অদ্ভুত যত সৎকার পদ্ধতি

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

অদ্ভুত যত সৎকার পদ্ধতি

বিবিধ ডেস্ক ১:২০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৬, ২০১৯

print
অদ্ভুত যত সৎকার পদ্ধতি

বিপুলা এ পৃথিবীর নানা জাতি-গোষ্ঠীতে আছে হরেক রকম সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। সেই বৈচিত্র্যে বাদ যায় না সৎকার পদ্ধতিও। সমাজে আমরা মূলত, মৃতদেহকে কবর দিতে কিংবা শ্মশানে পোড়াতে দেখি। তবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে, জাতি-গোষ্ঠীতে মৃতদেহ সৎকারের এমন সব অদ্ভুত প্রথা প্রচলিত আছে বা ছিল, যা সত্যিই অবাক করার মতো-

‘মমি’ পদ্ধতি
হাজার হাজার বছর আগে মৃতদেহের শরীরের ভেতর থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে বিভিন্ন পচনশীল পদার্থ বের করে সেখানে অন্য পদার্থ দিয়ে পূর্ণ করে দেওয়া হতো। এরপর সেই দেহটি সাদা কাপড়ে মুড়ে দিয়ে একে রাখা হতো বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত এক বাক্সে। অবশ্য মমি প্রথা তখনকার সময়ে কেবল অভিজাতদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। অধিকাংশ গবেষকের মতে, মমির উৎপত্তিস্থল হলো প্রাচীন মিসর। তবে গ্রহণযোগ্য সূত্রে জানা যায়, প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতারও এক হাজার বছর আগে উত্তর চিলি এবং দক্ষিণ পেরুর চিনচেরাতে মমির সংস্কৃতি চালু হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে পাপুয়া নিউগিনির মধ্যভাগ ও পশ্চিম অংশের পাহাড়ি অঞ্চলে বাস করা উপজাতিদের মধ্যে ‘দানি’ একটি। তারা তাদের গোত্রপ্রধান ও যোদ্ধাদের মৃতদেহ মমি করে সংরক্ষণ করে থাকে। শত শত বছরের পুরনো এই প্রথায় তারা নিজস্ব উদ্ভাবিত কৌশল ব্যবহার করে। শুধু এক ধরনের প্রাণীজ তেল ও অল্প আগুনের আঁচে অনেকদিন ধরে করা হয়ে থাকে এই মমিগুলো।

ভাইকিংদের নৃশংস প্রথা
ভাইকিং হলো স্ক্যান্ডিনেভিয়ার অঞ্চলের সমুদ্রচারী ব্যবসায়ী, যোদ্ধা ও জলদস্যুদের একটি দল। মৃতদের সৎকারের প্রথাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য ভাইকিংদের প্রথাটি। কোনো গোষ্ঠীপতি মারা গেলে প্রথম পর্বে তার মৃতদেহটি ১০ দিনের জন্য এক অস্থায়ী কবরে রাখা হতো। এ সময়ের মাঝে তার জন্য নতুন কাপড় বানানো হতো। একই সঙ্গে কোনো ক্রীতদাসীকে তার সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হতো। এ সময় তাকে রাত-দিন পাহারার মাঝে রাখা হতো এবং প্রচুর পরিমাণে উত্তেজক পানীয় পান করানো হতো। সৎকারের আনুষ্ঠানিকতা যখন শুরু হতো, দুর্ভাগা সেই মেয়েটি একের পর এক গ্রামের সব তাঁবুতেই যেতে বাধ্য হতো।

