মানবধর্মের গুরু

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

লালন বলে জাতের কী রূপ

মানবধর্মের গুরু

বিবিধ ডেস্ক ২:৩৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩০, ২০১৯

print
মানবধর্মের গুরু

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি/মানুষ ছাড়া খ্যাপারে তুই মূল হারাবি।’ লালন মানবতাকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছিলেন। যা লালনের গান থেকেও স্পষ্ট। প্রায় সিংহভাগ গানে প্রেম ও মানবতাবাদ স্পষ্ট। এসব গান থেকে জানা যায়, তিনি না ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী, না ছিলেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী। লালন শাহের প্রথম জীবনীকার বসন্ত কুমার পালের মতে, ‘সাঁইজি হিন্দু কি মুসলমান, একথা আমিও স্থির বলিতে অক্ষম।’ লালনের জীবদ্দশায় তাকে তেমন কোনো ধরনের ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতে দেখা যায়নি। যেমন তার একটি গানে তিনি বলছেন, ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে/লালন বলে জাতের কী রূপ/আমি দেখলাম না দুই নজরে।’ আসলে তিনি ছিলেন প্রেমিক, মানবতাবাদী। প্রেমই তার প্রার্থনা। মানবতাই তার ধর্ম।

১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর শুক্রবার ভোরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ফকির লালন শাহ বা লালন ফকির। কথিত আছে, ‘ক্ষমো ক্ষমো মোর অপরাধ’-এ গানটি গাইতে গাইতে তিনি না-ফেরার দেশে চলে যান। লালন ফকিরের জন্মতারিখ নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে ‘হিতকরী’-এর তথ্য মতে, ১৭৭৪ সালে তার জন্ম বলে ধারণা করা যায়। ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক সাধকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তিনি একাধারে ফকির (মুসলমান সাধক), দার্শনিক, অসংখ্য অসাধারণ গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। গান্ধীরও ২৫ বছর আগে, ভারত উপমহাদেশে প্রথম, তাকে ‘মহাত্মা’ উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তার মৃতুর ১২ দিন পর তৎকালীন পাক্ষিক পত্রিকা মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত হিতকরীতে প্রকাশিত একটি রচনায় প্রথম তাকে ‘মহাত্মা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। রচনার লেখকের নাম রাইচরণ।

লালন ফকিরের জীবন সম্পর্কে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় না।

তার সবচেয়ে অবিকৃত তথ্যসূত্র তার নিজের রচিত অসংখ্য গান। গানে গানে তিনি নিজের কথা বলে গেছেন। তিনি একজন বাঙালি যার জন্মস্থান বর্তমান বাংলাদেশের যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার হারিশপুর প্রামে। লালন শাহের জাতি বা সম্প্রদায় নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। এই প্রশ্ন তার জীবদ্দশায়ও বিদ্যমান ছিল। পারিপার্শ্বিক প্রচলিত থেকে অনুমিত হয়েছে যে কথিত আছে, তিনি হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, কিন্তু ছেলেবেলায় জলবসন্ত রোগে অসুস্থ অবস্থায় তার পরিবার তাকে ভেলায় ভাসিয়ে দেয়। তখন মলম শাহ এবং তার স্ত্রী মতিজান নামের এক মুসলমান দম্পতি তাকে আশ্রয় দেন এবং সুস্থ করে তোলেন। মলম সাহ তাকে কোরআন ও হাদিস শিক্ষা দেন এবং ধর্মীয় শিক্ষার জন্য ফকির সিরাজ সাঁই নামের একজন ফকিরের কাছে পাঠান।

লালন শাহ বিশেষ কোনো ধর্মীয় আচার-অনুসরণ করতেন না এটা নিয়ে এখন আর কেউ তেমন বিতর্ক করে না।

তিনি জাতিভেদ মানতেন না, হিন্দু-মুসলমানকে সমভাবে দেখতেন এবং শিষ্যদেরও তিনি এই সেই শিক্ষাই দিতেন। তিনি ধর্ম নিয়ে তর্ক করতেন না, তবে ধর্ম আলাপ করতে ভালোবাসতেন। ধর্মের আলাপ শুনলে শেষ বয়সে অসুস্থ অবস্থা থেকেও সুস্থ হয়ে উঠতেন, সব রোগের যন্ত্রণা ভুলে যেতেন। তিনি বিশেষ কোনো ধর্ম মতকে প্রচার করতেন না।