পেঁয়াজকাহন

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

পেঁয়াজকাহন

বিবিধ ডেস্ক ১:৩৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২০, ২০১৯

print
পেঁয়াজকাহন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে মোড়ের চায়ের দোকান- পেঁয়াজ নিয়ে আলোচনা সর্বত্র। যেন একটা তুলকালাম কা-, এই নিত্যপণ্যটির দাম গিয়ে ঠেকেছে প্রায় তিনশ’তে। কেন এমন হলো, সেটা অন্য আলোচনা। আমরা বরং পণ্যটির ইতিহাস ঘাঁটতে চাই, সঙ্গে থাকছে সংশ্লিষ্ট নানা কিছু-

নামকরণ
বহুস্তরীয় এই সবজিটির নামকরণ নিয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
এর ইংরেজি ‘অনিয়ন’ নামটি আদি নামের সবচেয়ে কাছাকাছি বলে মনে করা হয়।
ধারণা করা হয়, ১৭০৩ খ্রিস্টপূর্ব অব্দে সুয়েজ উপসাগরের তীরে ইহুদি রাজা অনিয়ার নির্মিত শহরের নামেই পেঁয়াজের নামকরণ হয়

উৎপত্তি ও ইতিহাস
প্রত্নতাত্ত্বিক, উদ্ভিদবিদ ও খাদ্য ইতিহাস-বিশারদদের অনেকে মনে করেন, সাত হাজার বছর আগেই পেঁয়াজের চাষ শুরু হয়েছিল। প্রাচীন রোমের এক বিখ্যাত খাদ্যরসিক এপিসিয়াসের লেখাতে সর্বপ্রথম পেঁয়াজের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। একটি ব্যাবিলনীয় শিলালিপিতে পাওয়া ১৭০০ থেকে ১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের রেসিপিতে রান্নার উপকরণ হিসেবে পেঁয়াজের কথা উল্লেখ আছে। অর্থাৎ ব্যাবিলনীয় সংস্কৃতি থেকেই মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে পেঁয়াজের চাষ শুরু হয় বলে ধরে নেওয়া যায়।


একাধিক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, প্রথম পেঁয়াজের আবাদ হয় ইরান ও পশ্চিম পাকিস্তানে। এছাড়া উত্তর-পশ্চিম ভারত, বেলুচিস্তান ও আফগানিস্তানেও প্রাগৈতিহাসিককালে পেঁয়াজের ব্যবহার সম্পর্কে জানা যায়। অবশ্য প্রাচীন মিসরের বিখ্যাত পিরামিডের নির্মাণকাজে নিযুক্ত শ্রমিকদের রান্নার মেন্যুতেও ছিল পেঁয়াজের কথা।
পৃথিবীতে যখন কৃষিকাজের প্রচলন হয়নি সেই সময়েও খাদ্য হিসেবে পেঁয়াজের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। সেসময় থেকেই মানুষ বুনো পেঁয়াজ সংগ্রহ করে খেত। আমেরিকান পেঁয়াজ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, প্রাচীন মানুষের তৃষ্ণাও মেটাতো পেঁয়াজ। যখন সব পুষ্টিকর খাদ্য ফুরিয়ে যেত সেসময় খাওয়ার জন্য মানুষ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করত।
ইসরায়েলিরা যখন ফেরাউনের অত্যাচার থেকে বাঁচতে মিসর ছেড়ে পালিয়ে এক বিরান মরুভূমিতে আশ্রয় নেয়। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে তখন তারা স্মরণ করে- মিসরে তাদের ছিল অফুরন্ত মাছ, শসা-লাউ, তরমুজ, পলাণ্ডু, পেঁয়াজ এবং রসুন। এ স্বগতোক্তিটি বাইবেলের ১১:৫ শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে। আলেকজান্ডার মিসর বিজয়ের পর সেখান থেকে গ্রিসে পেঁয়াজ নিয়ে গিয়েছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

