প্রতি। ক্যাসিনো বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিপুল টাকা উদ্ধারের পর অবৈধ অর্থ ধরতে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট সরকার বাতিল করতে যাচ্ছে বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখি শুরু হয়। আর সেই গুজবই ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।


ডেঙ্গুজ্বর
এ বছর সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ছিল ডেঙ্গু। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই এপ্রিল-মে মাসের দিকে রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গু হু হু করে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এই রোগ। সরকারি হিসাবে ডেঙ্গুতে ১১২ জনের মৃত্যুর কথা জানানো হয়েছে। তবে বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে অনেকে মনে করেন। অন্য বছরের তুলনায় এবার প্রচণ্ড জ্বর তেমন একটা দেখা যায়নি। বরং জ্বর ভালো হওয়ার পর রোগী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকতেন।

এবার ডেঙ্গুতে মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, যকৃত ও কিডনির মতো সংবেদনশীল অঙ্গ আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যু বেশি হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় (১৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত) রাজধানী ঢাকায় ১৫৬ জন ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে নতুন ৩৭১ জনসহ সারা দেশে ৫২৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। এ ছাড়া দেশে এবার গত আগস্ট মাসে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫০ হাজারের বেশি।