ঐতিহ্যের খেজুর রস

ঢাকা, শনিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২০ | ১২ মাঘ ১৪২৬

ঐতিহ্যের খেজুর রস

রাশেদ রহমান ৩:২৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯

print
ঐতিহ্যের খেজুর রস

খেজুর গাছের জন্মস্থান হিসেবে আরবের মেসোপটেমিয়াকেই বিবেচনা করা হয়। তবে আমাদের দেশীয় খেজুর গাছের উচ্চতা ১০-১৫ মিটার হয়ে থাকে। গ্রামবাংলার এই জাতটিকে বুনো জাত হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়।

খেজুর গাছ ছয়-সাত বছর বয়স থেকে রস দেওয়া শুরু করে। পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছর পর্যন্ত রস দেয়। গাছ পুরনো হয়ে গেলে রস কমে যায়। আর পুরনো খেজুর গাছের রস খুব মিষ্টি হয়। মাঝ বয়সী গাছ থেকে সবচেয়ে বেশি রস পাওয়া যায়। বেশি রস সংগ্রহ করা গাছের জন্য অবার অনেক ক্ষতিকর। রস সংগ্রহের জন্য কার্তিক মাসে খেজুর গাছ কাটা শুরু হয়। কার্তিক মাস থেকেই রস পাওয়া যায়। রসের ধারা চলতে থাকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। শীতের সঙ্গে রস ঝরার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। শীত যত বেশি পড়বে তত বেশি রস ঝরবে। রসের স্বাদও তত মিষ্টি হবে। অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ মাস হলো রসের ভর মৌসুম।

এই বুনো গাছটির রস কাঁপতে কাঁপতে চুমক দেওয়ার মজাটাই আলাদা। এই শীতের কুয়াশা ঢাকা সকালে গ্রামে ঘুম থেকে খুব ভোরে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে খড়কুটোয় আগুন জ্বেলে হাত-পা গরম করার মতোই আনন্দের খেজুর রস। রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে গুড়। সেই গুড়ের আবার রকমফের আছে। যেমন, পাটালি গুড়, ঝোলা গুড়। এসব গুড় বিভিন্নভাবে খাওয়া হয়। শীতের খেজুর গাছের রস ধেকে যে গুড় তৈরি হয় তা দিয়ে দুধের পিঠা, পুলি পিঠা, সেমাই পিঠা আরও কত পিঠাই না তৈরি হয়।

পাটালি গুড় দিয়ে মুড়ির মোয়া খাওয়া ও ঝোলা গুড় দিয়ে মচমচে মুড়িও গ্রাম বাংলার একটি পরিচিত খবার। খেজুরের রস দিয়ে তৈরি রসের পিঠা খুবই সুস্বাদু হয়ে থাকে। আর খেজুর গুড়ের প্রচলিত সন্দেশও হয়।

রস সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি বেশ শ্রমসাধ্য। গাছ কাটার জন্য গাছের মাথার এক দিকের শাখা কেটে চেঁছে পরিষ্কার করে সেই কাটা অংশেরই নিচ বরাবর দুটি খাঁজ কাটার প্রয়োজন পড়ে। সে খাঁজ থেকে কয়েক ইঞ্চি নিচে একটি সরু পথ বের করা হয়। এই সরু পথের নিচে বাঁশের তৈরি নলী বসানো হয়। এই নলী বেয়ে হাঁড়িতে রস পড়ে। নলীর পাশে বাঁশের তৈরি খিল বসানো হয়। সে খিলেই মাটির হাঁড়ি টাঙিয়ে রাখা হয়। বিকাল থেকে হাঁড়িতে রস জমা হতে হতেই সারা রাত্রিতে হাঁড়ি পূর্ণ হয় যায়। গাছ কাটার পর দুই-তিন দিন রস পাওয়া যায়। প্রথম দিনের রসকে বলে জিরান কাট। জিরান কাট রস খুবই সুস্বাদু। প্রথম দিনের রস থেকে ভালো পাটালি গুড় তৈরি হয়। দ্বিতীয় দিনের রসকে বলে দোকাট। তৃতীয় দিনের রসকে বলে তেকাট। রসের জন্য খেজুর গাছে একবার কাটার পর আবারও পাঁচ-ছয় দিন পর কাটতে হয়। গাছের কাটা অংশ শুকানোর জন্য এ সময় দেওয়া প্রয়োজন পড়ে। খেজুর গাছ কাটা অংশ শুকানোর সুবিধার জন্যই সাধারণত পূর্ব ও পশ্চিম দিকে গাছ কাটা হয়। যাতে সূর্যের আলো সরাসরি কাটা অংশে পড়ে।

গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করা হয়। হাঁড়িকে কেউ কেউ ভাঁড়ও বলে থাকেন। ভাঁড়টি খুব ছোট আকৃতির হয়ে থাকে। মাঝারি আকৃতির দশ বা পনেরো ভাঁড় রস জ্বাল দিয়েই এক ভাঁড় গুড় হয়। সেই এক ভাঁড় গুড়ের ওজন ছয় থেকে আট কেজির মতো বলা চলে। গুড় তৈরির জন্য রস জ্বাল দেওয়া হয় মাটির জালায় বা টিনের তাপালে। খুব সকালে রস নামিয়ে এনেই জ্বালানো হয়। জ্বাল দিতে দিতে এক সময় রস ঘন হয়ে গুড় হয়ে যায়। এ গুড়ের কিছু অংশ তাপালের এক পাশে নিয়ে বিশেষভাবে তৈরি একটি খেজুর ডাল দিয়ে ঘষতে হয়। ঘষতে ঘষতে এই অংশটুকু শক্ত হয়ে যায়। আর শক্ত অংশকেই আবার কেউ কেউ বীজ বলে থাকে। বীজের সঙ্গে তাপালের বাকি গুড় মিশিয়ে স্বল্পক্ষণের মধ্যে গুড় জমাট বাঁধতে শুরু করে। তখন এ গুড় মাটির হাঁড়ি বা বিভিন্ন আকৃতির পাত্রে রাখার প্রয়োজন পড়ে। সে গুড় দেখলে বোঝা যাবে, একেবারে জমাট বেঁধে পাত্রের আকৃতি ধারণ করেছে।

তা ছাড়া সারা দেশে খেজুর গুড়ের একটি অর্থনৈতিক উল্লেখযোগ্য দিকও আছে। খেজুরের রস দিয়ে তৈরি শরীয়তপুরের ঝোলা গুড়ের নাম রয়েছে দেশব্যাপী। চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জে বাজারে প্রতি হাটের দিন গড়ে ২৫০-৩০০ টন খেজুর গুড় বিক্রি হয়। যার বিক্রয় মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা।

খেজুর রস বা খেজুর গুড় এ দেশের খাদ্য সংস্কৃতির একটি অবধারিত অংশ। প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা এই খেজুর রস, খেজুর গুড় দেশের প্রতিটি মানুষের প্রতিবছরকার স্মৃতি। শীত মানে খেজুর রস; খেজুর রস ছাড়া যেন শীতটা জমতেই চায় না। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি, শীতের এই অবধারিত উপাদানের উৎসব, খেজুর গাছ, যা আশঙ্কাজনকভাবে দেশে কমে যাচ্ছে। সেদিকে এখন আমাদের মনোযোগ দেওয়ার সময় হয়েছে।