লোককথা
পেঁয়াজ নিয়ে অনেক লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। ঝাঁঝালো গন্ধের কারণে এটি ছিল প্রাচীন মানুষের কাছে এক রহস্য।
তুরস্কের এক কিংবদন্তিতে আছে, শয়তানকে যখন বেহেশত থেকে পৃথিবীতে ছুড়ে ফেলা হয়, তখন তার বাঁ পা যেখানে পড়ে, সেখান থেকে গজিয়ে ওঠে রসুন, আর ডান পায়ের স্থান থেকে গজায় পেঁয়াজ। পূর্ব ইউরোপে প্লেগ মহামারীর সময় মানুষ জানালায় পেঁয়াজ ও রসুন ঝুলিয়ে রাখত।
এতে করে অশুভ আত্মা দূরে চলে যাবে বলে তাদের বিশ্বাস ছিল। এছাড়া ইউরোপের মানুষ ভ্যাম্পায়ারের কবল থেকে বাঁচতে ঘরের প্রবেশপথ, জানালা ও গলায় পেঁয়াজ-রসুনের মালা ঝুলিয়ে রাখত।

ঔষধি গুণ
ভারতের ষষ্ঠ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লিখিত চরক সংহিতায় পেঁয়াজকে মূত্রবর্ধক, হজমে সহায়ক, হৃদপিণ্ড, চোখ ও অস্থিসন্ধির জন্য উপকারী ভেষজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে গ্রিক শারীরতত্ত্ববিদ ডিওসকরিডেস লিখে গেছেন পেঁয়াজের একাধিক ঔষধি গুণের কথা। অলিম্পিক গেমসের জন্য প্রস্তুত করতে গ্রিকরা ক্রীড়াবিদদের পেঁয়াজ খেতে দিত। প্রতিযোগিতা শুরুর আগে ক্রীড়াবিদরা প্রচুর পরিমাণে কাঁচা ও রান্না পেঁয়াজ, পেঁয়াজের জুস খেত। শরীরেও ঘষা হতো পেঁয়াজ।
গবেষকদের মতে, পেঁয়াজের ওপর মিসরীয়দের এভাবে দেবত্ব আরোপের কারণ পেঁয়াজের ঔষধি গুণ। পেঁয়াজের ঔষধি গুণের কারণে নানা অসুখ ভালো হতো। ফলে মিসরীয়রা পেঁয়াজকে জাদুকরী বস্তু মনে করত।


তবে প্রাচীন মিসরীয়দের তুলনায় প্রাচীন গ্রিকরা পেঁয়াজের ব্যবহারে ছিল কয়েক ধাপ এগিয়ে। রোমানরা নিয়মিত পেঁয়াজ খেত। তাদের হাতেই তৎকালীন রোমান প্রদেশ ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে পেঁয়াজের আগমন ঘটে। রোমান লেখক, প্রকৃতিবিদ প্লিনি দ্য এলডার পম্পেই নগরীর বাঁধাকপি ও পেঁয়াজের কথা লিখে গেছেন।
ইতিহাসখ্যাত সেই অগ্নুৎপাতে প্রাণ হারানোর আগে প্লিনি পেঁয়াজ নিয়ে রোমানদের নানা বিশ্বাসের কথা লিখে গেছেন। ক্ষীণদৃষ্টি, ঘুমের সমস্যা, মুখের ঘা, কুকুরে কামড়ানো, দাঁতের ব্যথা, আমাশয় ও কোমরের ব্যথায় পেঁয়াজ অব্যর্থ মহৌষধ বলে বিশ্বাস করত রোমানরা। গ্লাডিয়েটরদের এরিনায় পাঠানোর আগে শরীরে পেঁয়াজের রস মালিশ করা হতো। এটি শক্তিবর্ধক বলে বিশ্বাস ছিল তাদের।
প্রাচীন আমলে কলেরা এবং প্লেগের প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহার করা হতো পেঁয়াজ। রোমান সম্রাট নিরো ঠাণ্ডার ওষুধ হিসেবে পেঁয়াজ খেতেন বলেও শ্রুতি রয়েছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জামাল উদ্দিন বলেন, পেঁয়াজে থাকা এলিসিন নামের উপাদান অ্যান্টি-ফাঙ্গাল এবং অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় এটি কিছু কিছু ক্যান্সার প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ঠিক রাখা, ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে পেঁয়াজের ব্যবহার দেখা যায়। তিনি বলেন, পেঁয়াজ কাঁচা খেলে সর্দি-কাশি খুব কম পরিমাণে হয়।