সেসব তাঁবুর পুরুষরা তার সঙ্গে মিলিত হতো আর বলত, ‘তোমার মনিবকে বলো, এটা তার প্রতি আমার ভালোবাসা থেকেই করলাম’! সবগুলো তাঁবু ঘোরা শেষে মেয়েটি যেত আরেকটি তাঁবুতে যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করত ছয়জন ভাইকিং পুরুষ। তারাও তার সঙ্গে মিলিত হতো। এরপরই দড়ি দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে দুর্ভাগা সেই মেয়েটিকে মেরে ফেলা হতো। মৃত্যু নিশ্চিত করতে সেই গোত্রেরই মহিলাপ্রধান তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করতেন। এরপর? সেই মেয়ে আর তার মনিবের মৃতদেহ একই কাঠের নৌকায় তুলে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। এটি করা হতো যাতে পরকালে গিয়ে মেয়েটি তার মনিবের ঠিকঠাক সেবা-যত্ন করে সেই ব্যাপারটি নিশ্চিত করতেই।

বসে থাকা মৃতদেহ
ফিলিপাইনের ইফুগাঁও অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তারা মৃতদেহটিকে বাড়ির সামনে চেয়ারে বসিয়ে রাখে! হাত-পা-মাথা বেঁধে রাখা হয় যাতে সদ্য মৃত সেই ব্যক্তি পড়ে না যান। ঠিক যেন বাড়ির উঠোনে লোকেরা কাজ করছে, আর চেয়ারে বসে থেকে কেউ সেই কাজগুলোর তদারক করছে। এভাবে দেহটি রেখে দেওয়া হয় আট দিন পর্যন্ত। এই আট দিনে তার আত্মীয়স্বজনরা মৃতদেহকে ঘিরে নানা আচার-অনুষ্ঠানে মেতে ওঠে। শোক প্রকাশ, হাসি-ঠাট্টা, পার্টি, অ্যালকোহল পানে মেতে ওঠা- এসবই চলে আসরের মাঝখানে সেই দেহটি ঘিরে।

মহাসমুদ্রে মহাযাত্রা
যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা প্রাকৃতিক কারণে যারা সমুদ্রের বুকে মৃত্যুবরণ করেন, তাদের মৃতদেহ সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়ার ইতিহাস বহু পুরনো। তবে স্থলভূমিতে মারা গিয়েও প্রবালের মাঝে নিজেকে মিশিয়ে সমুদ্রের তলদেশে চিরনিদ্রায় শায়িত হতে চাওয়ার বিচিত্র এ শখের জন্ম গত শতকের শেষদিকে।

এ ক্ষেত্রে প্রথমে মৃত ব্যক্তির ছাইকে কনক্রিটের সঙ্গে মিশিয়ে প্রবালের বল বানানো হয়। এরপর সেই বলকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ দিকে সমুদ্র উপকূলের নির্দিষ্ট জায়গায় মৃত ব্যক্তি বা তার প্রিয়জনদের পছন্দের জায়গায় ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এভাবে নিজেদের দেহভস্ম সমুদ্রের তলদেশে রাখা মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮০০।

আতশবাজি ফিউনারেল
কেউ কেউ আতশবাজিকে এতটাই পছন্দ করেন, এখানেই নিজের শেষ দেখতে চান। এক্ষেত্রে মৃতদেহের কিছু অংশকে প্রথমে আতশবাজির দাহ্য পদার্থগুলোর সঙ্গে মেশানো হয়। এরপর যখন সেটি আকাশে বিস্ফোরিত হয়, তখন সেই অবশেষ ছড়িয়ে পড়ে সবদিকে, ভেসে চলে বাতাসে!

মৃত ব্যক্তির স্যুপ
ভেনেজুয়েলার ঘন বনাঞ্চলে বাস করা ইয়ানোমামি গোত্রের লোকেরা মৃতের হাড় চূর্ণ করে তা সিদ্ধ করেন। সঙ্গে সিদ্ধ করেন কলা। কলা সিদ্ধর মাঝেই মিশিয়ে দেওয়া হয় সেই হাড়চূর্ণ ও ছাই। মৃতের আত্মীয়রা এরপর সেগুলো মজা করে খায়! একে মৃতের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের উপায় হিসেবেই মনে করে তারা।

