বাতাস যখন বিষ

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বাতাস যখন বিষ

বিবিধ ডেস্ক ২:১৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৯, ২০১৯

print
বাতাস যখন বিষ

বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের জ্বলন্ত সমস্যা বায়ুদূষণ। সর্বশেষ জরিপে দূষণের মাত্রায় বাংলাদেশ উঠে এসেছে এক নম্বরে। অন্যদিকে নয়াদিল্লিকে ‘গ্যাস চেম্বার’ ঘোষণা করেছেন সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী। তাছাড়া সব মিলিয়ে বিশ্বের শতকরা নব্বই জন বায়ুদূষণের শিকার। দিনে দিনে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে উঠছে বিষয়টি-

এক নম্বর বাংলাদেশ
বিশ্বে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশ এখন বাংলাদেশ। বায়ুদূষণের দিক দিয়ে বাংলাদেশের ধারে কাছেও নেই কোনো দেশ। প্রায় ২১ পিএম কম বায়ুদূষণ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। এরপর ভারত, আফগানিস্তান, বাহরাইন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজ্যুয়ালের সর্বশেষ তথ্যএগুলো। তাদের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে গড় বায়ুদূষণের পরিমাণ ৯৭ দশমিক ১০, যেখানে পাকিস্তানের ৭৪ দশমিক ২৭, ভারতের ৭২ দশমিক ৫৪, আফগানিস্তানের ৬১ দশমিক ৮০ এবং বাহরাইনের ৫৯ দশমিক ৮০ পিএম২.৫।

এয়ার ভিজ্যুয়াল ঘণ্টায় ঘণ্টায় বায়ুদূষণের তথ্য হালনাগাদ করে। গত সোমবার (২৫ নভেম্বর) সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বিশ্বে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের মধ্যে ৫ নম্বরে ছিল ঢাকা। ওই সময় ঢাকা শহরে বায়ুদূষণের পরিমাণ ছিল ১৭১ পিএম। তখন ২০৯ পিএম নিয়ে প্রথমে ভারতের দিল্লি, তারপর ১৯২ পিএম নিয়ে পাকিস্তানের লাহোর, ১৮৭ পিএম নিয়ে কলকাতা ও ১৮২ পিএম নিয়ে মঙ্গলিয়ার উলানবাতর চতুর্থ স্থানে ছিল। তীব্র বায়ুদূষণের ফলে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ সতর্কতা জারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হলেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।

‘গ্যাস চেম্বার’ দিল্লি
মারাত্মক বায়ুদূষণে নাকাল নয়াদিল্লির বাসিন্দারা। দূষণ মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ভারতের রাজধানী এখন ‘গ্যাস চেম্বারে’ পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। স্কুলে স্কুলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দূষণরোধী মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে সেখানে। এ পর্যন্ত ৫০ লাখ মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আম আদমি পার্টির এ নেতা দিল্লির বায়ুদূষণের জন্য পার্শ্ববর্তী দুই রাজ্য পাঞ্জাব ও হরিয়ানাকেও দায়ী করেছেন। দুই রাজ্যের প্রশাসন কৃষকদের নাড়া পোড়াতে বাধ্য করায় রাজধানীর এ বেহাল অবস্থা বলেও অভিযোগ করেন তিনি। স্কুল শিক্ষার্থীদের পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখতেও পরামর্শ দিয়েছেন কেজরিওয়াল। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং ও হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খাট্টারের নাম উল্লেখ করে বলেন, তোমরা ক্যাপ্টেন আঙ্কেল ও খাট্টার আঙ্কেলের কাছে চিঠি লিখতে পার। বলতে পার, দয়া করে আমাদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে ভাবুন।

কেজরিওয়াল আরও বলেন, পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর ফসলের উচ্ছিষ্ট পোড়ানোর ধোঁয়ায় দিল্লি গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়েছে। আমরা যেন এই বিষাক্ত বাতাসের দূষণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি, সে জন্য সচেষ্ট হতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি স্কুলগুলোতে মাস্ক বিতরণ শুরু করেছি আমরা। খাট্টার এবং ক্যাপ্টেনের সরকার কৃষকদের নাড়া পোড়াতে জোর করছে, যা দিল্লিতে ভয়াবহ দূষণ নিয়ে আসছে।