পেঁয়াজ গম্বুজ
‘পেঁয়াজ গম্বুজ’ হলো পেঁয়াজের মতো। এই ধরনের গম্বুজ সাধারণত যেখানে বসানো হয়, তার চেয়ে ব্যাস বড় এবং উচ্চতা প্রস্থের চেয়ে লম্বা থাকে। এই কুন্দল কাঠামোর উপরে একটি বিন্দুতে মসৃণ সরু মাথা থাকে। চার্চের গম্বুজের এই কাঠামো রাশিয়া, বাভারিয়া, জার্মানিসহ আরও নানা জায়গায় দেখা যায়।
রাশিয়ার ঐতিহ্যে পেঁয়াজ গম্বুজ কবে এবং কীভাবে আদর্শ বৈশিষ্ট্যরূপে পরিগণিত হলো তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। ১৯ শতকের শেষে, পেত্রাইন যুগের আগে রাশিয়ার চার্চগুলো ছিল কুন্দল গম্বুজ। সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ গম্বুজ নির্মাণ করা হয় ১৭শ’ দশকে ইয়াস্লাভ অঞ্চলে, ঘটনাক্রমে ওই এলাকা বড় পেঁয়াজের জন্য বিখ্যাত ছিল। রাশিয়ায় মোঙ্গল আগ্রাসনের পূর্বে পেঁয়াজ গম্বুজের গির্জায় প্রতীক চিত্র ছিল না। অনেকে বলেন, ইভানের শাসনামলে পেঁয়াজ গম্বুজের প্রচলন শুরু হয়। ইভানের পুত্র ফইডরের শাসনামলে সেন্ট ব্যাজল’স ক্যাথিড্রাল গম্বুজের পরিবর্তন করা হয়নি, যার অর্থ পেঁয়াজ গম্বুজের অস্তিত্ব রাশিয়াতে ১৬শ’ শতক থেকে।


কিছু প-িত স্বীকার করেন যে, পেঁয়াজ গম্বুজ ধারণা রাশিয়ানরা মুসলিম দেশগুলো, সম্ভবত কাজানের কানাতে থেকে এনেছিল। যেটি ইভান জয় করেছিলেন এবং সেন্ট বেসিল ক্যাথিড্রাল গির্জা নির্মাণের জন্য তিনি স্মরণীয়।
পেঁয়াজ গম্বুজ শুধুমাত্র রাশিয়ার স্থাপত্যেই পাওয়া যায়নি, এটি মুঘল স্থাপত্যেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, যেটি পরবর্তীতে ভারতের বাইরে ইন্দো-গ্রোথিক স্থাপত্যেও প্রভাব রাখে। এটি ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য (ইসলামিক স্থাপত্য) এবং মধ্য এশিয়াতে দেখা যায়। উনিশ শতকের শেষে, ইন্দোনেশিয়ার আচেতে ওলন্দাজদের তৈরি বাইতুর রহমান গ্র্যান্ড মসজিদে পেঁয়াজ গম্বুজ ব্যবহার করা হয়। তারপর থেকে ইন্দোনেশিয়ার অনেক মসজিদে এই আকৃতির গম্বুজ ব্যবহার করা হয়েছে।
পেঁয়াজ আকৃতির গম্বুজ রোম সাম্রাজ্যেও ব্যবহৃত হয়েছে। স্থপতি হান্স হলো (১৫১২-১৫৯৪) আউগ্সবুর্গের সেন্ট মেরি স্টার অ্যাবে চার্চে প্রথম পেঁয়াজ গম্বুজ নির্মিত হয় ১৫৭৬ সালে।

