উৎসবের আজব দুনিয়া

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

উৎসবের আজব দুনিয়া

বিবিধ ডেস্ক ২:১২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০১৯

print
উৎসবের আজব দুনিয়া

দেশে দেশে কত জাতের মানুষ, কত বিচিত্র তাদের জীবনাচরণ। বৈচিত্র্যময় তাদের উৎসব। উৎসবের বৈচিত্র্য আর বিচিত্র উৎসবে ভরা এ দুনিয়া। কোনো কোনো উৎসবের বিচিত্রময়তা এতটাই মাত্রা ছাড়িয়েছে, সেটা আর সেই জাতির মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। তামাম দুনিয়ার আমুদে লোক ভিড় জমান সেখানে।

ষাঁড় দৌড় উৎসব
মনে করেন, আপনি দৌড়াচ্ছেন এবং আপনার পেছনে দৌড়াচ্ছে মস্ত বড় বড় ষাঁড়। এরকম কোনো ভয়াবহ কাজ নিজ ইচ্ছায় করার সাহস দেখাবেন? তবে এরকম পাগলামি কিন্তু প্রতিবছরই স্পেনে করা হয়। বলছি, ‘স্যান ফার্মিন’ উৎসবের কথা।

প্রত্যেক বছর ৭ থেকে ১৪ জুলাইয়ের প্রতি সকালে স্যান সারনিন চার্চে যখন ঠিক সকাল ৮টা বাজে তখন ক্যালে সানটো ডোমিঙ্গোর এক খোঁয়াড়ের ভেতর থেকে এ ষাঁড় দৌড় শুরু হয়। এ দৌড়ে ১২টি ষাঁড় ব্যবহৃত হয়, যার মধ্য থেকে ৬টি ষাঁড় পড়ে লড়াইয়ে যোগ দেয়।

এখানে অংশ নেওয়া বিপজ্জনকও বটে। প্রতিবছর কমপক্ষে ২০০-৩০০ জন এ দৌড়ে আহত হয়, যদিও তা বেশি একটা আশঙ্কাজনক হয় না। প্রতিবছর এ ব্যতিক্রমধর্মী উৎসব উপভোগ করতে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।


কাদা উৎসব, ব্রাজিল
রোগবালাই থেকে রেহাই পেতে ব্রাজিলের রেড ইন্ডিয়ানরা গায়ে কাদা মাখত। সেই কাদা সারা শরীরে নিয়ে সারা দিন রোদে বসে থাকত। কাদা শুকিয়ে গেলে শরীর থেকে তা তুলে ফেলত। তাদের বিশ্বাস ছিল, কাদা মাখার ফলে কোনো রোগবালাই তাদের শরীরে বাসা বাঁধবে না। সেই ধারণা থেকে ১৯৮৬ সালের দিকে ব্রাজিলের প্যারোটি শহরে ছোট পরিসরে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই উৎসব এখন ব্রাজিলের হাজারো মানুষের সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।


উৎসব যখন শুরু হয়, তখন সবাই একসঙ্গে কর্দমাক্ত ভূমিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। গড়াগড়ি খান। একে অন্যের দিকে ছুড়ে মারেন কাদার দলা। কাদায় মাখামাখি হয়ে তখন হারিয়ে যায় সত্যিকারের চেহারা, কিন্তু আনন্দটা এখানেই।
কাদা উৎসব এখন আর নির্দিষ্ট জায়গার মানুষের আনন্দ উপলক্ষেই আবদ্ধ নেই, বর্তমানে এটি পরিণত হয়েছে ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় পর্যটন বিনোদনে। প্রকৃতির ছোঁয়ায় সজ্জিত লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি ব্রাজিল এমনিতেই সেজে আছে দুরন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে। প্যারেটির কাদা উৎসব যত দিন যাচ্ছে, ততই আকৃষ্ট করছে বিশ্ব পর্যটকদের। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকেন ব্রাজিলে এসে গায়ে কাদা মাখানোর জন্য। আর এ সুযোগে ব্রাজিলের পর্যটন কর্তৃপক্ষ এ উৎসবকে ঘিরে তৈরি রেখেছে পর্যটকদের জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা।