উৎস
মূলত যান্ত্রিক উৎস থেকে সৃষ্টি হওয়া ধোঁয়া এবং ধুলা থেকে বাতাসে ক্ষুদ্র কণাগুলো ছড়িয়ে পড়ে। মূলত কয়লা ও জৈব জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর কণার সৃষ্টি হয়। ইটভাটা, শিল্প-কারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের ধোঁয়া এবং সড়ক ও ভবন নির্মাণসামগ্রী থেকে তৈরি ধুলায় এগুলো সৃষ্টি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুস সালাম ১০ বছর ধরে ঢাকা ও বাংলাদেশের বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ করে এমন মন্তব্য করেছেন।

অধ্যাপক সালামের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে কয়লা পোড়ানো হয় এমন শিল্প-কারখানার সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে ঢাকাসহ সারা দেশে যে নির্মাণকাজ হচ্ছে, তাতে প্রচুর ধুলা ও ধোঁয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে বাতাসে ওই ক্ষুদ্র কণাগুলো এমনিতেই বেশি পরিমাণে পরিবাহিত হয়। আর এই সময়ে বেশি নির্মাণকাজ চলায় এবং সব কটি ইটভাটা চালু থাকায় দূষণের পরিমাণ বেড়ে যায়।

পরিবেশ অধিদফতরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে যে নির্মাণকাজগুলো হচ্ছে, তাতে সকাল ও বিকেল দুই বেলা নির্মাণসামগ্রী, বিশেষ করে বালু ও ইট পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু রাজধানীর বেশির ভাগ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের নির্মাণসামগ্রী যত্রতত্র ফেলে রেখে ধুলা সৃষ্টি করছে।

এ ছাড়া ২০১৬ সালে পরিবেশ অধিদফতরের কেইস প্রকল্পের আওতায় ঢাকার বায়ুদূষণের উৎস ও ধরন নিয়ে একটি জরিপ হয়েছে। নরওয়ের ইনস্টিটিউট অব এয়ার রিসার্চের মাধ্যমে করা ওই জরিপে দেখা গেছে, ঢাকার চারপাশে প্রায় এক হাজার ইটভাটায় নভেম্বরে ইট তৈরি শুরু হয়। এসব ইটভাটা বায়ুদূষণের জন্য ৫৮ শতাংশ দায়ী।

রোগবালাই
বায়ুদূষণের ফলে শুধু ফুসফুসকেন্দ্রিক রোগ বিস্তার লাভ করতে পারে এমনটি নয়। এর মাধ্যমে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের মতো মারাত্মক রোগও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এ ছাড়া অকাল গর্ভপাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যদি কোনো নারী বায়ুদূষণে আক্রান্ত হন, তাহলে তার গর্ভে থাকা সন্তানটিও এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

আমেরিকার যুদ্ধফেরত সৈন্যদের ওপর এক গবেষণায় দেখা যায়, বায়ুদূষণের কারণে কিডনির কাজে বাধা পড়ে, কিডনির রোগ হয় এমনকি কিডনি ফেইলিওর পর্যন্ত হতে পারে। স্পেন, জার্মানি, সুইডেন এবং নরওয়ের ৪১ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর গবেষণায় দেখা যায়, বায়ুদূষণ বাড়ায় তাদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বা হাইপারটেনশন।


এক্ষেত্রে ওবেসিটির মতোই ক্ষতিকর বায়ুদূষণের মাঝে বসবাস। গবেষণা শুরুর সময়ে তাদের কারওই হাইপারটেনশন ছিল না। সম্ভাবনা আছে জন্মগত ত্রুটিরও।

সম্প্রতি ইঁদুরের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা যায়, গর্ভাবস্থায় বায়ুদূষণের মাঝে থাকলে প্রি-ম্যাচিওর বার্থ এবং জন্মের সময়ে ওজন কম হতে পারে। এ সময়ে ইঁদুরগুলো এমন বায়ুতে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল যাতে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো কণিকা ছিল, যা কিনা দূষিত এলাকাগুলোর মতোই। দেখা যায় গর্ভাবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ে বায়ুদূষণের মাঝে থাকলে প্রিম্যাচিওর বার্থের ঝুঁকি থাকে ৮৩ শতাংশ।

