১৯৯১-র ঘূর্ণিঝড়

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯ | ৪ ভাদ্র ১৪২৬

১৯৯১-র ঘূর্ণিঝড়

বিবিধ ডেস্ক ১:৫৩ অপরাহ্ণ, মে ০৮, ২০১৯

print
১৯৯১-র ঘূর্ণিঝড়

২৯ এপ্রিল ১৯৯১। কক্সবাজার উপকূলের মানুষের জন্য এক ভয়বহ রাত। ঘণ্টায় ২৪০ কিমি গতিবেগে বাতাস আর প্রায় ২০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস নিয়ে রাত প্রায় বারোটা নাগাদ উপকূলে আছড়ে পড়ে হারিকেনের শক্তিসম্পন্ন প্রবল এক ঘূর্ণিঝড়। ওই সময় ঢাকার আবহাওয়া অফিসে কাজ করতেন বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত আবহাওয়াবিদ সমরেন্দ্র কর্মকার। তিনি দেখেছিলেন কীভাবে একটি দুর্বল লঘুচাপ হারিকেন শক্তিসম্পন্ন প্রবল এক ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়। ২৩ এপ্রিল সকালের দিকে লঘুচাপ হিসেবে ধরা পড়ে এটি। অবস্থান ছিল আন্দামান সাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে।

এরপর থেকে এটি ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। ২৫ এপ্রিল সকালের দিকে এটি নিম্নচাপে পরিণত হয়। ২৭ এপ্রিল সকালে এটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। সেদিন মধ্যরাতেই এটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। ২৮ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে এটি হারিকেন শক্তিসম্পন্ন প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয় বলে জানান সমরেন্দ্র কর্মকার। শক্তিশালী সে ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষ মারা যায়। ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন রেখে যায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে। প্রায় এক কোটি মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। উপকূলজুড়ে বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকে অসংখ্য মৃতদেহ।

ঘূর্ণিঝড়ে যে কেবল মানুষের প্রাণহানি ও বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছিল তা নয়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বিভিন্ন অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতির। এর মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান এবং নৌবাহিনীর জাহাজ। ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে পতেঙ্গায় বিমানবাহিনীর অধিকাংশ যুদ্ধবিমান নষ্ট হয়েছিল।

ওই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষের মৃত্যু বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিল। নিহতদের অনেক আত্মীয়-স্বজন বলছেন, তারা ঠিকমতো সতর্ক বার্তা শোনেননি। আবার অনেকে বলছেন, সতর্ক বার্তা শুনলেও তারা সেটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি। বিভিন্ন সংস্থার লোকজন ‘মহাবিপদ সংকেতে’র কথা প্রচার করেছিল। কিন্তু কোনো মানুষ সেটাকে পাত্তা দেয়নি।

একরাতেই উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। বেঁচে থাকা অনেকের কাছেই ছিল অলৌকিক ঘটনার মতো। ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা ছিল এক রকম এবং পরবর্তী বিভীষিকা ছিল অন্যরকম। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে ছিল খাবার ও পানির সংকট। বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে ছড়িয়ে পড়ে নানা ধরনের রোগ। ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে শুরু হয় বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও টিকে থাকার লড়াই। স্বাধীন বাংলাদেশে এর আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগে একসঙ্গে এত মানুষ কখনো মারা যায়নি। উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালে উপকূলীয় জেলায় শক্তিশালী এক ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল বলে বলা হয়।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি কাটিয়ে পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলের মানুষের। সে ঘূর্ণিঝড়ের পর বাংলাদেশের উপকূলে প্রচুর ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের সময় উপকূলের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে সরিয়ে আনার পদ্ধতিও বেশ জোরদার হয়েছে।