রেজোমেশন
রেজোমেশনকে বলা হয়ে থাকে মৃতদেহ সৎকারের আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি।
এ জন্য মৃতদেহকে পানি ও লাই ((Lye-ধোয়া-মোছায় ব্যবহৃত তরল ক্ষারবিশেষ) এর মিশ্রণের সঙ্গে উচ্চ চাপে প্রায় ৩২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপে উত্তপ্ত করা হয় রেজোমেটর (Resomator) নামক মেশিনে। এর ফলে মৃতদেহের সাদা বর্ণের ধুলার মতো অবশেষ পাওয়া যায়। অপেক্ষাকৃত কম কার্বন-ডাই অক্সাইড নিঃসরণ ও শক্তি সাশ্রয়ী পদ্ধতি বলে অনেকেই একে পরিবেশবান্ধব বলে মনে করে থাকেন।

অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের প্রথা
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের মধ্যে মৃতদেহ সৎকারে কবর দেওয়া, আগুনে পোড়ানো, মমিতে পরিণত করা, এমনকি মৃতদেহ খেয়ে ফেলার প্রথাও আছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলে একদল আদিবাসী আছে যারা এত ঝামেলায় যেতে চায় না। প্রথমে মৃতদেহটিকে এক উঁচু, খোলা জায়গায় রেখে আসে তারা। গাছের শাখা-প্রশাখা দিয়ে ঢেকে দেওয়া দেহটির মাংস পচে যেতে সময় লাগে মাস খানেক। কয়েক মাস পর তারা সেখানে গিয়ে হাড়গুলো নিয়ে আসে এবং সেগুলোকে লাল রং দিয়ে সাজায়। তারপর সেই লালরঙা হাড়গুলো কোনো গুহায় কিংবা গাছের ফাঁপা গুঁড়িতে রেখে আসা হয়। কখনো আবার মৃতের আত্মীয়রা সেই হাড়গুলো এক বছর সময় ধরে নিজেদের সঙ্গে নিয়েই ঘুরে বেড়ান!

মৃতের সঙ্গে বসবাস
ইন্দোনেশিয়ার টোরাজা উপজাতির মানুষ সভ্যতার এই উৎকর্ষের সময়ও বাস করে যাচ্ছেন মৃত মানুষের সঙ্গে। মৃত্যুর পর ছাড়তে ইচ্ছে হয় না প্রিয় মানুষটিকে, তারপরও সৎকারের জন্য বিদায় দিতে হয়। কিন্তু এই রীতি মানতে নারাজ ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের টোরাজা উপজাতিরা। তারা মৃতদেহকে সৎকার না করে বাড়িতেই রেখে দেয় বছরের পর বছর। মৃতদেহ রাখার জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করা হয়। সেই ঘরে থাকে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, বিছানা, জামা-কাপড়।

প্রতিদিন খাবারও দেওয়া হয়। যত দিন না তার শ্রাদ্ধ শান্তির জন্য জমকালো অনুষ্ঠান করার মতো অর্থ জোগাড় করা যায়, তত দিনই চলে মৃতের সঙ্গে প্রতিদিনের এই অদ্ভুত জীবনযাপন। বিদায়ের দিন মহাআয়োজন করা হয়। বলি দেওয়া হয় মহিষ। তারা বিশ্বাস করে মহিষ মৃত ব্যক্তির আত্মা স্বর্গে পৌঁছে দেবে। এখানেই শেষ নয়।
প্রতিবছর মানেনে নামক এক উৎসবে মৃতদেহগুলোকে কফিন থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়। মৃতদেহকে নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে সাজিয়ে ঘোরানো হয় পুরো গ্রাম। শিশু থেকে শুরু করে অনেক বছরের পুরনো মৃতদেহগুলোও বাদ যায় না।