পরের দিকে বায়ুদূষণের কারণে ৫০ শতাংশ ইঁদুর শিশুর ওজন কমে ১১ শতাংশেরও বেশি। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, দূষিত বায়ুতে শ্বাস নেওয়ার ফলে হতে পারে হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন রোগ।

অ্যালকোহল, কফি বা এক্সারসাইজ যেভাবে হার্ট অ্যাটাকের জন্য দায়ী, বায়ুদূষণও সেভাবেই দায়ী।

পরিমাপক যন্ত্র
‘ফ্লো’ একটি বায়ুদূষণ পরিমাপক যন্ত্র। যা সহজেই যে কোনো জায়গায় বহন করা সম্ভব। ‘ফ্লো’ ডিভাইসটি আপনার চারপাশের সব ধরনের বায়ুর গুণমান ও দূষণ চিহ্নিত করতে সক্ষম। ফলে মুহূর্তেই কোন জায়গার দূষণের পরিমাণ কেমন তা আপনি জেনে নেওয়া যায়।

মেগা সিটিতে বসবাসরত মানুষদের জন্য ‘ফ্লো’ ডিভাইসটির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এমনটাই মনে করছেন ‘ফ্লো’-এর নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান প্লুম ল্যাবস। মূলত বায়ুদূষণের কথা মাথায় রেখেই এই ডিভাইসটির ডিজাইন তৈরি করা হয়েছে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।

ফান্সের প্লুম ল্যাবস প্রতিষ্ঠানের সিইও রোমেইন লাকোম্বে বলেন, ডিভাইসটি তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বস্তুকণা, ওজোন, উদ্বায়ী জৈব যৌগ এবং নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড সহজেই ট্র্যাক করার ক্ষমতা রাখে।

‘ফ্লো’ ডিভাইসটি এখন স্মার্টফোনের সঙ্গেও সংযোগ করা যাবে। এর জন্য ‘ফ্লো’-এর অ্যাপটি ডাউনলোড করে ‘ফ্লো’ ডিভাইসের সঙ্গে ব্লুটুথ-এর মাধ্যম সংযোগ স্থাপন করেই অনায়াসে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এ ছাড়াও নিকটবর্তী এলাকায় দূষণের মাত্রাসহ ব্যক্তিগত এক্সপোজার রিপোর্ট দেওয়ারও কাজ করবে এই ডিভাইসটি।

অক্সিজেন বার
পৃথিবীর অন্যতম দূষিত বায়ুর নগরীগুলোর একটি দিল্লি, যেখানে বায়ুদূষণের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে বাতাসের মানসূচকে দিল্লির বাতাসের ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। তাই এই শহরের নাগরিকদের বিভিন্ন ফ্লেভারের সুগন্ধি অক্সিজেন দেওয়ার উদ্দেশে তৈরি হয়েছে ‘অক্সিজেন বার’। শহরবাসীকে একটু স্বস্তি দিতে অভিনব এই উদ্যোগ নিয়েছেন ২৬ বছর বয়সী আর্যবীর কুমার। শহরের সাকেত এলাকায় একটি অক্সিজেন বার খুলেছেন তিনি। ইন্ডিয়া টুডের একটি খবরে বলা হয়, চলতি বছরের মে মাসে যাত্রা শুরু করে আর্যবীরের প্রতিষ্ঠান ‘অক্সি পিওর’।

বর্তমানে ৭টি ফ্লেভারে পাওয়া যাচ্ছে অক্সি পিওরের এই বিশেষ সেবা। সেগুলো হলো, লেমনগ্রাস, অরেঞ্জ, সিনামন, স্পিয়ারমিন্ট, পিপারমিন্ট, ইউক্যালিপ্টাস ও ল্যাভেন্ডার। অক্সি পিওরের প্রধান নির্বাহী বনি ইরেংবাম ইন্ডিয়া টুডে কে বলেন, ‘নিয়ন্ত্রিত চাপে ১৫ মিনিট বিভিন্ন ফ্লেভারে অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকি আমরা। এর নানা ধরনের উপকারিতা রয়েছে।’ কীভাবে একজন এই সেবা গ্রহণ করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথমে ক্রেতাদের মুখে একটা টিউব লাগিয়ে দেওয়া হয়।