উৎপাদন
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ৯২ লাখ হেক্টর জমিতে ৯ কোটি ৮৯ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ চাষ হয় চীনে, এর পরই রয়েছে যথাক্রমে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরান, মিসর, তুরস্ক, পাকিস্তান, রাশিয়া অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদক দেশ। ভারতে বর্তমানে প্রতি বছর গড়ে ২ কোটি ২৪ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়।
ভারতে পেঁয়াজ সব থেকে বেশি আসে মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে। মহারাষ্ট্র ছাড়া দক্ষিণ ভারত, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাটে পেঁয়াজের বিপুল চাষাবাদ হয়। জরুরি ক্ষেত্রে পাকিস্তান হয়ে ভারতে পেঁয়াজ আমদানি হয় আফগানিস্তান থেকে।


আমাদের দেশে পেঁয়াজের স্থানীয় জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে তাহেরপুরী, ফরিদপুরী ও ঝিটকা। প্রতি হেক্টর জমিতে এই জাতগুলোর গড় ফলন ৭ থেকে ১০ মেট্রিক টন। এছাড়া মেহেরপুর জেলায় ভারতের সুখ সাগর জাতের পেঁয়াজ আবাদ হয়। প্রতি হেক্টরে এই জাতের পেঁয়াজের গড় ফলন ৩৫ থেকে ৪০ মেট্রিক টন। কিন্তু এ জাতের পেঁয়াজের সংরক্ষণ ক্ষমতা কম থাকায় জাতটি কৃষক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লালতীর সিড লিমিটেডের ২০টি জাত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য লালতীর কিং ও লালতীর হাইব্রিড।
প্রতি হেক্টর জমিতে এগুলোর ফলন ১২ থেকে ১৫ মেট্রিক টন। এই জাতের পেঁয়াজের সংরক্ষণ ক্ষমতা দেশি জাতের চেয়ে কম। ফলে এই জাতগুলোও যথাযথভাবে সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয় হচ্ছে না। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত ২৭ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে কন্দ পেঁয়াজ আবাদ হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান অর্থবছরের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত কন্দ পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে ২২ হাজার ৪৩৮ হেক্টর জমিতে।

মুদ্রা যখন পেঁয়াজ
মধ্যযুগে পেঁয়াজকে দেখা হতো ‘সুপার-ফুড’ হিসাবে। সেসময় মানুষ ঠিক মুদ্রার মতো পেঁয়াজ ব্যবহার করত। নানা কাজের পারিশ্রমিক হিসাবে কিংবা ভাড়া পরিশোধ করার ক্ষেত্রেও পেঁয়াজের প্রচলন ছিল। এছাড়াও বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান যেমন বিয়েতে মানুষ বর-কনেকে পেঁয়াজ উপহার দিতেন।

পেঁয়াজ নদী
যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন রাজ্যে প্রবাহিত একটি নদী হচ্ছে ‘ওনিয়ন রিভার’। বাংলায় যার নাম দাঁড়ায় ‘পেঁয়াজ নদী’। ৫৯ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটি ট্রাউট মাছের বিচরণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। এই নদীর একটি ছবি ফেসবুকে দিয়েছেন নদী গবেষক, সাংবাদিক ও রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন। নদীটির নামকরণ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, এমন নামের কারণ নদীটির দুই তীরে প্রচুর বন্য পেঁয়াজ (অলিউম ট্রাইকোসিকাম) জন্মে।


দেশে সাম্প্রতিক পেঁয়াজ সংকটের প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ রোকন স্ট্যাটাসে আরও লিখেছেন, একসময় ভারতীয় উপমহাদেশেও বন্য পেঁয়াজ জন্মাতো, নদীতীরের দোআঁশ মাটিতে। এখনও গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের ‘দোয়াব’ পেঁয়াজ চাষের জন্য উৎকৃষ্ট। যে কারণে পাবনায় এর উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। নদীগুলোর আদিরূপ ধরে রাখতে পারলে নদীও ভালো থাকতো মাগনা পেঁয়াজও মিলতো!