তিহার উৎসব, নেপাল
নেপালিদের একটি উৎসব আছে যার নাম তিহার উৎসব। সেখানে তারা দেবদেবীসহ প্রকৃতি পূজা করে থাকেন। এ উৎসবেরই একটি অংশ হচ্ছে কুকুরকে ধন্যবাদসূচক পূজা। এই পূজাতে কুকুরদের কপালে তিলক লাগিয়ে খাবার খাইয়ে তাদের বিশ্বস্ততার প্রতি শ্রদ্ধা জানান নেপালিরা।

উৎসবের একটি অংশে তারা কাকের কপালে টিকা দিয়েছেন। তারা কাককে দুঃখের পাখি হিসেবে বর্ণনা করেন। তাই এ পাখিকেই বরণ করে নেন তারা। উৎসবের তৃতীয় দিনে সুখ ও সমৃদ্ধির প্রতীক গরু ও দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়। চতুর্থ দিনে গোবর্ধন নামক পর্বতকে বরণ করা হয়। পশুপাখির প্রতি ভালোবাসা জানানোর এমন উৎসবকে বিবিসি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক উৎসব বলে রায় দিয়েছে।


নটিং হিল কার্নিভাল, লন্ডন
ইউরোপের অতীত ও বর্তমান সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের মিলনমেলা হলো নটিং হিল কার্নিভাল। বলা হয়ে থাকে, এটিই ইউরোপের সবচেয়ে জমকালো আর বড় পরিসরের স্ট্রিট কার্নিভাল। ১৯৬৪ সালে সূচনা হয়েছিল দু’দিনব্যাপী চলা এ উৎসবের। প্রথম দিকে আফ্রো-ক্যারিবিয়ান জাতি গোষ্ঠী এ উৎসবের আয়োজক ছিল। উৎসবে তাদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য তুলে ধরা হতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়ায় এ উৎসব ধীরে ধীরে সার্বজনীন হয়ে উঠে। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে নটিং হিল কার্নিভাল।


দীর্ঘ প্রস্তুতি চলতে থাকে উৎসব শুরুর অনেক আগে থেকেই। অনুষ্ঠানে যোগদানকারীরা বর্ণিল পোশাক আর বাহারি রঙে নিজেদের রাঙিয়ে উৎসব মাতিয়ে তোলেন। কারো কারো মাথায় থাকে বাহারি পালকের মুকুট, কারো হাতে থাকে রঙিন ব্যানার আর ফেস্টুন। নাচ ও গানসহ নানান ধরনের আনন্দ আয়োজন তো থাকেই। মুখরোচক বিভিন্ন খাবারেরও দেখা মিলবে এ উৎসবে।


ক্রাইং বেবি ফেস্টিভ্যাল, জাপান
জাপানের একটি উদ্ভট উৎসব হচ্ছে ‘ক্রাইং বেবি ফেস্টিভ্যাল’ বা বাচ্চা কাঁদানো উৎসব! প্রতি বছর এপ্রিলের চতুর্থ রোববার সকালে এবং বিকালে এ উৎসব পালন করা হয়। বিগত চারশ বছরেরও বেশি সময় ধরে জাপানে এ উৎসব পালিত হয়। এটি জাপানের একটি সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।
এ উৎসবে জাপানের সুমো কুস্তিগীররা প্রতিযোগিতা করে, কে কার আগে বাচ্চা কাঁদাতে পারে! চোখ মুখ খিঁচে হালকা দুলিয়ে যে তার কোলের বাচ্চাকে কাঁদাতে পারবে সেই এ প্রতিযোগিতায় প্রথম হবে!

সুমো কুস্তিগীরদের কাছে বাচ্চাদের কাঁদানোর ব্যাপারটা কুস্তিতে জেতার চেয়েও কঠিন। কুস্তিগীররা যখন তাদের ঝুলিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে তখন অনেক বাচ্চা ভয় না পেয়ে বরং আনন্দে হাসতে থাকে। অনেকে আবার ঘুমিয়েও পড়ে। অনেক সময় বাচ্চাদের কাঁদানোর জন্য কুস্তিগীররা উপস্থিত অন্যদের সাহায্য নিয়ে থাকে।
আপাতদৃষ্টিতে, জাপানের এ নাকিজুমো উৎসবকে নিষ্ঠুর বলে মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে জাপানিদের অন্যরকম এক বিশ্বাস। জাপানিরা তাদের সন্তানদের মঙ্গল কামনায় এ উৎসব পালন করে থাকে। তারা বিশ্বাস করে, বাচ্চারা যখন জোরে কেঁদে ওঠে তখন তাদের আশপাশ থেকে শয়তান পালিয়ে যায়। ফলে শয়তান শিশুর স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। শিশুর বিকাশ ঠিকমতো হয় এবং তারা সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে।