ওই টিউবের মাধ্যমে বিভিন্ন ফ্লেভারের বিশুদ্ধ অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়। এরপর ক্রেতাদের স্বাভাবিকভাবে শ্বাস গ্রহণ করতে বলা হয়। ‘তবে একজন দিনে মাত্র একবারই নির্ধারিত সময়ের জন্য সেবা নিতে পারবেন, তার বেশি নয়’, যোগ করেন বনি। এর উপকারিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে বনি ইরেংবাম বলেন, ‘পরিশুদ্ধ অক্সিজেন গ্রহণের বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত ও মানসিক উপকারিতা রয়েছে। এতে ঘুম ও হজম ভালো হয়। শুধু বিশুদ্ধ অক্সিজেন ফুসফুসে প্রবেশ করে মানসিক অবস্থার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে দেহের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়।’

‘এর পাশাপাশি মানসিক অবসাদগ্রস্তদের চিকিৎসায় এটি বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি’-যোগ করেন তিনি। শুধু তাই নয়, এই সেবা পেতে যা খরচ হবে সেটাও সাধারণ মানুষের সাধ্যের নাগালেই রয়েছে। ১৫ মিনিট বিশুদ্ধ অক্সিজেন পাওয়ার জন্য একজনের খরচ পড়বে ২৯৯ রুপি।

উদ্যোগ
আশার কথা হচ্ছে, অনেক দেশে সরকারিভাবেই দূষণ কমানোর জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যেমন, ক্যালিফোর্নিয়ায় দূষণের মাত্রা অনেকটা কমে আসার ফলে অপরাধ কমে গেছে বলে জানা গেছে। ২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল থেকে লন্ডনে আল্ট্রা লো এমিশন জোন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেখানে গাড়ি চালানোর ফলে নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশি বায়ুদূষণ ঘটলে আগের ১১.৫০ পাউন্ডের সঙ্গে আরও ১২.৫০ পাউন্ড করে অতিরিক্ত জরিমানা করা হবে। সেই সঙ্গে ‘ক্লিনার এয়ার ফর লন্ডন’ উদ্যোগের অধীনে কম দূষণ ঘটায়, এমন অনেকগুলো গ্রিন বাস চালু করা হচ্ছে।

আমাদের জন্য আশার কথা হলো, পরিবেশ দূষণ রোধে ঢাকার আশপাশের সবগুলো ইটভাটা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ জন্য প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এসময় বায়ুদূষণ রোধে কী কী করা হয়েছে তা জানতে কমিটি গঠনেরও নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের শুনানিতে হাইকোর্টের বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

চলতি বছরের শুরুতে ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে একটি রিট আবেদন করা হয়। ওই রিটের শুনানি নিয়ে পরের দিন আদালত রুলসহ ঢাকা মহানগরীর ‘ধুলাবালিপ্রবণ’ এলাকাগুলোতে সকাল ও বিকেলে দুবার পানি ছিটাতে ঢাকার দুই সিটিকে নির্দেশ দেন আদালত। পরে পানি ছিটানো হয়েছে কি না সে বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে দুই সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে তলবও করেন হাইকোর্ট।

বাঁচার উপায়
বায়ুদূষণের দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে। এর সমাধান কী হতে পারে? প্রথমত ব্যাপকভাবে বায়ুদূষণের উৎস হ্রাস করাই এর সবচেয়ে বড় সমাধান। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা বায়ুদূষণ মুক্ত শহর না পাই, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা নিজেদের রক্ষা করার জন্য কী করতে পারি?