অনন্ত জীবনের প্রতীক
প্রাচীন মিসরে পেঁয়াজের ব্যবহার শুধু খাদ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সেখানে পেঁয়াজ রীতিমতো পূজনীয় বস্তু ছিল। সম্ভবত অসংখ্য শল্কপত্রের কারণে পেঁয়াজকে অনন্তের প্রতীক মনে করত মিসরীয়রা। একটি পেঁয়াজ আড়াআড়ি কাটলে অনেকগুলো বৃত্ত তৈরি হয়। একটি বৃত্তের ভেতরে আরেকটি বৃত্ত। এটি অনন্ত জীবনের প্রতীক মনে করা হয়। এ কারণে ফেরাউনের মরদেহের সঙ্গে পেঁয়াজও সমাহিত করা হয়। পিরামিডের দেয়ালে পেঁয়াজের ছবি রয়েছে।
দেবতার প্রতীক হিসেবেও পেঁয়াজ রাখতেন মিসরীয় ধর্মগুরুরা। মোটকথা, তারা পেঁয়াজকেই অনন্ত জীবনের প্রতীক হিসাবে গণ্য করতেন। এই ঘটনার সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রমাণ পাওয়া যায় রাজা চতুর্থ রামেসিসের সমাধিতে। এই সমাধি আবিষ্কৃত হওয়ার পর দেখা যায় রাজা চতুর্থ রামেসিসের মমির দুই চক্ষু কোটরে ভরে রাখা হয়েছে পেঁয়াজ! এছাড়াও মৃতদেহের শরীরের নানা অংশে পেঁয়াজ রাখা হতো। বুকে পেঁয়াজের ফুল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হতো। মমির কান, পায়ের পাতা ইত্যাদি স্থানে পেঁয়াজ দিয়ে সাজানো হতো। বহু মিসরীয় পিরামিডের ভেতরের নানা চিত্রকর্মে পেঁয়াজের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বহু মিসরীয় যাজকদেরও ছবিতে পেঁয়াজ হাতে দেখা গিয়েছে।

ধর্ম যা বলে
উত্তেজক গুণ ও গন্ধের কারণে নানা ধর্ম ও সংস্কৃতিতে পেঁয়াজ খেতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন হিন্দুধর্মে সন্ন্যাসীদের পেঁয়াজ খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ।
আবার ইসলাম ধর্মে এবাদতের আগে কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়া মাকরুহ বা অপছন্দনীয় বলা হয়েছে। এভাবে সেমিটিক অসেমিটিক প্রায় সব ধর্মেই পেঁয়াজ খাওয়ার ব্যাপারে টেক্সট দিয়ে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
ইসলাম ধর্মের টেক্সট অনুযায়ী, নবী (সা.) বলছেন, পেঁয়াজ আর রসুন পারতপক্ষে না খেতে। আর কাঁচা খেলে কেউ যাতে মসজিদের নিকটবর্তী না হয় ওই সময়, সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া আছে। হিন্দু ধর্মের অসুরদের খাবারের উচ্ছিষ্ট হয়েছিল পেঁয়াজ, এজন্য কৃষ্ণ-অমৃত’র ডায়েটে পেঁয়াজ রাখা হয় না। হিন্দুদের বড় একটা অংশ তো বটেই, জৈন এবং শিখরাও পেঁয়াজ এভয়েড করে ধর্মীয় কারণে।
সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং হচ্ছে ‘মান্না সালওয়া’র ঘটনা। সেমিটিক সব ধর্ম- খ্রিস্টানদের বাইবেল, ইহুদিদের ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং আমাদের কোরআন; সর্বত্রই এই ‘মান্না সালওয়া’র কাহিনী আছে।


