চুয়াত্তরের বন্যা

ঢাকা, বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯ | ২ শ্রাবণ ১৪২৬

চুয়াত্তরের বন্যা

বিবিধ ডেস্ক ২:২৬ অপরাহ্ণ, মে ০৮, ২০১৯

print
চুয়াত্তরের বন্যা

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের বন্যা আগের সব ভয়াবহতাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এ সময় রংপুর জেলার প্রায় ১ হাজার ২৯৬ বর্গমাইল এলাকা প্লাবিত হয়। তলিয়ে যায় ১ লাখ ৩৩ হাজার একর জমির ফসল। প্রায় এক লাখ বাড়িঘর পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরো ৬৪ হাজার ঘরবাড়ি। ওই বন্যায় রংপুর জেলার প্রায় ১ হাজার ৭৪৮টি গবাদিপশু মারা যায়। ভেঙে পড়ে জেলার পাঁচ হাজারের মতো ছোট-বড় পুল, সেতু, রাস্তঘাট, নদীতীর ও বাঁধ। ১ হাজার ৪২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বিনষ্ট হয়। সব মিলিয়ে আর্থিক ক্ষতি হয় প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার, যা ওই অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের প্রায় ১৬৮ শতাংশ। ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে সরকারের বাজেট প্রস্তাবনা ছিল ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকার।

জনগণের দুর্ভোগের কাছে এসব পরিসংখ্যান কিছুই না। বন্যার পানি বাড়তে শুরু করলে দূরদর্শী অনেক পরিবারই বাড়ির পার্শ্ববর্তী গাছের ওপর মাচা বেঁধে রেখেছিল। তাদের আশঙ্কাকে সত্যি করে সে সময় তলিয়ে যায় শত শত বাড়িঘর। ১৯৭৪ সালের বন্যায় ভুক্তভোগীদের পুরো সময়টাই কেটেছে অনাহারে-অর্ধাহারে। মজুত চাল নিঃশেষ, অবশিষ্ট যা ছিল কয়েকটি গবাদিপশু। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদককে ওই সময় মোহাম্মদ আবদুল্লাহ নামের এক ভুক্তভোগী বলেছিলেন, ‘এগুলোর মাংস খেতে পারি আমরা, কিন্তু রাঁধব কী দিয়ে। আমাদের কাছে কোনো জ্বালানি নেই। চালের মজুত যাওবা ছিল, ফুরিয়েছে। প্রাণ বেঁচেছে পরের মৌসুমের জন্য জমিয়ে রাখা ধানের বীজ খেয়ে।’

সাপ্তাহিক বিচিত্রার তথ্য অনুযায়ী, বন্যার ভয়াবহতা এতটাই তীব্র ছিল যে, জামালপুরে ১৫টি ইউনিয়নে মরদেহ দাফনের মতো শুকনো জায়গাও ছিল না। কুড়িগ্রামের চিলমারী রেললাইনের পাশে একটি গণসমাধি তৈরি করা হয়। ১৯৭৪ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি হিসাবে রাজধানীর ১২৪টি ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নেয় ৮৫ হাজার ৭০০ মানুষ। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে, ১৯৭২ সালের জুনে মণপ্রতি চালের দাম ছিল ৭১ টাকা। এক বছর পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৬ টাকায়। ১৯৭৪ সালের জুনে ১৬২ আর ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি নাগাদ চালের দাম মণপ্রতি ৩৩০ টাকায় উঠে যায়। শুধু চাল নয়, ১২ টাকার প্রতি সের সরিষার তেল দুই বছরের ব্যবধানে উঠে যায় ৪১ টাকায়। গুড়, লবণ সবকিছুর দামই কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দেশের বাজারে মোটা ও মধ্যম মানের চালের গড়পড়তা মূল্যবৃদ্ধির তথ্য রয়েছে মহিউদ্দিন আলমগীরের ‘ফেমিন ১৯৭৪: পলিটিক্যাল ইকোনমি অব মাস স্টার্ভেশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গ্রন্থেও।

ওই গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে প্রতি মণ চালের দাম ছিল ৮৯ টাকা ৬০ পয়সা। ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে তা ১২০ টাকা ৫০ পয়সায় উন্নীত হয়। পরের অর্থবছরে তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ২৪৪ টাকা ৪০ পয়সায়।