আপনার যদি বিকল্প কোনো রাস্তা থাকে, তাহলে আপনি রাস্তা পরিবর্তন করে সেই রাস্তায় প্রবেশ করুন, এর দ্বারা আপনি বায়ুদূষণ কমিয়ে আনতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারবেন। সচেতনতা সহকারে রাস্তার ব্যবহার করলে এবং এক পার্শ্ব দিয়ে পথচারীরা চলাচল করলে প্রায় ৫৩ শতাংশ বায়ুদূষণ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে একটি গবেষণায় দেখা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই সফলতা প্রায় ৬০ শতাংশে উন্নীত করা যেতে পারে।

অ্যাপের ব্যবহার করতে পারেন। বায়ুদূষণ রোধে অ্যাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিংস কলেজ কর্তৃক ‘লন্ডন এয়ার’ নামে একটি অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে, সেখানে দেখানো হয় সমগ্র শহরের কোথায়, কখন, কী পরিমাণে বায়ুদূষণ হচ্ছে। এই অ্যাপটি খুব দ্রুত সময়ে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে এবং নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে ক্রমবর্ধমান প্রমাণ আমাদের হাতে আছে যে, ভালো খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর আরোপিত বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব প্রশমিত করতে পারি। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ মেডিসিন থেকে প্রকাশিত এক গবেষণায় পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ওপর বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে।

অপরাধ বাড়ায় বায়ুদূষণ
গবেষণা মতে, বায়ুদূষণ মস্তিষ্কের ওপর যে প্রভাব ফেলে, তার ফলে মানুষের বিবেচনা বোধ এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। বেড়ে যেতে পারে মানসিক সমস্যা ও অপরাধ প্রবণতা। এখন প্রশ্ন হলো বায়ুদূষণের প্রভাবে আসলেই কি অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে?

গবেষণায় দেখা গেছে, যে এলাকার বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি থাকবে, সারা জীবনের জন্য সে এলাকার শিক্ষার্থীরা কোনো কারণ ছাড়াই অনেকটা পিছিয়ে যাবে। গবেষকরা কিছু এলাকা বেছে নিয়ে, দূষিত বায়ু শনাক্ত করে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। বাতাস যেদিকে বইবে, দূষিত বায়ু ধীরে ধীরে সেদিকেই সরে যাবে। সে হিসেবে, একটা শহরে সময়ে সময়ে বায়ুদূষণের পরিমাণ কম-বেশি হবে। গবেষক রথের ভাষায়, আমরা কেবল সেই দূষিত বায়ুমেঘটাকে অনুসরণ করে গিয়েছি এবং সেসব এলাকার অপরাধ প্রবণতার দিকেও লক্ষ্য রেখেছি। দেখা গেল, দূষিত বায়ু যে এলাকা দিকে যাচ্ছে, অপরাধের হার তুলনামূলকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এ গবেষণা থেকে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলেও, ভয়াবহ অপরাধগুলোর ওপর এর প্রভাব সেভাবে বোঝা যায়নি। কিন্তু ২০১৮ সালের আরেক গবেষণা থেকে খুন, ধর্ষণের মতো অপরাধের উপরেও এর প্রভাবের সম্ভাব্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এই গবেষণাটি এমআইটির গবেষক জ্যাকসন লু’র নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। প্রায় নয় বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নয় হাজারের মতো এলাকা নিয়ে কাজ করেছেন তারা। দেখা গেল, ছয়টি ভয়াবহ অপরাধ যেমন খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি ইত্যাদির ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব পড়ছে এবং যেসব শহরে দূষণের মাত্রা বাড়ছে, সেখানে অপরাধের মাত্রাও বেড়ে যাচ্ছে।

পরবর্তীতে আরেক দল গবেষক অপরাধমূলক আচরণ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছেন, প্রতারণা কিংবা স্কুল পালানো থেকে শুরু করে ছোটখাটো চুরি, ভাঙচুর ইত্যাদির উপরেও বায়ুদূষণের প্রভাব আছে। এই গবেষণায় ৬২৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির ডায়ানা ইউনান এবং তার সহকর্মীরা এই গবেষণা চালিয়েছেন।

গবেষকদের মতে, শুধু উদ্বেগ বা স্বার্থপর ভাবনাই না, জৈবিক কারণও আছে এর পেছনে। দূষিত বায়ুতে শ্বাস নিলে আপনার মস্তিষ্ক প্রয়োজনের চেয়ে কম অক্সিজেন পায়। এরকম অবস্থায় সে যে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবে না, সেটাই তো স্বাভাবিক। তা ছাড়া, দূষিত বায়ু নাক-কান-গলা-ফুসফুসের উপরেও প্রভাব ফেলে।