কাহিনীটা হচ্ছে- বনি ইসরায়েল তথা মূসা নবীর অনুসারীদের খোদা বেহেশত থেকে খাবার পাঠাতেন। কেননা তাদের জীবনে অখাদ্য দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি লেগেই ছিল। তাই বনি ইসরায়েলের লোকদের আশীর্বাদের নিদর্শন হিসেবে বেহেশত থেকে সরাসরি খাবার নিয়ে আসতেন ফেরেশতারা। সকাল বেলা তারা ঘুম থেকে উঠে দেখতো, একটা নির্দিষ্ট জায়গায় খাবার ছড়ানো-ছিটানো আছে।
খোদার নির্দেশে এই খাবার ৪০ বছর চলল। এরপর বনি ইসরায়েল তথা ইহুদিরা এই বেহেশতি খাবারের বাজে রিভিউ দেওয়া শুরু করল। তাদের এসব স্বর্গীয় খাবার মুখে রোচে না। কারণ এগুলোতে মসলা বিশেষত পেঁয়াজ-রসুন নেই। তাই তারা নীলনদের অববাহিকায় পেঁয়াজ উৎপাদন করে তা দিয়ে বেহেশতি খাবার খাইতে চাইল। খোদা বিরক্ত হয়ে তাদের বেহেশতি খাবার পাঠানো বন্ধ করে দিলেন।

কাটলে চোখে পানি আসে কেন?
পেঁয়াজ কাটার সময় ঝাঁজে চোখ জ্বালা করে, চোখে পানি চলে আসে। কিন্তু এই ঝাঁজ আসে কোথা থেকে সেটা জানেন? পেঁয়াজ-রসুন প্রভৃতির গাছ মাটি থেকে সালফার গ্রহণ করে। পেঁয়াজ কাটার সময় অ্যালিনাস জাতীয় এনজাইম নিঃসৃত হয়, যা অ্যামিনো এসিড সালোক্সাইডকে ভেঙে ফেলে। এ সময় ১-প্রোপেনসালফেনিক এসিড নামে একটি যৌগ তৈরি হয়। এই যৌগটি থেকে পর্যায়ক্রমে সিনপ্রোপানেথিয়াল-এস-অক্সাইড নামে একটি গ্যাস তৈরি হয়। পেঁয়াজের কোষ কাটার ৩০ সেকেন্ডের মাঝেই গ্যাসটি সর্বোচ্চ পরিমাণে তৈরি হয়।


এই গ্যাসটি যখন চোখের ভেতরের ভেজা অংশের সংস্পর্শে আসে, তখন চোখের সিলিয়ারি স্নায়ুর মাধ্যমে জ্বালাপোড়ার অনুভূতি হয়। ফলে চোখের পাতার ওপরের দিকে থাকে একধরনের গ্ল্যান্ড বা গ্রন্থি থাকে, যা চোখের পানি নিয়ন্ত্রণ করে। যখন চোখের জ্বালাপোড়া ভাব এই গ্রন্থিগুলোতে এসে লাগে, তখন মস্তিষ্কে খবর যায় যে চোখের ভেতর কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সংকেত দেয়। ফলে চোখে অতিরিক্ত পানি আসে। চোখের ভেতরে জ্বালাপোড়া সৃষ্টিকারী কোনো কিছুকে ধুয়েমুছে বের করে দেওয়ার জন্যই মস্তিষ্ক এই অতিরিক্ত পানির ব্যবস্থা করে। রান্না করার পর পেঁয়াজের ঝাঁজালো স্বাদটুকুই থাকে। কাঁচা পেঁয়াজের সেই এনজাইম নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে খাওয়ার সময় চোখে পানি আসে না।