বাংলাদেশ সফর

ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯ | ৩ কার্তিক ১৪২৬

বিশ্ব বিপ্লবের বরপুত্র

বাংলাদেশ সফর

বিবিধ ডেস্ক ১২:৫৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০১৯

print
বাংলাদেশ সফর

১৯৫৯ সালে কিউবার সরকারি সিদ্ধান্তে এশিয়ার উদ্দেশে একটি বিশেষ সফরে বের হয়েছিলেন চে গেভারা। ৩ মাসের সেই সফরে ঘুরতে ঘুরতে জুলাই মাসে এসেছিলেন বাংলাদেশেও (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান), এটি এখন আর অবাক হওয়ার মতো তথ্য নয়, ঢাকার আদমজী জুট মিলের সাবেক নির্বাহী পরিচালক কেআর হাসান ও ভারতীয় সাংবাদিক ওম থানভি এবং চে গেভারার বেশ কয়েকটি জীবনী গ্রন্থ থেকে এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে। সফরে এসে আদমজী পাটকল শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তবে শ্রমিকরা জানত না তিনি আসলে কে।

চে গেভারার সঙ্গে সাক্ষাতের দাবি করা শ্রমিক নেতা ছায়েদুল হক ছাদু সেই ঘটনার বর্ণনা দেন। এক সময় শ্রমিক নেতা হয়ে ওঠা ছায়েদুল হক ছাদু ১৯৫৯ সালে ছিলেন সাধারণ শ্রমিক। পরবর্তীতে তিনি আদমজী জুট মিলের শ্রমিক ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হন। ঘটনাচক্রে এ শ্রমিক নেতা ৩ নম্বর মিলের কর্মকর্তা কেআর হাসানের কাছে রক্ষিত একটি বইয়ে চে গেভারার ছবি দেখে সোল্লাসে জানান, ছবির লোকটিকে তিনি চেনেন এবং ১৯৫৯ সালের জুলাইয়ে এ আদমজী জুট মিলেরই ৩ নম্বর মিলে তার সঙ্গে ছবির মানুষটির সাক্ষাৎ হয়েছে।

শ্রমিক নেতা ছাদুর বর্ণনানুসারে, ১৯৫৯ সালের জুলাইয়ে চে গেভারা একটি প্রাইভেটকারে, ছদ্মবেশে আদমজী জুট মিলের শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। আদমজী শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা ছাড়াও ৩ নম্বর মিলের তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন চে গেভারা। ৩০ মিনিটের মতো চের সঙ্গে আলাপ হয় শ্রমিকদের। সাধারণ একজন শ্রমিক হিসেবে সে সভায় ছাদুও উপস্থিত ছিলেন।

ছদ্মবেশে ও পরিচয়ে আসা চে কোত্থেকে এসেছিলেন বা সাক্ষাৎ শেষে কোথায় ফিরে যান, সে বিষয়ে ছায়েদুল হক ছাদু আর কিছু জানতে পারেননি এবং এই অচেনা বিদেশিদের নিয়ে তার মধ্যে বিস্ময় ছিল। তরুণ ছাদুর পক্ষে তখন চে গেভারাকে শনাক্ত করতে পারার কথা নয়। কারণ, সদ্য ‘কিউবা বিপ্লব’ সফল করে তিন মাসের সফরে বেরোনো চে সম্বন্ধে এ অঞ্চলের অনেক লোকেরই তেমন পরিষ্কার কোনো ধারণা ছিল না।

ছায়েদুল হক ছাদুর দেওয়া সেই তথ্য যে মিথ্যা নয় তা আরও বেশ কিছু তথ্যসূত্র থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। বিপ্লবী চে গেভারার বিভিন্ন রহস্যময় সফর, গোপন দলিল প্রকাশ ও বিভিন্ন সময়ে আবিষ্কৃত নানা তথ্য-উপাত্ত থেকে ছায়েদুল হকের করা দাবি আরও স্পষ্ট ও জোরালো হয়ে উঠেছে।

১৯৫৯ সালের এ সফরের কথা পাওয়া যায় চের প্রেমিকা অ্যালেইদা মার্চের স্মৃতিচারণেও। ১২ জুন তিনি এ ভ্রমণে বের হন। সফরে যাওয়ার কিছুদিন আগেই চে ২য় বিয়ে করেছিলেন অ্যালেইদা মার্চকে। অ্যালাইদা ছিল তার বিপ্লবী সহযোদ্ধা। সদ্য বিবাহিত অ্যালাইদাও যেতে চেয়েছিলেন চে গেভারার সঙ্গে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সফরে ব্যক্তিগত প্রভাব যাতে না পড়তে পারে, সে জন্য অ্যালাইদাকে সঙ্গে নিয়ে যাননি। যা ছিল অ্যালাইদার জন্য বিরহের। দীর্ঘ এ সফরের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে আল্যাইদা এক স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছিলেন, ‘চে গেভারার এ বিদেশ সফরের সময়টা ছিল ১৯৫৯ সালের ১২ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর। এ সফরে চে গিয়েছিলেন মিসর, সিরিয়া, ভারত, বার্মা (মিয়ানমার), শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান), পাকিস্তান (তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান), যুগোস্লভিয়া, থাইল্যান্ড, গ্রিস, সিঙ্গাপুর, সুদান ও মরক্কো।’ চের বাংলাদেশে আসার খবর পাওয়া যায় ভারতের দিল্লি থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা জন সত্তা’র সম্পাদক ওমথানভির এক লেখায়ও। ২০০৭ সালে ‘দ্য রোভিং রেভুলেশনারি’ নামে একটি নিবন্ধন প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ভারত সফর শেষে চে গেভারা বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) এসেছিলেন।

কেন চে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, সে প্রশ্নটাও এসেছে। বলা হয়, এর একটি উদ্দেশ্য ছিল পাট। চে ভারতের কৃষিমন্ত্রী এপি জৈনের সঙ্গে বৈঠকে ভারত থেকে পাট আমদানির বিষয়ে আগ্রহ দেখান। তখন বাংলাদেশকে বলা হতো সোনালি আঁশের দেশ। অর্থাৎ উন্নতমানের পাট ও পাটজাত দ্রব্য উৎপাদনে বাংলাদেশ তখন এগিয়ে। যেহেতু পাটবিষয়ক আগ্রহ প্রকাশ করেন চে সেহেতু এতদূর ভ্রমণে এসে পাটের মূল অঞ্চলে প্রবেশ করার সুযোগ হাতছাড়া করার কোনো কারণ নেই।