ওনাম উৎসব, কেরালা
কেরলে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে ওনাম উৎসব পালিত হয়। রাজ্যের প্রতিটি মানুষের কাছে এ উৎসব অত্যন্ত প্রিয়। কেরালার সবচেয়ে বড় উৎসব বলা হয় এটিকে। ভারতের অন্য প্রদেশের উৎসবের সাথে ওনামের পার্থক্য আছে। এ উৎসব সার্বজনীন ও ধর্ম নিরপেক্ষ। এ উৎসব সবধর্মের মানুষের জন্য। রাজ্যের সমস্ত ধর্মের, সমস্ত জাতের মানুষ এ উৎসবে শামিল হন।
হিন্দু, মুসলমান ও খ্রিস্টান সবার কাছেই এ উৎসব সমান বার্তা বয়ে আনে।

মোট দশদিন ধরে চলা এ উৎসবের প্রথম ও শেষ দিনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দিন সকালে স্থানীয় মন্দিরে দেবতার কাছে প্রসাদ নিবেদন করে ওনাম উৎসবের আয়োজন শুরু হয়। সেদিন প্রত্যেক বাড়ির উঠোনে ফুলের এক বৃত্ত এঁকে ওনাম উৎসবের সূচনা হয়। এই আল্পনাকে বলা হয় পোক্কালম। প্রতিদিন এ বৃত্তের সংখ্যা বাড়ে একটি করে। অর্থাৎ ওনাম দিনের সকালে বৃত্তের সংখ্যা দাঁড়ায় দশটি। সেদিন সকালে ছেলেমেয়েরা শেষ বৃত্ত রচনা করে নানা বর্ণের ফুল দিয়ে। তবে প্রথমদিন হলুদ ফুলের প্রাধান্য থাকে। উৎসবের পরের দিনগুলোয় বিভিন্ন ফুল আল্পনাতে যুক্ত হতে থাকে।
ওনাম উৎসবের শেষ দিন হলো থিরুভুনাম। সকালে স্নান সেরে নতুন কাপড় পরে ঘরবাড়িতে নতুন করে আল্পনা দেয়া হয়। সরকারিভাবে সারা রাজ্যে আলোকসজ্জা ও আতশবাজির ব্যবস্থা করা হয়। শহরজুড়ে বের হয় বর্ণিল শোভাযাত্রা। এসব শোভাযাত্রায় থাকে কেরালার ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত ও নৃত্য। উৎসব উপলক্ষে রাজ্যের গ্রামগুলোতে স্থানীয় নানা ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আয়োজন করা হয়।
উৎসবের শেষ দিনে শহরজুড়ে বের হয় বর্ণিল শোভাযাত্রা।


কমলা উৎসব
ইউরোপের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আর প্রাচুর্যময় দেশ নেদারল্যান্ড। এখানে প্রতিবছরের ৩০ এপ্রিল পালিত হয় মজার একটি উৎসব। উৎসবটির নাম কমলা উৎসব। নেদারল্যান্ডে ৩০ এপ্রিলকে ‘রানীর দিবস’ বলা হয়। এ দিন রানী বিট্রিক্স-এর মা রানী জুলিয়ানার জন্মদিন। তাই রানী মাতার জন্মদিন পালনে ৩০ এপ্রিল আমস্টারডামের সব জায়গায় কমলা দিয়ে বাড়িঘর, পশুপাখি, নানা রকম অবয়ব এবং বিভিন্ন কমিক চরিত্র তৈরি করা হয়।
পুরো শহরজুড়ে কোটি কোটি কমলা। কমলা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় সংস্কৃতি, উপাসনালয়। উপহার হিসেবে একে অপরের মধ্যে চলে কমলা বিনিময়। চলে কমলার তৈরি উপাদেয় জুস, নানা রকম খাবারের আদান-প্রদান।
সঙ্গে চলে রানীর গুণকীর্তন, গান-বাজনা। ডাচ ভাষায় এ উৎসবকে কনিনজিনেডাগ বলে। কমলা দিয়ে কে কত সৃষ্টিশীল কাজ দেখাতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলে সারা দিনের উৎসবে।