সতীদাহ
সতীদাহ প্রথা সম্পর্কে কমবেশি জানা আছে আমাদের সবারই। এ প্রথার ফলে সদ্য বিধবা হওয়া স্ত্রীকেও তার স্বামীর সঙ্গে চিতার আগুনে যেতে হতো। পার্থক্য হলো, স্বামী যেতেন মৃত্যুর পর আর স্ত্রীকে যেতে হতো জীবিতাবস্থায়। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, গায়ে আগুন লাগার পর সদ্য বিধবা সেই নারী স্বাভাবিক মানব প্রবৃত্তি অনুযায়ী, নিজেকে বাঁচাতে সেখান থেকে পালাতে চাইতেন। আর এটা যাতে তিনি না করতে পারেন সে জন্য সেখানে বাঁশ নিয়েও দাঁড়িয়ে থাকতেন কেউ কেউ।

বিধবা সেই নারী উঠতে চাইলেই আঘাত করে আবার আগুনে ফেলে দেওয়া হতো। কখনো কখনো আবার সরাসরি হাত-পা বেঁধেই আগুনে নিক্ষেপ করা হতো সেই দুর্ভাগাকে। আঠারো শতকের এক বিধবার কথা শোনা যায় যিনি এসব বাধা পেরিয়ে কোনোক্রমে পাশের নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শরীরের আগুন নিভিয়ে ছিলেন। এতে করে ক্ষিপ্ত জনতা তাকে ধরে এনে প্রথমেই পা ও পরে হাত দুটি ভেঙে দিয়েছিল যাতে করে তিনি আর পালাবার দুঃসাহস করতে না পারেন। এরপর তাকে আবারও আগুনে নিক্ষেপ করা হয়।

সনাতন ধর্মে সৎকার
হাজার হাজার বছর ধরে সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী ভারতীয়রা দাহকার্যকে অপরিহার্য সৎকার-ক্রিয়া মনে করতেন। বিশ্বাস ছিল, দাহ না সম্পন্ন হলে আত্মার মুক্তি ঘটে না। কিন্তু সব হিন্দু মৃতদেহেরই দাহ-সৎকার ঘটে না। কতগুলো বিশেষ ক্ষেত্রে শাস্ত্র এবং লোকাচার দাহকার্যকে নিষিদ্ধ বলে বিধান করে দেওয়া হয়েছে।

এক. সন্ন্যাসীদের মৃতদেহ দাহ হয় না। তবে সব সন্ন্যাস মার্গে এই বিধান প্রচলিত নেই। দশনামী সম্প্রদায়ের মধ্যে কয়েকটি সলিল সমাধিতে বিশ্বাস রাখে। কারণ সন্ন্যাসী সংসারত্যাগী। তার কোনো অপত্য থাকতে পারে না। সুতরাং তার মুখাগ্নি সম্ভব নয়। সে কারণেই তার দেহ জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

দুই. শিশুদের মৃতদেহ দাহ হয় না। একটা বিশেষ বয়স পর্যন্ত শিশুদের দাহকার্য নিষিদ্ধ। হিন্দু ঐতিহ্যে মনে করা হয়, পূর্ণ দেহ প্রাপ্তি না ঘটলে দাহ সম্ভব নয়।

তিন. অন্তঃসত্ত্বা নারীকেও দাহ করার বিধান নেই। বিধান অনুযায়ী, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মৃত নারীকে শ্মশানভূমিতে নিয়ে আসা হবে। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন গর্ভস্থ শিশুর প্রাণরক্ষা। সেটা সম্ভব না হলে মৃতাকে হয় ভাসিয়ে দিতে হবে, নয়তো কবর দিতে হবে।

চার. কোনো কোনো হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে দাহ করার রেওয়াজ নেই। বাংলায় ‘জাতবৈষ্ণব’ নামের একটি সম্প্রদায় তাদের সদস্যদের মৃতদেহ সমাধিদানেরই পক্ষে। তবে, ইদানীং তারাও দাহই করছেন।

পাঁচ. সাপে কাটা মৃতদেহ সাধারণত দাহ না করে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। এই রেওয়াজ একান্তভাবে বাংলাতেই প্রচলিত ছিল। ‘মনসামঙ্গল’ অনুযায়ী লখীন্দরের জীবন ফিরে পাওয়ার ঘটনায় বিশ্বাস থেকেই এমনটা করা হতো।